The Veritas
03/09/2026
যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল অতিক্রম করত। আজ সেই সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় শূন্যের কোটায়।
অদ্ভুত হলেও সত্য—ইরান পানিতে মাইন পেতেছে বলে নয়, কোনো ট্যাঙ্কারে হামলা হয়েছে বলেও নয়। বরং কারণ, Lloyd’s of London ফোন তুলেছে।
“Operation Epic Fury” শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধঝুঁকি বীমা আন্ডাররাইটাররা হরমুজ প্রণালী পারাপারের পলিসি বাতিল করতে শুরু করে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে—প্রিমিয়াম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বেসলাইন যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম জাহাজের Hull Value-এর ০.২৫ শতাংশ। Hull Value হলো জাহাজটির ঘোষিত বাজারমূল্য—যার ওপর ভিত্তি করে বীমা কোম্পানি প্রিমিয়াম নির্ধারণ করে।
সঙ্গত কারণেই এখানে একটি প্রেক্ষাপট উল্লেখযোগ্য। লেখক যুক্তরাষ্ট্রে একটি বীমা প্রতিষ্ঠানে Commercial Insurance Specialist হিসেবে কর্মরত। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলা যায়—এই যুদ্ধে ইন্সুরেন্স একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করছে। যুদ্ধক্ষেত্রে গোলাবারুদ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, অর্থনীতির যুদ্ধে ততটাই গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি মূল্যায়ন ও বীমা কাঠামো। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হলে, তার প্রভাব শুধু যুদ্ধরত দেশেই সীমাবদ্ধ থাকে না—বিশ্ব অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই জ্বালানি সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে ইরান, হরমুজ প্রণালী এবং বীমা শিল্প।
একশ মিলিয়ন ডলারের একটি ট্যাঙ্কারের ক্ষেত্রে প্রতি যাত্রায় যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম দাঁড়ায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার। উত্তেজনা চরমে পৌঁছালে প্রতি ট্রানজিটে তা বেড়ে হতে পারে ১০ লাখ ডলার। ইতোমধ্যে আমেরিকান বা ইসরায়েলি স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো কার্যত বীমার অযোগ্য হয়ে পড়ছে। অর্থ যতই অফার করা হোক, যদি বীমা না মেলে—তবে কোনো পারাপারও নেই।
বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট। ওমানি অপরিশোধিত তেল নিয়ে বসরার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া KHK Empress হরমুজের মাঝপথ থেকে ইউ-টার্ন নিয়ে ভারতে চলে যায়। দুই মিলিয়ন ব্যারেল সৌদি তেল নিয়ে চীনের পথে থাকা Eagle Veracruz পশ্চিম প্রবেশমুখে থেমে যায়। ইরাকি তেল নিয়ে রটারডামের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা Front Shanghai শারজাহ উপকূলে নোঙর ফেলে। জাপানের Nippon Yusen তাদের পুরো বহরকে হরমুজ এড়িয়ে চলার নির্দেশ দেয়। গ্রিস তাদের বাণিজ্যিক নৌবহরকে ঝুঁকি পুনর্মূল্যায়নের পরামর্শ দেয়। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শিপিং কোম্পানি Hapag-Lloyd সব ধরনের ট্রানজিট স্থগিত করেছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয়—তাদের কারও ওপর গুলি চলেনি। প্রত্যেকেই একই ফোনকল পেয়েছে।
পঞ্চাশ মিলিয়ন বছর আগে আরবীয় প্লেট ও ইউরেশীয় প্লেটের সংঘর্ষে পারস্য উপসাগর একটি অববাহিকায় রূপ নেয়, যার নিষ্কাশন পথ একটি মাত্র ভূতাত্ত্বিক সংকীর্ণ গলা—মাত্র একুশ মাইল প্রশস্ত। এই bottleneck দিয়েই বিশ্ব পেট্রোলিয়ামের ২১ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত এলএনজির ২০ শতাংশ অতিক্রম করে। শিল্পসভ্যতার জ্বালানি সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এমন একটি সরু পথে প্রবাহিত, যা ইংলিশ চ্যানেলের চেয়েও সংকীর্ণ। যার এক পাশে সেই দেশ, যার সর্বোচ্চ নেতা গত শনিবার সকালে নিহত হয়েছেন।
সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা প্রশ্নাতীত। USS Abraham Lincoln ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইআরজিসি-র টহল নৌকা ধ্বংস করার মতো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র বহন করে। ১৯৮৮ সালের “Operation Praying Mantis” মাত্র আট ঘণ্টায় ইরানের নৌক্ষমতাকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। পঞ্চম নৌবহর বহু দশক ধরে এই পরিস্থিতির মহড়া দিয়েছে।
কিন্তু এখানে আসল বিষয় সামরিক শক্তি নয়। বিমানবাহী রণতরী কোনো আন্ডাররাইটারকে নতুন করে বীমা পলিসি লিখতে বাধ্য করতে পারে না। টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র প্রিমিয়াম কমাতে পারে না। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী নৌবাহিনীও Lloyd’s of London-এর কোনো সিন্ডিকেটকে বুঝাতে পারে না যে, দুবাইয়ে যখন ক্ষেপণাস্ত্র পড়ছে, তখন ইরানের উপকূল ঘেঁষে চলা একটি VLCC (Very Large Crude Carrier) গ্রহণযোগ্য ঝুঁকি।
গোল্ডম্যান স্যাক্সের পূর্বাভাস—ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। JP Morgan বলছে ১২০ থেকে ১৩০ ডলার। সে স্তরে পৌঁছালে প্রতিটি এয়ারলাইন ক্ষতিতে ডুববে। প্রতিটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখবে—তিন বছর ধরে যে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই চলছিল, তা এক রাতেই আবার জেগে উঠেছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিকল্প পাইপলাইন মিলিয়ে দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল পরিবহন সম্ভব। অথচ হরমুজ দিয়ে যেত দুই কোটি ব্যারেল। হিসাব সহজ—বিকল্প পথ দিয়ে ঘাটতি পূরণ সম্ভব নয়।
ইরান এমন একটি বিষয় বুঝে গেছে, যা পেন্টাগন এখনো পুরোপুরি অনুধাবন করেনি।
প্রণালী বন্ধ করার জন্য মাইন বা গোলাবারুদ প্রয়োজন নেই।
শুধু সেটিকে বীমার অযোগ্য করে তুললেই যথেষ্ট।
মইনুল হক
ডেট্রয়েট, মিশিগান।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the business
Website
Address
Detroit, MI
48093