NCC Rampurhat

NCC Rampurhat

Share

14/06/2022

১২ জুন বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। শিশুশ্রম নয়, শিশুর জীবন হোক স্বপ্নময়।

শিশুর অধিকার সু-রক্ষা ও ঝুঁকিপূর্ন শিশুশ্রম প্রতিরোধের লক্ষ্যে আন্তজার্তিক শিশু শ্রম সংস্থা (আইএলও) ২০০২ সাল থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালন করে আসছে, বর্তমানে বিশ্বের ৮০টি দেশে পালিত হচ্ছে এ দিবসটি। আইএলও দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘সামাজিক সুরক্ষা ও কল্যাণ নিশ্চিত করি, শিশুশ্রম বন্ধ করি।’

শিশুশ্রম আইন ও শৈশবের হালহকিকত্।

বিকেলের দিকে যদি আসেন, জবাকে বাড়িতেই পাবেন। দূর থেকেই দেখতে পাবেন, টালির ঘরের সামনের উঁচু মাটির দাওয়ায় উবু হয়ে ঝুঁকে বসে সে কিছু একটা করছে। আর একটু কাছে এলে বুঝতে পারবেন, সেটা আসলে সেলাই জাতীয় কোনও কাজ। সামনে প্রমাণ সাইজের একটা কাঠের ফ্রেম, তাতে আঁটা একটা শাড়ির ওপর হুমড়ি খেয়ে বসে। চোখ আর পুরো মনোযোগটা ওর ডান হাতের সুচ আর শাড়ির ওপর হালকা পেনসিলে আঁকা ডিজাইনের ওপর সাঁটা। প্রথম দু’বার ডাকলে হয়তো সাড়াও মিলবে না। তার পর, কাজ এক মুহূর্তের জন্যও না থামিয়ে, শাড়ি থেকে চোখ না তুলেই আপনার কথার উত্তর দিতে শুরু করবে বছর বারোর বাচ্চা মেয়েটি। কলকাতা থেকে ঘণ্টাদুয়েকের পথ উজিয়ে এসে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার মল্লিকপাড়া গ্রামে বিকেলের পড়ে আসা আলোয় এ ভাবেই অন্য এক ভারতবর্ষের সঙ্গে আপনার পরিচয় ও কথোপকথন শুরু হবে।
তিন ভাই আর দু’বোনের মধ্যে জবা ’ই সবচেয়ে বড়ো। বাবা নুর আলির চাষের জমি -জায়গা বলতে কিছুই নেই, উস্তির বাজারে মুরগি কেটে রোজগার। মা রুকসানা বিবি কলকাতায় ক’বাড়ি কাজ করে, রোজ ভোর পাঁচটার জয়নগর লোকালের ডেলি প্যাসেঞ্জার। ছোট ভাই দু’টো যেহেতু একেবারেই ছোটো, ফলে তাদের দেখভাল জবারই দায়িত্ব। তাদের ঘুম থেকে তোলা, স্নান করানো, খাওয়ানো, তার সঙ্গে বাড়ির রান্নাবান্না, বাসন মাজা, দাওয়া -উঠোন ঝাঁট … এমনকী পাশের পুকুর থেকে জল তুলে আনাও। ‘তুই রান্নাও করতে পারিস? ’প্রশ্ন শুনে ফিক করে হেসে ঘাড় কাত করে জবা, ‘সে তো সবাই পারে। ’‘কী কী রাঁধিস? ’‘কেন? ভাত, ডালসেদ্ধ, আলুর তরকারি, সব ...সে আর কি কঠিন কাজ …! ’‘তার পর কী করিস? ’…সংসারের সব কাজ সামলে, নিজে স্নান -খাওয়া করে, রান্নার এঁটো বাসন ধোয়াপাখলা সেরে এর পর স্কুলে যাবে জবা খাতুন। পাড়ার অনেক মেয়েই যেমন যায়। সমবয়সি সখিদের সঙ্গে কলকল করতে -করতে বইখাতা বুকে চেপে প্রায় দু’কিলোমিটার রাস্তা হেঁটেই যাওয়া। তার পর স্কুল। ফিরতে -ফিরতে বেলা গড়িয়ে সেই বিকেল। তার মধ্যে মা এসে যাবে। বাবাও। বাড়ি ফিরে মুড়ি খেয়ে, তার পর কাজে বসতে হবে তাকে। মা শাড়িতে জরি সেলাইয়ের কাজ করে। কলকাতা থেকে ফেরার পথে অর্ডার নিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে কাঠের ফ্রেমে শাড়িটাকে টানটান করে আটকে, সুচ -সুতো নিয়ে কাজ শুরু। তার মধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামবে, সন্ধে গড়িয়ে রাত … হারিকেনের কালি -পড়া আলোয় সরু সুতো নিয়ে কাজ করতে -করতে চোখ লাল হয়ে ব্যথা করতে শুরু করবে, কোমর ধরে যাবে, ঘাড় টনটন করতে থাকবে …‘তুই কবে থেকে করছিস জরির কাজ? ’‘ছোটবেলা থেকেই। প্রথম প্রথম মায়ের পাশে বসে দেখতাম, দেখতে -দেখতে শিখে গেলাম …’‘ছোটবেলা থেকে মানে? তুই কি বড়ো হয়ে গিয়েছিস নাকি? ’‘বড়োই তো। পাঁচ বছর ধরে এই কাজ করছি। টাকাও পাই, জানো? ’ সে যে দস্ত্তরমতো রোজগেরে, অসম্ভব জোর দিয়ে সে খবর আপনাকে শোনাবে বারো বছরেই ছোটবেলা পার করে আসা জবা খাতুন।
‘ভালো লাগে তোর জরির কাজ? ’‘নাহ ’...খানিক সময় নিয়ে উত্তর দেয় জবা। হয়তো বোঝার চেষ্টা করে, এর মধ্যে ভালো লাগা বা মন্দ লাগার প্রশ্নটা আসছে কোত্থেকে।
‘তবে করিস কেন? ’‘মা একা পারে না যে…’‘তুই খেলতে যাস না কেন বন্ধুদের সঙ্গে? ভালো লাগে না? ’‘খুব। ’‘তা হলে যাস না কেন খেলতে? আসার পথে যে দেখলাম সবাই দাড়িয়াবান্ধা খেলছে … তোর বন্ধুরা তোকে খেলায় নেয় না? ’প্রশ্ন শুনে চোখে বোধ হয় একটু ছায়া ঘনায় মেয়ের। কান পেতে শোনে পাশের মাঠ থেকে ভেসে আসা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের হইচই। একটু থেমে বলে, ‘নেবে না কেন? গেলেই নেবে। কত ডাকে রোজ …’‘তা হলে? যাস না যে? ’‘এগুলো তো টাইমের কাজ। তিন দিনের মধ্যে গোটা শাড়িটা শেষ করতে হবে তো’… চোখ নামিয়ে হাতের কাজের ওপর ফের উপুড় হয়ে পড়ে ১২ বছরের জবা খাতুন। শিশুশ্রমিক কাকে বলে, জবা জানে না। তার জন্মের ১৭ বছর আগেই যে সরকার সারা দেশে শিশুশ্রম বন্ধ করতে আস্ত একটা আইন বানিয়ে ফেলেছে, এই ক’দিন আগেই যে সে আইন সংশোধন করার ছাড়পত্র দেওয়া নিয়ে দফায় -দফায় বৈঠক করেছে কেন্দ্রীয় ক্যাবিনেট, সে সংশোধনীর যাথার্থ্য নিয়ে দেশ জুড়ে যে শোর মচে গিয়েছে, মস্ত এই খবরটাও তার কাছে পৌঁছয়নি। হয়তো বা তার বাবা -মার কাছেও নয়। বা হয়তো পৌঁছেছে, কিন্ত্ত সে আইনটা যে তৈরি হয়েছে বিশেষ করে তাদের মেয়ের জন্যই, সে তথ্যটা, বা তার গুরুত্ব হয়তো তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি। দেশের সরকার যে খাস দিল্লিতে বসে এই অজ মল্লিকপাড়া গাঁয়ে তাদের খিনখিনে চেহারার কালোকোলো মেয়েটার কথা ভেবেছে, এটা হয়তো কেউ মাথায় ঢুকিয়ে দেয়নি তাদের। যদি ঢোকাত, তা হলে স্রেফ সেই গর্ববোধ থেকেই হয়তো মুরগি বেচার টাকা দিয়ে সন্ধেবেলা চোলাইয়ের ঠেকে বসার আগে দু’বার ভাবত বাবা নুর আলি। মা রুকসানা হয়তো ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা সুনিশ্চিত করার জন্য আরও দু’বাড়ি কাজ খোঁজার তাগিদ অনুভব করত। কিন্ত্ত বলা বাহুল্য, সে সব কিছুই হয়নি। দেশের আরও পাঁচটা আইনের মতোই শিশুশ্রম -নিরোধক আইন তৈরি হয়েছে, আইনটা ঠিক হল কিনা তা নিয়ে চুলচেরা গবেষণা হয়েছে, বদলানোর প্রস্তাব নিয়ে মিটিং হয়েছে, ২৮ বছর পরে অবশেষে বদলেছেও, কিন্ত্ত সেটা যে নোটিফিকেশনের কাগজের আওতা থেকে বের করে এনে কাজেও লাগানো দরকার, হাজার কাজের ব্যস্ততায় সেটা আর মাথায় রাখা হয়ে ওঠেনি।
নয়া সংশোধনী প্রস্তাব মোতাবেক অবশ্য জবার জরির কাজে শর্তসাপেক্ষে ছাড় দিয়েছে সরকার। বলা হয়েছে, বিপজ্জনক নয় এমন পারিবারিক পেশায় কাজ করতে পারবে ১৪ বছরের কমবয়েসি ছেলেমেয়েরা, কিন্ত্ত তার জন্য পড়াশোনা নষ্ট করা চলবে না। স্কুলের সময় বাদ দিয়ে বাকি সময়টায়, বা ছুটিছাটায় কাজ করা যাবে। তার মানে কি সরকার থেকে প্রকারান্তরে বলেই দেওয়া হল যে, জবাদের এখন থেকে আর ছুটির প্রয়োজন নেই--- অবসর যাপন ও খেলাধুলো আসলে ওদের বেড়ে ওঠার পথে নিছকই ‘হলেও হয়, না -হলেও ক্ষতি নেই’ গোত্রের বিলাসিতা, পোশাকি ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে ‘সুপারফ্লুয়াস লাক্সারি ’? ৩আইনের তর্কে ঢোকার আগে একবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার মল্লিকপাড়া থেকে একটু কষ্ট করে যেতে হবে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায়। হয়তো নিছকই সমাপতন, তবে আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম -বিরোধী দিবসের মাত্রই মাসখানেক আগে সেখানে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে শিশু শ্রমিকরা। উঠে এসেছে বড়ো মর্মান্তিক ভাবে ; বেআইনি বাজি কারখানায় বিধ্বংসী বিস্ফোরণের হাত ধরে। শিশুশ্রমকে খবর -কাগজের প্রথম পাতায় পৌঁছে দিতে গিয়ে বেমালুম খরচের খাতায় চলে গিয়েছে ছ-ছ’টা ঝকঝকে, তাজা প্রাণ ! দেশজোড়া হাজার গুরুত্বপূর্ণ খবরের ঘনঘটায় প্রথম পাতায় একটা নতুন হেডলাইন যোগ হয়েছে। আর, তার পর, প্রত্যাশিত ভাবেই, তা হারিয়েও গিয়েছে দিনকয়েকের মধ্যেই। খবরের যেটুকু বেঁচে থেকেছে, তার পুরোটাই দখল করেছে বিস্ফোরণের ‘আসল ’ কারণ নিয়ে ‘সনসনি খুলাসা ’, তার গূঢ় রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে তর্কযোগ্য নানা চাপান -উতোর, টানা -হ্যাঁচড়া, বিবৃতি, পালটা বিবৃতি ইত্যাদি। গুরুত্বপূর্ণ এই সব হাজারো ‘নিউজ অ্যাঙ্গল ’-এর ভিড়ে আড়ালেই চলে গিয়েছে তর্কাতীত ভাবে হাড় -হিম -করে -দেওয়া এই তথ্যটি যে, বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণে যে ১২টি প্রাণ গিয়েছিল, তার মধ্যে ছ’ জনই কিশোর, যাদের বয়স ১২ থেকে ১৪ বছরের আশেপাশে। অর্থাত্, আইনের ভাষায়, যারা বিলক্ষণ ‘শিশু ’।
ঠিক কী ছিল তাদের অপরাধ, প্রাণ দিয়ে যার প্রায়শ্চিত্ত করতে হল ওই শিশুদের? বয়স ১২ থেকে ১৪ -র আশেপাশে, মানে ওদের তো এই সময়টা ইস্কুলে থাকার কথা ছিল ! মুর্শিদাবাদের সুতিতে যাদের বাড়ি, সেখান থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে পশ্চিম মেদিনীপুরের পিংলায় তারা কী করছিল তা হলে ! কী ভাবে তারা পৌঁছল বাড়ি থেকে অত দূর? কে নিয়ে গেল তাদের? কেন? বাড়ির লোকেরা কেন যেতে দিলেন? পাড়াপড়শিরা কেন বাধা দিলেন না? স্থানীয় প্রশাসনের কী ভাবে তা নজর এড়িয়ে গেল? খবরের কাগজের বয়ান যদি সত্যি হয়, তা হলে অন্তত পাঁচ -ছ’মাস ধরে ওই কিশোরেরা কাজ করছিল বাজির কারখানায়। ওরা যে নাবালক, তা কেন এত দিনেও চোখে পড়ল না কারখানা -কর্তৃপক্ষের? নাকি চোখে পড়লেও তা সযত্নে এড়িয়ে যাওয়া হল? কেন? খবরে প্রকাশ, পিংলার গ্রামবাসীরা নাকি একাধিক বার স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন বেআইনি কারখানাটির ব্যাপারে। কিন্ত্ত সেখানে যে শিশুশ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো হয়, সে খবর কি তাঁদের কাছে ছিল? যদি থেকে থাকে, তা কি প্রশাসনের নজরে এনেছিলেন তাঁরা? সে খবরে প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? শিশুশ্রম -বিরোধী আইনে যেখানে ১৪ বছরের কমবয়েসিদের জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে, সেখানে এত কাণ্ড কোত্থাও কারও নজরে পড়ল না? কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হল না? মারাত্মক বিপজ্জনক বাজির মশলা নিয়ে দিনের পর দিন কাজ করছে এতগুলি কিশোর, যে কোনও মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা, এ আশঙ্কা কারও মাথায় এল না? এমন অনেক প্রশ্ন… প্রশ্নের আড়াল থেকে ভিড় করে আসা আরও অনেক -অনেক প্রশ্ন। বলা বাহুল্য, এ সবের কোনওটিই নতুনও নয় তেমন। এমনও নয় যে, অভিনব এই ঘটনা এ বারই প্রথম ঘটল … এমন মারাত্মক কিছু এর আগে কস্মিনকালে ঘটেনি, ফলত এ ধরনের ঘটনার জন্য আমরা আদৌ প্রস্ত্তত ছিলাম না। বস্ত্তত, বাজি কারখানায় আগুন লেগে বা বিস্ফোরণে শিশুশ্রমিকদের মৃত্যুর খবর ইতিপূর্বে বহু বার আমরা শুনেছি, কখনও অন্ধ্রে বা তামিলনাড়ুতে, কখনও বা এই বাংলাতেও। তা নিয়ে বিস্তর লেখালেখিও হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে শিশুশ্রম -নিবারণ আইনও হয়েছে উত্তরোত্তর কড়া। কিন্ত্ত কাজের কাজ তাতে কদ্দূর হয়েছে? শিশুশ্রম -নিবারণ আইন বলছে, ১৪ বছরের নীচে শিশুদের কোনও বিপজ্জনক পেশা বা জীবিকায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ। বিপজ্জনক পেশার যে তালিকা আইনে উল্লেখ করা হয়েছে, তার একেবারে ওপরের দিকেই রয়েছে বাজি প্রস্ত্তত শিল্প। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন আরও কঠোর, সেখানে ১৮ বছরের নীচে শিশুশ্রমকে সম্পূর্ণ বেআইনি বলে ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের সেই নির্দেশিকায় অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে ভারতও জাতীয় শিশুনীতিতে শিশুর বয়ঃসীমা ১৮ বছর বলে নীতিগত ভাবে মেনে নিয়েছে। কিন্ত্ত কার্যক্ষেত্রে শিশুশ্রম আইন এখনও শৈশবের সর্বোচ্চ বয়ঃসীমা বলতে ১৪ বছর বয়সকেই কেন বোঝে, তাও অবশ্যই সঙ্গত এবং প্রাসঙ্গিক জিজ্ঞাস্য। কিন্ত্ত সে বিতর্কে না -ঢুকেও এ -কথা অবশ্যই বলা যেতে পারে যে, সংশ্লিষ্ট আইনের যথাযথ রূপায়ণ বলতে যা বোঝায়, আমরা এখনও তার থেকে ঢের দূরে দাঁড়িয়ে। ধরেই নেওয়া যেতে পারে, কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখে স্বেচ্ছায় দরখাস্ত করে পিংলার বাজি কারখানায় ‘চাকরি ’ করতে আসেনি সুতির হতভাগ্য কিশোরেরা। খবরের কাগজের প্রতিবেদনেও জানা গিয়েছে, স্থানীয় কেউই তাদের ‘মোটা রোজগারের লোভ ’ দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল পিংলায় ; পৌঁছে দিয়েছিল বাজি কারখানায়। সে সংবাদ যদি সত্যি হয়, তা হলে এমন একটি প্রস্তাবে কেন রাজি হলেন ওদের বাবা -মায়েরা? ওঁরা না -হয় দরিদ্র, অর্ধশিক্ষিত … আইন তেমন জানতেন না, কিন্ত্ত এমন একটি বিপজ্জনক কাজের সঙ্গে যে তাঁদের সন্তানের প্রাণের ঝুঁকি জড়িয়ে, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি? নাকি অপরিসীম দারিদ্রের সংসারে ক’টা বাড়তি টাকার স্বপ্ন চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল তাঁদের? আশেপাশে কেউ ছিলেন না তাঁদের ভুল ভাঙানোর জন্য? প্রশ্ন আরও থাকে। গ্রামের কোনও কিশোর -কিশোরী যদি দীর্ঘদিন স্কুলে না যায়, তা হলে শিক্ষকদেরও দায়িত্ব বাড়ি গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেওয়া … শিক্ষার অধিকার আইনের এই নিহিত বার্তাটি কি মনে রাখেননি স্থানীয় বিদ্যালয় -কর্তৃপক্ষ? যদি ধরে নেওয়া হয় যে, ওই হতভাগ্য শিশুরা কখনও স্কুলের গণ্ডি মাড়ায়নি … তা হলে তাতেও তো শিক্ষার অধিকার আইনের প্রয়োগজনিত অসম্পূর্ণতাই প্রমাণিত হয়? গ্রামের কোনও কিশোর দীর্ঘদিন ধরে বাইরে থাকলে সে কোথায় রয়েছে, কী করছে, কে তাদের নিয়ে গিয়েছে, কী বলে নিয়ে গিয়েছে ইত্যাদি তথ্য অনুপুঙ্খ জানাও কিন্ত্ত শিশু -সুরক্ষা আইন -মোতাবেক স্থানীয় প্রশাসনের কাজের মধ্যে পড়ে। সে জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকাঠামোও যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে অর্থের সংস্থানও। সে সব কাজ কতটা সুষ্ঠুভাবে চলছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে পিংলা।
জবা, বা জবার মতো অসংখ্য আরও ছেলেমেয়ে যারা শাড়িতে জরি বসানোর কাজ করছে, বাসন ধুচ্ছে চায়ের দোকানে, জুতো পালিশ করছে স্টেশন -চত্বরে, চাষের মাঠে কীটনাশক ছড়াচ্ছে, বিড়ি বাঁধছে, ধুপকাঠি -মোমবাতি -দেশলাই তৈরি করছে, কার্পেট বুনছে, ইটভাটায় -ক্রাশারে -স্পঞ্জ আয়রন কারখানায় -সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে কাজ করছে … তাদের অধিকাংশই পিংলার বাজি কারখানার মৃত শিশুদের চেয়ে অনেক বেশি ভাগ্যবান। অন্তত পৈতৃক প্রাণটা তো এখনও যায়নি তাদের।
কিন্ত্ত শৈশবটা যে চলে গেল ! অবান্তর প্রশ্ন। সে সব নিয়ে আর কবেই বা কে ভেবেছে ! ভাবলে কি শিশুশ্রম -নিরোধক আইন সংশোধনে দীর্ঘ ২৮ বছর লেগে যায়? আজ আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম বিরোধী দিবস। দীর্ঘ আঠাশ বছর পরে খাতায় কলমে ভারতে শিশু শ্রম আইন সংশোধিত হয়েছে। কিন্ত আইনের বাস্তব রূপায়ণ কি আদৌ হচ্ছে? লিখছেন অভী আচার্যবাজি কারখানায় আগুন লেগে শিশুশ্রমিকদের মৃত্যুর খবর ইতিপূর্বে বহু বার আমরা শুনেছি, কখনও অন্ধ্রে বা তামিলনাড়ুতে, কখনও বা এই বাংলাতেও। তা নিয়ে বিস্তর লেখালেখিও হয়েছে। সরকারি উদ্যোগে শিশুশ্রম -নিবারণ আইনও হয়েছে উত্তরোত্তর কড়া। কিন্ত্ত কাজের কাজ তাতে কদ্দূর হয়েছে? পিংলায় বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণের পরে।

সংবাদপত্র থেকে তথ্য সংগৃহীত - প্রতাপ সাহা (https://www.facebook.com/pratapcsaha)। ধন্যবাদ।.........

Want your school to be the top-listed School/college in Rampur Hat?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Address


Rampur Hat
731202

Opening Hours

Monday 9am - 5pm
Tuesday 9am - 5pm
Wednesday 9am - 5pm
Thursday 9am - 5pm
Friday 9am - 5pm
Saturday 9am - 5pm