Abta Nadia
পশ্চিমবঙ্গ দিবস : শ্যামাপ্রসাদ কতটুকু কৃতিত্বের দাবিদার?
রাজ্য জুড়ে উৎসবের আবহ... যোগ বিয়োগের ঘনঘটা। এর মধ্যেই হাজির হয়েছে ২০ জুন তারিখটি। স্বাধীনতার আটাত্তরটি বসন্ত পার করে অবশেষে তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ... সহসা তার অঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের সম্মান। এবং জনগণ উল্লসিত। তবে নিন্দুকও কম নেই। তারা সব ভালো কাজেই বাগরা দেয়। এবারেও প্রশ্ন তুলেছে, কেন? কী প্রয়োজন?
এমনিতেও দেশভাগ খুব জটিল একটি রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ইতিহাস। এক কথায় বা একটি ব্যক্তির নিরিখে ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা সম্পূর্ণ ভুল ভাবনা। আজ পশ্চিমবঙ্গ দিবসকে নিয়ে যা বলা হচ্ছে সমস্তটাই বিশুদ্ধ রাজনৈতিক ন্যারেটিভ। যার ঐতিহাসিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। কিন্তু কিছু জনপ্রিয় কয়েনেজ ব্যবহার করে, যেমন হিন্দু বাংলা বা মুসলিম বাংলা ইত্যাদি ...এই ছদ্ম ইতিহাসকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয়েছে। যেভাবে হিন্দুত্ববাদী বা অন্যান্য রাজনৈতিক অন-ইতিহাস ছড়িয়ে দেওয়া হয় সেভাবেই।
২০ শে জুনকে আলাদাভাবে দেখবার চেষ্টাটা তাই সম্পূর্ণ অযৌক্তিক । দেশভাগ তথা বাংলাভাগের বীজ নিহিত ছিল ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গের মধ্যেই, কিংবা তারও আগে। এবং বিভিন্ন চাপানউতরের পর ... কমিউনাল রোয়েদাদ ইত্যাদি... দ্বি’জাতি তত্ত্বের সূত্রপাত হয় যার প্রথম উল্লেখ অবশ্য ১৯৩৭ সালে সাভারকারের ভাষণে দেখতে পাওয়া যায়। এবং সাভারকরের ভাবনার সঙ্গে মুসলিম লীগের দ্বিজাতি তত্ত্বের ভাবনা সম্পূর্ণভাবে মিলে যায় যেখানে হিন্দু এবং মুসলিমকে দুটি পৃথক জাতি হিসেবে তুলে ধরবার চেষ্টা করা হয়েছে।
এই পথেই ২০ জুন আসলে মাউন্টব্যাটেনের ৩রা জুনের ডিক্লারেশনের একটা মধ্যকালীন ধাপ মাত্র। এবং দেশভাগই যে একমাত্র পথ সেইটা মোটামুটি সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বই মেনে নিয়েছিলেন। ফলে দ্বি-জাতি তত্ত্বকেই দেশভাগের ভিত্তি করে তোলা হয়। মুসলিম লীগ ১৯৪০ সালে লাহোর অধিবেশনে পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করে। এরপর ১৯৪৭-এর ৮ই মার্চ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিও জানিয়ে দেয় যে দেশভাগ যদি হতেই হয়, তাহলে মুসলমান-প্রধান বাংলা আর পাঞ্জাবকেও ভাগ করতে হবে। দেশ ভাগের পদ্ধতি নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতৃত্ব — দ্বন্দ্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয় বাংলা ও পাঞ্জাব। তৎকালীন ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন দায়িত্ব নিয়েই এই দ্বন্দ্বের মীমাংসায় কংগ্রেস, লিগ এবং শিখ নেতৃত্বের সঙ্গে বারংবার আলোচনায় বসেন, এবং তাদের প্রায় বাধ্য করেন মেনে নিতে যে এই দ্বন্দ্বের মীমাংসায় জন্য দেশভাগ অনিবার্য সিদ্ধান্ত। তবে এটাও বোঝাপড়ায় আসে যে পাঞ্জাব ও বাংলার অমুসলিম প্রধান এলাকাগুলো পাকিস্তান থেকে বাদ দেওয়া হবে। এই প্রেক্ষিতেই ৩রা জুন মাউন্টব্যাটেন ডিক্লারেশন আসে। ইংল্যান্ডের মন্ত্রিসভা যা ঠিক করে, তাই এখানে প্রতিফলিত হয় - ‘For the immediate purpose of deciding on the issue of partition, the members of the legislative assemblies of Bengal and the Punjab will sit in two parts according to Muslim majority districts (as laid down in the Appendix) and non-Muslim majority districts. This is only a preliminary step of a purely temporary nature as it is evident that for the purposes of final partition of these provinces a detailed investigation of boundary question will be needed; and as soon as a decision involving partition has been taken for either province a boundary commission will be set up by the Governor-General, the membership and terms of reference of which will be settled in consultation with those concerned. It will be instructed to demarcate the boundaries of the two parts of the Punjab on the basis of ascertaining the contiguous majority areas of Muslims and non-Muslims. It will also be instructed to take into account other factors. Similar instructions will be given to the Bengal Boundary Commission. Until the report of a boundary commission has been put into effect, the provisional boundaries indicated in the Appendix will be used...’ : দুই মুসলমান প্রধান রাজ্য, বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভাগ করে মুসলমান-প্রধান জেলাগুলো যাবে পাকিস্তানে, আর বাদবাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ঘোষণা করেন যে দশ সপ্তাহের মধ্যে ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যাবে। প্রথমে ১৯৪৮ সাল, পরে মাউন্টব্যাটেনের তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তে ঠিক হয় ১৯৪৭ এর ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের দুই উত্তরসুরীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হবে। এই প্রস্তাব হিন্দু-মুসলিম এবং শিখ পক্ষ ... এবং তাদের প্রতিনিধি হিসেবে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ (হিন্দু মহাসভার কোন প্রতিনিধিত্বই ছিল না) ও শিখদের প্রতিনিধি এই প্রস্তাবটি স্বীকার করে নেওয়ায় কার্যত দেশভাগ অবশ্যম্ভাবী হয়ে যায়। যাকে আইনিভাবে ২০ জুনের প্রাদেশিক আইনসভার ভোটাভুটিতে চূড়ান্ত করা হয়। এই সময়ে গুরুদাসপুর, নোয়াখালী এবং কলকাতার দাঙ্গা হিন্দু ও মুসলিম উভয় জনগোষ্ঠীর মনে পরস্পরের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ তৈরি করে। যার সুযোগ নিয়ে কংগ্রেস ও লীগের বিভাজনপন্থী নেতৃত্ব দেশকে ভাগ করার পরিকল্পনায় সফল হয়।
তৃতীয় আরেকটি পক্ষ, কমিউনিস্টদের অবস্থান কিন্তু বরাবর দেশভাগের বিপক্ষেই ছিল। এবং অখন্ড বাংলাকে ভারতের মধ্যে রাখার পক্ষে তারা মতামত দিয়েছে - কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাদের এই মতামত স্পষ্ট ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। অথচ দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ থাকায় কংগ্রেসের ভিতরে থেকে কাজ করা, পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমকালে ফ্যাসিবাদকে পরাস্ত করার ভাবনায় জাতীয় আন্দোলন থেকে সরে থাকলেও এবং তৎকালীন ভারতে বিভিন্ন শ্রেণী আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যথেষ্ট প্রভাব তৈরি করলেও কমিউনিস্ট বিরোধিতার জায়গা থেকে মাউন্টব্যাটেন তাদের আলোচনার অংশীদার করেনি। তা সত্ত্বেও তারা জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের একটি মডেল উপস্থাপন করেন … যেখানে ভারতীয় ডোমিনিয়নের ভিতরে প্রতিটি স্বতন্ত্র পরিচিতিগুলি একটি ফেডারেশন হিসাবে কাজ করবে। সোভিয়েত রাশিয়াকে অনুসরণ করে এই মডেল আপাতভাবে একটি জটিল প্রক্রিয়ার কথা বলেছিল - যা অনুধাবন করা সেই সময়ের জনগণের জাতীয়তাবাদী চরিত্রের পক্ষে সহজ ছিল না। কমিউনিস্টদের মধ্যেও এই নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি ছিল। তার ওপর তারা কোথাও পৃথক মুসলিম জাতিসত্তাকেও স্বীকৃতি দিয়েছিল, এবং হিন্দু অভিন্ন জাতিসত্তার বদলে সঠিকভাবেই তাকে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিচিতি ভিত্তিক সত্তার সম্মিলন হিসাবে দেখেছিল।
২০ জুন ভোটাভুটিতে প্রাথমিকভাবে কমিউনিস্টরা এই পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী অবস্থানের পক্ষেই মতামত দিয়েছিল। তিনজন কমিউনিস্ট প্রতিনিধি (জ্যোতি বসু, রতনলাল ব্রাহ্মিন, রূপনারায়ণ রায়) প্রথম পর্বের যৌথ অধিবেশনে বাংলার অখণ্ডতার প্রশ্নে ভোটগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে … যেহেতু গৃহীত প্রস্তাব তাদের অবস্থানের অর্থাৎ জাতির স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেনি। কিন্তু পরবর্তীতে যৌথ অধিবেশনে অখন্ড বাংলার ভারতে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব পরাজিত হলে, দেশভাগ অবধারিত হলে মুসলমান ও অমুসলমান (হিন্দু নয়) প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দুটি পৃথক অধিবেশনের ভোটাভুটিতে পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে ভোট দেয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে রক্ষা করার তাগিদে … স্বাধীনতা পত্রিকায় এবং পরবর্তীকালে জ্যোতি বসুর আত্মজীবনীতে, এবং বিভিন্ন কমিউনিস্ট নেতৃত্বের লেখালেখিতে এই মনোভাব স্পষ্ট হয়। তবে তাদের এই জটিল অবস্থানের প্রতিফলন আপাতভাবে দেশভাগের পক্ষেই তাদের মতামত - এই ধারণা তুলে ধরে, দক্ষিণপন্থী অংশের মতামতে। এবং একে কেন্দ্র করে বর্তমানে দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী ন্যারেটিভ এর নির্মাণ, যা দেশভাগের জন্য কমিউনিস্টদের ভিলিফাই করে। অপরদিকে হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধি হিসেবে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে হিন্দুদের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই যে প্রাদেশিক সভার নির্বাচন, তাতে জনগণের সার্বিক প্রতিনিধিত্ব ছিল না, মাত্র ১৪ শতাংশের ভোটে প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। বাংলা ভাগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি গণভোটের দাবি তুলেছিল, যা কোনদিনই নেওয়া হয়নি।
এটাও ভেবে দেখার মতো যে হিন্দু মহাসভার পক্ষে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় একা প্রতিনিধি ছিলেন, সার্বিক ভোটের বিচারে তাঁর সংখ্যা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বরং কংগ্রেসের বাংলা ভাগের পক্ষে থাকা বিধায়করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত এবং কিরণ শংকর রায়। অমুসলিম সংখ্যাধিক্য অংশ বা পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাব জয়ী হয় ৫৫-২১ভোটে। এই ৫৫টি ভোটের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মাত্র ১টি ভোট দিয়েছেন। যদি ভোট উনি নাও দিতেন, তাতেও সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হতো না। যদিও এটা ঠিক, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হিন্দুত্ববাদী অবস্থান কোন গোপন বিষয় ছিল না। দেশভাগ প্রসঙ্গে অবশ্য প্রাথমিকভাবে আরএসএস বা হিন্দু মহাসভা কোন মতামত রাখেনি, প্রথম সভারকার তার হিন্দু রাষ্ট্রের ধারণায় হিন্দু মুসলিম পৃথক জাতিসত্তার প্রসঙ্গ স্থাপন করেন, এবং অখন্ড হিন্দু ভারত রাষ্ট্রের কথা বলেন। পরবর্তীকালে দেশভাগ অনিবার্য হলে হিন্দু মহাসভা তার অবস্থান পরিবর্তন করে এবং হিন্দু বাংলার ধারণা সামনে আনে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এই পথেই উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু তার একক প্রতিনিধিত্ব কোনদিনই এই বিষয়ে ডিসাইসিভ ভূমিকা গ্রহণ করবার জায়গায় ছিল না। এটাও ঠিক, যে তিনি সারা জীবন তার এই চিন্তা ভাবনার সঙ্গেই ঘর করেন। রাজনৈতিক প্রয়োজনে তাকে ত্যাগ করেননি, বা সরে আসেন নি। এই প্রসঙ্গে কংগ্রেসের শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর প্রতি নরম দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবতাও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কংগ্রেসের বিভাজনপন্থী অংশ, যারা অনেকেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি তথা হিন্দু মহাসভার (বা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের) রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি আস্থাশীল ছিল। কিংবা মুসলিম রাজনীতির বিরুদ্ধে পাল্টা হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনার সমর্থক ছিল। কংগ্রেসের সমর্থনে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৪৬ সালের বাংলার প্রাদেশিক আইন সভায় প্রতিনিধি নির্বাচিত হন, স্বাধীনতার পরেও কংগ্রেস মন্ত্রিসভায় তাকে জায়গা দেওয়া হয়।
কংগ্রেসের হিন্দু রাজনীতির প্রতি ঝোঁক এর কথাগুলো সঠিক ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন অরিজিৎ Arijit Mukherjee । সাহায্য নিয়েছেন মূলতঃ জয়া চ্যাটার্জির লেখা ডিভাইডেড বেঙ্গল বইটির। অরিজিৎ লিখেছেন,
“তিরিশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড (কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড নামেও ইতিহাসে পরিচিত) আর বেঙ্গল টেনেন্সী অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট - মূলত: এই দুটো ঘটনা, আর গ্রামের দিকে বাড়তে থাকা কৃষক আন্দোলন - এই সবকিছুর জেরে ভদ্রলোক হিন্দুরা কংগ্রেসের দিক থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করে। বিশেষ করে যে জমিদার আর হিন্দু ব্যবসায়ীদের চাঁদার ওপর কংগ্রেস ভালোমত নির্ভরশীল ছিল, তারা বিমুখ হওয়ায় কংগ্রেস বেশ চাপে পড়ে যায়। ১৯৩৬-৩৭-এর প্রাদেশিক ভোটে আশিটা সাধারণ আসনের মাত্র আটচল্লিশটা আর বিশেষ সংরক্ষিত হিন্দু আসনের মাত্র চারটে জেতে কংগ্রেস। নির্দল হিন্দু প্রার্থীরা জেতে সাঁইত্রিশটা আসনে, হিন্দু মহাসভা দুটো আসনে।
হিন্দু এবং হিন্দুধর্মকে রক্ষার দাবী নিয়ে ততদিনে হিন্দু ভদ্রলোক আইডেন্টিটি তৈরী হয়ে গেছে - মূলত: শিক্ষিত সমাজকে ঘিরে, যাদের বেশিরভাগের গ্রামের দিকে জমিজমা, বাড়ি আর শহরে চাকরি ছিল - অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ক্ষমতাশালী উচ্চবিত্ত, বা মধ্যবিত্তের ক্রীমি অংশ। চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে প্রান্তিক গোষ্ঠীর লোকজনকেও এই বৃহত্তর হিন্দু সমাজের অংশ হিসেবে টেনে আনার চেষ্টা শুরু হয়। জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসবগুলো হয়ে ওঠে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র, ফলে গ্রাম বা ছোট মফস্বল শহরের সাধারণ হিন্দুদের মধ্যেও এই প্রবল হিন্দু আইডেন্টিটি ছড়াতে শুরু করে। ১৯৩৬-৩৭ এর ভোটের ফলাফলের পর কংগ্রেসও আর এর বাইরে থাকার কথা ভাবেনি। কমতে থাকা ফান্ড আর সরতে থাকা "ভদ্রলোক সাপোর্টের" ধাক্কায় কংগ্রেসও উঠেপড়ে লেগেছিল হিন্দু প্রোফাইল তৈরী করতে। প্রথম পদক্ষেপ ছিল সুভাষ-শরতের আমলে কংগ্রেস ছেড়ে চলে যাওয়া হিন্দু জমিদারদের খুব কাছের লোক নলিনীরঞ্জন সরকারকে আবার বড় দায়িত্ব দিয়ে ফিরিয়ে আনা। তারপর ক্রমশ: কৃষক আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে উলটে জমিদারদের পক্ষ নেওয়া, সুভাষ-শরতকে একঘরে করে দেওয়া এবং শেষপর্যন্ত সরিয়েই দেওয়া – সবটাই ঘটেছিল বাংলা কংগ্রেসকে ফের ভদ্রলোকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে। জয়া চ্যাটার্জী তাঁর বেঙ্গল ডিভাইডেড বইয়ে রীতিমত তথ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই সময়ে, মানে সুভাষ আর শরৎ বসুকে বের করে দেওয়ার পর, হিন্দু মহাসভা আর বাংলা কংগ্রেসের মধ্যে বিশেষ কোনো তফাৎ সাধারণ চোখে ধরাই পড়তো না। ১৯৪৫-৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে হাতেনাতে ফল পায় কংগ্রেস এই আইডেন্টিটি পরিবর্তনের - বাংলার হিন্দুরা একজোটে কংগ্রেসের পক্ষে ভোট দেয় - একাত্তরটা সাধারণ আসন আর পনেরোটা বিশেষ হিন্দু আসন জেতে কংগ্রেস, তার মধ্যে বেশ কয়েকটা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা। হিন্দু মহাসভা ছাব্বিশটা আসনে কংগ্রেসের বিপক্ষে লড়ে পায় মোটে ২.৭৩% ভোট। একটা মাত্র আসনে - বিশেষ ইউনিভার্সিটি আসন – সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জেতেন শ্যামাপ্রসাদ। খুব স্পষ্টভাবে, ভদ্রলোক হিন্দুদের রায় ছিল কংগ্রেসের পক্ষেই। অন্যদিকে, সংরক্ষিত তফশিলী আসনের ৮০% জেতে কংগ্রেস, ৩৬-৩৭ সালে যেটা ২৫%-এরও কম ছিল। সব মিলিয়ে মোটামুটি ৯০% হিন্দু ভোটার মনে করেছিল যে কংগ্রেসই তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা - ধনী ব্যবসায়ী, জমিদার - যাদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা তিরিশের দ্বিতীয়ভাগ থেকে ক্রমশ: শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তাদেরও বিপুল সমর্থন পেয়েছিল কংগ্রেস - এই নতুন পাওয়া হিন্দু আইডেন্টিটির জোরে।
আলাদা হিন্দু অধ্যুষিত রাজ্যের দাবীও ওঠে এই সময় থেকেই। ১৯৪৬-এর ভোটে সুরাহওয়র্দীর মন্ত্রীসভার ক্ষমতায় আসা, বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের সময়ে যে সুরাহওয়র্দীকে নিয়ে প্রবল ক্ষোভ ছিল হিন্দুদের মধ্যে, ছেচল্লিশের কুখ্যাত দাঙ্গা, এবং সেই সময়ে কলকাতার রাস্তায় ঘটে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সামলাতে না পারা - সব মিলিয়ে বাংলার হিন্দুদের বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয়ে যায় যে "মুসলমানদের সরকার" থাকলে বাংলার পাকিস্তান হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না, হিন্দুদের থেকে যেতে হবে মুসলমানদের অধীনে। স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদের হাতে লেখা ছেচল্লিশ সালের একটা নোট পাওয়া যায় এই মর্মে, যার মূল বক্তব্য ছিল – “বাংলা যদি পাকিস্তান হয়ে যায়, বাঙালী হিন্দুদের যদি পাকাপাকি মুসলমান শাসনে থাকতে হয়, তাহলে সেটা হবে বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির শেষ অধ্যায়…নীচু জাতের কিছু হিন্দু যারা মুসলমান হয়েছে, তাদের খুশী করতে হিন্দু সংস্কারকে বলি দেওয়া…”। একসময় "অবিভক্ত বাংলা"-র সমর্থক শ্যামাপ্রসাদ সেই সময়েই কিন্তু বাংলা ভাগের পক্ষে চলে গিয়েছিলেন। আর, ব্রিটিশ রাজের শেষ দুটো বছরে, বাংলার হিন্দু ভদ্রলোকদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা বস্তুত: কংগ্রেসের সেকেন্ড ফিডল হিসেবেই থেকে গিয়েছিল। ….”
তবে পশ্চিমবঙ্গ দিবসের অন্য একটা দিকও আছে। মানে যেদিন বাংলার হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি নিয়ে গঠিত হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ .... তাহলে সেই জেলার বাইরে থাকা বাংলার বাকি অংশের, পূর্ববাংলার হিন্দু মানুষদের কী হলো? কি হয়েছিল আমরা, সবাই জানি .. এই বিভাজন সেই বিপুল হিন্দু জনগোষ্ঠীকে উদ্বাস্তু মানুষে পরিণত করেছিল .... তাদের নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছিল। অথচ এই হিন্দু পশ্চিমবঙ্গ তাদের সেদিন সাদরে গ্রহণ করেনি। বাঙাল বলে দূরে ঠেলেছিল। তারা না পেয়েছিল সঠিক পুনর্বাসন, না পেয়েছিল এপারের মানুষের সহমর্মিতা। বনেবাদারে, জলা-জঙ্গলে, অন্যের জমি দখল করে তাকে বসতি গড়ে তুলতে হয়েছে। পাশে বামপন্থীরা না থাকলে সেটাও হতো না। দুইটি প্রজন্ম লেগেছে এপারে থিতু হতে .... তাও সবাই পারেনি। আজকের উদ্বাস্তু পরিবারের নতুন প্রজন্ম সে খবর রাখে না, রাখতেও চায় না। যাদের জন্য দেশভাগ, যাদের জন্য তাদের শিকড় ছিন্ন হওয়া ... তাদের বিরুদ্ধে নয়, তাদেরই পক্ষে থাকে। তাদের তৈরি করা বিকৃত ইতিহাসে বিশ্বাস করে। বিভাজনকামী রাজনীতিকে শক্তিশালী করে।
আমি নিজে সেই উদ্বাস্তু উত্তরাধিকার বহন করি। তাদের সব হারিয়ে শিকড় উপড়ে চলে আসার দায়ভার নিয়ে। আমার ঠাকুরদা, বাবা পিসীদের কাছ থেকে সেই ইতিহাসের উত্তরাধিকার লাভ করেছি ... দেখেছি চূড়ান্ত বিদ্বেষ ঘৃণার মধ্যে দিয়ে হওয়া দেশভাগের পরেও তারা আজীবন তাদের মুসলিম প্রতিবেশীদের অভিযুক্ত করেননি। অনেকের ভিতরে অভিমান থাকলেও, রাগ তৈরি হলেও স্বাধীনতার পরে এপারের ধর্মনিরপেক্ষ উদার অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তার সেই নেতিবাচকতাকে তরল করেছে। পারস্পরিক বিদ্বেষের আগুন ছড়াতে পারেনি। রুজিরুটির লড়াইয়ের বাস্তবতা, প্রগতিশীল সংস্কৃতির যাপন ... বিশেষ করে সহজিয়া লোকসংস্কৃতির মিলমিশ ... এবং উদারনৈতিক ও বামমনস্ক রাজনৈতিক প্রতিবেশ এই বিদ্বেষকে পরাজিত করেছিল অনেকদিন পর্যন্ত।
ফিরে আসা যাক জুন মাসের কুড়ি তারিখে। ২০ জুন শুধুমাত্র ৩রা জুনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় - অর্থাৎ দেশ ভাগ হবে এবং তারা পৃথক পৃথক গণ পরিষদের অংশ হবে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের আকারের কোন নির্দিষ্টকরণ সেদিন হয়নি …. এই নির্দিষ্টকরণ প্রথম হয় র্যাডক্লিফ ঘোষণার মাধ্যমে, প্রকাশিত হয়েছিল ১৭ ই আগস্ট ১৯৪৭; চূড়ান্ত হয় ১৯৫৬ সালে ভারতের রাজ্যগুলির সীমান্ত নির্দিষ্ট করবার মধ্য দিয়ে।
২০ শে জুনকে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সমার্থক করে দেখানো সম্পূর্ণ ভুল ইতিহাস। এটি সম্পূর্ণরূপে গোটা দেশভাগ প্রক্রিয়ার মধ্যবর্তী একটি তারিখ মাত্র।
এবং এটাও দেশভাগের চরম দুঃখজনক স্মৃতিকে পেছনে ফেলে বাঙালি অনেকদূর এগিয়ে এসেছে। এখন আবার পিছনে হাঁটতে চাইছি কেন? সেই দুঃসহ ইতিহাসকে, যাকে ভুলিয়ে রেখেছিল বাঙালি, বিশেষ করে উদ্বাস্তু হয়ে আসা বিপুল জনগণ … নতুন করে থিতু হয়েছে এপারে …. তাকে খুঁচিয়ে সেই বিভাজনের ইতিহাসকে জনজীবনে পুনরুজ্জীবিত করার দরকার পড়ল কেন? পরিষ্কার, রাজনীতির প্রয়োজনেই। এপারে… ওপারেও। সংখ্যাগুরুর উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির হাত ধরে।
প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কোনদিকে থাকব। সদর্থক ভাবনা চিন্তার আশা দিনদিন ক্ষীন হচ্ছে। এই দ্রুতগামী কিন্তু নির্মিত তথ্যায়িত সময়ে (ক্রাফটেড ডেটা) সঠিক কথাটিও ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসে।
পুনঃ উপরের কথাগুলো চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করবেন না। এই বিষয়ে প্রচুর বইপত্র লেখালেখি আছে ... একটু ঝালিয়ে নিতেই পারেন।
@অভিজ্ঞান সেনগুপ্ত
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the school
Telephone
Website
Address
Satyapriya Bhavan, Patramarket
Krishnagar
733102