Dwandwik Group Theatre
06/01/2021
ও আলোর পথযাত্রী / শান্তিরঞ্জন দাশ
২৭ বছর আগের একটি দিন। চলে গিয়েছিলেন নাট্যকার, 'দ্বান্দ্বিক' এর প্রাণপুরুষ অচিন্ত্য চৌধুরী । একটা নক্ষত্র পতন। গর্জমান সমুদ্রের ওপর একটা জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়েছিল, থমকে দাঁড়িয়েছিল আমাদের চলা। কে একজন লিখেছিল; যাঁর মৃত্যু নেই / তাঁকে নিয়ে শোকগাথা লিখতে নেই । দেখতে দেখতে কত গুলো বছর চলে গেল। ইতিমধ্যে তাঁর হাতে-গড়া দ্বান্দ্বিক ৪৭ বছরে পা দিয়েছে। 'বিষণ্ণ মধ্যাহ্ন', 'স্বপ্ন ভাঙ্গার স্বপ্ন' - এমন সব দুরন্ত নাটক লিখে অচিন্ত্যবাবু সে দিনের নাট্য-আন্দোলনকে দিশা দেখিয়েছেন। সেই আথাল-পাথাল-করা সময়ে গণ-মানসের সৈকতে এক অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি করেছিলেন। আসলে তিনি ছিলেন এক দুর্নিবার পদাতিক । এক দুঃসাহসী বিন্দু বুকে বহন করে চলতেন সিন্ধুর চেতনা। এই অসম্ভব মানুষটি সৃষ্টির খেলাঘরে বসে সময়ের চালচিত্রকে বদলাতে চেয়েছিলেন। যে কারণে 'একালে একলব্য', 'তাঁতিয়া টোপি' র মতো নাটক লিখতে পেরেছেন। তাঁর নাটক আজও দর্শক-চিত্রকে দুলিয়ে দিয়ে যায়।
অচিন্ত্য চৌধুরী ছিলেন এক সোনার মানুষ। প্রথাগত চিন্তার অচলায়তনকে বার বার ভেঙ্গেছেন। কোনোও বন্ধন তাঁকে কখন থামিয়ে দিতে পারেনি। ১৯৭৮ সাল।বন্যায় ভাসছে গোটা বাংলা। তখন তিনি বাগনানের বিডিও। স্পিড বোট নিয়ে বন্যা দুর্গত এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। কী অফুরন্ত সাহস! কী অদম্য মনোবল! দিনের শেষে চুনো মাছ দিয়ে দু-টো ভাত খাচ্ছেন। কোথাও এতটুকু আক্ষেপ নেই। এভাবে একেবারে মাটিতে নেমে জীবনকে দেখেছিলেন। আর সেই জীবনকে চিত্রায়িত করেছিলেন নাটকে।
স্বপ্নের খেয়াঘাট ছেড়ে নায়ক অনেক দূরে চলে গেছেন, তাঁর গল্পগুলো আমাদের প্রজন্মের ছেলেদের আজও উদ্বেলিত করে, বার বার ফিরে
দেখতে ইচ্ছে করে তাঁকে।
অচিন্ত্য চৌধুরীর সেই স্বপ্নকে 'দ্বান্দ্বিক' আপ্রাণ চেষ্টা করেছে রূপায়িত করতে। তাঁর আদর্শকে তুলে ধরার জন্য কোথাও খামতি থাকেনি।
অচিন্ত্যবাবুকে নিয়ে কত মণি-মাণিক্য আমাদের স্মৃতিতে সঞ্চিত। কখনও তিনি নট, কখনও তিনি নির্দেশক। আবার কখনও লেখক, কখনও কবি। সুর একটাই, ক্ষয়িষ্ণু সমাজটাকে আঘাত করা, নতুন মূল্যবোধ তৈরি করা। এ সময়ে মূল্যবোধের সংকট ঘনীভূত। ক্রমশ কমে যাচ্ছে এই মানুষগুলো।
জীবন কোনও স্থিরচিত্র নয়।
সেখানে কত ভাঙ্গা, গড়া, কত উত্থান-পতন । সেই জীবনকে নিবিড়ভাবে দেখেছিলেন অচিন্ত্য চৌধুরী। সংস্কৃতির অঙ্গনে যে পরম্পরা চলছে, যে ধারা চলছে, সেই ধারার কখনও প্রতিনিধিত্ব করেননি। তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর মহত্ত্ব। 'তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ, তাই তব জীবনের রথ ••••••••••••, হয়তো তাই। তিনি ছিলেন সত্যিকারের জীবন-শিল্পী। ছিল অনন্ত তৃষা, অনন্ত ভালবাসা। আবার তিনিই ক্রান্তি-চেতনার রঙে রাঙিয়েছেন জীবনকে। এটাই জাত-রোমান্টিকের বৈশিষ্ট্য। একজন বিখ্যাত মানুষের কথা মনে পড়েছে। তিনি লিখেছিলেনঃ মানুষের ইতিহাস যখন যুগের চৌমাথায় থমকে দাঁড়িয়েছে, তখন এই রোমান্টিকরাই নিজেদের জ্বালিয়ে ধরেছে মশাল করে, পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দিয়েছে মানুষকে পথ দেখাতে। মনুষ্যত্বের শৃঙ্খল মুক্তির সংগ্রামে নিজেকে একেবারে নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন অচিন্ত্য চৌধুরী। তাঁর ২৮তম প্রয়াণ দিবসে তাঁকে আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম।
বর্তমান পরিবেশ পরিস্থিতিতে অচিন্ত্য চৌধুরী স্মরণে দ্বান্দ্বিক নাট্যোৎসব স্থগিত রাখা হল। সবাই ভালো থাকুন।সুস্থ থাকুন।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Telephone
Website
Address
Howrah