Singerkach Views
সিংগেরকাছের অফিসে বাংলাদেশের আমেজে খেলা দেখা হচ্ছে।
12/06/2026
#স্মৃতির পাতায় এক মহীরুহ: মৌলভী মোহাম্মদ তবারাক আলী মাস্টার।
সময়ের নদী যেন অনেক কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ কিছু স্মৃতি চিরকাল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। মৌলভী মোহাম্মদ তবারাক আলী মাস্টার ঠিক তেমন একজন মানুষ ছিলেন। তিনি কেবল একজন শিক্ষক ছিলন না, বরং তিনি ছিলেন এক আলোকবর্তিকা, এক প্রেরণার নাম, ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানের সমান।
তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯১৪ সালে, সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মৌলভীরগাঁও গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর পিতা মরহুম আনফর মোহাম্মদ ছিলেন একজন আদর্শবান, পরহেজগার ও রুচিশীল ব্যক্তি, যার কাছ থেকেই হয়তো তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন প্রজ্ঞা ও সমাজসেবার অমোঘ আকর্ষণ।
তাঁর কর্মজীবন ছিল বিস্তৃত, গৌরবময় ও গভীর। সিঙ্গেরকাছ (১ ও ২), সাতপাড়া, গোয়াহরী, জগদীশপুর, ভাটিপাড়া ও মৌলভীগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু এসব পদ-পদবী তাঁকে সংজ্ঞায়িত করতে যথেষ্ট নয়। তিনি ছিলেন মানুষের শিক্ষক, জীবনের শিক্ষক।
তিনি ছিলেন মাটির খুব কাছের মানুষ। এলাকার মানুষের সুখে হাসতেন, দুঃখে পাশে থাকতেন। শালিস-বিচার, সামাজিক দ্বন্দ্ব, পারিবারিক টানাপোড়ন সবকিছুর সমাধানে তাকে খুঁজে পাওয়া যেত এক দৃঢ়, ন্যায়বান ও কোমলহৃদয় arbitrator হিসেবে। তাঁর মুখে সবসময় একটি শান্ত মুচকি হাসি থাকত, যেন সে হাসির মাঝেই লুকিয়ে ছিল শত অভিজ্ঞতার ভারসাম্য।
চল্লিশের দশকে তিনি পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন ঐতিহ্যবাহী ছোটদিঘলীর (বর্তমানে শহীদ সুলেমান নগর) সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মহীয়সী নারী মোছাম্মাত খয়েরুন নেছার সঙ্গে। তাঁদের ঘরে জন্ম নেন ছয় পুত্র ও তিন কন্যা। ছেলেরা হলেন আ,ন,ম, শফিকুল হক্ব, মনসুরুল হক্ব, সিরাজুল হক্ব, মাহবুবুল হক্ব, নজরুল হক্ব ও আনোয়ারুল হক্ব এবং মেয়েরা হলেন খালেদা বেগম, রাজিয়া বেগম ও আসমা বেগম। উনার সেই একান্নবর্তী পরিবারে শিক্ষা, নৈতিকতা আর পারস্পরিক ভালোবাসার সুর বাজত প্রতিনিয়ত।
আমি সম্পর্কে ছিলাম তাঁর নাতি, তাঁকে চিনেছি তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ে। নিতান্তই ছোট্ট ছিলাম তাই সেই বয়সে বুঝতাম না, এমন একজন মানুষ কতটা গভীর! কিন্তু তার মুখের দিকে তাকালেই মনে হতো তিনি যেন যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকা একজন সাধক। সুন্নতি পোশাক আর মুখভরা মুচকি হাসিতে এক অদ্ভুত আভিজাত্য ছিল তাঁর।
আমাকে ভাই বলে ডাকতেন তিনি। প্রতিবার দেখলে মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করতেন। আমার মায়ের নাম ধরে ডাক দিতেন, নানাজির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আর স্মৃতির গল্পগুলো শোনাতে শোনাতে কখনো কখনো আবেগে তাঁর চোখ চিকচিক করে উঠত। বাবার কথা উঠলে তাঁর দুচোখ ভিজে উঠত, আমার মনে হত, ভালোবাসা কত গভীর হলে স্মৃতি এমন করেই বুক চিরে উঠে আসে!
সপ্তাহে দুই দিন আমাদের এলাকায় হাঠ বসতো সোমবার ও শুক্রবার। তিনি সেই দুইদিন আমাদের বাড়িতে আসতেনই আসতেন। কখনো আসরের নামাজ, কখনো মাগরিবের জামাত আদায় করতেন, আমাদের বাংলাঘরের বারান্দাই হয়ে উঠত তাঁর মসজিদ।
তিনি ছিলেন এক বিরল ভাষাবিদের প্রতিচ্ছবি। বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফার্সি, উর্দু সব ভাষায় ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। মাঝে মাঝে ফার্সির ছড়ার মতো শ্লোক আওড়াতেন, আর বলতেন, "ভাইরে, ইসলামি শিক্ষার জন্য আরবি ও ফার্সি জানা খুব দরকার!"
জীবনের এক পর্যায়ে তাঁর শরীর নুয়ে পড়ল, অসুস্থতা তাঁকে গৃহবন্দী করল। আমাদের বাড়িতে আর আগের মতো আসতে পারতেন না। কিন্তু তাঁর এক ছেলে, মাহবুবুল হক্ব চাচা, যিনি সিঙ্গেরকাছ বাজারে চায়ের দোকান চালাতেন, তাঁর মাধ্যমেই তিনি খোঁজখবর রাখতেন।
১৯৯০ সালের ১৯ মে, এক পবিত্র শুক্রবার দিবাগত রাতে, এই মহীরুহ চিরবিদায় নেন। আমি তখন শহরে, ফাইনাল পরীক্ষায় ব্যস্ত। শেষ দেখা হলো না, এমন আফসোস জীবনের গভীরে আজও কাঁটার মতো বিঁধে আছে।
তবে সেই থেকে আজ পর্যন্ত যতবার গ্রামের পথে হাঁটি, মৌলভীগাঁও কবরস্থানের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর কবর জিয়ারত করতে প্রাণ টানে। আজও তাঁর হাতের ছোঁয়া, তাঁর দোয়ার শব্দ, তাঁর মুচকি হাসি সব মনে পড়ে।
আজ আমি মাওলার দরবারে মাথা নিচু করে বলি “হে কা'বার মালিক, আমার প্রিয় মৌলভী তবারক আলী নানাকে তুমি জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাক্বাম দান করো।”
লেখকঃ এম এ বাসিত আশরাফ
বই: নীলিমায় ছোঁয়া দূরের আলো।
প্রকাশকাল: ২০২৬।
চলবে।।।
আলহামদুলিল্লাহ..! স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে, আলোকিত শেখেরগাঁও পশ্চিম প্রবাসীদের অর্থায়নে😍❤️।
゚viralシ ゚viralシfypシ゚
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Telephone
Website
Address
Suite 4, Second Floor, 145 High Street
Colchester
CO11PG