St Islamic Tune Multimedia
10/12/2025
১৯০১।
ওসমানী সালতানাতের বিশাল মানচিত্রে একটা ছোট্ট দাগ কুয়েত। সেই দাগই তখন ব্রিটিশদের গোপন ঘাঁটি, যেখানে আশ্রয় নিয়ে ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে নাজদের এক পলাতক বেদুইন,
আব্দুল আজিজ ইবনু সৌদ।
সে সময় নাজদের মরুভূমিতে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখছিল ওসমানী সাম্রাজ্যের বিশ্বস্ত মিত্র 'ইবনু রাশিদ' বা শাম্মার গোত্র। রিয়াদের দায়িত্বে তখন রাশিদিদের নিযুক্ত ওসমানী গভর্নর (আমিল) 'ইবনু আজলান'।
১৯০২ সালের জানুয়ারি মাস।
পবিত্র রমজান। আব্দুল আজিজ আরবের বীরোচিত যুদ্ধের নিয়ম তোয়াক্কা না করে দস্যুবৃত্তির পথ বেছে নিল। কুয়েত থেকে মাত্র ৪০ জন লোক নিয়ে তিনি মরুভূমি পাড়ি দিল। রিয়াদ তখন গভীর ঘুমে। শহরের ধর্মপ্রাণ মানুষ সেহরির অপেক্ষায়। আব্দুল আজিজ ও তার সঙ্গীরা খেজুর গাছ কেটে সেই গুঁড়ি ব্যবহার করে মাসমাক দুর্গের পেছনের দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। তারা ইবনু আজলানের শোবার ঘরের আশেপাশে লুকিয়ে ওত পেতে থাকে। তাদের লক্ষ্য ফজরের নামাযের জন্য বের হওয়া নিরস্ত্র গভর্নরের ওপর অতর্কিত হামলা করা।
ভোর হলো। মুয়াজ্জিনের আজানে রিয়াদের আকাশ বাতাস মুখরিত। ইবনু আজলান, আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে কোনো দেহরক্ষী ছাড়াই ঘর থেকে বের হয়ে মসজিদের দিকে পা বাড়ালেন। ঠিক তখনই, অন্ধকারের ভেতর থেকে আব্দুল আজিজ ও তার দল হায়েনার মতো আমিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
শুরু হয় এক অসম লড়াই। নিরস্ত্র আজলান নিজেকে বাঁচানোর জন্য দুর্গের দরজার দিকে দৌড় দেন। আব্দুল আজিজের চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ বিন জিলুউই পেছন থেকে তার হাতের বর্শা সজোরে ছুড়ে মারে। সেই বর্শা আজলানের গায়ে না লেগে দুর্গের শক্ত কাঠের দরজায় গেঁথে যায়, যা আজও সেই রাতের নৃশংসতার সাক্ষী হয়ে আছে। আজলানকে ধরে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় এবং মসজিদের সামনেই তাকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। এরপর তার কাটা মস্তক দুর্গের উঁচু প্রাচীর থেকে নিচে ছুড়ে ফেলা হয় রিয়াদবাসীর সামনে, যাতে জনগণের মনে ত্রাস সৃষ্টি হয়।
এই ঘটনার কয়েক দিন পর, বসরার ওসমানী ভালি বা গভর্নর ইসলামবুলের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি অত্যন্ত গোপন তারবার্তা পাঠান। সতর্ক করে বলেন, কুয়েতে ব্রিটিশদের আশ্রয়ে থাকা সেই পলাতক বেদুইন আব্দুল আজিজ তার দলবল নিয়ে রিয়াদে প্রবেশ করেছে, আমাদের নিযুক্ত আমিলকে হত্যা করেছে। এই দস্যু এখন নিজেকে রিয়াদের শাসক দাবি করছে। আমাদের আশঙ্কা, এর পেছনে কুয়েতের শেখ এবং ইংরেজদের হাত আছে। নাজদে ইবনু রাশিদের শাসন দুর্বল করতে এটি ইংরেজদের চাল।
সুলতান আব্দুল হামিদ আস-সানী বুঝতে পারলেন, মরুভূমিতে পুরনো সেই 'খারেজি' মতবাদ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। তবে এবার তাদের হাতে শুধু তলোয়ার নেই, পেছনে আছে ব্রিটিশদের কূটবুদ্ধি।
রিয়াদ দখলের পরপরই কুয়েতে থাকা ব্রিটিশ এজেন্ট কর্নেল কেম্বল তার সরকারকে জানালেন, ইবনু সৌদ সফল হয়েছে। এখন তাকে ব্যবহার করার মোক্ষম সময় এসেছে। ওসমানী গোয়েন্দারা লক্ষ্য করলেন, রিয়াদ দখলের পর থেকেই আব্দুল আজিজের কাছে ব্রিটিশ অস্ত্র এবং অর্থের আনাগোনা বেড়ে গেছে। ইসলামবুলের আলিমরা প্রশ্ন তুললেন, যেই যুবক নিজেকে 'খাঁটি মুসলমান' দাবি করে, সে কীভাবে কাফির সাম্রাজ্যবাদীদের টাকায় নিজের ভাইদের হত্যা করে? তারা একে আখ্যা দিলেন স্পষ্ট 'মুনাফিকি'।
ওসমানী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাগদাদ এবং বসরার ভালির পক্ষ থেকে আরেকটি গোপন তারবার্তা এসে পৌঁছাল। বলা হলো, নাজদের মরুভূমিতে রিয়াদ দখলকারী সেই বিদ্রোহী আব্দুল আজিজ ইবনু সৌদের তাঁবুতে এক 'লাল চামড়ার ফিরিঙ্গিকে দেখা গেছে। পরনে আরবদের পোশাক থাকলেও সে আদতে এক ইংরেজ কর্মকর্তা। তার হাতে রয়েছে অদ্ভুত সব যন্ত্র, ক্যামেরা এবং মানচিত্র আঁকার সরঞ্জাম। ওসমানী গোয়েন্দারা নিশ্চিত হলেন, কুয়েত মারফত ব্রিটিশরা এই বেদুইনদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে খিলাফতের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে।
সুলতানের কাছে আব্দুল আজিজ ছিলেন সামান্য এক গোত্রপতি। কিন্তু যখনই তার সাথে ব্রিটিশ কর্মকর্তার সখ্যের খবর এল, ইসলামবুল বুঝতে পারল, এ সাধারণ গোত্রীয় মারামারি নয়, খিলাফতের পেটে ছুরি মারার এক আন্তর্জাতিক চক্রান্ত।
ব্রিটিশ গোয়েন্দা এবং কুয়েতের পলিটিক্যাল এজেন্ট ক্যাপ্টেন উইলিয়াম শেকসপিয়র ছিলেন ধূর্ত এবং দুঃসাহসী। তিনি মরুভূমির গভীরে ইবনু সৌদের তাঁবুতে গিয়ে দিনের পর দিন কাটিয়েছেন, যুদ্ধের মাঠ প্রস্তুত করতে। তিনি মরুভূমির প্রতিটি পানির কুয়া, গিরিপথ এবং ওসমানী দুর্গগুলোর অবস্থান নিখুঁতভাবে ম্যাপে টুকে নিচ্ছিলেন। মূলত, তিনি ভবিষ্যতের ব্রিটিশ অভিযানের জন্য নজদের মানচিত্র চুরি করছিলেন।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় ছিল ইবনু সৌদের ভণ্ডামি। যে আব্দুল আজিজ ও তার অনুসারীরা ছবি তোলা বা প্রতিকৃতি তৈরি করাকে 'হারাম' ও 'শিরক' বলে ফতওয়া দিত, সেই আব্দুল আজিজই হাসিমুখে এই বিধর্মী ব্রিটিশ কর্মকর্তার ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছিলো। ক্যাপ্টেন শেকসপিয়রই প্রথম ইবনু সৌদের ছবি তোলে লন্ডনে রিপোর্ট পাঠান, এই লোকই পারবে আরবে তুর্কিদের শাসন শেষ করতে, তাকে যেন দেদারসে টাকা ও বন্দুক দেওয়া হয়।
১৯১৫ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ব্রিটিশরা চাইল ইবনু সৌদ যেন ওসমানী সালতানাতের বিশ্বস্ত মিত্র 'ইবনু রাশিদ'কে পেছন থেকে আক্রমণ করে। ব্রিটিশ টাকার বিনিময়ে ইবনু সৌদ রাজি হলেন, নিজের মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।
এই যুদ্ধের ময়দানেই ঘটল এক নজিরবিহীন ঘটনা। নাজদী বাহিনীর সাথে যুদ্ধের ময়দানে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন সেই ব্রিটিশ কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন শেকসপিয়র। তিনি ইউরোপীয় পোশাকে, হ্যাট মাথায় দিয়ে, ইবনু সৌদের গোলন্দাজ বাহিনীকে নির্দেশনা দিচ্ছিলেন কীভাবে মুসলমান রাশিদিদের ওপর গোলা ছুড়তে হবে। নিজেকে 'মুওয়াহিদ' দাবি করা সৌদিরা সেদিন এক কাফিরের নির্দেশে মুসলমানদের রক্ত ঝরাতে কুণ্ঠাবোধ করেনি।
জারাবের প্রান্তর। ওসমানী মিত্র ইবনু রাশিদের বাহিনী ছিল দুর্ধর্ষ। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাশিদি অশ্বারোহীরা বিদ্যুৎগতিতে সৌদি বাহিনীর ব্যূহ ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তাদের তলোয়ারের আঘাতে সৌদি বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়।
ঠিক সেই মুহূর্তে, ইবনু সৌদের পাশে দাঁড়ানো ক্যাপ্টেন শেকসপিয়র আক্রান্ত হন। রাশিদি যোদ্ধাদের আঘাতে এই ব্রিটিশ গোয়েন্দা নিহত হন। তার মৃত্যু ছিল ইবনু সৌদের জন্য এক বিশাল ধাক্কা, ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের মুখে এক চপেটাঘাত।
যুদ্ধশেষে ইবনু রাশিদের যোদ্ধারা শেকসপিয়রের হেলমেট এবং তার ক্যামেরাটি গনীমাহ হিসেবে দখল করে। তারা উল্লাস করে বলেছিল, তথাকথিত মুওয়াহিদদের আসল চেহারা আজ উন্মোচিত হলো! তারা কাফিরদের কাঁধে চড়ে মুসলমানদের মারতে এসেছিল, কিন্তু আল্লাহ আজ সেই নাপাক ইংরেজকে ধ্বংস করেছেন। ওসমানী সালতানাত এই সংবাদে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। একে 'গাজাবে ইলাহি' বা ঐশ্বরিক বিচার হিসেবে আখ্যায়িত করে।
জারাবের যুদ্ধে ইবনু সৌদের পরাজয় এবং শেকসপিয়রের মৃত্যুতে ব্রিটিশরা সাময়িকভাবে পিছিয়ে যায়। কেউ কেউ ভেবেছিলো, ব্রিটিশরা হয়তো এই পরাজিত বেদুইনদের ওপর থেকে ভরসা হারিয়ে ফেলবে। তবে শেকসপিয়র তো কেবল দাবার বোড়ে ছিলেন। ব্রিটিশরা এবার পাঠায় তাদের আসল খেলোয়াড়কে। এমন এক গুপ্তচর, যে আরবদের মতো আরবি বলবে, আরবদের মতো পোশাক পরবে এবং ইবনউ সৌদকে হাতে ধরে মক্কা-মদিনার দিকে নিয়ে যাবে। তার নাম হ্যারি সেন্ট জন ফিলবি।
তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে তার পরিবার পরিজনের কাছে উত্তম। ”
– ইবনে মাজাহ
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Website
Address
Patenga