Alor Kafela

Alor Kafela

Share

Photos from Alor Kafela's post 04/03/2020

“বাদশাহ আলমগীর
কুমারে তাহার পড়াইত এক মৌলবী দিল্লীর।”

বাদশা আলমগীর বা সম্রাট আওরঙ্গজেব (নভেম্বর ৩,১৬১৮ – মার্চ ৩, ১৭০৭) ষষ্ঠ মোগল সম্রাট। দীর্ঘ ৫০ বছর তিনি রাজত্ব করেছিলেন। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন। আওরঙ্গজেবের পুরো নাম 'আসসুলতানুল আজম আবুল মুজাফফর মুহিউদ্দীন মুহম্মদ আওরঙ্গজেব বাহাদুর আলমগীর বাদশা গাজী'।
ফারসিতে আলমগীর অর্থ জগতবিজেতা ৷

আওরঙ্গজেব (রহ) এ উপমহাদেশের অতীত ঐতিহ্যের হীরক খণ্ড। ১৫ কোটি মানুষকে ৫০ বছর ধরে শাসন করেছিলেন আওরঙ্গজেব। তাঁর রাজত্বকালে মুঘল সাম্রাজ্য প্রথমবারের মতো এতটা বিস্তৃত হয়েছিল যে প্রায় পুরো উপমহাদেশ তাঁর শাসনের করায়ত্ত হয়েছিল। এই ভারতবর্ষে আওরঙ্গজেবের রাজত্বই ছিল ছিল সবচে' বিস্তীর্ণ। আফগান থেকে আরাকান আর কাশ্মীর থেকে কেরালা পর্যন্ত ছিল তার রাজ্য। এই ভারত বর্ষের প্রাচীন আমল আমল থেকে ইংরেজ বর্বরদের উত্থান অবধি এতটা বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে আর কেউ রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। দৈর্ঘ্য প্রস্থ কোন বিচারেই না ৷ [ ক্যামব্রিজ হিস্টোরীর সূত্রে তারীখে দাওয়াত ওয়া আযীমতঃ ৫:৪২ পৃ]

মোগল পরিবারের নিয়মানুযায়ী শাহি কায়দায় তিনি রাজপ্রাসাদে লালিত-পালিত হন। শারীরিক বর্ধনের সঙ্গে সঙ্গে বহুবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। শৈশবের চঞ্চলতায়ই কুরআন-হাদিস-ফিকাহসহ আরবি হস্তাক্ষরবিদ্যায় পান্ডিত্য অর্জন করেন। যৌবনের আগেই প্রকাশিত হয় তার সংকলিত নবীজি (সা.) এর ৪০ হাদিসের গ্রন্থ 'আল-আরবাইন'। তার হস্তলেখা ছিল অত্যন্ত সুন্দর। আগেকার যুগে প্রেস বা ছাপাখানা না থাকায় বই-পুস্তক ও কিতাবাদি হাতে লিখে লিখে কপি তৈরি করা হতো। সম্রাট আওরঙ্গজেব শাসনভার গ্রহণের আগে পবিত্র কোরআন ও আল-আরবাইনের কপি স্বহস্তে লিখে মক্কা শরিফের ছাত্রদের জন্য উপহার পাঠাতেন।

তিনি ছিলেন পাক্কা ঈমানদার, পন্ডিত আলেম, ইবাদতগুজার, খোদাভীরু-মুত্তাকি, বীর্যশালী বীরপুরুষ, ন্যায়পরায়ণ ও মুবাল্লিগ। এমন কোনো ভালো কাজ নেই যা তিনি হাতছাড়া করেছেন। তার যোগ্যতা দিয়েই তিনি ভারতবর্ষ শাসন করেছেন। তিনি ছিলেন ইসলামী সংবিধানের বাস্তবায়নকারী খোলাফায়ে রাশেদিনের মূর্তপ্রতীক সুদক্ষ সম্রাট। আওরঙ্গজেব অল্প বয়সেই ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে যেমন দক্ষতা হাসিল করেছিলেন, তেমনি জাগতিক জ্ঞানবিদ্যা, রাজনীতি, নেতৃত্ব ও রণকৌশলেও নিপুণ হয়ে উঠেছিলেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সের ঘটনা। একটা সামরিক হাতি ধেয়ে এসেছিল। সবাই ছোটাছুটি করে পালিয়ে গেল। কিন্তু সাহসী বীর আওরঙ্গজেব মোকাবিলা করে হাতিকে পরাজিত করেছিলেন। মূলত তখন থেকেই তিনি 'বাহাদুর' উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।

মহান কীর্তিমালা : আওরঙ্গজেব (রহ) উপামহাদেশে ইসলাম কায়েম করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালান৷ তিনি বিদ‘আত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। নিজে গান-বাজনায় দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও তা শোনা ত্যাগ করেন। পৌত্তলিক ও বিদ‘আতী উৎসবাদি বাতিল করেন। রহিত করেন শির নত করা এবং মাটিতে চুমু খাওয়া। যা পূর্বতন রাজন্যবর্গের জন্য করা হত। বিপরীতে তিনি ইসলামী সম্ভাষণ-বাক্য তথা ‘আসসালামু আলাইকুম’ -এর মাধ্যমে অভিবাদন জানানোর নির্দেশ দেন। সম্ভবত এ কারণে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী কিছু লেখক তাকে গোঁড়া হিসেবে অপবাদ দেন।

তাঁর প্রশংসিত কাজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কুসংস্কার ও বিদ‘আতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, রাফেযী-শিয়া রাজ্যগুলো নির্মূল এবং বিদ’আতী ও পৌত্তলিক উৎসবাদি নিষিদ্ধ করা ইত্যাদি। এসবের দাবী হলো, তিনি সম্মান, মর্যাদা, নেক দু‘আ পাওয়ার উপযুক্ত। আর এটিই শাসনকার্য পরিচালনায় সালাফ তথা পূর্বসুরীদের কর্মপন্থার বাস্তব প্রয়োগ।

বলা হয়ে থাকে মুঘল সম্রাটদের মধ্যে ইসলামের সবচেয়ে নিকটবর্তী ছিলেন সম্রাট আওরঙ্গজেব, আমাদের বাদশাহ আলমগীর।

ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে আওরঙ্গজেব রহ. এতই পারঙ্গমতা লাভ করেছিলেন যে, তাঁর উদ্যোগে রচিত বিখ্যাত ফতোয়ার কিতাব 'ফতোয়া আলমগিরি বা আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া' পৃথিবীজুড়ে প্রসিদ্ধি পেয়েছে। ফতোয়া আলমগিরিতে মোট ৬০ অধ্যায় ১০০০ অনুচ্ছেদ-পরিচ্ছেদ ও দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় প্রায় সব মাসলা-মাসায়েল আছে। ফিকহে হানাফির শাখা-প্রশাখাগত মাসাইলের সবচেয়ে বড় সঙ্কলন এটি। তার দরবার ছিল অসংখ্য আলেমের ঠিকানা। তিনি ও তার তত্ত্বাবধানে দরবারের আলেমরা যৌথভাবে এ ফতোয়াসমগ্র রচনা করেছেন। তিনি এ গ্রন্থের কারণে অমর হয়ে থাকবেন। কেয়ামত পর্যন্ত পুরো পৃথিবীর মুসলমান এতে তাদের সমস্যার সমাধান খুঁজে পাবে।

সিংহাসনারোহণের পর সম্রাট আলমগীর ৩০ পারা কোরআন শরিফ মুখস্থ করেছিলেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে ঈলম চর্চায় আত্মনিয়োগ করতেন। দিনে-রাতে অনেক বেশি নফল নামাজ পড়তেন। কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার করতেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়তেন। রমজান মাসের শেষ দশক মসজিদে এতেকাফ করতেন। খতম তারাবি নিজে পড়াতেন। তিনি ছিলেন ইবাদতগুজার, শ্রেষ্ঠ শাসক, বীরযোদ্ধা, মুজাহিদ-গাজী।

‘(সম্রাট আওরঙ্গজেব) আমাদের যুগে হিন্দুস্থানের সম্রাট, আমিরুল মুমিনীন ও ইমাম তথা মুমিনদের নেতা ও আমীর, মুসলিমদের এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার স্তম্ভ, আল্লাহর পথের মুজাহিদ, বিশিষ্ট আলেম ও আল্লামা, আরেফবিল্লাহ বা আল্লাহর পরিচয় লাভকারী সূফী এবং দীনের সাহায্যে অটল বাদশাহ। নিজ দেশে তিনি কাফিরদের নির্মূল করেন। তাদের করেন পরাস্ত। তাদের গির্জাগুলো গুঁড়িয়ে দেন। তাদের অংশীদারদের করেন দুর্বল। ইসলামের সাহায্য করেন এবং হিন্দুস্থানে ইসলামের মিনার উঁচু করেন। আল্লাহর কালামকে করেন একমাত্র বুলন্দ। হিন্দুস্থানের কাফিরদের থেকে তিনি জিযয়া গ্রহণ করেন।
অব্যাহতভাবে তিনি সুবিশাল সব রাজ্য বিজয় করে যান। যখনই তিনি কোনো শহর বিজয় করতে চাইতেন, তা করেই ছাড়তেন। এমনকি আল্লাহ তাকে সম্মানের জগতে স্থানান্তর অব্দি তিনি ছিলেন জিহাদে। যাবতীয় সময় ব্যয় করেছেন দ্বীনের কল্যাণ ও মহান পালনকর্তার খেদমতে। যেমন সিয়াম, কিয়াম ও সাধনায়- যার কোনোটিও অনেকগুলো মানুষের জন্য কঠিন। এটা আসলে আল্লাহর অনুগ্রহ যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন। সম্রাট আলমগীর নিজের সময়গুলো ভাগ করে নিতেন। নির্দিষ্ট সময় ছিল ইবাদত, পাঠদান, সামরিক দফতর, ফরিয়াদকারী, দিনে-রাতে আগত রাজ্যের সংবাদ ও চিঠি পাঠ ইত্যাকার প্রত্যেক কাজের জন্য। একটি কাজের সঙ্গে অন্য কাজের সময় কখনো একাকার হত না। এককথায় তিনি ছিলেন সময়ের সৌন্দর্য-তিলক, সাম্রাজ্য পরিচালনায় তুলনারহিত। তাঁর সাম্রাজ্য ও উত্তম জীবনী নিয়ে ফারসীতে অনেক দীর্ঘ বই সংকলিত হয়েছে। আগ্রহী ব্যক্তিগণ চাইলে সেসব পড়ে দেখতে পারেন।’ (সিলকুদ-দুরার ফী আ‘ইয়ানিল কারনিছ-ছানী ‘আশার: ৪/১১৩)

আওরঙ্গজেবের এই আধ্যাত্মিক ও আত্মিক উৎকর্ষ সাধনের কথা স্বীকার করেছেন শ্রীবিনয় ঘোষের মত লোকও। বলেছেনঃ 'ভারতবর্ষ যদি ইসলাম ধর্মের দেশ হইত তাহা হইলে সম্রাট আওরঙ্গজেব হয়ত ধর্মপ্রবর্তক মুহাম্মদের বরপুত্ররূপে পূজিত হইতেন। বাস্তবিক তাহার মত সচ্চরিত্র,নিষ্ঠাবান,মুসলমান ইসলামের জন্মভূমিতেও দুর্লভ।' তিনি আরো লিখেছেন-'সম্রাট বলতেনঃ বিশ্রাম ও বিলাসিতা রাজার জন্য নহে।' শ্রী-বিনয় মশাই আরো লিখেছেনঃ 'বাস্তবিক বিলাসিতার অভ্যাস আওরঙ্গজেবের একেবারেই ছিল না। বাদশাহের বিলাসিতা তো দূরের কথা, সাধারণ ধনীর বিলাস স্বাছন্দ্যও তিনি ব্যক্তিগত জীবনে এড়াইয়া চলিতেন। লোকে তাঁহাকে যে রাজবেশী 'ফকীর' ও 'দরবেশ' বলিত তাহা স্তুতি নহে ,সত্য। পোশাক-পরিচ্ছেদে, আহারে বিহারে তিনি সংযমী ছিলে। সুরা,নারী,বিলাস তাহাকে স্পর্শ করিতে পারে নাই।' (চেপে রাখা ইতিহাসঃ ১০৫-১০৬পৃ)

সুলতান আওরঙ্গজেবের এই প্রবাদসম সফলতার পেছনে বিপ্লবী সংস্কারক আলিম হযরত মুজাদ্দিদে আলফেসানীর অবদানের কথা ইতিহাসের ছাত্র মাত্রই জানেন। সম্রাট আকবরের ইসলামবিদ্বেষী বিনাশী নতুন চিন্তাধারার প্রেক্ষিতে শ্রদ্ধাভাজন আলিম সমাজ যে মুক্তির প্রদীপ জ্বালিয়ে ছিলেন তার প্রদীপ প্রভায় সর্বাধিক আলোকিত ছিল আওরঙ্গজেবের কাল। ফলে বিজয়, শাসন, ইনসাফ ও সমৃদ্ধির বিচারেও তাঁর শাসনকাল ছিল মোগল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। বিশাল ভারতের মাটিকে সিক্ত করেছিল তাঁর ন্যায় ইনসাফ ৷

আরব সাহিত্যিক শাইখ আলী তানতাবী রহ. তার ক্ষেত্রে ‘খুলাফায়ে রাশিদীনের অবশিষ্টাংশ’ উপাধি প্রয়োগের দাবী করেছেন। তার রচিত ‘রিজালুম মিনাত-তারীখ’ (ইতিহাসের মনীষীরা) গ্রন্থে তিনি তার অমূল্য জীবনী সংযুক্ত করেছেন।

আওরঙ্গজেবের জীবনী শেষ করেছেন তিনি এ কথা বলে, ‘বাদশাহ এমন দু’টি বিষয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন যা পূর্ববর্তী কোনো মুসলিম শাসক সক্ষম হন নি:

প্রথম: তিনি পাঠদান কর্ম সম্পাদন বা কিছু সংকলন ইত্যাদি কাজ দাবী করা ছাড়া কোনো আলেম বা পণ্ডিতকে উপঢৌকন বা সম্মানি দিতেন না। এমন যাতে না হয় যে তিনি সম্পদ পেলেন আর অলস হয়ে গেলেন। এতে করে দুটি মন্দ কাজের সন্নিবেশ হবে- অধিকার ব্যতীত সম্পদ গ্রহণ এবং জ্ঞান গোপন করা।

দ্বিতীয়: তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি শরী‘আতের বিধি-বিধানগুলো এক কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন, যাকে আইন হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তাঁরই নির্দেশ, তত্ত্বাবধান ও সুনজরে ফাতওয়া সংকলনগ্রন্থ প্রণীত হয়। তার নামে যার নাম দেওয়া হয় ‘ফাতাওয়া আলমগীরী’। এটি ‘ফাতাওয়া হিন্দিয়া’ নামে সুবিখ্যাত। ফিকহে ইসলামীতে বিধি-বিধান সংক্রান্ত সবচেয়ে বিখ্যাত ও বিন্যাসের দিক থেকে সবচেয়ে অনবদ্য গ্রন্থ।’ (রিজালুম মিনাত-তারীখ, পৃ. ২৩৬)

আওরঙ্গজেবের মানবতাবোধ, জনদরদ আর চারিত্রিক দৃঢ়তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো পিতা শাহজানের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ। ভারত বর্ষে শাহজানের অমর কীর্তি-তাজমহল। প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজকে হারিয়ে তার স্মৃতি স্তম্ভ হিসাবে শাহজাহান পৃথিবীর সপ্তাশ্চর্য এই তাজমহল নির্মাণ করেন। বাইশ বছর ধরে বিশ কোটি বার লক্ষ রূপি খরচ করে নির্মাণ করা হয় এই মহল। এর ফলে রাজকোষ শূন্য হয়ে পড়ে। কিন্তু এতেও তৃপ্ত হয়নি শাহজাহানের বিষাদ-পীড়িত রাজ-হৃদয়। তাই তিনি তুষার শুভ্র আকাশ স্পর্শী তাজমহলের পর ভ্রমর কালো কৃষ্ণ পাথরের আরেকটি তাজমহল তৈরির পরিকল্পনা করেন। যার ভেতরে থাকবে পান্না,হিরা, মনি, পদ্মরাগ প্রভৃতি অমূল্য ধাতুর সংস্থাপন। আর শুভ্র কৃষ্ণ তাজমহলের সংযোগ পথ তৈরি হবে মাটির ভেতর দিয়ে। ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে যদি এই নতুন তাজমহল সৃষ্টি হতো তাহলে দিল্লীর রাজকোষ অর্থনৈতিক পতনের অতল তলে হারিয়ে যেত। দেশ শিকার হতো চরম আকালের। পিতা শাহজাহানকে আরাম কক্ষে বন্দী করে আওরঙ্গযেব দেশ ও জাতিকে সেদিন এই ভয়ানক আকাল থেকে রক্ষা করেন।

আওরঙ্গজেবের অর্থনৈতিক সচেতনতা,সামাজিক সুবিচার সমকালীন পৃথিবীকে স্তম্ভিত করেছিল। বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও ফরাসী পর্যটক বার্নিয়ের এবং তাভার্নিবার। তারা উল্লেখ করেছেন-আওরঙ্গযেবের সাম্যবাদ অর্থনীতি ও শাসননীতি এত সুন্দর ছিল যা, যে কোন নিরপেক্ষ মানুষের মনকে আনন্দে বিস্ময়ে অভিভূত করে। কালমার্কসও ইতিহাসের এই অধ্যায় পড়ে অভিভূত ও মুগ্ধ হয়েছিলেন। একথা শ্রী বিনয় ঘোষও তার 'ভারতবর্ষের ইতিহাস' গ্রন্থে স্বীকার করেছেন। বিনয় বাবু লিখেছেন-'বার্নিয়েবের বিশ্লেষণ পাঠ করিয়া কালমার্কসের মত মনিষীও মুগ্ধ হইয়াছিলেন। (চেপে রাখা ইতিহাসঃ ১৩২-১৩৩ পৃ ,ভারতজনের ইতিহাস, পৃঃ ৪৮০)

মার্কিন ইতিহাসবিদ ট্রাশকার মতে, “এটা একটা ভুল ধারণা যে আওরঙ্গজেব হাজার হাজার হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন। তাঁর সময়ে এমন কোন ঘটনা ঘটেনি যাকে হিন্দুদের গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করা যেতে পারে। সত্যিকার অর্থে আওরঙ্গজেব হিন্দুদেরকে সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছিলেন।”

জিযিয়া কর প্রবর্তন তিনি করেন কারণ এটা ইসলামের আইন। অন্যদিকে সম্রাট আকবের প্রবর্তন করা অসংখ্য অবৈধ কর যেগুলো অমুসলিমদের উপর করা হয়েছিল সেগুলো তিনি রহিত করেন৷ তাহলে এসব অভিযোগের সত্যতা কতটুকু সেটা আমরা অনুমান করতেই পারি৷

মার্কিন ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রাশকা তাঁর বই ‘আওরঙ্গজেব – দ্যা ম্যান অ্যান্ড দ্যা মিথ’ বইয়ে লিখেছেন যে আওরঙ্গজেব হিন্দুদের ঘৃণা করতেন আর তাই মন্দির ধ্বংস করেছেন বলে যে দাবী করা হয়, তা ভুল।

তিনি লিখেছেন, ব্রিটিশদের শাসনের সময় তাদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ অর্থাৎ জনগোষ্ঠীকে ‘বিভাজন আর শাসন করো’ নীতির আওতায় ভারতে হিন্দু বর্ণবাদী ধারণা উস্কে দেয়ার কাজটি করেছিলেন যেসব ইতিহাসবিদরা, তারাই মূলত: আওরঙ্গজেবের এমন একটি ইমেজ তৈরির জন্য দায়ী।

আওরঙ্গজেব ও সাহিত্য-কৃষ্টি
আওরঙ্গজেব যখন জন্ম নেন তখন সম্রাট ছিলেন তাঁর পিতামহ জাহাঙ্গীর। তিনি ছিলেন শাহ জাহানের তৃতীয় পুত্র। শাহ জাহান ছিলেন চার ছেলের পিতা, আর এদের সবার মা ছিলেন মমতাজ মহল। ইসলাম ধর্মীয় সাহিত্য চর্চার বাইরে তিনি তুর্কি সাহিত্য এবং বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি পড়েছেন। অন্যসব মুঘল সম্রাটদের মতোই আওরঙ্গজেব ছোটবেলা থেকেই হিন্দিতে অনর্গল কথা বলতে পারতেন।

আওরঙ্গজেব ১৬৭৯ সালে দিল্লি ছেড়ে দক্ষিণ ভারতে চলে যান। মৃত্যুর আগে তিনি আর উত্তর ভারতে ফিরে আসেননি।

আওরঙ্গজেব তাঁর পুস্তক ‘রুকাত-ই-আলমগীরী’তে লিখেছিলেন যে দক্ষিণ ভারতে যেটির অভাব তিনি সবচেয়ে বেশী অনুভব করতেন, তা হলো আম। জামশেদ বিলিমোরিয়া এই বইটি অনুবাদ করেছেন। বাবর থেকে শুরু করে সব মুঘল সম্রাটই আম খুব পছন্দ করতেন।

ট্রাশকা লিখেছেন আওরঙ্গজেব নিয়মিতই তার সভাসদদের নির্দেশ দিতেন যে তাঁর জন্য যে উত্তর ভারতের আম পাঠানো হয়। কয়েকটা আমের হিন্দি নামকরণও করেছিলেন তিনি, যেমন সুধারস আর রসনাবিলাস ৷

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দের ৩ মার্চ ৮৮ বছর বয়সে আহমেদনগরে তিনি ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন শুরু হয়৷ ওয়াদিয়ে কিদ্দিস বা ঋষিদের উপত্যকা নামক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।(তারীখে দাওয়াত ওয়া আযীমতঃ ৪:৩৪৩)

ট্রাশকা লিখেছেন যে আওরঙ্গজেবকে দাফন করা হয়েছিল মহারাষ্ট্রের খুলদাবাদে একটি কাঁচা কবরে।
ঠিক এর বিপরীতে, হুমায়ূনের জন্য দিল্লিতে একটি লাল পাথরের মকবরা তৈরি করা হয়েছিল, আর সম্রাট শাহ জাহানকে দাফন করা হয়েছিল জাঁকজমকপূর্ণ তাজমহলে।

ওফাতপূর্ব অবস্থার বর্ণনা দিতে গিয়ে শামসুল উলামা যাকাউল্লাহ দেহলবী (রহ) লিখেছেন-
'শরীরের তাপ ছিল প্রচণ্ড। প্রবল অসুস্থতা সত্ত্বেও উত্তীর্ণ তাকওয়ার বলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে পড়তেন। একটি ওসিয়তনামা লিখেছেন। তাতে উল্লেখ করেছেন- টুপি সেলাই করে অর্জিত অর্থের অবশিষ্ট সাড়ে চার রুপি দিয়ে আমার কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। পাক কুরআনের কপি তৈরি করে অর্জিত অবশিষ্ট আটশ' পাঁচ রূপি গরীব দুঃখীদের মধ্যে বণ্টন করে দিবে।

কবি কাজী কাদের নেওয়াজ যথার্থই বলেছিলেন,
'আজ থেকে চির উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির
সত্যই তুমি মহান উদার বাদশা আলমগীর'।

Want your business to be the top-listed Media Company in Mirpur?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Telephone

Address


Isolutions
Mirpur
1216