amarastha.com

amarastha.com

Share

06/07/2025

**এক নারীর অসীম ত্যাগের নির্মম প্রতিদান: বাল্যবিবাহ, নির্যাতন আর বিশ্বাসঘাতকতার গল্প**

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম ও গণমাধ্যমে এক নারীর হৃদয়বিদারক গল্প নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে। উম্মে সাহেদীনা টুনি, যিনি নিজের স্বামী মোহাম্মদ তারেকের জীবন বাঁচাতে নিজের কিডনি দান করেছিলেন, তিনি আজ সেই স্বামীর হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার। শুধু তাই নয়, সুস্থ হওয়ার পর তারেক পরকীয়ায় জড়িয়ে টুনিকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন এবং তার প্রেমিকার সঙ্গে সংসার পেতেছেন। এই গল্পের শিরোনাম যতটা নাটকীয়, ভেতরের বাস্তবতা ততটাই নির্মম এবং সমাজের কিছু কঠিন সত্যকে তুলে ধরে।

# # # বাল্যবিবাহ ও গ্রুমিংয়ের শিকার
টুনির জীবনের গল্প শুরু হয় ২০০৬ সালে, যখন মাত্র ১৬ বছর বয়সে তার বিয়ে হয় তারেকের সঙ্গে। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি, যা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সর্বোচ্চ হারের মধ্যে রয়েছে। প্রতি তিনটি বিয়ের দুটিই বাল্যবিবাহ, এবং টুনিও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। এই অল্প বয়সে বিয়ে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুতির আগেই সংসারের দায়িত্বে ঠেলে দেয়। একজন প্রতিবেশীর বক্তব্য অনুযায়ী, “মাত্র ১৬-১৭ বছর বয়সে টুনি আপা বিয়ে করেছিলেন। এরপর নিজের সবকিছু স্বামীর চিকিৎসায় ব্যয় করেছেন।” এই বিয়ের মাধ্যমে টুনি শুধু বাল্যবিবাহের শিকারই হননি, বরং গ্রুমিংয়েরও শিকার হন, যেখানে তার সরলতা ও কম ধারণার সুযোগ নেওয়া হয়।

বিয়ের এক বছরের মধ্যেই টুনি মা হন। তাদের পুত্রসন্তান আজমাইন দিব্য জন্ম নেয়। এই অল্প বয়সে মা হওয়া এবং সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব টুনির জীবনকে আরও জটিল করে তোলে। সমাজে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, অল্প বয়সে সন্তান জন্ম দেওয়া নারীদের “নিয়ন্ত্রণে” রাখার একটি কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। টুনির ক্ষেত্রেও এটি সত্য বলে মনে হয়, কারণ তিনি সংসার ও সন্তানের দায়িত্বে আটকে পড়েন।

# # # স্বামীর অসুস্থতা ও টুনির অসীম ত্যাগ
২০০৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে তারেক অসুস্থ হয়ে পড়েন। চিকিৎসকরা জানান, তার দুটি কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে। টুনি এই সংকটের মুহূর্তে স্বামীর পাশে দাঁড়ান। তিনি একা সন্তান লালন-পালন করার পাশাপাশি হোম পার্লার ও বুটিকের ব্যবসা শুরু করেন। তার উপার্জনের পুরোটাই স্বামীর চিকিৎসা ও সংসারে ব্যয় হয়। তিনি নিজের গয়না বিক্রি করেন, বাবার বাড়ি থেকে সাহায্য নেন, এমনকি তার মায়ের পেনশনের টাকাও তারেকের উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়ার খরচে ব্যবহার করেন।

বছরের পর বছর চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা জানান, তারেকের কিডনি প্রতিস্থাপন ছাড়া বাঁচার উপায় নেই। টুনির শ্বশুরবাড়ির অনেকের সঙ্গে কিডনি ম্যাচ করলেও কেউ দাতা হতে এগিয়ে আসেননি। এমন পরিস্থিতিতে টুনি নিজের কিডনি দান করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৯ সালের ২৬ অক্টোবর দিল্লির চিকিৎসক কেএন সিংয়ের তত্ত্বাবধানে কিডনি প্রতিস্থাপন সম্পন্ন হয়। এই ত্যাগের মাধ্যমে টুনি তারেকের জীবন ফিরিয়ে আনেন। কিন্তু এই ত্যাগের প্রতিদান কী পেলেন তিনি?

# # # নির্যাতনের শুরু: হাসপাতাল থেকেই অমানবিক আচরণ
অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, কিডনি প্রতিস্থাপনের পর হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই তারেক টুনির সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করেন। দিল্লির হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্টাফরা তারেকের আচরণে এতটাই বিস্মিত হয়েছিলেন যে তারা তাকে ডেকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, যে নারী তাকে নতুন জীবন দিয়েছে, তার সঙ্গে এমন আচরণ কীভাবে সম্ভব! কিন্তু তারেকের আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

দেশে ফিরে তারেকের আচরণ আরও খারাপ হয়। সুস্থ হয়ে চাকরি খোঁজার বদলে তিনি অনলাইন জুয়ায় মেতে ওঠেন এবং এক তালাকপ্রাপ্তা নারীর সঙ্গে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েন। টুনি যখন এই সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন করেন, তখন তারেক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। তিনি টুনিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে আরও টাকা আনার জন্য চাপ দিতে থাকেন এবং গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করেননি।

# # # আইনি লড়াই ও সমাজের নিষ্ঠুরতা
নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে টুনি ২০২৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সাভার মডেল থানায় তারেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। কিন্তু তারেক কৌশলে মুচলেকা দিয়ে অভিযোগ প্রত্যাহার করিয়ে নেন। এরপর নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। শেষপর্যন্ত জীবনের ভয়ে টুনি বাবার বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল তারেকের বিরুদ্ধে যৌতুক ও নারী নির্যাতনের মামলা দায়ের করেন। তারেক ২৪ এপ্রিল গ্রেপ্তার হলেও ৪ জুন জামিনে মুক্তি পান এবং বর্তমানে তিনি তার প্রেমিকার সঙ্গে টুনির বাড়িতেই বসবাস করছেন। টুনিকে ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে সম্পত্তি তার নামে করার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

টুনির আইনজীবী নেহার ফারুক বলেন, “নিজের কিডনি দিয়ে যে নারী স্বামীকে বাঁচিয়েছেন, সেই স্বামীই এখন তার ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন। আমরা তার জামিন বাতিলের আবেদন করব।” সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসানের মতে, এই ঘটনা শুধু নারী নির্যাতন নয়, বরং ‘মানবদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন’ লঙ্ঘনেরও অভিযোগ হিসেবে গণ্য করা উচিত।

# # # সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা
সামাজিক মাধ্যমে এই ঘটনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। একটি পোস্টে বলা হয়, “যে স্ত্রী তাকে কিডনি দিয়ে জীবন দিলো, সুস্থ হয়ে সেই স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে পরকীয়া প্রেমিকার সঙ্গে বসবাস করছেন তারেক। অমানবিক ও হৃদয়বিদারক এই ঘটনা সাভারের কলমা এলাকায় ঘটেছে।” নেটিজেনরা এই ঘটনাকে “নারী নির্যাতনের চরম নজির” হিসেবে উল্লেখ করছেন এবং তারেকের কঠিন শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন।

# # # সমাজের প্রতিচ্ছবি
টুনির গল্প শুধু একজন নারীর নয়, বরং বাংলাদেশের অসংখ্য নারীর জীবনের প্রতিচ্ছবি। বাল্যবিবাহ, গ্রুমিং, পারিবারিক নির্যাতন, এবং সামাজিকভাবে নারীর অধিকারহীনতার এই চক্র থেকে বের হওয়া এখনও অনেক নারীর জন্য দুঃসাধ্য। টুনি হয়তো অনেক আগেই তারেককে ছেড়ে চলে যেতে পারতেন, কিন্তু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তাকে “লোভী” বা “স্বার্থপর” বলে গালি দিত। তবুও তিনি প্রায় দুই দশক ধরে এই সম্পর্কে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, এমনকি নিজের স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিয়েও।

# # # আশার আলো
টুনির এই লড়াই শুধু তার নিজের নয়, বরং প্রতিটি নারীর অধিকার ও স্বাধীনতার লড়াই। তিনি এখন আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের পথে হাঁটছেন। তার মা বলেন, “আমরা আদালতের কাছে তারেকের কঠিন শাস্তি দাবি জানাই, যাতে আর কোনো মেয়ের জীবন এভাবে ধ্বংস না হয়।” আমরাও চাই, টুনি এই জখম থেকে সুস্থ হয়ে উঠুন, নিজের জীবনের মালিক হন, এবং আর কখনো পিছনে ফিরে না তাকান।

**সূত্র**: জুগান্তর, রাইজিংবিডি, ওয়ানবাংলানিউজ, সমকাল, সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত পোস্ট।[](https://inews.zoombangla.com/kidney-donation-betrayal-2/)[](https://www.jugantor.com/country-news/973525)[](https://www.risingbd.com/bangladesh/news/612510)

Want your business to be the top-listed Shop in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Telephone

Address


1st Floor, 90 Mushafir Tower, Kakrail, Dhaka
Dhaka
1000