Morsheda hossen ruby-
21/04/2026
অ বউ, সাবিলারে এট্টু ভালো কইরা কাঁচা হলুদ বাটা লাগায়া দ্যাও তো।
জ্বী, আম্মা দেবো। হাতের কাজটা সেরে নেই।
আরে রাখো তোমার হাতের কাম। ঝাটের কাম। আগে আমার মাইয়াটারে তৈয়ার করো। তোমার কাম সারাদিনই চলতে থাকবো। কামের কি বাইরা বাইরি। এইরকম কত কাম চক্ষের পলকে একশ একটা করছি। কাকপক্ষী ট্যার পায়নাই। তোমগো মতো এতো আরামের জীবন পাই নাই আমরা। রান্ধনের আগে তয়তরকারী কুটছি, নিজের হাতে মশলা বাটছি, মাছ কুটছি তয় রানছি। তোমরা তো প্যাকেট খুললেই এই মসলা ঐ মসলা পাও। তারপরেও তোমগো বলে কামই শ্যাষ হয়না।
ওপাশে নিরব। সালেহা বেগম অধৈর্য্য হয়ে চেঁচালেন, কি করতাছো কি তুমি ?
রেজালাটা চুলায় আম্মা। যদি তলা ধরে যায় তাই নামিয়ে রেখে সরতে চাচ্ছিলাম!" নিহার রান্নাঘর থেকে উঁকি দিয়ে বলল।
জ্বাল ঢিমা কইরা পাতিলের নিচে তাওয়া দিয়া দ্যাও। কিচ্ছু হইবো না। এক বাচ্চার মা হয়া গেছো অখোনো কামের ভাও শিখলানা।
সালেহা বেগম গজগজ করতেই থাকলেন। নিহার দ্রুত হাতে রেজালার পাতিলা সরিয়ে ধিমে আঁচে তাওয়া বসিয়ে তার উপর পাতিলা বসিয়ে দিলো। এতোটুকু সাবধান না হয়ে উপায় নেই। এটা ঘরের তরকারী হলেও এতো চিন্তা ছিলো না। কিন্তু বহিরাগত দশ জন লোক খাবে এটা। এদিক ওদিক হলে মানসম্মান থাকবে না। তাই নিহার খুব যত্ন করেই রেজালাটা রেঁধেছে আজ। মাংসটা ইচ্ছে করে আন্ডারডান রেখেছে যেন সন্ধ্যায় আরেকবার জ্বাল দিলে খুলে না যায়।
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে হলুদ বাটার বাটিটা নিয়ে সাবিলার ঘরে উঁকি দিলো নিহার।
আসব ?
হম, আসো। কাজ শেষ হইসে তোমার?
হ্যাঁ, হয়েছে। এসো তোমায় হলুদ মেখে দেই। একটু সন্ধি বাটাও এনেছি, চুলে দিয়ে দেব।'
আম্মা বাটতে বলসে, তাই না?
নিহার জবাব না দিয়ে হাসল। নিজ হাতেই সাবিলার খোঁপা খুলে চুলগুলো হাত দিয়ে আলগা করতে লাগলো।
সাবিলা ওর দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে বসে বলল, ভাবী?
হুম? '
আমি তো তোমার চেয়েও ফর্সা তারপরেও আম্মা আমাকে হলুদ বাটা লাগাতে বলে কেনো বলো তো?
কারন হলুদে গায়ের ময়লা কাটে। রং ফুটে ওঠে। দেখি মাথা ঠিক কর।' বলে সাবিলার চুলগুলো বিলি দিয়ে ভাঁজে ভাঁজে সোন্দা মাখিয়ে দিতে লাগলো নিহার।
সাবিলা মুখ গোমড়া করে বললো, চেহারার ময়লা নাহয় হলুদ দিয়ে কাটালে। আমার ভাগ্যের ময়লা কি দিয়ে কাটাবে।
ছিঃ এভাবে বলতে হয়না। ভাগ্য আল্লাহর হাতে। তুমি নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে মনের মানুষ চাও। একমাত্র দোয়াই পারে তাকদীর বদলে দিতে। তাছাড়া আমরা তো কেউ এখানে পার্মানেন্টলি থাকতে আসিনি। পরীক্ষা দিতে এসেছি। পরীক্ষা শেষে খাতা গুটিয়ে হল ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হবে। রেজাল্ট মিলবে আখেরাতে।
এসব বলে নিজেকে বুঝ দিয়ে রাখছো ভালো কথা কিন্তু এভাবে আর কতদিন।
যতদিন আল্লাহ চান। আমার গোটা জীবন আমি আল্লাহর কাছে বিক্রি করে দিতে চাই ঐ দুনিয়ায় নাজাতের আশায়। কুরআনে আল্লাহ তা'লা মুমিনদের জান মাল কিনে নেবার কথা বলেছেন যার বিনিময় জান্নাত। জানিনা আমার এই টুটাফাটা আমল আমার রব কিনবেন কিনা।
সাবিলা আর কোনো কথা বাড়ালো না। কখনো বাড়ায় না। কথাবার্তার একটা পর্যায়ে তাকে চুপ করে যেতে হয় কারন তার দৃষ্টিতে নিহারের ধৈর্য্য অপরিসীম। এতো দুঃখ মনে নিয়েও সে হাসিমুখে কিভাবে চলতে পারছে সাবিলা ভেবে পায়না।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, " ভাবী, আজকের পাত্রটা নিয়ে আম্মা মনে হয় একটু বেশীই এক্সাইটেড, তাই না? প্রসঙ্গান্তরে সাবিলা বললো।
মা হন তোমার। এক্সাইটেড তো হবেনই। ঘরে বিবাহযোগ্যা মেয়ে থাকলে মায়ের অস্থির না হয়ে উপায় আছে। তোমার একটা ভালো বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত আম্মার এই চিন্তা যাবেনা!"
' তুমি নিজেও তো বিবাহ যোগ্যা। কই তোমার মায়ের তো কোনো চিন্তাই নাই! তোমার বয়সও তো আমার চেয়ে কম। সম্পর্কে বড় ভাইয়ের বৌ ছিলে বলে ভাবী ডাকতে হয়। ভাগ্যের ফেরে অল্প বয়সে বিধবা হয়ে গেছো তাই বলে কি সারাজীবন কি এভাবেই থাকবে! কি আশ্চর্য্য! তোমার বাসা থেকে সবাই এভাবে ঠান্ডা মেরে বসে আছে কেন বুঝিনা। তোমার মামারাই বা কেমন ! সাবিলা এবার না বলে পারলো না।
আমার কথা বাদ দাও। ছেলের মা হয়ে গেছি। দুদিন বাদে শ্বাশুড়ী হয়ে যাব ! আমার আবার কিসের বিয়ে ! নিহার হাসলো।
অল্প বয়সে বিয়ে করসো বলে এতো তাড়াতাড়ি ছেলের মা হইসো। আর দেড় বছরের সংসারও কোনো সংসার ? তাছাড়া তালহা এখনো দুধের শিশু। তোমার বিয়ে নিয়ে তোমার বাড়ীর লোকদের ভাবা উচিত! তখন তালহা পেটে ছিলো বলে নাহয় ভাবতে পারেনি কিন্তু এখন তো ভাবতে পারে।
নিহার কোনো জবাব দিলো না। মনোযোগের সাথে সাবিলার হাত পা পিঠ ঘাড় সর্বত্র হলুদ মাখাতে লাগল।
সালেহা একবার এ ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে সন্তষ্টচিত্তে চলে গেলেন। আজ তার মনটা অন্যান্য দিনের তুলনায় একটু ভালো কারন আজ সাবিলাকে দেখতে যে পাত্রপক্ষ আসবে তারা আত্মীয়ের মধ্যেই পড়ে। আর আত্মীয় পরিজনের মাধ্যমেই ভালো বিয়ে লেগে যায়। জোর সম্ভাবনা আছে সাবিলার বিয়েটা এখানেই লেগে যাবার।
ছোটবোন মিলার মুখে খবরটা শোনার পর থেকেই সালেহার মনটা আনন্দে অধীর হয়ে আছে। খুশিতে তিনি আজ জোহরের নামাজের পর পর দুই রাকাত শোকরানা নামাজও আদায় করে ফেলেছেন। সকাল বেলাতেই নিহারকে ডেকে আজকের রাতে পোলাও কোর্মা রান্নার আয়োজন করতে বলে দিয়েছিলেন। আলমারী থেকে টাকাও বের করে রেখেছেন যেন মেয়েটাকে জোর করে হলেও পার্লারে পাঠাতে পারেন।
যদিও মাসের সাতাশ তারিখে মেয়ের হাতে ফেসিয়ালের খরচ তুলে দেয়াটা তার পক্ষে এক ধরনের বিলাসিতা ছাড়া আর কিছুই নয় কিন্তু কোনো উপায় নেই। আজকের পাত্রটা হাতছাড়া করা চলবেনা কোনোমতেই।
যে কোনে উপায়েই হোক পাত্রটাকে রাজী করাতেই হবে। অবশ্য সেই উপলক্ষে তার ছোটোবোন মিলাও কম সাহায্য করছে না। ওর পাশের বাড়ীরই কোন এক মহিলা যেন বিয়ের জন্য পানিপড়া চিনিপড়া দেয় মিলা সেগুলোও যোগাড় করে নিয়ে এসেছে। কাঁচাহলুদ বাঁটা পড়িয়ে এনেছে। এটা মেয়ের মুখে লাগালে নাকি পাত্রের মনে বিয়ের আকর্ষণ জন্মাবে।
সালেহা সেসবই যত্ন করে তুলে রেখেছেন। পাত্রের সামনে যাবার আগে হলুদটা মুখে হালকা করে মেখে গেলেই হবে। আর ঐদিকে নিহারকে বলে দিয়েছেন চিনিটা যেন ঘন দুধের পায়েশ রান্না করার সময় তাতে দিয়ে দেয়। ছেলে এক চামচ খেলেই কেল্লা ফতে। টুক করে মন ঘুরে যাবে। তবে ছেলে যদি বলে 'মিষ্টি খাইনা' তাহলেই বিপদ। তাকে যে করেই হোক এক চামচ হলেও খাওয়াতেই হবে।
তবে যত যাই হোক, সাবিলার ফেসিয়ালটা আজ একবার করানো দরকার। কারন তিনি দেখেছেন ফেসিয়াল করে এলে সাবিলার চেহারাটা বেশ উজ্জল দেখায়। এমনিতে সাবিলার গায়ের রংটা ফর্সামতন হলেও চেহারার মধ্যে প্রচুর তিলের আধিক্যের জন্য ওর রঙটা যেন ঠিক ফুটে উঠেনা। তার উপর গায়ে একটু তাপ লাগলেই তার কাছে মনে হয় মেয়েটাকে কেমন যেন একটু কালচে দেখায়। আর এ কারনে সালেহা কখনোই মেয়েকে রান্না ঘরে ভিড়তে দেন না। কলেজেও রিক্সা ভাড়া দিয়ে পাঠান। যেন রোদে হাঁটাহাঁটি করতে গিয়ে গায়ের রঙটা পুড়ে তামাটে হয়ে না যায়। তার উপর মসুরের ডাল বাটা, বেসন পেষ্ট, শসা আর আলুর চাক কিংবা চা-পাতার ব্যাগ দিয়ে রূপচর্চা তো নিত্যদিনই চলছে। তবে এতো কিছুর পরও কেন যে মেয়েটার একটা ভালো সান্ত মাসে না তিনি ভেবে পান না। মেয়েটাকে একরকম শোকেসে সাজিয়ে রাখার মতো করে পালছেন তিনি অথচ চেহারায় কোনো জেল্লা নেই। দিন দিন আরো যেন মুটিয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। অথচ ঐ দিকে নিহারের অবস্থা ঠিক তার উল্টো। চেহারার চিকনাই যেন আরো বাড়ছে। ওর কি এখন এতো রুপের দরকার আছে !
প্রচলিত অর্থে নিহারকে খুব সুন্দরী বলা যাবে না। কারন ওর গায়ের রংটা একটু চাপার দিকেই। সাবিলার তুলনায় ওকে কালোই বলা চলে তবে ওর ঘন পাঁপড়ী ঘেরা চোখ দুটোয় বেশ অদ্ভুত একটা মায়া আছে। হাসলে গাল দুটো ভেতরে গর্ত হয়ে ডেবে যায় বলে বেশ লাগে দেখতে।
ছেলেটার অনেক পছন্দ ছিলো বলেই পিতৃমাতৃহীনা নিহারকে তার একমাত্র ছেলের বউ করে এনেছিলেন সালেহা। তার ছেলে এতোই পছন্দ করেছিলো যে যৌতুকের ধারও ধারে নি।
ছেলের দিকে তাকিয়ে সালেহাও মেনে নিয়েছিলেন সেসব। আর মামার বাড়ীতে মানুষ হওয়া নিহারও সমান আবেগে মনপ্রাণ দিয়ে তার সংসারটাকে আপন করে নিয়েছিলো।
কিন্তু কপালের লিখন না যায় খন্ডন। একটা মৃত্যু সব এলোমেলো করে দিলো।
বিয়ের মাত্র দেড় বছরের মাথায় তার ছেলেটা রোড এক্সিডেন্টে প্রাণ হারায় আর অল্প বয়সের বউটা বিধবা হয়ে যায়। একমাত্র নাতি 'তালহা' তখন নিহারের গর্ভে। সালেহার সেদিন সামান্য একটু আশঙ্কা ছিলো নিহারকে নিয়ে। কে জানে, হয়তো ওর মা বা মামারা নিজেদের কাছে নিয়ে যাবে নিহারকে, বাচ্চাটা হয়ে গেলে নাতিটাকে তার কাছে ফেলে দিয়ে নিহারকে অন্যত্র বিয়ে দিয়ে দেবে। এই ভয়টা কুড়ে খেতো তখন।
কিন্তু সেরকম কিছুই হয়নি। নিহার নিজেই সেসব দিকে পা বাড়ায়নি আর তার মামারাও এসব নিয়ে মাথা ঘামায়নি। বরং নিহারের মা তালহা হবার পর তার হাত ধরে বলেছে, 'আমার মেয়েটা আপনার ঘরে আসছে লাল শাড়ী পড়ে আর বেরোবে সাদা শাড়ী পড়ে।
সেই থেকে নিহার সালেহার কাছেই আছে। সালেহা নিজেও তালহার মাঝে তার হারানো ছেলেকে খুঁজে পেয়েছেন। তালহা তার হৃদয়ের অর্ধেক। নিহার নিজেও তার জীবনের সমস্ত আনন্দ খুঁজে পেয়েছে তালহাকে ঘিরে। বাপহারা এতিম ছেলেটাকে এক নজরের জন্য চোখের আড়াল করেনা নিহার।
সালেহা নিজেও নিহারের মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়ে গেছেন। মুখে না বললেও মনে মনে তিনি ঠিকই টের পান যে, নিহার না থাকলে তার সংসার দেখার কেউ নেই। তার সংসারের ঘরে বাইরে যাবতীয় ঝুট ঝামেলা নিহারই সামলায়।
নিহার মেয়ে হিসাবেও যথেষ্ট চৌকস, একাই ঘর বাহির দুই দিক সামলাতে পারে। ঘর সংসারের কাজ ছাড়াও তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়া, হঠাৎ কোনো দরকারে ডায়াবেটিস প্রেসার চেক করিয়ে আনা, মাসান্তে ঔষধ কিনে আনা, বাড়ী আনার পর সেগুলোকে আবার সকাল বিকালের ষ্টিকার লাগিয়ে দুটো বাটিতে ভাগ করে রাখা, সপ্তাহে দুদিন চুলে শ্যাম্পু সাবান দিয়ে দলাই মলাই করে তাকে গোসল করিয়ে দেয়া, চুলে তেল দিয়ে চুল আঁচড়ে দেয়া, প্রতিদিন দুই বেলা ইনসুলিন পুশ করা আর ঘড়ি ধরে খাবার সামনে তুলে দেবার এই কাজগুলো তো ওই করে দেয়। সাবিলা বেচারী তো পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত। রাত জেগে পড়তে হয় ওকে, এসব কাজের সময় কোথায় ওর!
সালেহার সংসারে মানুষ বলতে তারা চারজন। বিধবা নিহার, একমাত্র নাতি তালহা, মেয়ে সাবিলা আর সালেহা নিজে। সাবিলার বাবা মারা গেছেন আজ থেকে বছর দশেক আগে। তারপর থেকে সালেহা নিজেই এক হাতে সবদিক সামলে আসছিলেন। ছেলেটাকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। ভালো চাকরীও করছিলো সে। ও বেঁচে থাকতে সংসারে তবু যতটুকু স্বচ্ছলতা ছিলো, ওর মৃত্যুর পর থেকেই বেশ টানাটানির মধ্যে পড়ে গেছে সালেহার সংসার।
বর্তমানে স্বামীর রেখে যাওয়া বাড়ীটার একটা অংশ ভাড়া দিয়ে দিন কোনোরকম দিন কেটে গেলেও তাতে নেই স্বচ্ছলতার রেশ। একদিক সামলাতে গেলে আরেকদিক উজাড়। এসব দেখে একদিন নিহার নিজেই শ্বাশুড়ীর অনুমতি নিয়ে স্থানীয় একটা কিন্ডারগার্টেনে চাকরী নিয়ে নিলো। বেতন অল্প হলেও কাজ মাত্র চার ঘন্টার। সকাল আটটা থেকে বেলা বারোটা। ঐ সময়টা তালহা ঘুমেই থাকে। ও ঘুম থেকে উঠে একেবারে সাড়ে দশটা কি এগারোটার দিকে। ফলে সব দিক দিয়েই নিহারের সুবিধা।
কেবল তালহাকে ওর ঘুম থেকে ওঠার পর ওকে এক দেড় ঘন্টা একটু দেখে রাখতে হয় এই যা! নিহার তালহার নাস্তা খাবার সব শ্বাশুড়ীর ঘরে রেখে যায় যেন তালহা উঠলে ওকে নাস্তা খাওয়াতে তার কোনো অসুবিধা না হয়। তবে সালেহা এমনিতে কড়া ধাঁচের মহিলা হলেও তালহা তার বড় আদরের। ফলে চাকরীটা নিতে নিহারের আর কোনো অসুবিধা হয়নি।
নিহার চাকরীটা নেয়াতে ঘরে বিরাট স্বচ্ছলতা না এলেও কিছুটা বাড়তি স্বস্তি বয়ে নিয়ে এসেছে। নাতিটার অসুখ বিসুখে অন্তত হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতে হয় না। সংসারের ছোটোখাটো প্রয়োজনেও নিহার যথেষ্ট সাহায্য করে।
সাবিলা নিজেও কিছু টিউশনি করে সংসারে সাহায্য করতে চেয়েছিলো কিন্তু সালেহা তাতে রাজী হন নি। তাতে রোদে ধুলায় ওর গায়ের রঙটাতে আরো ময়লা বসে যাবে। এমনিতেই তো সমন্ধ ঠিকমতো আসেনা, দুচারটা যাওবা আসে, তারা মেয়ে দেখে টেখে নাস্তা খেয়ে চলে যায়। তখন দেখা যাবে আরো কেউ আসবেনা। এসব ভয়েই সালেহা সাবিলাকে কলেজের বাইরে অন্য কোথাও অহেতুক ঘোরাঘুরি করতে দিতে নারাজ। তার কঠিন আদেশ হলো ক্লাস শেষ হলে সোজা বাসায়।
আজকের পাত্রটা সালেহার ছোটোবোন মিলার শ্বশুড়বাড়ীর দিকের লোক। পাত্র মিলার স্বামীর মামাত ভাইয়ের একমাত্র ছেলে। এতোদিন দেশের বাইরে ছিলো গতমাসে দেশে এসেছে বিয়ে করার জন্য। বিয়ে করে ছয়মাসের মধ্যেই নাকি বউ নিয়ে চলে যাবে। তাছাড়া ছেলের দিক থেকে নাকি কোনো চাওয়া পাওয়া নেই। ভালো সচ্চরিত্রের নামাজী মেয়ে চায় তারা।
সব শুনে সালেহা সাবিলাকে বলে কয়ে জোহর আসর মাগরিব তিন ওয়াক্তের নামাজই পড়ালেন আজকে। অন্তত যেন বলতে পারেন মেয়ে তার নামাজী।
সন্ধ্যের পর পরই পাত্রপক্ষ চলে এলো। সব মিলিয়ে পাঁচজন মানুষ। মিলা আর তার স্বামী তো আছেই, যেহেতু তাদের মাধ্যমেই পাত্রের এ বাড়ী আসা। আরও এসেছে মিলার মামাতো ভাসুর, জা অর্থাৎ ছেলের বাবা-মা, ছেলের ভাবি আর ছেলে নিজে।
সালেহা প্রচুর নাস্তার আয়োজন করেছেন। বেশীর ভাগ নাস্তাই ঘরে তৈরি। তবে তার জন্য অবশ্য নিহারকে সামান্য খাটাখাটনি করতে হয়েছে। বেচারী স্কুল থেকে এসেই সেই যে রান্নাঘরে ঢুকেছে। সারাদিনে তিনবার বেরিয়েছে, দুইবার নামাজের জন্য আর একবার তালহাকে ভাত খাওয়াতে। মাগরিবের একটু আগে কাজ শেষ করে বসার ঘর ভালো করে পরিস্কার করে মোছার কাজ শেষ করে এই অবেলাতেই গোসল করেছে।
মেহমানদের নাস্তা গুছিয়ে সাবিলার ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো সাবিলা একরকম তৈরী হয়েই আছে। সালেহা নিজে এসে এক ফাঁকে এসে মেয়েকে দেখে নিলেন।
নিহারকে বললেন," অরে তৈরী কইরা মিলার সাথে বসার ঘরে পাঠায়া দাও আর তুমি নাস্তা নিয়া আসো!"
- আম্মা, আমি গিয়ে কি করবো। বাইরের পুরুষ মানুষদের সামনে আমার যাওয়াটা তো ঠিক হবে না।"
-ক্যান, তুমি গেলে কি অসুবিধা। তোমারে তো আর দেখতে আসে নাই। তুমি হইলা গিয়া ভাবি। ননদের জামাইরে মিষ্টি তো জোর করে তুমিই খাওয়াইবা। ঐ টা কি আমি বা মিলা করতে পারুম যে ঢংয়ের কথা কও? প্যাচাল থুয়া নাস্তা নিয়া জলদি আসো।" বলে সালেহা বেরিয়ে গেলেন।
নিহার মনখারাপ করে রান্না ঘরে চলে এলো। দ্বীনহীন মানুষদের মাঝে দ্বীনের ছোটখাটো আহকাম গুলো মেনে চলাও বড় কঠিন হয়ে পড়ে মাঝে মধ্যে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিহার স্যালোয়াড় কামিজের উপর দিয়ে একটা বড় হিজাব পড়ে নিলো। তার উপর দিয়ে পেঁচিয়ে নিলো থ্রিপীসের ওড়নাটা।
কাঁপা হাতে ট্রে নিয়ে যখন বসার ঘরে পা দিলো তখন শুনলো ছেলের মা হাসিমুখে সাবিলাকে প্রশ্ন করছেন আর বলছেন, "মাশাআল্লাহ। খুব ভালো। কোন সাবজেক্টে অনার্স করছো তুমি?
নিহার আস্তে করে সালাম দিয়ে নাস্তার ট্রেটা নামিয়ে রাখলো। একে একে নাস্তা সাজিয়ে ছেলের মায়ের হাতে তুলে দিলো। মিলাও সাহায্য করলো ওকে। সালেহা যথাসম্ভব মিষ্টি হেসে বললেন," আমার ছেলের বউ। আমার মেয়েই বলতে পারেন। ওকে আমি আমার মেয়ের মতোই দেখি। "
নিহারের মনে হলো পাত্র পক্ষ যেন আচমকা বোবা বনে গেছেন। পাত্রের মা চুপচাপ খেলেন কোনো মন্তব্য করলেন না। শুধু ছেলে একবার কেকের প্লেটটা বাড়িয়ে ধরে বলল, আপনিও নিন আমাদের সাথে।' নিহার তর্ক না করে অনুরোধ রক্ষা করলো।
রাতের খাবারের সময় হলে টেবিলে খাবার দিয়ে তালহাকে কোলে নিয়ে একপাশে সরে দাঁড়ালে ছেলের মা বললেন," তুমি তো বেশ গুণী মেয়ে। এসবই তুমি রান্না করেছো?'
নিহার লজ্জা পেয়ে কিছু বলতে যাবার আগেই সালেহা বললেন, " ও আর সাবিলা মিলে করেছে। আমার সাবিলাও রান্নায় ওস্তাদ। যে কোনো রেসিপি পাইলেই হইলো, সাথে সাথে রান্না করে সবাইরে খাওয়াবে।"
-" তাই নাকি, মাশাআল্লাহ! আপনার মেয়ে তো বেশ গুণী। তা মা তুমিও আমাদের সাথে বসো। নিহারকে উদ্দেশ্য করে বললেন ছেলের মা।
নিহার মৃদু হেসে বললো," না, আন্টি। আপনারা বসুন। আমি তো আছিই।"
মিলা নিজেই এবার পাত্রপক্ষের খাওয়া দাওয়ার দিকটা দেখলেন। যাবার আগে ওরা সাবিলার হাতে দুহাজার টাকা দিয়ে গেলো। ছেলের মা মিলার কানে কানে বলে গেল, বাসায় গিয়ে ফোন দিয়ে মতামত জানাবে।
সালেহা সেইরাতে ভালো করে ঘুমাতে পারলেন না। মিলা এরই মধ্যে ফোন করে জানিয়েছে তার মামাত ভাসুর আর জা'র হাবভাব নাকি পজিটিভ মনে হচ্ছে। আগামী কাল সকালে তারা মিলার বাড়ী আসবেন বলেও জানিয়েছেন। খবরটা শুনে সালেহার বুকের ভেতর ধুকধুক শুরু হয়ে গেছে।
মনে মনে তিনি মেয়ের বিয়ের একটা খসড়া হিসাব করতে লেগে গেলেন।
সকালে উঠে আজ নিহারকে নাস্তা বানাতে দিলেন না তিনি। হাসিমুখে বললেন, ' তুমি স্কুলে যাও গিয়া। আজ সাবিলাকে বলুম নাস্তা বানাইতে। দুইদিন পরেই তো পরের ঘরে যাইবো। কাজকাম শিখতে হইবোনা। পরে শ্বাশুড়ীর কথা শুনোন লাগবো আমার মাইয়ার। সবাই কি আর আমার মতোন সইয্য করবো নাকি !
শেষ কথাটা নিহারের বুকে গিয়ে বিঁধলেও হাসিমুখেই বোরকা নিকাব করে স্কুলে চলে গেলো সে।
ফিরলো বেলা সাড়ে বারোটায়। অন্যান্য দিনের মতো স্কুল থেকে ফিরে বোরকা খুলেই সংসারের কাজে নেমে পড়লো নিহার। তবে শ্বাশুড়ীর থমথমে মুখ দেখে কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না আর। কেন যেন মনে হচ্ছে তার মনমেজাজ সকালের মতো ভালো নেই। একটু আশঙ্কাও জাগলো মনে, এরা কি মানা করে দিলো নাকি! ইস্, বেচারী সাবিলা।
শ্বাশুড়ীর জন্য এবার কষ্টই হতে লাগলো নিহারের।
দুপুরের রান্না শেষ করে ছেলেকে খাওয়াতে বসেছে নিহার। তখন সালেহা ঘরে ঢুকে বললেন, ' রাকিব তোমারে কয়দিন থেইকা চিনে বউ ?
কোন্ রাকিব আম্মা ?
আমার লগে রং করবানা, রাকিবরে তুমি চিনো না, তাই না? কাইলকা যে পোলাটা সাবিলারে দেখতে আইছিলো অর নাম যে রাকিব তুমি তাও জানো না।
আমি কিভাবে জানবো আম্মা। আমি কি ওনাকে কখনো দেখেছি না জানি ? কেন কি হয়েছে ? "
-" না দেখলে না জানলে ঐ আবিয়াইত্তা পোলা সাবিলারে থুয়া তোমার মতো বিয়াইত্তা বেটিরে বিয়া করবার চায় কিয়ের লিগা এইটা বুজাও আমারে ! '
উপলব্ধি
শুধুমাত্র বইটই তে
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Website
Address
Dhaka