Independence Research Parishad -IRP

Independence  Research  Parishad -IRP

Share

21/09/2024

'৭১ এর মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু দুর্লভ ছবি।

09/09/2024

আমার সোনার বাংলা
আমি তোমায় ভালোবাসি।

20/08/2024

শুভ জন্মদিন
শহিদ কবি মেহেরুননেসা
(মুক্তিযুদ্ধে শহিদ প্রথম নারী কবি)
বিনম্র শ্রদ্ধা।।

[বেঁচে থাকলে তিনি আশিতে পদার্পণ করতেন আজ। পূর্ণ বয়সী মানুষ হিসেবে স্বাধীন দেশে হয়তো আমাদের মাঝেই থাকতেন আজও। একাত্তরে অবিশ্বাস্য পৈশাচিকতার শিকারে পরিণত হবার সময় তিনি ছিলেন মাত্র ২৯ বছর বয়সী।

জীবনের সূচনাতেই তাঁকে চলে যেতে হয়েছিল মা ও ভাই'দের নিয়ে। জীবন সংগ্রামে তিনি জয়ীই ছিলেন, সে যুদ্ধে তিনি অপরাজেয়। বাবা'র মৃত্যু'র পর পুরো সংসারের দায়িত্ব তাঁর ওপরেই এসেছিল।

১৪ বছর বয়সে, প্রজাপতির মতো জীবন হবার কথা যার। কিন্তু, তাঁকে লড়তে হয়েছিল কঠিন জীবন যুদ্ধে। বাংলা একাডেমী, ইউসিস লাইব্রেরী'তে কপি রাইটার হিসেবে কঠোর শ্রম দিয়েছেন। সবকিছু ছাপিয়ে তিনি এক অনন্য দেশপ্রেমিক, স্বজাত্যবোধে অনুপ্রাণিত এক মহান মানুষ। তাঁর নাম মেহেরুননেসা।

বাংলাদেশের প্রথম 'নারী শহীদ কবি', মেহেরুননেসা।

১৯৪২ সালের ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার, কোলকাতার খিদিরপুরের পাইপ রোডের ৬৩/১, বাড়িতে জন্মেছিলেন তিনি। শৈশব কেটেছে কোলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে। ছোটবেলা থেকেই যেন পৃথিবীর প্রতি আগ্রহ প্রবল ছিল তাঁর। তাই বাবার সঙ্গে ছোট্ট মেয়েটি কয়লার দোকানে বসতেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে দাঙ্গায় উদ্বাস্তু হয়ে মেহেরুনদের পরিবার ১৯৫০ সালে ঢাকা চলে আসেন। পুরনো ঢাকার নানান এলাকায় বাস করে ১৯৬৫ সালে তাঁদের পরিবার থিতু হয়ছিলেন মিরপুরে। সেসময় মিরপুর বিহারী অধ্যুষিত এলাকা, বাঙালী পরিবার বিহারীদের তুলনায় নগণ্য।

আমাদের অনেকেরই জানা নেই, 'আমাদের দাবী মানতে হবে' এবং 'রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই' শ্লোগান দুটি কবি মেহেরুননেসার সৃষ্টি। ১৯৫৪ সালে তাঁর রচিত কবিতা 'রাজবন্দী'তে এ লাইন দুটি এসেছে।

বাবা'কে হারিয়েছিলেন ক্যান্সারে। এরপর, জীবন যুদ্ধে টিকে থাকতে তিনি ফিলিপস ওয়ার্কশপে রেডিও অ্যাসেম্বলিং করেছেন। উল্লেখ্য যে, সে সময় ফিলিপস ইংরেজি ও উর্দু'তে মুখপত্র ছাপাতো, কবি মেহেরুননেসা'র চেষ্টায় বাংলা ভাষায় রচিত পত্রিকাও প্রকাশে বাধ্য হয়েছিল ফিলিপস কর্তৃপক্ষ।

কবিতার প্রতি ভালোবাসা, বাংলা সাহিত্যের প্রতি অকৃত্রিম আকর্ষণ তাঁকে সাহিত্য চর্চা থেকে দূরে থাকতে দেয়নি। তাঁর সৃষ্টি ছাপা হয়েছে, ইত্তেফাক, বেগম, দৈনিক পাকিস্তান, যুগের দাবী সহ অনেক কাগজ ও সংকলনে। 'রানু আপা' ছদ্মনামে রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখেছেন ৬৯'এর আইয়ুব বিরোধী উত্তাল গণআন্দোলনে।

কবি মেহেরুননেসা শুধুমাত্র রাজনীতি সচেতন মানুষই ছিলেন না, আমরা তাঁর মাঝে প্রবল সমাজবোধের প্রকাশ দেখতে পাই নীচের পঙক্তিতে।

'কয়লা খনির গভীরে দেখেছি জ্বলতে
জ্বালানীবিহীন মহাজীবনের সলতে
তবুও কখনো শুনিনি ওদের বলতে
আমরাও জানি জীবন নাট্য ঘরে
বাঁচার খেলা খেলতে.........'

২৩ মার্চ ১৯৭১, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে লেখক সংগ্রাম শিবির আয়োজিত বিপ্লবী কবিতা পাঠের আসরে হাসান হাফিজুর রহমান, আহসান হাবীব, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, হুমায়ুন কবিরসহ অন্যান্য কবিদের সঙ্গে স্বরচিত কবিতাপাঠে অংশ নেন মেহেরুননেসা।এ আসরে সভাপতিত্ব করেছিলেন ড. আহমদ শরীফ। সেই অনুষ্ঠানে তিনি 'জনতা জেগেছে' কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন। সেদিনই তাঁর রচিত এ কবিতাটি 'বেগম' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

"জনতা জেগেছে
মুক্তি শপথে দীপ্ত আমরা দুরন্ত দুর্বার,
সাত কোটি বীর জনতা জেগেছি, এই জয় বাঙলার।
পাহাড় সাগর, নদী প্রান্তরজুড়ে-
আমরা জেগেছি, নবচেতনার ন্যায্য নবাঙ্কুরে।
বাঁচবার আর বাঁচাবার দাবি দীপ্ত শপথে জ্বলি,
আমরা দিয়েছি সব ভীরুতাকে পূর্ণ জলাঞ্জলি।
কায়েমী স্বার্থবাদীর চেতনা আমরা দিয়েছি নাড়া,
জয় বাঙলার সাত কোটি বীর, মুক্তি সড়কে খাড়া।
গণতন্ত্রের দীপ্ত শপথ কণ্ঠে কণ্ঠে সাধা-
আমরা ভেঙেছি, জয় বাঙলার যত বিজয়ের বাধা।
কায়েমী স্বার্থবাদী হে মহল! কান পেতে শুধু শোনো-
সাত কোটি জয় বাঙলার বীর! ভয় করিনাকো কোনো।
বেয়নেট আর বুলেটের ঝড় ঠেলে-
চির বিজয়ের পতাকাকে দেব, সপ্ত আকাশে মেলে।
আনো দেখি আনো সাত কোটি এই দাবির মৃত্যু তুমি,
চির বিজয়ের অটল শপথ, এ জয় বাঙলা ভূমি।"

২৩ মার্চ একাত্তরেই কবি মেহেরুন্‌নেসা ও তাঁর দুই ভাই মিরপুর ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য রফিক ও টুটুল ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মিরপুরে নিজ বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। বিহারী অধ্যুষিত মিরপুরে তিনি ও তাঁর পরিবার অনেক আগে থেকেই চিহ্নিত হয়ে ছিলেন মুক্তিকামী বাঙালী হিসেবে।

অবশেষে ২৭শে মার্চ এলো, দু'দিন আগেই ঢাকা'সহ দেশের বিভিন্ন জেলায় তখন পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ও বিহারীদের হাতে বাঙালি নিধন তথা গণহত্যা শুরু হয়ে গিয়েছে। মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনের ডি ব্লক, ১২ নম্বর রোডের ৮ নম্বর বাড়িতে সেদিন সংঘটিত হয়েছিল অমানবিক, পৈশাচিক, নির্মম হত্যাযজ্ঞ।

খোদার আরশ কি কেঁপেছিল সেই ক্ষণে ?

বেলা আনুমানিক ১১ টা থেকে ১২ টার ভেতর এ বাড়িতে হানা দেয় মিরপুরের 'কসাই' খ্যাত কাদের মোল্লার নেতৃত্বে মিরপুর এলাকার বিহারী হাসিব হাশমি, বিহারী আব্বাস চেয়ারম্যান, কুখ্যাত বিহারী আখতার গুন্ডা, বিহারী নেহাল গুন্ডা সহ আরও বেশ কিছু অমানুষ।

দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার মুহূর্তে কবি মেহেরুননেসা বুকে কোরআন শরিফ চেপে বলেছিলেন , ‘আমরা তো মুসলমান আমাদের মারবে কেন? যদি মারতেই হয় আমাকে মারো। ওদের কোনো দোষ নেই। ওদের ছেড়ে দাও।’ কিন্তু পাকিস্তানী ও তাদের এ দেশীয় দালাল হাইওয়ান'দের ভেতর কোন মনুষ্যত্ব ছিলোনা একাত্তরে, আজও নেই।

প্রথমেই কবি মেহেরুননেসার দুই ভাই রফিকুল ইসলাম বাবলু ও শহিদুল ইসলাম টুটুল'কে মেরে ফেলে জল্লাদের দল। প্রত্যক্ষদর্শী এক বিহারী'র (হত্যায় অংশ নেয়নি ও প্রতিবেশী) তথ্যে জানা যায় তাঁর দুই ভাইয়ের মাথা বিচ্ছিন্ন করে লাথি মারা হয়। কবি'র মা ছেলেদের মৃত্যু দেখে অজ্ঞান হয়ে গেলে তাঁকে সে অবস্থাতেই ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খণ্ড খণ্ড করে কাটা হয়। সবাইকে হত্যা শেষে কসাই কাদের ও আখতার গুন্ডা (প্রত্যক্ষদর্শী সেই বিহারীর ভাষ্যমতে) কবি মেহেরুননেসার মাথা বিচ্ছিন্ন করে, তাঁর লম্বা চুল দিয়ে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে দেয়। তাঁর পবিত্র রক্ত সেদিন পুরো কক্ষ জুড়ে ছিটকে পরেছিল।

কবি তাঁর স্বপ্নের গ্রন্থটির নাম রেখেছিলেন, 'সূর্যজ্যোতির পাখি'। গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়নি, তার আগেই নির্মম মৃত্যু কেড়ে নেয় সবকিছু থেকে।

🔵 (সূর্য জ্যোতির পাখির হাতে লেখা মূল কপি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে রাখা আছে)

আমরা, তাঁর ও পরিবারের সকলের আত্মার চিরশান্তি প্রার্থনা করি।

🔴 তথ্য সূত্র:

👉 বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র: দ্বিতীয় খণ্ড
👉 শহীদ কবি মেহেরুননেসা: কবি কাজী রোজী (গেল ২০ ফেব্রুয়ারি প্রয়াত)
👉 মোমেনা খাতুন (কবির বড় বোন) - এর ২৩ মার্চ ২০০৭ সালে দেয়া বিবরণ
👉 মিরপুর ৬ সেকশনের স্থায়ী বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী
👉 শ্রদ্ধেয় মফিদুল হক (ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর)

কপি, গেরিলা '৭১ ]

20/08/2024

বীর শ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান :

বীর শ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান (২৯ অক্টোবর ১৯৪১ - ২০ আগস্ট ১৯৭১) বাংলাদেশের একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীর শ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভূষিত করা হয় তিনি তাদের অন্যতম।[২]

মতিউর রহমান
বীর শ্রেষ্ঠ

জন্ম
২৯ অক্টোবর ১৯৪১
ঢাকা, বঙ্গ, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমান বাংলাদেশ)
মৃত্যু
২০ আগস্ট ১৯৭১ (বয়স ২৯)
থাট্টা, পশ্চিম পাকিস্তান
আনুগত্য
পাকিস্তান (১৯৭১ সালের মার্চ পর্যন্ত)
বাংলাদেশ (১৯৭১ সালের মার্চ থেকে)
সেবা/শাখা
পাকিস্তান বিমানবাহিনী
(১৯৬৩ – মার্চ ১৯৭১)
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী
(মার্চ ১৯৭১ – ২০ আগস্ট ১৯৭১)
কার্যকাল
১৯৬৩–৭১ (আমৃত্যু)
পদমর্যাদা
ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট
সার্ভিস নম্বর
পাক-৪৩৬৭
ইউনিট
নম্বর. ২ স্কোয়াড্রন
যুদ্ধ/সংগ্রাম
• ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ১৯৬৫
• বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ
পুরস্কার
বীর শ্রেষ্ঠ
দাম্পত্য সঙ্গী
মিলি রহমান[১]

জন্ম

মতিউর রহমান ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর পুরান ঢাকার ১০৯, আগা সাদেক রোডের "মোবারক লজ"-এ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলভী আবদুস সামাদ এবং মাতার নাম সৈয়দা মোবারকুন্নেসা খাতুন। নয় ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন ৬ষ্ঠ। তার পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামে। যা এখন মতিউরনগর নামে পরিচিত।

শিক্ষাজীবন

ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পাস করার পর তিনি সারগোদায় পাকিস্তান বিমান বাহিনী পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন। ডিস্টিংকশনসহ মেট্রিক পরীক্ষায় সাফল্যের সাথে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।

কর্মজীবন

১৯৬৩ সালে নতুন পাইলট অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তগণ (মতিউর রহমান, সামনের সারিতে ডান থেকে দ্বিতীয়)
মতিউর রহমান ১৯৬১ সালে পাকিস্তান বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালে রিসালপুর পি,এ,এফ কলেজ থেকে পাইলট অফিসার হিসেবে কমিশন লাভ করেন। কমিশন প্রাপ্ত হবার পর তিনি করাচির মৌরিপুর (বর্তমান মাসরুর) এয়ার বেজ এর ২ নম্বর স্কোয়ার্ডন এ জেনারেল ডিউটি পাইলট হিসাবে নিযুক্ত হন। এখানে তিনি টি-৩৩ জেট বিমানের উপর কনভার্সন কোর্স সম্পন্ন করেন এবং ৭৫.৬৬% নম্বর পেয়ে উর্ত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি এফ-৮৬ স্যাবর জেট এর উপরেও কনভার্সন কোর্স করেন এবং ৮১% নম্বর পেয়ে উর্ত্তীর্ণ হন। বৈমানিক কনভার্সন কোর্স এ ভালো ফলাফলের ভিত্তিতে তাকে পেশোয়ারে (১৯ নং স্কোয়ার্ডন) এ পোস্টিং দেয়া হয়।

১৯৬৫ তে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় ফ্লাইং অফিসার অবস্থায় কর্মরত ছিলেন। এরপর মিগ কনভার্সন কোর্সের জন্য পুনরায় সারগোদায় যান। সেখানে ১৯৬৭ সালের ২১ জুলাই তারিখে একটি মিগ-১৯ বিমান চালানোর সময় আকাশে সেটা হঠাৎ বিকল হয়ে গেলে দক্ষতার সাথে প্যারাসুট যোগে মাটিতে অবতরণ করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট পদে পদোন্নতি লাভ করেন। ইরানের রানী ফারাহ দিবার সম্মানে পেশোয়ারে অনুষ্ঠিত বিমান মহড়ায় তিনি ছিলেন একমাত্র বাঙালি পাইলট। রিসালপুরে দু'বছর ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হিসাবে কাজ করার পর ১৯৭০ এ বদলি হয়ে আসেন জেট ফ্লাইং ইন্সট্রাক্টর হয়ে।

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা

১৯৭১ সালের শুরুতে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মতিউর রহমান সপরিবারে ঢাকায় দুই মাসের ছুটিতে আসেন। ২৫ মার্চের কালরাতে তিনি ছিলেন নরসিংদীর রায়পুরার রামনগর গ্রামে৷ যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে, পাকিস্তান বিমান বাহিনীর একজন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হয়েও অসীম ঝুঁকি ও সাহসিকতার সাথে ভৈরবে একটি ট্রেনিং ক্যাম্প খুললেন৷ যুদ্ধ করতে আসা বাঙালি যুবকদের প্রশিক্ষণ দিতে থাকলেন ৷ তিনি দৌলতকান্দিতে জনসভা করেন এবং বিরাট মিছিল নিয়ে ভৈরব বাজারে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা অস্ত্র দিয়ে গড়ে তোলেন প্রতিরোধ বাহিনী। পাক-সৈন্যরা ভৈরব আক্রমণ করলে বেঙ্গল রেজিমেন্টে ই,পি,আর-এর সঙ্গে থেকে প্রতিরোধ বুহ্য তৈরি করেন। ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বিমান বাহিনী এফ-৮৬ স্যাবর জেট থেকে তাদের ঘাঁটির উপর বোমাবর্ষণ করে ৷ মতিউর রহমান পূর্বেই এটি আশঙ্কা করেছিলেন৷ তাই ঘাঁটি পরিবর্তন করেন এবং ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পান তিনি ও তার বাহিনী৷

এরপর ১৯৭১ সালের ২৩ এপ্রিল ঢাকা আসেনও ৯ মে সপরিবারে করাচি ফিরে যান ৷ কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে জঙ্গি বিমান দখল এবং সেটা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাকে তখন বিমানের সেফটি অফিসারের দ্বায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো। তিনি বিমান দখলের জন্য ২১ বছর বয়সী রাশেদ মিনহা্জ নামে একজন শিক্ষানবীশ পাইলটের উড্ডয়নের দিন (২০ই আগস্ট,১৯৭১) টার্গেট করেন। তার পরিকল্পনা ছিলো মিনহাজ কন্ট্রোল টাওয়ারের অনুমতি পেয়ে গেলে তিনি তার কাছ থেকে বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নেবেন। পরিকল্পনা অনুসারে অফিসে এসে শিডিউল টাইমে গাড়ি নিয়ে চলে যান রানওয়ের পূর্ব পাশে৷ সামনে দুই সিটের প্রশিক্ষণ বিমান টি-৩৩ । পাইলট রাশেদ মিনহাজ বিমানটি নিয়ে দ্বিতীয় বারের মত একক উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কন্ট্রোল টাওয়ার ক্লিয়ারেন্সের পর মিনহাজ বিমানটি নিয়ে রানওয়েতে উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিলে মতিউর রহমান সেফটি অফিসারের ক্ষমতাবলে বিমানটি থামাতে বলেন। মিনহাজ বিমানটি থামান এবং ক্যানোপি ( জঙ্গি বিমানের বৈমানিকদের বসার স্থানের উপরের স্বচ্ছ আবরন) খুলে বিমান থামানোর কারণ জানতে চান। এসময় মতিউর রহমান বিমানের ককপিটে চড়ে বসেন এবং রাশেদ মিনহাজকে ক্লোরোফর্ম দিয়ে অচেতন করে ফেলেন। জ্ঞান হারানোর আগে রাশেদ মিনহাজ কন্ট্রোল রুমে জানাতে সক্ষম হন তিনিসহ বিমানটি হাইজ্যাক হয়েছে। বিমানটি ছোট পাহাড়ের আড়ালে থাকায় কেউ দেখতে না পেলেও কন্ট্রোল টাওয়ার মিনহাজের বার্তা শুনতে পায় এবং রাডারে বিমানের অবস্থান বুঝে অপর চারটি জঙ্গি বিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। মৃত্যু আসন্ন জেনেও মতিউর রহমান বিমানটি নির্ধারিত সীমার নিচে চালিয়ে রাডার কে ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসার চেষ্টা করেন।

মৃত্যু

প্রায় ভারতের সীমান্তে পৌঁছে যাওয়া অবস্থায় রাশেদ মিনহাজ জ্ঞান ফিরে পান এবং বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিতে চেষ্টা করেন। রাশেদ চাইছিলেন, মতিউর রহমানের বিমান ছিনিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা সফল হওয়ার চেয়ে বিমানটি বিধ্বস্ত করা ভালো ।[৩] এ সময় রাশেদের সাথে মতিউরের ধ্বস্তাধস্তি চলতে থাকে এবং এক পর্যায়ে রাশেদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পড়েন। বিমানটি কম উচ্চতায় উড্ডয়ন করার ফলে একসময় রাশেদ সহ বিমানটি ভারতীয় সীমান্ত থেকে মাত্র ৩৫ মাইল দূরে থাট্টা এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। মতিউর রহমানের সাথে প্যারাসুট না থাকায় তিনি নিহত হন। তার মৃতদেহ ঘটনাস্থল হতে প্রায় আধ মাইল দূরে পাওয়া যায়।

২০ই আগস্ট,১৯৭১ এ মতিউর রহমান এবং রাশেদ মিনহাজ স্ব স্ব দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করেন। বাংলাদেশ সরকার মতিউর রহমানকে তার সাহসী ভূমিকার জন্য বীর শ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে এবং রাশেদ মিনহাজকে পাকিস্তান সরকার সম্মানসূচক খেতাব দান করে। প্রসঙ্গতঃ একই ঘটনায় দুই বিপরীত ভূমিকার জন্য দুইজনকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব প্রদানের এমন ঘটনা বিরল।

সমাধি স্থানান্তর

শাহাদতের ৩৫ বছর পর ২৪শে জুন ২০০৬ মতিউরের দেহাবশেষ পাকিস্তান থেকে দেশে এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধজীবী কবর স্থানে পুনঃসমাহিত করা হয়।
পাকিস্তান সরকার মতিউর রহমানের মৃতদেহ করাচির মাসরুর ঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণীর কবরস্থানে সমাহিত করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ার পর, ২০০৬ সালের ২৪ জুন মতিউর রহমানের দেহাবশেষ পাকিস্তান হতে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়।[৪] তাকে পূর্ণ মর্যাদায় ২৫শে জুন শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয়।

টিভির পর্দায় মতিউর

মতিউর রহমানকে নিয়ে অগ্নিবলাকা নামের একটি ডকুড্রামা নির্মাণ করা হয় ২০০২ সালে যেখানে রিয়াজ মতিউর রহমানের চরিত্রে এবং তারিন ওনার স্ত্রী মিলির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এছাড়া তার জীবনী নিয়ে ২০০৭ সালে অস্তিত্বে আমার দেশ চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়।

সম্মাননা

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যশোর বিমান ঘাঁটি তার নামে নামকরণ করা হয়েছে।[১] বিমান বাহিনী তার নামে একটি ট্রফি চালু করেছে। বিমান প্রশিক্ষনে সেরা কৃতিত্ব প্রদর্শনকারীকে এটি প্রদান করা হয়।[৫]

২০ আগস্ট ১৯৭১, বীর শ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লে. মতিউর রহমান শহীদ হন। বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

17/08/2024
17/08/2024

ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা অর্জন:

ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতার প্রথম পর্ব। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। ভাষা শহীদদের সম্মান জানাতে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে প্রভাত ফেরিতে অংশ নেন সাধারণ জনতা, রাজনৈতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ। মানুষ নগ্নপায়ে ফুলের তোড়া নিয়ে অগ্রসর হন শহীদ মিনারের দিকে। দিনটি দেখে মনে হবে আমরা যেন আবার বায়ান্নতে ফিরে গেছি। 'আমার ভায়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রম্নয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি।' সত্যিই আমরা যে শহীদদের ভুলিনি তার পরিচয় মিলবে এই শোক মিছিলে। কম হলেও কয়েক হাজার সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ এই শোক শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে থাকে। ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের পিতা-মাতার কোলে চড়ে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে। ৬৫ বছরের বৃদ্ধ, পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ফুল দিয়ে। প্রথাগত এই শোকযাত্রা শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো বিশেষ কোনো উপকারে আসবে না। এলে ভাষা আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন তারা প্রথম সারির মুক্তিযোদ্ধা। বাংলা ভাষায় কথা বলার দাবি যদি মারাত্মক আকার ধারণ না করত, তা হলে পুলিশও গুলি ছুড়তো না এবং মানুষ ওইভাবে মারাও যেত না এবং ওইভাবে তারা জেগে উঠতো না। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ছাত্র সমাবেশে যদি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে এই ঘোষণা না দিতেন, তা হলে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা এভাবে প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়ত না। জিন্নাহর ঘোষণায় উপস্থিত ছাত্রসমাজ তার বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান ও নো নো ধ্বনি তোলেন। পাকিস্তানের ৫৬% নাগরিক ছিল বাঙালি। তাই স্বাভাবিকভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকবর্গ ও কিছু বাঙালি নামক ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে পূর্ব থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিল উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার। বাংলার দামাল ছেলেরা কিন্তু ভুল করেনি। রাষ্ট্রভাষা এক মাত্র উর্দু হলে বাঙালিরা যে কত বছর পিছিয়ে যেত, বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়ন কর্মকান্ডে তা ছিল কল্পনার বাহিরে। তাই '৫২তে রফিক, সালাম, জব্বার, বরকত, সফিউলসহ যারা জীবন দিয়ে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠিত করল, তাই স্বভাবতই ভাষা আন্দোলনের দাবি পূরণ হওয়ায় এই আন্দোলন থেমে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাঙালি থামেনি। স্বায়ত্তশাসনের দাবি যে ক্রমাগত প্রখর থেকে প্রখরতর হচ্ছিল এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব অত্যন্ত সুকৌশলে ভাষা আন্দোলনকে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করলেন। তিনি প্রথম বাঙালি নেতা, যিনি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী হয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। অনেক শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী, সংস্কৃতিকর্মী এ ক্ষেত্রে অনেক সমর্থন জানিয়েছেন। আবার খাজা নাজিমউদ্দিনের মতো তথাকথিত বাঙালি পকিস্তানের পক্ষে দালালি করে উর্দুর পক্ষে কাজ করেছেন। এক সময় ধীরেন দত্ত পার্লামেন্টে এ বিষয়ে প্রশ্ন তুলে ছিলেন। এর পূর্বে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে সংসদের কার্যপ্রণালি বাংলায় বলতে দাবি জানান শেখ মুজিব। তাছাড়া বাংলা ভাষার দাবিতে তিনি প্রায়ই পাকিস্তান পার্লামেন্টে প্রস্তাব তুলতেন। ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ গঠন করার সময়ে যে প্রচারপত্র বিলি করা হয়েছিল, তাতে বাংলা ভাষার দাবি ছিল। প্রকৃত ভাষা আন্দোলন কিন্তু ১৯৪৮ সালে শুরু। ভারত বিভাগের পরপরই। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগ এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ দেন। আসল কথা হচ্ছে বাঙালি নেতাদের মধ্যে একমাত্র শেখ মুজিবই ভাষা আন্দোলনের তীব্রতা সৃষ্টি করে স্বায়ত্তশাসনের রূপ দান করেন। বাংলাদেশে অনেকেই স্বায়ত্তশাসনের দাবি করে ছিল। জেনারেল আইয়ুব খান তার লিখিত উন্নয়নমূলক একটি বইয়ে উন্নয়নের যে ফিরিস্তি লিখেছেন এরই বিপরীতে রাজশাহীর একজন ব্যাংক কর্মকর্তা মুজিবুর রহমানকে নিয়ে গ্রন্থ লিখে স্বায়ত্তশাসনের বৈষম্যগুলো নিরেটভাবে তুলে ধরেন। যারা বলেন, শেখ মুজিবের ভাষা আন্দোলনে তেমন কোনো অবদান নেই, যুক্তি দেখান তিনিতো জীবনের বিরাট সময় জেলে ছিলেন। তাদের কথা মিথ্যাচারে ভরা। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু মুখ্য ভূমিকা পালন করে ছিলেন। জাতীয় নেতারা জেলে থাকাকালে তিনি জেলের ভেতরে সভা করে সিদ্ধান্ত নিতেন যে, সব কর্মসূচি তা বাহিরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো এবং সেই অনুসারে আন্দোলন সংগ্রাম চলতো। তাছাড়া যখনি জেল থেকে বের হয়ে তিনি হাসপাতালে বা কোনো জনসভায় যেতেন, বুদ্ধি পরামর্শ ও কর্মসূচি সবাইকে জানিয়ে দিতেন। এমনকি জেল থেকে চিরকুট পাঠিয়ে নেতাদের কর্মসূচি সম্পর্কে অবহিত করা হতো। এমনটা যদি হতো যে ভাষা আন্দোলনের দাবি মেনে নেওয়ার পর সরকার আন্দোলনকে স্থিমিত করতেন, তা হলে স্বায়ত্তশাসনের দাবি এতটা প্রখর হতো না। তখনো স্বায়ত্তশাসেনের দাবি ছিল অসম্পূর্ণ। দুই পাকিস্তানের ভেতর অর্থনৈতিক বৈষম্যর প্রকৃতি কি ছিল এবং তার অবসান কীভাবে করা যেত সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বক্তব্যও কেউ পেশ করেননি। শুধু স্বায়ত্তশাসনের দাবি করেছেন। শেখ মুজিব একমাত্র বাঙালি নেতা- যিনি ৬ দফার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দিলেন এবং কীভাবে পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা যায় তার ধ্যান ধারণা দিলেন ৬ দফায়। অতি অল্পসময়ে জনগণ তার এই ৬ দফার পক্ষে আন্দোলন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ৬ দফার পক্ষে ব্যাপক জন সমর্থন ও জনমত গড়ে উঠে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সারাদেশে গ্রামগঞ্জে, শহরে-বন্দরে আন্দোলন দ্রম্নত ছড়িয়ে পড়ে। অবস্থা এমন হলো- গ্রামের মানুষ এক নজর শেখ মুজিবকে দেখার জন্য মশাল জ্বালিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতো। সরকার প্রমাদ গুলনেন। আইয়ুব খান ৬ দফাকে অস্ত্রের ভাষায় জবাব দেবেন বললেন। কিন্তু আইয়ুবের রক্ত চক্ষুকে বঙ্গবন্ধু ভয় পাননি। শুরু হলো আইয়ুব-মোনায়েম সরকারের অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন। মোনায়েম খান বললেন, শেখ মুজিবকে সুর্যের আলো দেখতে দেওয়া হবে না অর্থাৎ জেলে আবদ্ধ থাকবেন। কয়েক ডজন মামলা দিয়ে এক জেল থেকে অন্য জেলে স্থানান্তর করা হলো। জেলে থেকেও যে জেলায় তিনি গেছেন সেখানে আন্দোলন বেগবান হতো। এ সময় সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র নামক মিথ্যা মামলা দিয়ে ঢাকা জেল থেকে ঢাকা সেনা নিবাসে নিয়ে যান। তিনি জানতেন তাকে ফাঁসি দেওয়ার জন্য এই মামলা দেওয়া হয়েছে। এক মুঠো ধুলা কপালে মেখে সেনা নিবাসে প্রবেশ করলেন। সেখানে ক্যামেরা ট্রায়াল হলো। এর মাঝেই তাকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা হয়, এতে সার্জেন্ট জহুরুল হক নিহত হন। সেনানিবাসের বাহিরে ৬ দফা ও ১১ দফার আন্দোলন তখন তুঙ্গে। জনগণ শেখ মুজিবকে মুক্ত করার জন্য সেনানিবাসের বাহিরে ব্যাপক বিক্ষোভ সমাবেশ করলেন। জনরোষে সরকার শেখ মুজিবকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। বীর জনতা এরপর তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করলেন। তারপর সত্যিকার অর্থে তিনি বাংলার বন্ধু হিসেবে কাজ করেছেন। সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হলেন। ৬ দফাকে নির্বাচনি ম্যানডেট হিসেবে জনগণের কাছে তুলে ধরা হলো। '৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুষ বিজয় অর্জন করে। তিনি পাকিস্তানের বৃহত্তম দলের নেতা হিসেবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী যোগ্যতা অর্জন করলেন। পাকিস্তানের নেতারা ভাবলেন, প্রধানমন্ত্রী হয়ে শেখ মুজিব ৬ দফাকে ভুলে যাবেন। কিন্তু গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধু বললেন, ৬ দফার সঙ্গে কোনো আপস নেই। কোনো কমা-দাড়ি- সেমিকোলন পরিবর্তন হবে না। ৬ দফাভিত্তিক সংবিধান রচনা করতে হবে। জনগণ ৬ দফায় সমর্থন দিয়েছে। তখন সরকার বুঝলেন পাকিস্তান রক্ষা করতে হলে যুদ্ধই একমাত্র পথ। পার্লামেন্টে অধিবেশন ডেকেও অনিবার্য কারণে তা স্থগিত করা হলো। শেখ মুজিব ৩ মার্চ আহ্বান জানালেন অসহযোগ আন্দোলনের। পাকিস্তান সরকারের কোনো শাসন না মানার নির্দেশ দিলেন। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন অসহযোগ আন্দোলনে দুর্বল হয়ে পড়ে। শেখ মুজিবের কথায় প্রশাসন চলতে থাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে প্রধান বিচারপতির কার্যালয় পর্যন্ত শেখ মুজিবের কথা শোনত। শেখ মুজিব বিশ্ববাসীকে জানালেন, তিনি পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র নেতা। তিনি আরো জানালেন, পূর্ব পাকিস্তান শাসন করার নৈতিক ও আইনগত অধিকরা পাকিস্তান সরকারের নেই। এভাবে তিন সপ্তাহ চলল। ২৫ মার্চ কালো রাতে পাকিস্তানের বরর্বর সেনাবাহিনী ঢাকায় হঠাৎ সামরিক অভিযান চালায়। ওই রাতে ঢাকায় প্রায় ২৫ হাজার বাঙালিকে হত্যা করল। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক কিছুক্ষণ পূর্বে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বীয় বাসভবন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষাণ দেন। সেই থেকে আমরা স্বাধীন। শুরু হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধু বললেন বাংলার মাটি থেকে চির তরে পাকিস্তানের শেষ সৈন্যকে খতম করা না পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলবে। ৯ মাস যুদ্ধ চলল ভারত এই যুদ্ধে সর্বাত্মক সমর্থন জানিয়েছে। অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছে। তাই ভারতের অবদান ভুলবার নয়। ১৬ ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর শোচনীয় পরাজয় ঘটে ও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এই দিন আমাদের তাই মহান বিজয় দিবস। বিশ্বের বুকে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি লাভ করে।

ভাষা আন্দোলন আমাদের স্বাধীনতার প্রথম পর্ব। এই প্রথম পর্বে আমাদের শিল্পী, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীদের অবদান চিরস্মরণীয়। তাদের অবদান কোনো দিন ভুলবার নয়। কিছু লোক দালালি করলেও গোটা দেশ ছিল শেখ মুজিবের পক্ষে। তিনি ভাষা আন্দোলনকে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে রূপান্তর এবং স্বাধীনতার আন্দোলনকে তীব্রতর করে তুলতে সক্ষম হন। তিনি প্রথম বাঙালি, যিনি আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে বাঙালি জাতিসত্তায় রূপান্তর করে জাতি ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন- তাই তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা, আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
তাঁর ৪৯তম শাহাদাত বার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

তথ্য সূত্র : ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ।

Want your public figure to be the top-listed Public Figure in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Website

Address


Dhanmondi
Dhaka
1204