Zazafee
11/05/2026
কিছুক্ষণ আগে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে চেক আউট করেছেন আফতাব আহমেদ। বাংলাদেশ থেকে তিনদিনের সফরে তিনি এখানে এসেছেন। চেকআউট করার পর তার প্রথম কাজ হলো একটা গাড়ি ভাড়া করা। নিজের ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। নিজের গাড়ি সব সময় নিজেই ড্রাইভ করতে ভালোবাসেন। পেশায় তিনি একজন আইনবিদ। তবে দুবাইতে তিনি কোনো আইন বিষয়ক কাজে আসেননি। ব্যবসায়িক কাজেও আসেননি। তিনি এসেছেন একটা বিশেষ কারণে। স্ত্রী পুত্র আর কন্যাকে সাথে আনার সুযোগ নেই। তিনি একাই এসেছেন। অবশ্য স্ত্রী পুত্র কন্যা কেউ দেশে নেই। একটা গাড়ি ভাড়া নিতে পারলে তখন আসেপাশে ঘুরে দেখা সহজ হবে। হাতে তিনদিন সময় আছে। ফিরতি টিকেট আগেই করা আছে। এমনকি সেই টিকেট তিনি করেছেন দুবাই আসারও অনেক আগে। অর্থাৎ আগে ফেরার টিকেট করেছেন তারপর আসার টিকেট করেছেন। গাড়ি ভাড়া নিতে পারলে সেই গাড়ি ড্রাইভ করে পছন্দসই হোটেল খুঁজে নেওয়া যাবে। তার এই দুবাই সফরের কথা স্ত্রী পুত্র কন্যা কেউ জানে না। শুধু আমি জানি। আমি তার একজন বন্ধু। অবশ্য শুধু তার একার বন্ধু না বরং পাশাপাশি তার পুত্র আর কন্যারও বন্ধু। তাকে আমি চিনেছি তার কন্যার মাধ্যমে। সে বিরাট কাহিনী সেটা না হয় অন্য একদিন বলা যাবে।
আফতাব আহমেদ অত্যন্ত মেধাবী আর জ্ঞানী একজন মানুষ। যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি নিজেই যথেষ্ট হওয়ার পরও প্রায় সর্বক্ষেত্রে তিনি তার কয়েকজন বন্ধু ও শুভাকাঙ্খীর সাথে আলোচনা করে তাদের মতামত জানতে চেষ্টা করেন। সৌভাগ্যক্রমে সেই কয়েকজন শুভাকাঙ্খীর একজন আমি। নানা বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার সাথে আলোচনা করেন। একদিন আমি তাকে বললাম আমি খুবই সাধারণ মানুষ। জ্ঞানগরিমাও তেমন নেই। তারপরও আমার মতামত নেন কেন? তিনি হাসলেন। বললেন কাছের মানুষদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলে সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। আমাদের বন্ধুত্ব দশ বছরের । তবে দেখা হয়েছে মাত্র চার বার। তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। মালয়েশিয়া,ইংল্যান্ড সহ বিভিন্ন জায়গায় থেকেছেন পড়াশোনা ও কাজের সুবাদে। হঠাৎ তার বাবা অসুস্থ হলে সংবাদ পেয়ে চলে এসেছেন। বিষয়টা এতো দ্রুত ঘটেছিল যে সাথে করে স্ত্রী পুত্র কন্যাকে নিয়ে আসতে পারেননি। এক সন্ধ্যায় তিনি আমাকে ফোন করলেন। সব সময়ইতো করেন। আমাকে ফোন করে বললেন তানজিম সাহেব আপনার সাথে একটা বিষয়ে আলোচনা করবো বলে ফোন দিলাম। আমি তাকে বললাম সেটা আপনি না বললেও আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি কাজের মানুষ। কাজের কথা ছাড়া আপনার থেকেতো আর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীদের মত টাইমপাস করার মত গল্প শোনার আশা করতে পারি না। তিনি আমার কথা শুনে একটু হাসলেন তারপর তিনি জানালেন তিনি দুবাই যাচ্ছেন। কেন যাচ্ছেন সেটাও জানালেন আর আমার মতামত জানতে চাইলেন।
তার কাছ থেকে পুরোটা শুনে আমি বিস্মিত হলাম। পাশাপাশি মুগ্ধও হলাম। তিনি দুবাই যাচ্ছেন মূলত তার স্ত্রী পুত্র আর কন্যাকে সারপ্রাইজ দিবেন বলে। তারা বাংলাদেশে আসবে। আফতাব সাহেব নিজেই টিকেট করে দিয়েছেন। তারা অবশ্য জানে না যে সেই ফ্লাইটে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যখন ট্রানজিট নিবে আর নতুন একজন যাত্রী তাদের পাশের সিটে উঠবে সেই যাত্রী কে। সেটা মূলত আফতাব সাহেব নিজে। স্ত্রী পুত্র কন্যার জন্য টিকেট কাটার সময়ই তিনি দুবাই থেকে বাংলাদেশ পযর্ন্ত নিজের নামেও একটা টিকেট করেছেন। আমেরিকা থেকে তারা যখন দুবাইয়ে ট্রানজিট নিবে তখন নিশ্চই কল্পনাও করবে না ওখানে আফতাব সাহেবের সাথে দেখা হবে। আফতাব সাহেবের এই পরিকল্পনা সত্যিই দারুণ। আমিও বললাম এটা হবে জীবনের অন্যতম চমকপ্রদ ঘটনা। এরপর নির্ধারিত দিনে তিনি ঢাকা থেকে দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। যেহেতু এতোটা পথ এতোগুলো টাকা খরচ করে যাবেন তাই তিনি স্ত্রী পুত্র কন্যারা যেদিন দুবাইয়ে ট্রানজিট নিবে তার তিনদিন আগে দুবাই পৌছালেন। যেন আশেপাশে ঘুরে দেখা যায়। সেই ভাবনা থেকেই তিনি দুবাই এসেছেন। এবং নিজের জন্য একটা গাড়ি ভাড়া নিবেন বলে পাশেই আল ইসলাহ রেন্ট এ কারে উপস্থিত হলেন।
লন্ডন থেকে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে বিদেশে নানা যায়গায় চাকরি করেছেন। তারপর দীর্ঘদিন আমেরিকাতে সেটেল্ড। ফলে ইংরেজীতে তিনি খুবই নেটিভ স্পিকার বলা যেতে পারে। তিনি আল ইসলাহ রেন্ট এ কারে গিয়ে তার চাহিদার কথা ইংরেজীতেই জানালেন। রেন্ট এ কারের মালিক সব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং তাকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলেন। এরপর তার পাসপোর্ট,ভিসা,ড্রাইভিং লাইসেন্স সব চেক করলেন । রেন্ট এ কার থেকে গাড়ি ভাড়া নেওয়ার জন্য কিছু শর্তও দিলেন। প্রথম শর্ত হলো ১ হাজার দিরহাম সিকিউরিটি হিসেবে জমা রাখতে হবে। আর গাড়ির ভাড়া দৈনিক ৫০০ দিরহাম। তবে ফুয়েল বা তেল যা লাগে নিজ খরচে ব্যবহার করতে হবে। আফতাব সাহেব রাজি হলেন। নির্ধারিত ফর্ম পূরণ করে তার কাছে জমা দিলেন।
আফতাব সাহেব এক সময় সেভ দ্য চিলড্রেন্স এ কাজ করেছেন। ফলে মানুষ নিয়ে কাজ করার চমৎকার অভিজ্ঞতা তার আছে। তাছাড়া ব্যরিস্টার হিসেবেও তিনি কিছুদিন প্র্যাকটিস করেছেন। সেই জীবনেও আছে দারুণ সব গল্প। সেই সব গল্প তিনি প্রায় সবই আমাকে বলেছেন। তিনি সব সময় বলেন তানজিম সাহেব আপনি হলেন আমার কথা জমিয়ে রাখা সিন্দুক। আপনি হলেন আমার কথা জমা রাখা ডায়েরি। তার জীবনের কত গল্প যে আমাকে তিনি বলেছেন। আমাকে বলতেন লিখে রাখুন। গল্প হয়ে উঠবে। আমি লিখি লিখি করে আর লেখা হয় না। আমি যদি লেখক হতাম তাহলে হয়তো সুন্দর করে তার জীবনের গল্প লিখতে পারতাম। তারপরও কিছু কিছু লিখতে চেষ্টা করেছি। হয়তো লিখতে লিখতেই লেখক হলেও হতে পারি। মূল গল্পে আবার ফিরে আসি। তিনি আল ইসলাহ রেন্ট এ কারের অফিসে যে লোকটির কাছে ফর্ম জমা দিলেন তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন আপনিই কি এই প্রতিষ্ঠানের মালিক? লোকটি জানালো তিনিই মালিক। টেবিলের একদিকে একটা পেন স্ট্যান্ডে অবশ্য নাম খোদাই করা দেখলেন। এতোক্ষণ খেয়াল করেননি। মালিকের নাম জয়নুল আবেদীন। নাম এবং চেহারা দেখে লোকটিকে বাঙ্গালী বলে মনে হলো আফতাব আহমেদের। তিনি কৌতুহল চেপে না রেখে জানতে চাইলেন আপনি কি বাংলাদেশী? লোকটি জানালো তিনি বাংলাদেশী। এবার আফতাব সাহেব তার সাথে বাংলাতেই কথা বলতে শুরু করলেন।
বিদেশ বিভূইয়ে ব্যবসা করা জয়নুল আবেদীন কত দেশের মানুষের সাথে কথা বলেন। সবার সাথেই ইংরেজীতে কথা বলতে হয়। হয়তো মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগই মেলে না। অবশ্য বাড়িতে স্ত্রী পুত্র কন্যা থাকলে আলাদা কথা। আফতাব সাহেব মানুষের সাথে পরিচিত হলে আন্তরিকতার কোনো কমতি রাখেন না। তিনি তার সাথে সময় থাকলে নানা বিষয়ে গল্প করেন। জয়নুল আবেদীনের সাথেও তিনি গল্প জুড়ে দিলেন। জানতে চাইলেন এখানে কতদিন হলো এসেছেন। পরিবারে কে কে আছে এবং তারা কি এখানেই থাকে নাকি বাংলাদেশে থাকে? জয়নুল আবেদীন জানালেন পরিবার তার সাথেই থাকে। বাবা মা ভাই বোন গ্রামে থাকে। পরিবারে তার একটি কন্যা আছে যার বয়স দশ বছর।ছোট্ট সুখী পরিবার। আফতার সাহেবের নিজেরও একটি কন্যা আছে। তিনি মেয়েকে ভীষণ ভালোবাসেন। জয়নুল আবেদিন সাহেবেরও একটি কন্যা আছে এবং সেও প্রায় তার মেয়ের বয়সী শুনে তার সম্পর্কেও জানতে আগ্রহী হলেন। তিনি জানতে চাইলেন মেয়েটির নাম কী এবং কিসে পড়ছে। জয়নুল আবেদীন জানালেন তার মেয়ের নাম মায়মুনা ইসলাম। সে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে। পাশাপাশি বাসায় বসে বসে পবিত্র কুরআন হিফজ করছে।
আফতাব আহমেদ তার কথা শুনে ভীষণ মুগ্ধ হলেন। বিশেষ করে তার বলা শেষ কথাটা তাকে চুম্বকের মত আটকে রাখলো। তিনি জানতে চাইলেন
বাসায় বসে হিফজ করার এই আইডিয়াটা কোথায় পেলেন?
জয়নুল আবেদীনের মুখটা উজ্জল হয়ে উঠলো। তিনি জানালেন ফাতিহা আয়াত নামে তের বছর বয়সী একটি মেয়েকে চেনেন যে পরিবারের সাথে আমেরিকাতে থাকে। সেই ছোট্ট মেয়েটি বাসায় বসে বসে পবিত্র কুরআন হিফজ করছে। তার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি এবং পরিবারের সবাই নিয়মিত দেখেন। তার মেয়ে মায়মুনাও ফাতিহা আয়াতের ভক্ত। তার থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই মায়মুনা জেনারেল লাইনে পড়াশোনার পাশাপাশি পবিত্র কুরআন হিফজ করা শুরু করেছে। বেশ কয়েক পারা হিফজ সম্পন্ন করেছে। আফতাব আহমেদকে তিনি বললেন আপনি কি ফাতিহা আয়াতের নাম শোনেন নি? মেয়েটা অনেক পপুলার। সে অনেক বার জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছে। এছাড়াও বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়েও বক্তব্য দিয়েছে। শিশু অধিকার সহ নানা বিষয়ে সে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। মেয়েটির বাড়ি বাংলাদেশে। গোটা বাংলাদেশীদের জন্য সে গর্বের বিষয়। তাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। কতইনা সৌভাগ্যবান ফাতিহা আয়াতের বাবা মা। তার কথা শুনে আফতাব সাহেব বললেন ফাতিহা আয়াত নামটা বেশ পরিচিতই লাগছে। তার কথা শুনে জয়নুল আবেদীন বললেন দাড়ান আপনাকে ফাতিহার ভিডিও দেখাই তাহলে চিনতে সুবিধা হবে।
আফতাব সাহেব দেখলেন জয়নুল আবেদীন মোবাইলটা হাতে নিয়ে ইউটিউবে ফাতিহা আয়াতের চ্যানেল খুঁজে বের করলেন। ফাতিহা যেখানে নিয়মিত ভিডিও আপলোড করে থাকে। তিনি আগেই চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রেখেছেন। ফলে সার্চ লিস্টে শুরুতেই ফাতিহার চ্যানেল চলে আসলো। এবার তিনি চ্যানেলে থাকা প্রথম ভিডিওটা চালু করলেন। যেখানে ফাতিহা আর তার বাবা কথা বলছে। ভিডিওটা চালু হতেই জয়নুল আবেদীনের চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেলো। তিনি একবার ভিডিও দেখছেন আরেকবার আফতাব আহমেদের দিকে তাকাচ্ছেন। কারণ ভিডিওতে ফাতিহার সাথে তার বাবাকে দেখা যাচ্ছে আর সেই মানুষটির সাথে জয়নুল আবেদিনের সামনে বসে থাকা মানুষটি দেখতে হুবহু একই রকম। এটা কী করে সম্ভব? বিষয়টা ভেবেই জয়নুল আবেদীন কনফিউজড। তিনি তার কনফিউশন প্রকাশ করে বললেন এটা হলো ফাতিহা আয়াত আর তার বাবা। কিন্তু ফাতিহার বাবার সাথে আপনার চেহারার এতোটা মিল কেন? কিভাবে সম্ভব? তার কথা শুনে গাড়ি ভাড়া নিতে আসা আফতাব আহমেদ হেসে উঠলেন।তারপর বললেন আমিই ফাতিহা আয়াতের বাবা!
আল ইসলাহ রেন্ট এ কারের মালিক জনাব জয়নুল আবেদীনের জীবনে এরচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা কখনো ঘটেছে বলে তিনি মনে করতে পারবেন না। তিনি বিস্ময়ে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারলেন না। আফতাব আহমেদ তার হাতে টোকা দিয়ে বললেন এটা স্বপ্ন নয় সত্যি। তিনি তার দুবাই আসার কারণ জানালেন। তিনদিন পর ফাতিহা, ফালাক্ব আর তার মা আমেরিকা থেকে এমিরেটস এর একটা ফ্লাইটে বাংলাদেশে যাবে। দুবাইতে ট্রানজিট নিবে। তাদেরকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই মূলত তিনি এখানে এসেছেন। ফাতিহারা সারপ্রাইজড হওয়ার আগে অবশ্য জয়নুল আবেদীন নিজেও সারপ্রাইজড হলেন। তিনি বললেন আপনার সাথে পরিচিত হয়ে খুবই ভালো লাগলো। একটু আগে যে ফর্মটি পূরণ করে আফতাব আহমেদ তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন সেটি ছিড়ে ফেললেন। এটা দেখে আফতাব আহমেদ একটা কনফিউজড হলেন। তিনি এসেছেন গাড়ি ভাড়া নিতে। সব শর্ত মেনে ফর্ম পূরণ করে দিয়েছেন আর এখন সেই ফর্ম ছিড়ে ফেলার মানে কী? তাকে কি তবে গাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে না? তিনি জানতে চাইলেন ফর্ম ছিড়লেন কেন? আমিতো গাড়ি ভাড়া নিতে চাই।জয়নুল আবেদীন জানালেন অবশ্যই আপনি গাড়ি ভাড়া পাবেন। তবে আগে আপনার সাথে যে আলোচনা হয়েছিল এখন পরিচিত হওয়ার পর সেই আলোচনা বদলাতে চাই। আপনাকে বলেছিলাম ১ হাজার দিরহাম সিকিউরিটি মানি জমা দিতে হবে। এখন সেটা লাগবে না। ফাতিহা আয়াতের নামই সিকিউরিটির জন্য যথেষ্ট। আর আপনার কাছে ভাড়া হিসেবে দৈনিক ৫০০ দিরহাম চেয়েছিলাম সেটাও বাদ। আপনি শুধু খরচের টাকাটা দিবেন। মানে ৩৫০ দিরহাম দিবেন। সব শুনে আফতাব আহমেদ বিস্মিত হলেন। জয়নুল আবেদীন তাকে অনুরোধ করলেন তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য। এক বেলা মেহমান হিসেবে তাকে আপ্যায়ন করার সুযোগ চাইলেন। সেই আবদার রক্ষা করতে পারলে হয়তো ভালো হতো কিন্তু আফতাব সাহেবের পক্ষে তা রাখা সম্ভব হলো না।
জয়নুল আবেদীন জানালেন বাড়ি ফিরে গিয়ে যখন মায়মুনা এবং ওর মাকে বলবো ফাতিহা আয়াতের বাবার সাথে দেখা হয়েছিল তখন মায়মুনা নিশ্চই মন খারাপ করবে। বলবে বাবা আমার সাথেও দেখা করিয়ে দিতে। বাবা আংকেলকে বাসায় নিয়ে আসতে। তখন মেয়ের কাছে ছোট হতে হবে। আফতাব সাহেব বললেন এটা অবশ্য ঠিকই বলেছেন। তবে নানা কারণে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আপনাকে যেন মায়মুনার কাছে বিব্রত হতে না হয় তার একটা ব্যবস্থা করতে পারি। আর তা হলো আপনি বাসায় ভিডিও কল দিন। তাহলে আমি মায়মুনার সাথে কথা বলবো। সাথে সাথে জয়নুল আবেদীন বাড়িতে ফোন করলেন। সেদিন স্কুল ছুটি থাকায় মায়মুনা ঘরেই ছিল। বাবার ফোনটা সেই রিসিভ করেছিল। ফোন রিসিভ করতেই বাবার মুখটা দেখে সে বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলো বাবা তোমার মুখতো আজকে এক হাজার ওয়াট বাল্বের মত উজ্জল দেখাচ্ছে। কী ব্যাপার বলোতো শুনি? মেয়েটা তার বুদ্ধিমতী। মাশাআল্লাহ। বাবার মুখের হাসি দেখেই বুঝতে পেরেছে কিছু একটা আনন্দের বিষয় আছে বলেই বাবা তাকে এই সময়ে ফোন করেছে এবং বাবার মুখে এতো হাসি। বাবা তখন বললেন তোমার এক আংকেলের সাথে দেখা হলো। তিনি এখনো আমার সামনে আছেন। তোমার সাথে কথা বলতে চান।
ছোট্ট মায়মুনা অবাক হলো। তার কোন আংকেল এখন বাবার অফিসে আছেন? দেশ থেকে তেমন কেউতো দুবাই আসার কথা না। ছোট মামা? নাকি বড় চাচ্চু? না বড় চাচ্চুরতো পাসপোর্টই নেই। কতবার তাকে বলা হয়েছে একটা পাসপোর্ট করো। একবার ঘুরে যাও দুবাই। কিন্তু কখনোই তিনি পাসপোর্ট করেননি। দেশ ছেড়ে যদি কোথাও যেতে হয় তবে সেটা যাবেন মক্কা আর মদিনায়। আর কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে তার নেই। অবশ্য এর মাঝে তিনি পাসপোর্ট করলেও করতে পারেন। মায়মুনা ভাবলো এটা বড় চাচ্চুও হতে পারে আবার ছোট মামাও হতে পারে। মামা অনেকদিন থেকেই বলছিলেন দুবাই ঘুরতে আসবেন। কিন্তু ব্যবসার চাপে কখনো আসতে পারেননি। কে হতে পারে সে ধারণা করতে পারছে না। আবার এমনও হতে পারে এলাকার কেউ হয়তো দুবাই এসেছেন চাকরি নিয়ে। ছোট্ট মায়মুনার মনের মধ্যে যে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তা জয়নুল আবেদীন সাহেব বুঝতে পারছেন। তিনি মেয়েটির কাছে জানতে চাইলেন তুমি অনুমান করোতো কে হতে পারে? তুমি কিন্তু সেই আংকেলকে খুব পছন্দ করো। যদিও তার সাথে তোমার কখনো কথা হয়নি এমনকি দেখাও হয়নি। বাবার মুখ থেকে এটুকু শুনে ছোট্ট মায়মুনা একেবারেই বিমূড় হয়ে গেলো। এমন এক আংকেল তার সাথে কথা বলতে চান যাকে সে নাকি খুব পছন্দ করে অথচ কখনো দেখা হয়নি, কথাও হয়নি। এমন কেউতো তার দুই কুলের আত্মীয়র মধ্যে নেই। সে এবার বাবাকে বললো বাবা আংকেলের কাছে ফোনটা দাওতো দেখি। জয়নুল আবেদীনের সাথে যা কথা হচ্ছিল সবই শুনছিলেন আফতাব আহমেদ। তিনিও আনন্দ পাচ্ছিলেন। তার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে যখন আফতাব আহমেদ সালাম দিলেন আর জানতে চাইলেন মায়মুনা কেমন আছো? তখন তাকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য মায়মুনা কোনো কথাই বলতে পারলো না। এটা কি স্বপ্ন নাকি সত্যি? তার অবস্থা বুঝতে পেরে আফতাব আহমেদ আবার তাকে সালাম দিলেন। তখন মায়মুনা সালামের উত্তর দিয়ে কথা বলা শুরু করলো। সে কল্পনাও করতে পারেনি ফাতিহা আয়াত আপুর বাবার সাথে সে কথা বলবে। তিন চার মিনিট কথা হলো। তার ইচ্ছে ছিল সব গল্প সামনা সামনি বসে শুনবে তাই সে দাওয়াত করলো আংকেল আপনি বাবার সাথে আমাদের বাসায় চলে আসুন। হোটেল নেওয়ারও দরকার নেই। খুব খুশি হবো। আফতাব সাহেব ছোট্ট মায়মুনাকে কিভাবে না করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসলেন মায়মুনার বাবা জয়নুল আবেদীন। তিনি মেয়েকে বুঝিয়ে বললেন আংকেল এবার আসতে পারবেন না। পরবর্তীতে কখনো আসলে তোমার সাথে দেখা হবে। আর আমরা যখন দেশে যাবো তখনও দেখা হবে। এই শান্তনা দিয়ে মায়মুনার থেকে বিদায় নিতে হলো।
সেই দিনটার কথা হয়তো আজীবন মনে থাকবে মায়মুনার। মনে থাকবে আল ইসলাহ রেন্ট এ কারের মালিক জয়নুল আবেদীনের। আর ফাতিহা আয়াতের বাবা আফতাব আহমেদও নিশ্চই কখনো ভুলতে পারবে না। এতো কিছু যে ঘটছে ফাতিহা,ফালাক্ব বা তার মা এর কিছুই জানতে পারেনি। জানতে পারলেতো আর সারপ্রাইজ থাকবে না। তারাতো তাহলে জেনেই যাবে যে আফতাব সাহেব দুবাইতে এসেছে তাদের রিসিভ করতে। একই ফ্লাইটে এখান থেকে তিনি বাংলাদেশে যাবেন।
জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে ফাতিহাদের ফ্লাইট ছাড়বে। বাসার সব কিছু গোছগাছ করে ফাতিহা,ফালাক্ব আর তার মা বের হলেন জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে …………. চলমান।
১১ মে ২০২৬
গল্প: দুবাই ট্রানজিট
~জাজাফী
https://zazafee.com/?p=2206
সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা গল্প।
তড়িঘড়ি করে অফিস থেকে নিচে নামলো সুজন। নামার আগে বলে গেল বস একটু নিচে যাচ্ছি। তার মধ্যে একরকম উত্তেজনা কাজ করছে। সে না বললেও আমি বুঝতে পারলাম কেন তার মধ্যে এতো উত্তেজনা কাজ করছে। তার প্রিয় একজন মানুষ আসছে। সেটার উত্তাপ তার মনের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে।তাকে বললাম সুজন একটু পরে যাও। সে বললো স্যার লেট করলে দেরি হয়ে যাবে। শেষে নুন আনতে পানতা ফুরানোর মত দশা হবে। যে উদ্দেশ্যে আমি নিচে যেতে চাচ্ছি তা আর হবে না। সূর্যাস্ত দেখার জন্য কিংবা নতুন চাঁদ দেখার জন্য আপনি বসে থাকলে চলবে না। যথাসময়ে উপস্থিত হতে হবে। আমিও তেমনই চাঁদ দেখবো বলেই নিচে যাচ্ছি। সুজনের কথা শুনলে যে কেউ ভাববে ও বোধহয় পাগল টাগল হয়ে গেছে। এখন সকাল সাড়ে এগারটা বাজে। এই সময়ে দিনের বেলায় সে নতুন চাঁদ কিভাবে দেখবে? নতুন চাঁদ উঠতে এখনো ঢের বাকি আর সেটাও উঠবে সন্ধ্যাবেলায়। সেই চাঁদ দেখে চাঁদে দেখা কমিটি ঘোষণা করবে কুরবানীর ঈদ কবে হবে। অথচ সুজন এখন এই দিনের বেলায় নতুন চাঁদ দেখতে নিচে যাচ্ছে। বিষয়টা আসলে অন্যদের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও আমি জানি ও যা বললে ঠিকই বলছে। রুপক অর্থে ও যে মানুষটিকে দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে নিচে যাচ্ছে তিনি ওর কাছে নতুন চাঁদের মতই। ঘোষণা অনুযায়ী আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিরাট এক গাড়িবহর নিয়ে এই পথ দিয়ে যাবেন সেই আকাঙ্ক্ষীত মানুষটি। সুজন যাকে মনে ও প্রাণে ধারণ করে। দিব্য চোখে একনজর তাকে দেখার সাধ মনে মনে পুষে চলেছে বছরের পর বছর। সুযোগ হয়নি কখনো। সুতরাং এতো কাছে চলে আসা সুযোগ সে হাতছাড়া করতে রাজি নয়। আমাকে বললো স্যার ফিরে এসে শুনবো আপনার কথা। আমাকে আর আটকাবেন না। আমিও হাসি দিয়ে বললাম ঠিক আছে যাও।
বেশ কিছুদিন হলো প্রচন্ড লোডশেডিংএ হাসফাঁস করছি। আইপিএস এর ব্যবস্থা নেই। অবশ্য একটা জেনারেটর আছে। প্রচন্ড শব্দ হয়। জেনারেটরে যে এতো শব্দ হতে পারে তা আমার জানা ছিল না। যখন ছোট ছিলাম তখন মাঠে ধানের জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য শ্যালো মেশিন ব্যবহার করা হতো। ভটভট করে শব্দ হতো। অনেক দূর থেকেও সেই শব্দ শোনা যেতো। সেই সাথে বের হতো ডিজেল পোড়া কালো ধোঁয়া। এখনো বেশ মনে আছে সেই শব্দ ছিল বিকট। কিন্তু এই জেনারেটরের সাথে যদি তুলনা করি তবে সেটার শব্দ মশার কানের কাছে গান শোনানোর চেয়ে তীব্র নয়। কিন্তু গরম থেকে বাঁচতে হলে জেনারেটরের শব্দ সহ্য করতেই হবে। তা সহ্য করতে আপত্তি নেই কারো। তবে জেনারেটর চালানোর জন্য যে তেল দরকার সেটার গভীর সংকট চলছে। ফলে খুব সচেতন ভাবে অতি প্রয়োজন ছাড়া জেনারেটর চালানোর সুযোগ নেই। আর আমাদের এই জেনারেটরটাও না একে বারে হাভাতে হাতির মত। এতো পরিমান তেল খায় যে বলে বুঝানো যাবে না। চৈত্র মাসে ফেটে চৌচির হওয়া জমিতে এক বোতল পানি দিলে যেমন সাথে সাথে সেটা উধাও হয়ে যায় আমাদের জেনারেটরটা অনেকটা সেরকম। এক হাজার টাকার অকটেন দিলে টেনেটুনে দুই ঘন্টা চলে। ছোটবেলায় মা বলতেন হিসাব না করে চললে রাজার গোলাও শেষ হয়ে যায়। তখন কথাটা না বুঝলেও এখন বুঝি। এখনতো একটু বড় হয়েছি। আর আমাদের এই জেনারেটরটা দেখলে সেটা আরও বেশি করে মনে পড়ে। যে হারে সে তেল খায় সেই হারে মনে হয় টিউবওয়েলের মুখ দিয়ে পানিও বের হয় না। অথচ আমাদের পাশেই অনিমেষদার অফিস। সেই অফিসেও একটা জেনারেটর আছে। কিন্তু শব্দ নেই। একদম কাছে না গেলে তার শব্দ শোনা যায় না। বিয়ের পর নতুন স্বামী স্ত্রী বাসর ঘরে যেভাবে ফিসফিস করে প্রায় শোনা যায় না এমন ভাবে কথা বলে। প্রেমিক প্রেমিকা যেমন পার্কে বসে কিংবা মোবাইলে খুব নিচু গলায় কথা বলে। পাশে দাঁড়ালেও শোনা যায় না। অনিমেষ দার অফিসের জেনারেটর অনেকটা সেরকম। খুব কাছে না গেলে শব্দ শোনা যায় না। অথচ অনিমেষদার অফিস চলছে নিগিঢিগির উপর। অর্থনৈতিক দিক থেকে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। কিন্তু তারপরও তাদের সব কিছু কত ফিটফাট। কথায় বলে উপরে ফিটফাট আর ভেতরে সদরঘাট। অনিমেষদার অফিসের সব ফিটফাট হলেও অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে একেবারে নাজেহাল অবস্থা। বছরের পর বছর ব্যবসায় লস যাচ্ছে। মালিকপক্ষ নিজেও লুটেপুটে খাচ্ছে। সেই দিক থেকে আমাদের অফিস অনেক ভালো অবস্থানে আছে। কিন্তু ভালো অবস্থানে থাকলেও উল্টো চিত্র ফুটে উঠেছে বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখার দিক থেকে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার জন্য অধিকাংশ লাইট বন্ধ থাকে। হঠাৎ করে কেউ গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকলে ভড়কে যাবে। ভাববে এটা কি অফিস নাকি কোনো অন্ধকার গুহায় এসে পৌঁছালাম?
পাশাপাশি দুটি অফিসের জেনারেটরের এই পার্থক্য দেখে আবুল হায়াত আর চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত সেই বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ে যায়। দুটো জেনারেটরই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তবে দামের পার্থক্য থাকায় সার্ভিস কোয়ালিটি আকাশ পাতাল ব্যবধান। অবশ্য এ ক্ষেত্রেও বিজ্ঞাপনে দেখানো আবুল হায়াতের মেয়ে জামাই চঞ্চল চৌধুরী যেমন দামে সস্তা দেখে বাজে কাপড়,বাজে টিন কিনে ভেবেছিল জিতে গেছে। পরে দ্রুত টিন ফুটো হয়ে গেছে আর এক ধোয়াতেই কাপড় থেকে রং উঠেছে। আমাদের জেনারেটর কেনার ক্ষেত্রেও অফিসের সুপ্রিম বস একই নীতি ফলো করে ধরা খেয়েছে। অবশ্য তিনিতো বসেন হেড অফিসে। তাকে তো আর এই বিকট শব্দ শোনা লাগে না। অন্যদিকে তেল কেনার আবার সারা মাসের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৫ হাজার টাকা। যেখানে ১ হাজার টাকার তেলে মাত্র দু ঘন্টা যায় সেখানে সারা মাস কিভাবে ৫ হাজার টাকার তেল দিয়ে চলা যায় তা আমার বোধগম্য নয়। অল্প দামে না কিনে ভালো জিনিস কিনলে তাতে তেল খরচ হতো কম আবার শব্দও হতো কম।টেকসই হতো। দীর্ঘ মেয়াদে লাভবান হওয়া যেতো। বোধহয় দূরদর্শী চিন্তা থেকেই বাংলা প্রবাদ প্রচলন হয়েছিল সস্তার বার অবস্থা।
শীত শেষ হতে না হতেই বিদ্যুৎ সংকট শুরু হলো। আর তা ক্রমাগত ভাবে প্রকট হতে শুরু করলো। এক ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে আর এক ঘন্টা থাকে না। গ্রামের দিকের কথাতো বলাই যাবে না। সেখানে এক ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘন্টা থাকে না। গ্রামের লোকেরা বলে মাঝে মাঝে নাকি তাদের গ্রামে বিদ্যুৎ আসে! একটা গল্প শুনেছিলাম এক লোকের খুব মামলা দেওয়ার অভ্যাস ছিল। সুযোগ পেলেই মামলা দায়ের করতো। লোকটা একবার শহরে গেলো। তার সাথে যে গিয়েছিল সে জানতে চাইলো ভাই কাজতো শেষ এখন কী করবেন? সোজা বাড়ি যাবেন নাকি অন্য কিছু করবেন? সে বললো শহরে যখন এসেছি চাচার নামে একটা মামলা দিয়েই যাই। বিদ্যুতের অবস্থা হয়েছে সেরকম। বিদ্যুৎ সংকট মানেই বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করে শহরের মানুষকে বিদ্যুৎ দিয়ে গ্রামের লাইন অফ করে রাখি। এর পিছনে অবশ্য কিছু যুক্তি তারা নিজেরা ভেবে রেখেছে। বিদ্যুৎ অফিস মূলত শহরে। আর সেই শহরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে অফিস ঘেরাও হওয়ার সম্ভাবনা আছে। গত সপ্তাহে আমাদের শহরে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও হয়েছিল বলে শুনেছি। আমি অবশ্য তখন ট্যুরে ছিলাম। তাছাড়াও শহরে নামীদামী ক্ষমতাবান লোকও থাকে। অন্যদিকে গ্রামে থাকে গেয়ো ভুত, কৃষক,দিনমজুর। গ্রাম থেকে শহরের দূরত্বও অনেক। তাদের ক্ষমতাও কম। ফলে গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকলে তারা হয়তো দুই চারটা গালি দিবে,হাসফাস করবে কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসতো ঘেরাও করতে আসবে না। আর তাছাড়া তারা তাদের গ্রামের বাড়িতে বসে দুই চারটা গালি দিলে সেই গালিতো আর শুনতে হচ্ছে না। তাই বিদ্যুৎ অফিসের কর্তারা গ্রামের লোকদেরকেই বলির পাঠা মনে করেন। তারা আরও ভাবেন গ্রামের মানুষ হাতপাখার বাতাস খেতে পারবে। অনেক গাছ আছে,পুকুর আছে। সেই পুকুরপাড়ে গিয়ে বসবে। গরম কম লাগবে। এগুলো কিন্তু আমার কথা না। এগুলো মানুষ বলাবলি করে। এসব বলা কি আমার পক্ষে সাজে?
বিদ্যুতের এই চরম সংকটের মধ্যেও কখনো কখনো হাওয়া থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। কিংবা বলা চলে হাওয়া থেকে বিদ্যুৎ যোগান দেওয়া হয়। তখন কোনো লোডশেডিং হয় না। দারিদ্রকে যাদুঘরে পাঠানোর কথা বলেছিলেন কোনো এক গুণীজন। তেমনি সেই সময়ে লোডশেডিং শব্দটা কেবল ডিকশনারির পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে এক গানের শিল্পী যে কোটায় সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন বিদ্যুৎ একদিন ঝাকায় করে ফেরি করা হবে। এই বিদ্যুৎ লাগবে বিদ্যুৎ। কিন্তু সেই দিন আমাদের দেখা হয়নি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়ের কেউ কথা রাখেনি কবিতার মত আক্ষেপ করা যেতেই পারে। সেই ফেরিওয়ালী এখন জেলে নাকি পলাতক ঠিক মনে পড়ছে না। বিদ্যুৎ সংকটে লোডশেডিং এর প্রকট এতো বেশি হয়েছিল যে জনজীবনে অশান্তি নেমে এসেছিল। কিন্তু হঠাৎ গতকাল দুপুরের পর থেকে এক সেকেন্ডের জন্যও বিদ্যুৎ যেতে দেখিনি। এটা অবশ্য অনুমেয়ই ছিল। এটুকু বুঝার জন্য রকেট সায়েন্স জানা লাগে না। মহামতি কুরেইশী আসবেন। সে কারণেই তার সম্মানার্থে বিদ্যুৎ বিভাগ এই অভাবনীয় কাজটি করেছেন বলে অনেকের ধারণা। মহামতি কুরেইশী অচিন্ত্যনগরের নতুন জমিদার। আগের জমিদারের অবসরের পর তাকে জমিদারি দেওয়া হয়েছে। একসময় তিনি প্রচন্ড ক্ষমতাবান ছিলেন। আগের জমিদারের সাথে বিরোধ থাকায় তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। তার পর কেটে গেছে পচিশ বছর। কুরেইশীর বয়স এখন সত্তর। অবশেষে তার নির্বাসন জীবনের অবসান ঘটেছে এবং তিনি অচিন্ত্যপুরে ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেই মহামতি হিসেবে জমিদারি গ্রহণ করেছেন। চারদিকে এখন তার জয়জয়কার। অবশ্য রাজ্যে এমনও অনেক লোক আছে যারা তাকে সমালোচনায় ব্যস্ত। কিন্তু তিনি তা গায়ে মাখেন না। সহজ সরল দিনযাপন করছেন। এগুলো দেখে আমিও অনেক মুগ্ধ হই। অবশ্য আমার মুগ্ধতা সুজনের মত না।
যেহেতু মহামতি কুরেইশী আসবেন তাই তিনি যেন এসে সব কিছু ঠিকঠাক দেখতে পান,প্রজাদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ না পান সে কারণেই মুলত বিদ্যুৎ বিভাগ এমন অসাধারণ কাজ করেছে। গতকাল দুপুরের পর থেকে এক মিনিটের জন্যও বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়নি। কিন্তু অনুমান করছি এই সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। কথায় আছে ”সুদে আসলে উশুল করে নিবে”। মহামতি কুরেইশী চলে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ কতক্ষণ বন্ধ থাকবে,কী পরিমান লোডশেডিং হবে তা কল্পনাও করতে পারছি না। তবে সুজনের উত্তেজনা দেখে ভালো লাগছে। সে তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে গেলো। মোটামুটি ধারণা করতে পারি কী ঘটতে যাচ্ছে। তারপরও সুজন ফিরে আসলে তার কাছ থেকে জানার আগ্রহ থেকে যাচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সুজন ফিরে আসলো। তার চোখে মুখে আনন্দের আভা। নতুন চাকরি পেলে কিংবা লটারি জিতলে যেমন মানুষ উল্লাসিত থাকে সে যেন তারচেয়েও বেশি আনন্দিত। অদৃশ্য ডানায় ভেসে বেড়াচ্ছে। মুখ জুড়ে হাসি। অন্যের মুখে হাসি দেখতে পেলে আমার ভালো লাগে। নিজে কারো মুখে হাসি ফুটাতে পারি বা না পারি এমনিতে কারো মুখে হাসি দেখলে আমিও খুশি হই। সুজনের হাসি আমাকেও খুশি করলো। জানতে চাইলাম এতো আনন্দিত কেন সুজন? সুজন হাফাতে হাফাতে বললো দেখা হয়েছে স্যার! দেখা হয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে হাতও নেড়েছেন। সুজনের কথা থেকে বুঝলাম মহামতি কুরেইশী এই পথ দিয়ে কিছুক্ষণ আগে গিয়েছেন। যাওয়ার পথে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে দুইপাশে অপেক্ষারত জনসাধারণের উদ্দেশ্যে হাত নেড়েছেন। সুজনও তাদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সুজন ভেবেছে তার উদ্দেশ্যেই বোধহয় মহামতি হাত নেড়েছেন। এই কারণেই বোধহয় বাংলায় প্রবাদ রচিত হয়েছে “পাগলের সুখ মনে মনে”। যাই হোক নিজেকে সুখী ভাবতে পারাও বিরাট ব্যাপার। অনেকে কোটি টাকার সম্পদ থাকার পরও সুখী না। সেখানে সুজন অসংখ্য মানুষের ভীড়ে থেকে মহামতির হাতনাড়াকে নিজের বিরাট সৌভাগ্য মনে করে সুখী হওয়াটাতো অন্যরকম ব্যাপার। এই সুখ কজনইবা অনুভব করতে পারে?
সেদিন সারাদিন সুজনের মুখে হাসি ফুটে থাকলো। হয়তো অফিস শেষে বাড়িতে যাওয়ার পথে পরিচিত যতজনের সাথে ওর দেখা হবে সবাইকে বলবে জানিস আজকে মহামতি কুরেইশী আমার দিকে চেয়ে হাত নাড়িয়েছেন। ওর ফেসবুক আছে কি না জানি না। থাকলে নিশ্চই স্ট্যাটাসও দিবে। সেই স্ট্যাটাসে অনেকে লাইক দিবে। অনেকে আবার প্রমাণ চেয়ে বসবে। মহামতি কুরেইশী যে তোকে উদ্দেশ্য করে হাত নেড়েছে তার প্রমাণ দেখা। ছবি থাকলে ছবি দেয়। অবশ্য যদি সত্যি সত্যি ছবিও থাকতো তাও অনেকে সন্দেহ করতো। সন্দেহপ্রবণরা বলবে আরে এটাতো এআই দিয়ে বানানো ছবি।............. স্মৃতিকথা।
২৭ এপ্রিল ২০২৬
মহামতি কুরেইশী
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the public figure
Website
Address
Dhaka
1230