Rezaur Rahman Rizvi
05/06/2026
পপ গুরু আজম খানের "উচ্চারণ" ব্যান্ড কি এখনো আছে?
বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে যে কয়েকজন শিল্পীর নাম চিরকাল শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছেন রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খান। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতীক, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের তরুণ সমাজের কণ্ঠস্বর এবং বাংলা ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম প্রধান স্থপতি।
১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন আজম খান। কৈশোর থেকেই খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং সংগীতচর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অস্ত্র হাতে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি ২ নম্বর সেক্টরের একজন সম্মুখসমরের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতার পর যুদ্ধের রণাঙ্গন থেকে ফিরে এসে তিনি হাতে তুলে নেন গিটার। নতুন স্বাধীন বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন ভাষা, নতুন সুর এবং নতুন সাংস্কৃতিক চেতনার সূচনা করেন তিনি। সত্তরের দশকের শুরুতে ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’-তে গান পরিবেশনের মাধ্যমে তাঁর সংগীতযাত্রা শুরু হয়।
পরবর্তীতে তিনি গঠন করেন কিংবদন্তি ব্যান্ড "উচ্চারণ", যা বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
যে সময়ে ব্যান্ড সংগীতকে অনেকেই ‘অপসংস্কৃতি’ বলে আখ্যায়িত করতেন, সেই সময় আজম খান এবং উচ্চারণ সাহসিকতার সঙ্গে বাংলা ভাষায় রক, পপ এবং ফোক উপাদানের সমন্বয়ে নতুন ধারার সংগীত পরিবেশন করেন। তাঁদের পরিবেশনা শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি, বরং বাংলা ব্যান্ড সংগীতকে জাতীয় সংস্কৃতির মূলধারায় প্রতিষ্ঠিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
উচ্চারণ এবং আজম খানের জনপ্রিয় গানের তালিকায় রয়েছে— হৃদয় সাগর মরুভূমি, বাংলাদেশ, মা গো মা, সালেকা মালেকা, আলাল ও দুলাল, প্রেম চিরদিন দূরে দূরে, অভিমানী, পাপড়ি, জীবন সাথী, চুপ চুপ চুপ, হায় আল্লাহ, আসি আসি, জীবনে কিছু পাবো না প্রভৃতি। এই গানগুলোর অনেকগুলোই আজ বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে জনপ্রিয়।
বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতকে প্রতিষ্ঠিত করার ক্ষেত্রে আজম খানের অবদান ছিল অসামান্য। তিনি এমন এক সময়ে ব্যান্ড সংগীতকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন, যখন এ ধারার সংগীতকে অনেকেই সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাঁর সাহসী পদক্ষেপ, ভিন্নধর্মী সংগীতচিন্তা এবং সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলা গানগুলো তরুণ সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর হাত ধরেই পরবর্তী সময়ে দেশের অসংখ্য ব্যান্ড গড়ে ওঠে এবং বাংলা ব্যান্ড সংগীত আজকের মর্যাদায় পৌঁছায়।
সংগীতজীবনে তিনি দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কিংবদন্তি ব্যান্ড Souls-এর ২০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে Channel i Music Awards-এ তাঁকে Lifetime Achievement Award-এ ভূষিত করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তরভাবে দেশের সর্বোচ্চ দুই রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করে— একুশে পদক (২০১৯) এবং স্বাধীনতা পদক (২০২৫)।
তবে আজম খান নিজে পুরস্কার ও সম্মাননার চেয়ে মানুষের ভালোবাসাকেই বেশি মূল্য দিতেন। তিনি প্রায়ই বলতেন— “আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার আমার গানের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।”
দীর্ঘদিন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করার পর ২০১১ সালের ৫ জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু কেবল শারীরিক প্রস্থান; তাঁর গান, দর্শন, সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলন আজও বেঁচে আছে লাখো মানুষের হৃদয়ে।
আজ খানের উচ্চারণ ব্যান্ডের বিভিন্ন সময়ের লাইন-আপ:
১৯৭২ সালে উচ্চারণের প্রথম লাইন-আপে লিড ভোকালে ছিলেন আজম খান, লিড গিটারে ইশতিয়াক রহমান, বেজ গিটারে ল্যারি, রিদম গিটারে নীলু, ড্রামসে ইদু, কঙ্গায় হাবলু এবং সাইড ভোকালে ছিলেন বাবু। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের প্রথম দিককার পরীক্ষামূলক ও সাহসী যাত্রাগুলোর অন্যতম ছিল এই লাইন-আপ।
১৯৭৬ সালে উচ্চারণ পুনর্গঠিত হলে আজম খানের সঙ্গে যুক্ত হন লিড গিটারিস্ট নয়ন হক মুন্সী, রিদম গিটার ও সাইড ভোকালে দুলাল জোহা, বেজ গিটারে ফুয়াদ নাসের, কঙ্গায় কাজল এবং ড্রামসে পেয়ারু খান। এই লাইন-আপের সময়েই ‘আলাল ও দুলাল’-এর মতো গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং উচ্চারণ দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ডে পরিণত হয়।
আশির দশকে উচ্চারণের সংগীতায়োজনে নতুন মাত্রা যোগ করেন রকেট। এ সময় আজম খানের সঙ্গে লিড গিটারে রকেট, বেজ গিটারে মাসুম হায়দার, রিদম গিটার ও সাইড ভোকালে দুলাল জোহা এবং ড্রামসে বাবু নিয়মিত পারফর্ম করতেন। ‘অভিমানী’, ‘জীবন সাথী’ এবং ‘পাপড়ি’র মতো জনপ্রিয় গান এই সময়ে ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জন করে।
নব্বইয়ের দশক থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আজম খানের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে প্রায় অর্ধশতাধিক সংগীতশিল্পী কাজ করেছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রেবেল (ভোকাল), ইফরান (লিড গিটার), জুবরান (বেজ গিটার), তপু (ড্রামস) এবং আরও অনেক প্রতিভাবান সংগীতশিল্পী, যারা বিভিন্ন সময়ে উচ্চারণের মঞ্চ ও রেকর্ডিং কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন।
উচ্চারণ ব্যান্ডের পুনর্গঠন ও বর্তমান কার্যক্রম:
আজম খানের পরিবারের প্রত্যক্ষ সমর্থনে এবং তাঁর সৃজনকর্মের কপিরাইট ও রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান Cool Exposure-এর উদ্যোগে, Channel i ও Impress Telefilm-এর সহযোগিতায় কিংবদন্তি ব্যান্ড উচ্চারণ নতুনভাবে পুনর্গঠিত হয়ে আবারও নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করেছে।
বর্তমানে উচ্চারণ ব্যান্ডের লাইন-আপে রয়েছেন দুলাল জোহা (ভোকাল ও রিদম গিটার), পেয়ারু খান (ভোকাল ও পারকাশন), সেকান্দার আহমেদ খোকা (বেজ গিটার), পার্থ মজুমদার (লিড গিটার), প্রেম (সাইড ভোকাল ও কিবোর্ড) এবং বাপ্পি (ড্রামস)।
ইতোমধ্যে উচ্চারণ অংশগ্রহণ করেছে TMSS–Channel i Music Awards, Channel i Music Fest, পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রবীন্দ্র সরোবরে অনুষ্ঠিত কনসার্ট, বিভিন্ন টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং দেশের নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে। তাদের পরিবেশনা দেশ-বিদেশের অসংখ্য দর্শক-শ্রোতার প্রশংসা অর্জন করেছে।
রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খানের সংগীত, দর্শন এবং উত্তরাধিকারকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে উচ্চারণ ব্যান্ড আগামী দিনে দেশব্যাপী এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত কনসার্ট, সাংস্কৃতিক উৎসব এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিভিন্ন আয়োজনে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশের পাশাপাশি উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলা ভাষাভাষী শ্রোতাদের কাছে আজম খানের গান ও বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে উচ্চারণ ইতোমধ্যে বিভিন্ন আয়োজক প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় কার্যক্রম শুরু করেছে।
উচ্চারণ ব্যান্ডের লক্ষ্য শুধু কনসার্ট করা নয়; বরং রক অ্যান্ড পপ গুরু আজম খানের সংগীত, দর্শন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাংলা ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাসকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া। দেশ ও বিদেশে নিয়মিত পরিবেশনার মাধ্যমে আজম খানের অমর গানগুলোকে নতুন শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
31/05/2026
আপনি কি আজকের আকাশের চাঁদটি দেখেছেন?
যদি না দেখে থাকেন, তবে এখনই দেখে আসুন।
কারণ আজকের চাঁদের জন্যই এ বছর আকাশে ১২টির বদলে ১৩টি পূর্ণিমা দেখা যাবে! আর এজন্য আজকের পূর্ণিমার চাঁদটিকে বলা হচ্ছে "ব্লু মুন"! যদিও নামের সঙ্গে "ব্লু" থাকলেও চাঁদটি নীল হবে না। তবুও সারা বিশ্বের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও আকাশপ্রেমীদের কাছে এটি একটি বিশেষ ঘটনা। কারণ একই মাসে দ্বিতীয়বার পূর্ণিমা হওয়ার ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না।
গত ১ মে ছিল পূর্ণিমা। আর আজ ৩১ মে আবার পূর্ণিমা। এই বিরল ঘটনাকেই বলা হয় "ব্লু মুন"।
মজার ব্যাপার হলো, এই ঘটনাই এত বিরল যে ইংরেজি ভাষায় একটি জনপ্রিয় প্রবাদ তৈরি হয়েছে—"Once in a Blue Moon"। অর্থাৎ এমন কিছু, যা খুব কম ঘটে।
তাই আজ রাতে একবার হলেও আকাশের দিকে তাকান।
কারণ পরেরবার এমন চাঁদ দেখার জন্য হয়তো আপনাকে অনেকদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে।
19/05/2026
শীতের শেষ দিকের রাত। সময় তখন প্রায় সাড়ে ৩টা। ঢাকার বাইরে পুরনো মহাসড়কের ধারে একটা ছোট্ট নামহীন এক চায়ের দোকান। রফিক প্রতিরাতেই সেখানে চা খেতে থামতো। ৪৮ বছরের মানুষ। পেশায় আন্তঃজেলা বাসচালক। ২৫ বছর ধরে একই রুটে বাস চালাতে চালাতে তিনি শিখে গিয়েছিলেন- গভীর রাতের রাস্তা কখনো পুরোপুরি ফাঁকা থাকে না। কোথাও না কোথাও কেউ জেগে থাকে। কেউ বাড়ি ফেরে, কেউ পালায়, কেউ অপেক্ষা করে।
সেদিনও বাস থামিয়ে তিনি চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখনই তার চোখে পড়ে মেয়েটাকে। চায়ের দোকানের ঠিক উল্টো পাশে, একটা বন্ধ ফার্মেসির সিঁড়িতে বসে ছিল সে। বয়স বড়জোর ৮ বা ৯। গায়ে পাতলা সোয়েটার। কোলে একটা স্কুলব্যাগ। মাথা নিচু করে বসে আছে। আশেপাশে কেউ নেই।
রফিক প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো পরিবারের কেউ দোকানে আছে। কিন্তু ১০ মিনিট পার হয়ে গেলেও কেউ এল না। তিনি রাস্তা পেরিয়ে কাছে গেলেন।
“মা, তোমার সঙ্গে কে আছে?”
মেয়েটা মাথা তুলল। চোখ দুটো লাল। কান্না থেমে যাওয়ার পর যেমন হয়। সে খুব আস্তে বলল-
“আব্বু বলছিল, এখানেই বসে থাকতে। উনি আসবে।”
“কোথায় গেছে?”
“জানি না।”
“কতক্ষণ আগে?”
মেয়েটা একটু ভেবে বলল- “অনেকক্ষণ।”
তারপর আবার মাথা নিচু করে ফেলল। রফিকের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ লাগল। তিনি চারপাশে তাকালেন। নির্জন রাস্তা। কুয়াশা। দূরে ট্রাকের শব্দ।
“ফোন নাম্বার জানো?”
মেয়েটা না সূচক মাথা নাড়ল।
“বাড়ি কোথায়?”
সে শুধু একটা গ্রামের নাম বলল, যেটা সেখান থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে। চায়ের দোকানদার এসে বলল- “ভাই, রাত ১টা থেকা বসা। একটা লোক বাইক দিয়া আনছিল। পরে কয় ‘এইখানে থাক, আমি আসতেছি।’ তারপর আর আসে নাই।”
কথাটা শুনে রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। মেয়েটা তখনও রাস্তার দিকেই তাকিয়ে আছে। যেভাবে কেউ বাস মিস করলে শেষ আলোটা মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে। রফিক জিজ্ঞেস করলেন- “খেয়েছ?”
মেয়েটা মাথা নাড়ল, "না"।
পাশের হোটেলে গরম গরম পরোটা ভাজছে। সেটা দেখে রফিক বললো, চলো মা, বাপ-বেটি দুটো পরোটা খেয়ে আসি। মেয়েটি না সূচক মাথা নেড়ে বললো- “আমি খাইতে গেলে যদি আব্বু এসে আমাকে না পায়?”
এই একটা বাক্য রফিককে পুরো ভেঙে দিল। তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিস 'ক্ষুধা' না, বরং 'ফেলে' যাওয়া।”
তিনি সেদিন থানায় ফোন করেছিলেন। পুলিশ এল। অনেক প্রশ্ন করল। মেয়েটা খুব কম কথা বলল। শুধু একটা তথ্য জানা গেল- তার নাম মাইশা। থানায় নেওয়ার সময়ও সে বারবার পেছনে তাকাচ্ছিল। ঠিক সেই ফার্মেসির সিঁড়িটার দিকে। যেন কেউ সত্যিই ফিরে আসবে।
পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাইশার একটা ছবি ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলব্যাগ কোলে ছোট্ট একটা মেয়ে। শীতের কুয়াশায় বসে আছে। চোখে এমন এক ধরনের অপেক্ষা, যেটা ভাষায় লেখা যায় না।
হাজার হাজার মানুষ ছবিটা শেয়ার করল।
কেউ লিখল- “কীভাবে পারে মানুষ?”
কেউ লিখল- “ও যেন ভালো থাকে।”
কিন্তু রফিক শুধু একটা জিনিস ভাবছিলো, রাত ১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত একটা ছোট্ট মেয়ে ওই সিঁড়িতে বসে ছিল। আর তার বিশ্বাস একবারও ভাঙেনি। সে ভাবছিল, তার বাবা আসবেই।
দুই দিন পর জানা গেল, মেয়েটার মা অনেক আগেই মারা গেছে। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলো। আশেপাশের মানুষ বলেছে, নতুন সংসারে মেয়েটাকে নিয়ে প্রায়ই ঝামেলা হতো। তারপর এক রাতে, তাকে বাইকে তুলে এনে ফেলে যাওয়া হয়।
কোনো দুর্ঘটনা না। কোনো ভুল না। পুরোপুরি সিদ্ধান্ত নিয়ে।
মাইশাকে অস্থায়ী শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হলো। কিন্তু সে কারও সঙ্গে কথা বলত না। প্রতিদিন সন্ধ্যায় দরজার পাশে গিয়ে বসে থাকত। আশ্রয়কেন্দ্রের খালারা ভাবত, সে হয়তো খেলতে চায়। পরে তারা বুঝলো, না। সে অপেক্ষা করে। কোনো বাইকের শব্দ হলেই উঠে দাঁড়ায়। তারপর আবার ধীরে বসে পড়ে। রফিক প্রায়ই গিয়ে তাকে দেখে আসতেন।
একদিন তিনি জিজ্ঞেস করলেন- “তুমি কি এখনো ভাবো, আব্বু আসবে?”
মাইশা অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলল- “মানুষ কি ইচ্ছা করে কাউরে ফেলে যায়?”
রফিক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর সত্যি দিয়ে দেওয়া যায় না। এর এক মাস পর রফিক একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। তার নিজের কোন সংসার ছিল না। অনেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী মারা যাবার পর আর বিয়ে করেননি। এক ছেলে আছে, সেও শহরে হোস্টেলে থেকে কলেজে পড়ে। তার নিজের আয়ও সীমিত। তবু তিনি আবেদন করলেন মাইশার অভিভাবক হওয়ার জন্য।
অনেকে বলেছিল- “এই বয়সে এসব ঝামেলা নেন কেন?”
রফিক শুধু বলেছিলেন- “কারণ ওই রাতে আমি বাসে উঠে চলে আসতে পারতাম। কিন্তু তারপর আয়নায় নিজের চোখে তাকাতে পারতাম না।”
রফিক মাইশাকে আইনগত অভিভাবক হিসেবে নিজের বাড়িতে নিয়ে এলেন। খুবই আনন্দের সাথে দিনগুলো কাটছিলো। ছয় মাস পরে মাইশা প্রথমবার তাকে “আব্বু” বলে ডাকল। কোনো নাটকীয় মুহূর্ত না। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় হঠাৎ বলেছিল- “আব্বু, আমার পানির বোতলটা?”
রফিক পরে বলেছিলেন, “জীবনে এত মানুষ আমাকে নামে ডাকছে। কিন্তু ওই একটা শব্দ শুনে মনে হইছিল, আমি নতুন জীবন পাইছি।”
এখন মাইশা ক্লাস ফাইভে পড়ে। আঁকতে ভালোবাসে। প্রতিদিন রাতে রফিক বাস নিয়ে ফিরলে দরজা খুলে দেয়। আর একটা কাজ সে আজও করে। রফিক বাইরে বের হলে, সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। যতক্ষণ না মানুষটা চোখের আড়াল হয়। তারপরও মাঝে মাঝে বলে- “ফোন দিবা তো?”
কারণ যাদের একবার ফেলে যাওয়া হয়, তারা নিশ্চিত হতে চায়।
বারবার।
কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে ভাঙতে।
কিছু মানুষ আসে ফেলে যেতে।
আর কিছু মানুষ-
একটা নির্জন রাত, একটা কাঁপতে থাকা অপেক্ষা, আর একটা ছোট্ট ভাঙা বিশ্বাসের সামনে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেয়- “না। এবার আমি থাকব।” #
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the public figure
Website
Address
Dhaka
1207