The Living System Lab
21/11/2014
সে কি আমাকে ভালোবাসতো বা আজো ভালোবাসে ??
জগতে হাজার মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে।
তারপর মনে ক্ষীন আশা জ্বালিয়ে রাখে.... নিজেকেই বিশ্বাস করায়... হয়তো ভালোবাসতো।
ইচ্ছে করে গভীরে ভাবে না,
কারন কিছু সময় আমরা কষ্ট পেতে চাই না।
ইচ্ছে করে নিজেকে ভুল বোঝাই।
সান্তনা দেই যেঃ সে পাশে আছে।
অনেক অপেক্ষার পর সে হয়তো হারানো মানুষটার জীবনে সুযোগ পায়।
কিন্তু,,
সেটা সাময়িক। কারন ভাংগা আয়নায় মুখ দেখা যায় না।যায় না চোরের স্বভাব আর চলে যাওয়া প্রিয়জন ফিরে এলে হয় বদলে যায় অথবা আবার পর হয় ক্ষনিকের মিলনের পর।
তবু,,
আমরা ভেতরের অচিন পাখির ধুকধুক করে বাড়িয়ে তোলা স্পন্দনের কান্না সহ্য করতে পারি না।
কি অদ্ভুত ভাবে নিজেকে কষ্ট দেয়ার ক্ষমতা এমন কারো হাতে দেই যে এটার অপব্যবহার করবে।
জগতে অপাত্রে প্রেম ভালোবাসা জনিত আবেগের ঠাই বেশি হয়।
বাস্তবে
একজন চরিত্রবানের চেয়ে চরিত্রহীনেররা বেশি সুবিধা নিয়ে বাঁচে।
যে ছেলেটা প্রতি দিন হাজার কবিতা লেখে, চিঠি লেখে কিন্তু সাহস হয় না দেবার এই ভেবে যেঃ মেয়েটা কি ভাববে।
অথচ,
ক্লাসের বখাটে ছেলেটা বিরক্ত করতে করতেই এক সময় মেয়েটার ভেতরে ঠাই পেয়ে যায়।
সমীকরণগুলো নিপাতনে সিদ্ধ।
এখানে ভালো মানুষেরা ভালোবাসার ছবি আঁকে কিন্তু স্পর্শ করতে পারে না।
গত আটারো বছর ধরে একজন আদর্শ ছেলে হতে চেয়েছি।
কোনদিন সিগারেট খাইনি।
খারাপ অভ্যাস নেই।
এসব কি আসলেই কোন মানে রাখে??
তুমি মানুষ।
কিন্তু তুমি বড় না ছোট মানুষ তা নির্ণয় করবে তোমার ক্রেডিট কার্ড।
তুমি যদি দশটা খুন কর টাকা দিয়ে ঢেকে ফেলবে পাপ।
মানুষ হয়ে কি করবে তুমি??
টাকার পিছে ছুটতে থাকো,
এতেই চলবে,......
তারপর কিনতে পারবে স্বপ্ন কিংবা দু চার পয়সার মানুষ।
কেউ পড়ালেখা করে কিছু শেখার দরকার নেই।
শেখ কি শিখলে টাকা পাবে।
অনেক টাকা,
যত টাকা হলে তুমি বড় মানুষ হতে পারবে।।
-----------------------------------------------
বিশেষ গল্পঃ
ট্রেনের টিকিট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা।লোকটা বলছে আর টিকিট নেই।মেয়েটা ডান হাত নাড়িয়ে কিছু বলছিলো।মেয়েটার কণ্ঠ শুনে মুহিবের ভেতরটা কেঁপে ওঠে,কন্ঠটা এত বেশি পরিচিত যে চাইলেও মুছে ফেলা যায় না।
হাতের পেপার ফেলে খানিকটা মন্ত্রমুগ্ধের মত মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে কথোপকথন শুনতে থাকে।
কাউন্টারের লোকটা জোর গলায় বলছেঃ
দেখুন মিস , আমাদের আজকের ট্রেনে আর কোন কেবিন ফাঁকা নেই !
মেয়েটা খানিকটা অনুনয়ের সুরে বলেঃ আর একবার চেক করুন।আমার যাওয়া খুব জরুরী।
লোকটি নিরুত্তাপ কন্ঠে উত্তর করেঃ
নেই ম্যাম।লোকাল সিট হবে আর নয়তো পরের ট্রেনে।
মুহিব আস্তে করে ডাকেঃ ইরা !
মেয়েটা চকিতে ঘুরে যায়।খানিকটা অপ্রস্তুত আর অবিশ্বাস নিয়ে তাকায় সামনে দাঁড়ানো মানুষটার।এক কালে কত শাসন করতো অথচ আজ কেন জানি গলা ধরে আসছে।ভেতরে থাকা হাজারটা স্মৃতি এলোমেলো করে দিচ্ছে!
ইরার লাগেজটা উঠিয়ে নিয়ে পাশের স্টীলের বসার সীটের সাথে রেখে বসে পড়ে।
ইরাও এসে বসে চুপ করে।কেউ কথা বলছে না।অথচ ইরা কথা বলতেই থাকতো।কেউ বাঁধা দিলে নখ দিয়ে আঁচড়ে দিতো অথবা কামড় বসাতো।ইরা বদলে গেছে।কিছু মানুষ বদলে গেলে অচেনা হয়।ইরাও কি অচেনা?নাকের ওপর তিলটা পর্যন্ত মেলে আর ইরার উপস্হিতি জানান দিতে তার কড়া পারফিউমই যথেষ্ট!তবু মুহিব আড় চোখে তাকায়।ফ্যাকাসে চেহারার বিধ্ধস্ত পাথরের মত বসে থাকা মেয়েটার সাথে আগের ইরার যেন কোন মিল নেই।
-ইরা চা খাবে?
:চা?আচ্ছা আনতে পাঠাও।
-বাড়ি যাচ্ছো?
:টিকেট আর মিলেছে কই?
-যদি আমার সাথে যেতে বলি !
:না না ! তা কি করে হয়!আমি ঠিক যেতে পারবো।
-জানি যেতে পারবে।তবু অনুরোধ করলে রাখবে?
:অনুরোধ না করাটাই বোধহয় ভালো।
-যাবে?একবার কথা দিয়েছিলে যা চাইবো দিবে।আজ এতটুকুন সময় না হয়!
:আচ্ছা যাবো।
ট্রেনে ছাড়তেই ইরা চোখ বন্ধ করে ফেলে।ট্রেনের শুরুর ঝাঁকুনিতে তার বমিভাব হয়।মুহিব রুমাল এগিয়ে দেয়।রুমাল হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে ইরা।প্রশ্ন করেঃ
-এত বছর রুমালটা আছে।হারানো ছেড়ে দিয়েছো?
:না।সব হারিয়ে ফেলেছিলাম তাই নতুন করে কিছু হারাই না।
প্রসংঙ্গ পাল্টে ফেলতে ইরা বলেঃ
-বৌ বাচ্চা কেমন আছে।
:একজনকে ভালোবাসি,বিয়েটা করা হয়নি।দেখবে?
-না না!দেখাতে হবে না।বাড়ি যাচ্ছো যে ?
:ঠিকানাটা তো ওখানেই।মাকে দেখতে যাচ্ছি।শরীরটা ভালো যাচ্ছে না মায়ের।তা তোমার উনি কোথায়?
খুব সহজ স্বাভাবিক প্রশ্নের উত্তর অনেক সময় জটিল হয়।ইরার কাছে প্রশ্নটার উত্তর নেই।ট্রেন চলছে একই গতিতে।ইরা উত্তর করে না আর মুহিবও দ্বিধায় পড়ে অপরাধবোধে ভোগে।ভাবেঃ
কি দরকার ছিল ?
আসলে জীবনে অনাকাঙ্খিত ঘটনাগুলোই ঘটে বেশি।কয়েক বছর আগে মুহিবকে নিয়ে ইরা পালিয়ে যেতে চেয়েছিলো!মুহিব সারারাত স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলো।গুনে গুনে সাতাশটা সিগারেট খেয়েছিলো।শেষ ট্রেনের দুটো টিকিট কিনেছিলো!
কিন্তু দ্বিতীয় টিকিটের সীটটা ফাঁকা গেছে।জোছনার আলোক ছটা শূন্যস্হানটাকে আলোকিত করে বুঝিয়ে দিচ্ছিলোঃ কারো আসার কথা ছিলো।
প্রকৃতি কি অদ্ভূত নিয়মে চলে ! আজকের জোছনায় ইরা মুহিবের সামনে।মুহিব আজো ইরার হাসিমাখা ছবিটা ওয়ালেটে ভরে রেখেছে।জীবনে ইরার মত বিশেষ মানুষ হয়ে আসে নি কেউ আর।
দুজনের আর একটি কথাও হয় না।ইরা বাচ্চাদের মত দলা পাকিয়ে শুয়ে পড়ে।আর মুহিবের ঠোঁটে থাকে একটা জ্বলন্ত সিগারেট।প্রতিটা শ্বাসে মুহিবের মুখের অস্পষ্ট অবয়ব ভেসে ওঠে।
ইরা বলেঃ
-সিগারেট ছাড়ো নি!
:কেউ তো বারণ করে নি!
-এতটুকু অনুরোধ অন্তত রাখতে পারতে!
:জীবনটায় প্রহসনের নগ্ননৃত্যে অনুরোধ রাখার মত ছোট কাজগুলো পাথর হয়ে চেপেছিলো বুকে।তাই সরিয়ে দিয়েছি।
ইরা একটু পরই ঘুমিয়ে যায়।মুহিবের মনে হয় জোছনায় আঁকা পটে এক অচিনপুরীর রাজকন্যা তার সামনে।কপালের অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিতে ইচ্ছে করে কিন্তু সে অধিকার তার নেই।
দেখতে দেখতে পাহাড়তলীর স্টেশনটা চলে আসে।মুহিব আস্তে করে ডাকেঃ ইরা ! ইরা !
ইরা উঠে বসে।তারপর আস্তে করে নেমে যায়।ট্রেন এখানে পনের মিনিট থামবে।ইরা নামতে গিয়ে পড়ে যেতে ধরে কিন্তু মুহিব ধরে ফেলে।অমনি স্টেশনে দাঁড়ানো ইরাদের প্রতিবেশীদের কেউ একজন বলেঃ
ঈশ স্বামী ছেড়ে এখন অন্য লোকের সাথে ফস্টিনস্টি।সাধে কি আর বউ ফেলে গেছে মানুষটা!সমাজটা রসাতলে গেল !
এতটুকু কথা শুনে অনেক প্রশ্নের উত্তর মুহিবের জানা হয়ে গেলো। ইরা হাত ছাড়িয়ে একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেল ।এদিকে ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছে।মুহিবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে।তবু দৌড়ে গিয়ে ট্রেনটাকেই ধরে আর ট্যাক্সির জানালা দিয়ে তাকানো ইরার মুখটা দেখে ভেতরটা ছল্যাত্ করে উঠে।
মুহিবের চোখ ফেটে কান্না আসে।ইরাকে সে কখনো কাঁদতে দেখেনি।পরের স্টেশনে ট্রেন থামে।মুহিব নামে।এ গ্রামেই আসার কথা কিন্তু এটাই কি তার সত্যিকার গন্তব্য ? নাকি এক স্টেশন আগেই থেমে আছে তার জীবন?
মুহিব ব্যাগ লাগেজ সব ফেলে এগিয়ে যায় টিকিট কাউন্টারের দিকে।
এখনো দেরি হয়ে যায় নি!
এখনো সব কিছু ঠিক হতে পারে!!
দরকার পড়লে ইরার বাড়ির সামনে দিনের পর দিন অপেক্ষা করবে তবু ইরাকে আর হারাতে চায় না মুহিব।জীবন তাকে দ্বিতীয় সুযোগ দিয়েছে।ট্রেনের টিকিট নিয়ে উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে মুহিব।
দুর থেকে ট্রেনের আওয়াজ আসছে।
মুহিব কি শুনতে পাচ্ছে ??
--------------------------------------------------------------------------
বিঃদ্রঃ গল্পটি স্যার হুমায়ুন আহমেদকে উত্সর্গকৃত।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Address
Gulshan Dhaka
Dhaka
1000