Ayaan,s Collection

Ayaan,s Collection

Share

20/06/2026

সকাল থেকেই আজ লাহিড়ী বাড়ির দালানে উলু-শঙ্খর আওয়াজে গমগম করছে। তিন দিন আগে এ বাড়ির ছোট বউ রোমির ছেলে হয়েছে। সেই দিন থেকেই বাড়ি জুড়ে হইহুল্লোড় আর আনন্দ।

আজ সব আত্মীয়-স্বজনরা এসেছে বাড়িতে, কারণ বাড়ির ছোট বউ ছেলে নিয়ে নার্সিংহোম থেকে বাড়ি ফিরছে। তারই তোড়জোড়ের আওয়াজ আজ পাড়ার মোড় থেকে শোনা যাচ্ছে।

লাহিড়ীদের দুই ছেলে, পাড়ার মধ্যে খুব শান্ত এই পরিবার। কোনো চিৎকার, হট্টগোল কিচ্ছু শোনা যায় না এ বাড়িতে। তাই আজ যখন এত জমাটি আয়োজন, পাড়ার প্রত্যেকেই যেন খুব সজাগ আর সচেতন। কান-চোখ যেন পেতেই আছে লাহিড়ী বাড়ির দেওয়ালে।

এরকমই আরেকবার বিশাল আয়োজন হয়েছিল, সেটা বাড়ির বড় ছেলের বিয়েতে। পাড়া-শুদ্ধ লোক তিন দিন ধরে ওখানেই খাওয়াদাওয়া করেছিল। লাহিড়ী বাড়ির কর্তা নিজে দেখে বড় বউকে এনেছিলেন। অপূর্ব সুন্দরী এ বাড়ির বড় ছেলের বউ। কত খুশি ছিল লাহিড়ীরা সেদিন।

বড়জনের বিয়ে খুব ধুমধাম করে হলেও ছোটজনেরটা হয়নি, কারণ সে নিজের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করেছে। লাহিড়ী কর্তার মনমতো কিছুই হয়নি ছোটটার ক্ষেত্রে, তাই তার বিয়েটা আর ধুমধাম করে হয়নি। ছোটখাটো একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠান করে ছোট বউ এ বাড়িতে এসেছিল। প্রথমে না মানলেও পরে সবাই মেনেও নিয়েছিল ছোট বউকে। কিন্তু তা হলেও বড় বউ যেন সবার চোখের মণি। রূপ আর বুদ্ধির জোরে সবার প্রিয় ছিল বাড়ির বড় বউ।

আজ ঘুঁটির চাল ঘুরে গেছে। এখন ছোট বউ সকলের নয়নের মণি। পাঁচ বছর হলো বড় ছেলের বিয়ে হয়েছে, কিন্তু ওরা আজও নিঃসন্তান। ডাক্তার সেরকম কোনো আশাও দেখায়নি। ওদের পরে বিয়ে হয়ে ছোট বউ আজ কোল আলো করে বাড়ি এলো।

ছোট বউ যখন ছেলেকে বুকে জাপটে ঢুকছে, দূর থেকে বড় বউ ললিতা দেখছে সে দৃশ্য। দূর থেকে দেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই, কারণ কোনো নিয়মকাজে ওর যাওয়া বারণ।
"কিগো বড় বউ, তোমারটা কবে হবে? তোমাকে কবে এরকম আশীর্বাদ করবো?" — ছোট বউ আর ওর ছেলের মাথায় ধান-দুর্বোটা ঠেকিয়েই বলল ললিতা আর রোমির মাসি-শাশুড়ি।

কথাখানা সবার মাঝে পড়ার আগেই তুলে নিলেন ললিতার শাশুড়ি, মানে লাহিড়ী গিন্নি। সবার সামনেই বললেন, "এ জন্মে আর হবে না।"
লাজে রাঙা হয়ে গেল বড়োর মুখখানা। সুন্দর সাদা মুখখানা যেন লাল হয়ে গেল। মাথা নিচু করে এক কোণে দাঁড়িয়ে মনে পড়ল ললিতার— আজ থেকে পাঁচ বছর আগে যখন বিয়ে হয়ে আসে ললিতা, এই লাহিড়ী গিন্নিই এই দালানে দাঁড়িয়েই কত প্রশংসা করেছিলেন ওর রূপের।

আর এই মাসি-শাশুড়ি আর অন্যরাও যেন মুগ্ধ চোখে দেখেছিল বড় বউকে সেদিন। আর সেদিনও লাজে রাঙা হয়ে গিয়েছিল এই মুখ। নিজের রূপের এত প্রশংসা শুনে যেন সেদিনও সুন্দর সাদা মুখখানা লাল হয়ে গিয়েছিল ললিতার।

দুই দিনের দুই লাল হয়ে যাওয়া মুখের কী বিস্তর ফারাক। ভালো লাগা, লজ্জা আর অভিমান— সবেতেই ললিতা লাজে রাঙা।

শাশুড়ির কথার পরে ঘরটা পুরো শান্ত হয়ে গিয়েছিল। সেই নিঃশব্দতা ভাঙানোর দায়িত্ব ললিতারই। তাই বলল,
"না হোক বাচ্চা, আমিও মা হবো। খুব শিগগির। আমি একটা ছোট্ট পরী আনবো। কথা বলে এসেছি হোমে। রোমির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। ওর ছেলে হয়েছে, তাই আমি মেয়ে আনবো। ভাই-বোন খেলে বেড়াবে লাহিড়ী বাড়ির উঠোনে। আসবেন কিন্তু মাসি, সেদিন আমার মেয়েকে আর আমাকে আশীর্বাদ করতে, আজকের মতো।"

চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলার সময় ললিতার সাদা মুখটা আবার লাল হয়ে গেল। তবে এটা লাজে নয়, আত্মবিশ্বাসে, আত্মসম্মানে।
লাল রংটাই যে এমন, মনের সব অনুভূতিগুলো বহন করে। ❤️

গল্প: লাজে_রাঙা
লিখেছেন: অনিন্দিতা_মুখার্জী_সাহা

গল্প কালেক্টেড

18/06/2026

যার বিশ্বাস ভঙ্গ করার বা ‘প্রতারণা’ করার মানসিকতা থাকে, তাকে আপনি এক আকাশ ভালোবাসা কিংবা পাহাড় সমান বিশ্বাস দিয়েও ফেরাতে পারবেন না। আপনি তাকে পাহারা দিয়ে রাখতে পারবেন, কিন্তু তার নিয়ত বদলাতে পারবেন না। কেউ কখনো ভুল করে অন্য কারো বিশ্বাসের অমর্যাদা করে না; তারা একদম জেনে-শুনে, পরিকল্পনা করেই এই কাজটা করে।

প্রকৃতপক্ষে, যে আপনাকে ভালোবাসে তাকে শাসন করতে হয় না, আর যে আপনাকে ঠকায় তাকে চোখে চোখে রেখে পরিবর্তন করা যায় না। তাই কারো পেছনে গোয়েন্দাগিরি করে নিজের মানসিক শান্তি নষ্ট করার চেয়ে, নিজের ব্যক্তিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া অনেক বেশি জরুরি। যে আপনার হওয়ার, সে হাজারো ভিড়ের মাঝেও আপনারই থাকবে; আর যার যাওয়ার, সে অজুহাত দিয়ে হলেও পথ বদলে ফেলবে॥

17/06/2026

অনীক বাসায় ফিরে দেখল ড্রয়িংরুমের আলো নেভানো। কেবল রান্নাঘর থেকে একটা হালকা হলুদ আভা আসছে। অনীকের অভ্যস্ত চোখ বলছে আজ বাসায় ঠান্ডা লড়াই চলছে। সাধারণত এই সময়ে রাইসা ল্যাপটপ নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে থাকে আর তাদের চার বছরের ছেলে আরিয়ান ওর পাশে বসে ড্রয়িং করে। আজ কেউ নেই।

​জুতো খুলে অনীক রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। সুফিয়া বেগম একা বসে সবজি কাটছেন। অনীক জিজ্ঞেস করল, -মা, রাইসা কোথায়?

​মা মুখ না তুলেই বললেন,
-জানি না বাপু। অযথাই চেঁচামেচি করতে করতে রুমে গিয়ে দরজা দিল। আরিয়ানকেও সাথে নিয়ে গেছে। নিজের ছেলের বউয়ের মেজাজ দেখা লাগে, আমার কপাল।

পেশায় আর্কিটেক্ট ​অনীক বুঝল রাইসার অফিসের প্রজেক্ট সাবমিশনের সময় বোধ হয় কাছাকাছি। আর মা নিশ্চয়ই ঘরের কোন কাজের কথা তাকে বলেছে। সে নিজেদের রুমের দিকে গেল। দরজা ভেতর থেকে লক করা। ধাক্কা দিতেই রাইসা দরজা খুলল। উস্কোখুস্কো চুল, চোখে চশমা। আরিয়ান খাটের এক কোণে ড্রয়িং খাতা আর একগাদা রং পেন্সিল নিয়ে বসে আছে।

​রাইসা ধরা গলায় বলল,
-অনীক, আমি আজকে ডিনার বানাতে পারিনি। মাকে বলো মরিয়ম খালার হাতে করা কিছু একটা খেয়ে নিতে।

​অনীক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-রাইসা, মা তো সারাদিন বাসায় একলা থাকেন। ওনার শরীরটাও ভালো না। তুমি যদি একটু আগে থেকে গুছিয়ে রাখতে...

​রাইসা ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ না তুলেই শান্ত স্বরে বলল,
-আমি ভোর ছয়টায় উঠে আরিয়ানের টিফিন বানিয়েছি, ওকে স্কুলে পাঠিয়েছি, তারপর নিজের আট ঘণ্টার শিফট শেষ করে বাসায় এসেছি। এর মাঝেও যদি রান্নাটা আমারই বাধ্যতামূলক ডিউটি হয়, তবে আমাকে একটু বলো,তোমার ডিউটি কোনটা?

​অনীক চুপ করে গেল। এই প্রশ্নের উত্তর ওর জানা নেই।

​দিনের পর দিন পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করল। রাইসা একটি নামী মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে লিড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে প্রমোশন পেয়েছে। কাজের চাপ বেড়েছে বহুগুণ। অন্যদিকে সুফিয়া বেগমের অভিযোগের ঝুলিও ভারী হয়েছে।

​সুফিয়া বেগম একদিন ডাইনিং টেবিলে বসে অনীককে শুনিয়ে শুনিয়ে অনীকের বড় বোন ফারহানার সাথে ফোনে বলছিলেন,
-বুঝলি ফারহানা, আমাদের সময় আমরা কি কাজ করিনি? স্কুল মাস্টারি করেছি, আবার দশ জনের রান্নাও সামলেছি। আর এখনকার মেয়েদের একটা ল্যাপটপ পেলেই দুনিয়া উদ্ধার হয়ে যায়। বাচ্চাটা তো মোবাইল আর ট্যাবের সাথেই মানুষ হচ্ছে।

​রাইসা পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, ও থামল। সুফিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,
-মা, আরিয়ানকে আমি মোবাইল দেই না। কিন্তু আপনারা যখন সারাদিন ওকে নিয়ে টিভির সামনে বসে থাকেন, তখন কি ওর মেধা বাড়ে? আমি তো চাই ও খেলতে শিখুক। কিন্তু আপনারা তো ওকে সারাক্ষণ আগলে রেখে জেদি বানিয়ে ফেলছেন।

​সুফিয়া বেগম ফোনটা দপ করে রেখে বললেন,
-ও আচ্ছা! এখন দোষ আমার? আমি ওর দাদি, আমি ওকে আদর করব না তো কে করবে? তুমি তো সারাদিন কোডিং আর মিটিং নিয়ে আছ। মা হতে গেলে সারাদিন ক্যারিয়ার ক্যারিয়ার করে মুখে ফেনা তুলে হয় না।

​রাইসা অনীকের দিকে তাকাল। অনীক চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছিলো। ওর কাছ থেকে কোন উত্তর আসবে না বুঝে রাইসা নিজেই বললো,
-ঠিক বলেছেন। ফারহানা আপুও তো এই ক্যারিয়ারের পেছনেই ছুটছে। নয়তো আমার আগে বিয়ে করেও এখনো মা হওয়াটাকে একদম পেছন দিকের প্রায়োরিটি লিস্টে রাখতেন না। বলে রাইসা গটগট করে চলে গেল। অনীকের ভ্রু কুঁচকে গেল। এতক্ষণ সে বধির ছিল কিন্তু রাইসা কথাগুলো বলার সময় তার কান পুরোপুরি সজাগ।

কিছুদিন পর একটা বড় প্রজেক্ট হাতে পেয়ে রাইসা দারুন খুশি। সে ঠিক করল এখন কাজে একটু বেশি সময় দেবে। প্রজেক্টটা সফল হলে ও বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবে।

ও অনীককে খুব করে বুঝিয়ে বলল,
-অনীক, এই তিনটে মাস আমাকে একটু সাপোর্ট করো। আরিয়ানকে বিকেলবেলা একটু সময় দিও আর মাকে বুঝিয়ে বলো যাতে তুচ্ছ বিষয়ে অশান্তি না করেন।

​অনীক ল্যাপটপ বন্ধ করে বলল,
-দেখো রাইসা, আমি আমার কাজ ফেলে আরিয়ানকে সময় দিতে পারব না। আমার নতুন সাইট ভিজিট শুরু হয়েছে। তুমি বরং এই প্রজেক্টটা না নিলেই পারো। আমাদের তো টাকার অভাব নেই।

​রাইসা বিদ্রূপের হাসি হাসল।
-টাকা! অনীক, তুমি কি এখনো ভাবো আমি টাকার জন্য কাজ করি? আমার একটা নিজস্ব সত্তা আছে, একটা মেধা আছে। সেটাকে ঘরে বসিয়ে পচিয়ে ফেলার জন্য আমি পড়াশোনা করিনি। আমার বাবার যথেষ্ট টাকা আছে যার একমাত্র উত্তরাধিকার আমি।

​-শান্তি চাই রাইসা, ঘরে ফিরলে শুধু শান্তি চাই। তোমার এই ক্যারিয়ারের নেশায় ঘরটা নরক হয়ে যাচ্ছে। অনীকের কণ্ঠস্বর এবার কঠিন।

-বিয়ের আগে তবে এত প্রতিশ্রুতি কেন দিয়েছিলে?তখন বললেই পারতে, আমি বিয়েটা ক্যানসেল করে দিতাম। তুমি তোমার পছন্দমত মেয়ে খুঁজে নিতে। এই দেশে তো হাউজ ওয়াইফ হবার মতো মেন্টালিটির মেয়ের অভাব পড়ে নি।

অনিক নিরুত্তর।

​রাইসাও আর কথা বাড়াল না। ও বুঝল, অনীক আসলে রাইসার সাফল্যকে ভয় পায়।

​অফিসের চাপে রাইসা যখন পিষ্ট, তখন একদিন খবর পেল আরিয়ান স্কুল থেকে ফেরেনি। ওর বুক কেঁপে উঠল। বাসায় ফোন দিতেই মা বললেন,
-ও তো বাসায় চলে এসেছে। ফারহানা ওকে নিয়ে পার্কে গিয়েছে।

​রাইসা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বাসায় গেল। ফারহানা ওকে না জানিয়ে আরিয়ানকে নিয়ে বেরিয়েছে। ফারহানা বাসায় আসতেই রাইসা বলল,
-আপা, আপনি আরিয়ানকে নিয়ে যাওয়ার আগে আমাকে একটা ফোন দিতে পারতেন না?

​ফারহানা চোখ মুখ শক্ত করে বললো,
-কেন ফোন দিতে হবে? নিজের ভাতিজাকে নিয়ে বের হতেও এখন পারমিশন লাগবে? সে আমাদের রক্ত। তুমি কোথাকার কে? উড়ে এসে জুড়ে বসা মেয়ে।

অনীক নিজেও বাসায় চলে এসেছিল। পুরো সময় সে চুপ। রাইসার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সে প্রায় চিৎকার করে বললো,
-আমি উড়ে এসে জুড়ে বসা মেয়ে না, আমি আরিয়ানের মা। ওকে আমি জন্ম দিয়েছি। ওর নিরাপত্তা নিয়ে যদি সবচেয়ে বেশি কেউ চিন্তা করে থাকে সে আমি।

-চুপ করো। চিৎকার করে অনীক। রোজ রোজ এই অশান্তি আর ভালো লাগে না। ছেলের নিরাপত্তার এতই যখন চিন্তা, তখন চাকরি ছেড়ে বাসায় বসে থাকো না কেন? কেউ তো তোমাকে মাথার দিব্যি দেয়নি বাইরে যাওয়ার।

রাইসা চুপ হয়ে গেল। তার বোন যে কাজটা করেছে তা যে একেবারেই সঠিক না সাথে রাইসার দুঃশ্চিন্তা যে অমূলক না সেটা কি অনীক বোঝে না? অনীক কি দেখে নি যে এইমাত্র তাকে বাইরের মেয়ে বলা হয়েছে?

​সেই রাতে রাইসা অনীকের আলমারি থেকে একটা ফাইল বের করল। ওর জমানো সব টাকা আর গয়নার রসিদ সেখানে ছিল। ও অনীককে জিজ্ঞেস করল,
-অনীক, আমাদের জয়েন্ট অ্যাকাউন্টে আমার যে বোনাসের টাকাটা ছিল, সেটা দিয়ে তুমি তোমার নতুন গাড়ি কিনলে আমাকে না জানিয়েই?

​অনীক নির্লিপ্তভাবে বলল,
-দুজনের টাকা কি আলাদা? গাড়িটা তো আমাদের সবার জন্যই কেনা হয়েছে।

-নাহ, কিন্তু আমি এখনো আমার বাবার দেয়া গাড়িটাতে চড়েই অফিসে যাই। তোমার ওই নতুন গাড়িতে ওঠার সৌভাগ্য আমার এখনো হয়নি।

-খোঁটা দিচ্ছ মনে হয়? অনীক একটু রাগান্বিত হয়ে বলে।

​রাইসা চুপ হয়ে গেল। সে বুঝল, এই সংসারে তার শ্রমের মূল্য আছে, তার আয়ের মূল্য আছে, কিন্তু সম্মতির কোনো মূল্য নেই। ও একটা পাখির মতো, যার দানাপানি দেওয়ার দায়িত্ব সবাই নিয়েছে, কিন্তু ডানা মেলার স্বাধীনতা কেউ দেয়নি।

​রাইসা প্রজেক্টটা শেষ করল এবং সেরা পারফরমার হিসেবে নির্বাচিত হলো। কোম্পানি ওকে সিঙ্গাপুরে তিন বছরের জন্য বদলি হওয়ার প্রস্তাব দিল। রাইসা জানত এই প্রস্তাব বাসায় তোলা মানেই বিস্ফোরণ।

​সেদিন রাতে ও ডাইনিং টেবিলে সবার সামনে ড্রপ লেটার নয়, বরং একটা লিগ্যাল পেপার রাখল।

​সুফিয়া বেগম চশমা ঠিক করে বললেন,
-এটা কি? আমার ছেলেকে ডিভোর্স দিচ্ছো নাকি?

​রাইসা শান্ত গলায় বলল,
-না মা। এটা বিচ্ছেদের নোটিশ নয়, বরং আমাদের এই ফ্ল্যাটটা বিক্রির আইনি নোটিশ।

​অনীক লাফিয়ে উঠল।
-কি বলছ রাইসা? এই ফ্ল্যাট আমার বাবার কেনা।

​রাইসা হাসল।
-না অনীক। তোমার বাবার করা পুরনো বাড়িটা ডেভেলপারকে দেওয়ার সময় তুমি যখন ফান্ডের অভাবে পড়েছিলে, তখন আমার বাবার দেওয়া পাঁচ কাঠা জমি বিক্রি করে আমি তোমাকে টাকা দিয়েছিলাম এই ফ্ল্যাটটা পাওয়ার জন্য। ফ্ল্যাটের দলিলে নামটা খেয়াল করেছ কোনোদিন? এটা শুধু আমার নামে।

​অনীক এবং সুফিয়া বেগম পাথরের মতো জমে গেলেন। রাইসা বলে চলল,
-আমি গত পাঁচ বছর ধরে তোমাদের নিঃশব্দ অবহেলা সহ্য করেছি। আমি ঘর চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমরা আমাকে একটা ডিউটি চার্ট দিয়েছিলে। আমি ক্যারিয়ার গড়তে চেয়েছি, তোমরা আমাকে অযথাই কথা শুনিয়েছো। এখন আমি আমার অফিস থেকে সিঙ্গাপুর যাচ্ছি। আরিয়ান আমার সাথেই যাবে। আমার সব কথা শোনার পরে আমার অফিসের বস মেহেরুন ম্যাডাম আরিয়ান কে আমার সাথে নিয়ে যাওয়ার পারমিশন দিয়েছেন।

​সুফিয়া বেগম আর্তনাদ করে বললেন,
-তুমি আমার নাতিকে নিয়ে যেতে পারো না।

​-মা, আরিয়ানকে আমি সেই মহিলার কাছে রেখে যেতে পারি না, যিনি তার মাকে কাজের মেয়ে মনে করেন। অনীক, তুমি তোমার নতুন গাড়িতে করে সাইট ভিজিট করতেই পারো কিন্তু এই ফ্ল্যাটটা তোমাকে আগামী এক মাসের মধ্যে খালি করতে হবে। আমি এটা ভাড়া দিয়ে দিচ্ছি।

​অনীক রাইসার দিকে তাকিয়ে রইল। ও কোনোদিন ভাবেনি রাইসা আইনি মারপ্যাঁচে এত শক্তিশালী হতে পারে। রাইসা ব্যাগ গুছিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

​দরজা খোলার সময় ও অনীকের দিকে তাকিয়ে বলল, -অনীক, তুমি বলেছিলে না,ঘরে ফিরলে শান্তি চাও? এখন থেকে তুমি শান্তিতেই থাকবে। কারণ এই কাঁচঘেরা বন্দিশালায় চিৎকার করার মতো কেউ আর থাকল না। এই সংসারে এখন কোন উড়ে আসা জুড়ে মেয়ে নিজের অধিকারের জন্য চিৎকার করবে না।

​রাইসা আরিয়ানকে নিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল। অনীক অন্ধকারের মাঝে সোফায় বসে রইল। দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দটা এবার ওর কাছে কামানের গোলার মতো মনে হতে লাগল। যে নিস্তব্ধতা ও চেয়েছিল, আজ সেই নিস্তব্ধতাই ওকে গিলে ফেলছে।


#নিস্তব্ধতা
কলমে: সুবর্না শারমিন নিশী

16/06/2026

আমি সেই অল্প কিছু মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ যারা সত্যিই আমাকে সমর্থন করে এবং আমার পাশে থাকে। তাদের উপস্থিতি আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমি জীবনে নিশ্চয়ই কিছু একটা ঠিক করেছি। এমন এক পৃথিবীতে যেখানে অনেক কিছুই বদলে যায়, তাদের এই আনুগত্য আশীর্বাদের মতো মনে হয়। কিছু সম্পর্ক সবকিছু বয়ে বেড়ানোকে একটু সহজ করে তোলে।

Want your business to be the top-listed Media Company in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Telephone

Website

Address


Dhaka
1211