Lore
31/03/2024
অমানুষ মনে হয় নিজেকে!
বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, জাপান। অথচ, তাদের চেয়ে বেশি খাবার অপচয় করি আমরা! যুক্তরাষ্ট্রে একজন ব্যক্তি বছরে ৭৩ কেজি খাবার অপচয় করে, যেখানে প্রত্যেক বাংলাদেশি বছরে অপচয় করে ৮২ কেজি খাবার। ভাবা যায়? দেশের সবাই মিলে অপচয় করেছি ১ কোটি ৪১ লাখ টন খাবার! যখন দেশের আনাচে কানাচে লাখ লাখ শিশু অভুক্ত অবস্থায় রাতে ঘুমাতে যায়, তিন বেলা ডাল-ভাত খাওয়ার জন্য একজন গৃহকর্মী ভোর থেকে রাত অবধি মানুষের বাসায় টানা কাজ করে, তখন ফুটানি দেখাতে গিয়ে আমরা লাখ লাখ মানুষের খাবার ডাস্টবিনে ফেলছি! যদিও অপচয় করার মতো খাবার দেশের অধিকাংশ মানুষের হাতেই থাকে না। অর্থাৎ, যারা অপচয় করে তাদের কেউ কেউ ২০০-৫০০ কেজি খাবার অপচয় করছে বছরে।
অবাক করা বিষয়- যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়ার মতো উন্নত দেশগুলোর চেয়ে বেশি খাবার অপচয় করি আমরা! ফুটানি দেখাতে গিয়ে আমাদের মতো ফকিন্নিরা আজীবন ফকিন্নিই থেকে যাচ্ছি। এক মুঠ ধান গোলায় তুলতে টানা চার-পাঁচ মাস অমানুষিক পরিশ্রম করে একজন কৃষক। কম দামের কারণে সেই ধান বিক্রি করে চলে না সংসার। আর আমরা শিক্ষিত দাবিদার অমানুষরা অবলিলায় সেই ফসল থেকে উৎপাদিত খাবার অপচয় করি। এজন্য শ্রেণিভেদে খাবারের দামে পার্থক্য থাকা উচিত। রাজধানীর একটা বাফেট রেস্টুরেন্টে দেখলাম, খাবার অপচয় করলে জরিমানার সাইনবোর্ড সাটিয়ে দিয়েছে। ভালো লেগেছে। অনেক ধনীদের সেখানে দেখলাম, তবে খাবার অপচয় কম ছিল।
গত কয়েকদিন বিভিন্ন ইফতার পার্টিতে গিয়েও প্রচুর খাবার অপচয় হতে দেখলাম। আলেমদের প্রশ্ন করেছি এটা নিয়ে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অপচয় ইসলাম কখনোই সমর্থন করে না। এজন্য অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই (বোনও হতে পারে) বলেও উল্লেখ আছে। আর রমজান সংযমের মাস। কম খেয়ে টাকা বাঁচাবেন, দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করবেন। অপচয়ের তো প্রশ্নই ওঠে না। অথচ, ১০ টাকা ভিক্ষা দিতে গেলে আমরা ৭০ বছরের বৃদ্ধকে ১০টা প্রশ্ন করি। অন্যদিকে অনায়াসে ডিনারসহ ইফতার পার্টিতে যোগ দিতে এক-দেড় হাজার টাকা দিয়ে দেই। কারণ, ওখানে ছবি তোলার বিষয় আছে। বড়লোকি দেখানোর বিষয় আছে। কে কত দামি জায়গায় ইফতার করতে পারলাম, সেটা দেখানোর বিষয় আছে। ফেসবুকটা না থাকলে এটা বোধহয় কিছুটা কমতো।
শুধু ইফতার নয়, বছরজুড়ে খাবার অপচয় হচ্ছে। জাতিসংঘের ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট-২০২৪ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী বেশিরভাগ খাবারই অপচয় হচ্ছে বাসাবাড়িতে। এটা আমিও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। কারণ, আমাদের বাসার বাইরে রাখা ময়লার ড্রামে প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ জনের খাবার ফেলা হয়। আপনার টাকা আছে, তাই আপনি দুপুরে যে খাবার রান্না করছেন, রাতে সেটা আর খাচ্ছেন না। তাহলে কম রান্না করুন। তিন দিন ফ্রিজে রেখে যে খাবারটা ফেলে দিচ্ছেন, তাতে অন্য কোনো পরিবারের সারাদিনের খাবার হয়ে যেতো।
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে ১০০ কোটি টনের বেশি খাবার অপচয় হয়েছে বিশ্বজুড়ে, যা বাজারে আসা উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। যত খাদ্য অপচয় হয়েছে তার ৬০ ভাগই বাসাবাড়িতে হয়েছে। ওই সময়ে বাংলাদেশের খাদ্য অপচয়ের প্রবণতা ছিলো ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। বাসাবাড়িতে এক ব্যক্তি বছরে গড়ে ভারতে ৫৫ কেজি, যুক্তরাজ্যে ৭৬ কেজি, যুক্তরাষ্ট্রে ৭৩ কেজি ও রাশিয়ায় ৩৩ কেজি খাবার অপচয় করেছে । আর বাংলাদেশে প্রতি ব্যক্তি অপচয় করেছে ৮২ কেজি।খাবারের সবচেয়ে বেশি অপচয় হয়েছে মালদ্বীপে ২০৭ কেজি আর সবচেয়ে কম হয়েছে মঙ্গোলিয়ায় ১৮ কেজি। এই যে ১০০ কোটি টন খাবার নষ্ট হলো, সেটা উৎপাদন করতে কত কোটি কৃষকের কী পরিমান শ্রম ছিল ভাবতে পারেন?
এলাকার দোকানদার বললো- ‘‘কোনো কিছুর দাম যখন কমে, তখন ক্রেতা আরো কমার আশায় কম কেনে। যখন দাম বাড়ে তখন আরো বাড়ার ভয়ে বেশি কিনে নিয়ে যায়।’’ ক্রেতার এই সাইকোলজিটাই মাঝেমধ্যে কাজে লাগিয়ে একটু মুনাফা করে সিন্ডিকেটেড ব্যবসায়ীরা।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Website
Address
Dhaka
1229