HouSe CollaPus
21/11/2025
And our eyes they keep on strainin'
As if to see what lies behind them
Through the shells of empty buildings and great columns of glass.
They say you don't look
They say you don't look cause it'll disappear
24/09/2024
পৃথিবীর সবচেয়ে শাদা পূর্ণিমা হয় শরৎকালে। রূপালী আলো দেখতে আসে চন্দ্রাহত ইলিশ জুটি। সেই আলো মেখেই তাদের শরীর এত ঝলমলে হয়। চাঁদ উঠলেই তাই জেলেদের মুখেও রূপালী হাসি ফোটে। ইলিশ বিয়ানো জোছনায় তারা জাল ছড়ায় সাগরে।
হারভেস্ট মুন বা ফসল তোলার চাঁদ— শারদ শশীকে এসব নামেই বেশি চেনে মানুষ। অন্য সব পূর্ণ চন্দ্রের সাথে এর বেশ পার্থক্য আছে। এই চাঁদ উত্তর গোলার্ধের মানুষকে বলে— ‘শীত আসছে। কন্যাকে ছেড়ে তুলায় সংক্রমিত হচ্ছেন সূর্য। রাত বড় হচ্ছে। গ্রীষ্মের ফসল ঘরে তোলো। শীতের সঞ্চয় করো। লেপ–কাঁথা রোদে দাও।’
একটা কাঁচা ডিমকে মসৃণ তলের ওপর সোজা দাঁড় করাতে পারলে সৌভাগ্য লাভ হয়। বছরে দুই বার ডিম দাঁড় করানোর খেলা হয় চীনে। দ্বিতীয়বার, শরৎকালে। চীনা চান্দ্র পঞ্জিকার ষোড়শ সৌরপদ— ‘ছিউফেন’। ডিম দাঁড় করানোর উত্তম সময়। জলবিষুবের প্রথম দিনে দক্ষিণ চীনের মানুষ দল বেঁধে ছিউছাই ফুল তুলতে যান। মাছের সঙ্গে ফুল মিশিয়ে হয় ‘ছিউথাং’ স্যুপ। খেলে যকৃৎ ও অন্ত্র ভালো থাকে। ক্রিসেনন্থিমাম বা চন্দ্রমল্লিকাও ফোটে এই সময়ে।
পৃথিবীর মাঝ বরাবর কল্পিত বিষুব রেখাটি একে উত্তর ও দক্ষিণ দুই গোলার্ধে ভাগ করেছে। আমরা উত্তর গোলার্ধের বাসিন্দা। বছরে দুইবার সূর্যের আলো একদম লম্বভাবে এই বিষুবরেখার দুটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে পড়লে দিন রাত সমান হয়। একবার উত্তরায়ণে, যখন সূর্য নিজ কক্ষপথে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে। উত্তর গোলার্ধে তখন বসন্তকাল, তারপর দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ে, গরমকাল আসন্ন, নতুন বছর শুরু হয় নানান জাতির। সেটা বসন্ত বিষুব বা মহাবিষুব। আরেকবার দক্ষিণায়নে, যখন সূর্য তুলা রাশিতে সংক্রমিত হয়। উত্তর গোলার্ধে তখন শরৎকাল, দিন ছোট হবে ক্রমশ, শীতকাল আসন্ন। এর নাম জলবিষুব বা শারদ বিষুব (অটাম ইকুয়েনক্স)।
সূর্যের আলো লম্বভাবে পড়াকে বলা হয় সৌরপদ। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ এই সৌরপদ অনুসারে নিজেদের জীবনযাপন ও কৃষিকাজ করছে, খাবার ও পোশাকে পরিবর্তন আনছে। সূর্যের আলো অনুসারে এটাই সহাবস্থানের শিক্ষা। আলোর এই হিসাবই পৃথিবীর সকল সমাজের লোকজ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠানের ভিত্তি।
চীনা দর্শনে বলা হয়, বিশ্বে দুই ধরনের শক্তি বিরাজ করে। ইন— নেতিবাচক ও নিষ্ক্রিয় এবং ইয়াং— ইতিবাচক ও সক্রিয়। প্রাচীন গ্রন্থ— The Detailed Records of the Spring and Autumn Period বলছে— জলবিষুবে ‘ইন’ ও ‘ইয়াং’ এর ভারসাম্য বিরাজ করে। দিন ও রাত সমান হয়, শীত ও গরম থাকে সমান। জাপানী ও চীনারা জানেন— ঠিক এই সময় কাঁকড়া খেতে সবচেয়ে মজা। হয়তো কাঁকড়ারাও জানে এটাই ধরা দেওয়ার সময়।
সেই বছর একে একে দশটা সূর্য উঠেছিল। রোদে পুড়ে খাঁক হয়ে যাচ্ছিল মানুষ আর মাঠের ফসল। তখন হৌয়ি— বিখ্যাত তীরন্দাজ, তীরের আঘাতে নয়টা সূর্য ডুবিয়ে দেয়। গ্রামের লোক প্রাণে বেঁচে তাকেই রাজা ঘোষণা করে। সবাই তাকে ত্রাণকর্তা ভাবত। কিন্তু ধীরে ধীরে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে হৌয়ি। মানুষের আনুগত্য তাকে জুলুমবাজ করে তোলে। এর মধ্যে আবার গ্রামদেবীকে সন্তুষ্ট করে অমৃত বর পায় সে। রাজা হৌয়ির বউ চাঙয়ি, খবর পেয়ে ভাবে— এখনই এত অত্যাচার করছে অমরত্ব পেলে না জানি কী করবে। তাই সে চুরি করে অমৃত খেয়ে ফেলে। এই খবর পেয়ে হৌয়ি তাড়া করে তাকে। তীর ছোঁড়ার সাথে সাথেই চাঙয়ি আকাশে উড়ে চলে যায় চাঁদের খরগোশের কাছে। ধবধবে সাদা ওই খরগোশ যখন লেজ–কান গুটিয়ে ঘুমায় তখনই গোল সাদা পূর্ণিমা দেখা যায় পৃথিবী থেকে।
এক সময় গ্রামের লোক জানতে পারে তাদেরকে বাঁচানোর জন্যই চাঙয়িকে চাঁদে চলে যেতে হয়েছে। তাই প্রতি শরতে যখন সবচেয়ে শাদা পূর্ণিমা হয় তারা চেঙয়ির জন্য গোল মুনকেক উৎসর্গ করে। খায় আর আনন্দ করে। বাংলা ভাষায় চাঁদের আরেক নাম শশধর। শশ মানে খরগোশ। চাঁদের খরগোশ আর দেবী চাঙয়ির জন্য সেই চৌ রাজবংশ আমল থেকে মুনকেক উৎসর্গ করার প্রথা চলে আসছে।
এখন থেকে ইরান, আফগানিস্তানে শুরু হবে আনারের চাষ। ইরানী ভাষায় মেহের শব্দের অর্থ তুলা। মেহেরগান— তুলা রাশিতে সূর্য সংক্রমণের উৎসব। প্রাচীন পারস্যে মেহেরগান বা জশন-ই-মেহর শুধু ফসল কাটার নয় বরং রাজকর আদায়েরও সময়। পারস্য সাম্রাজ্যের প্রজারা রাজার জন্য উপহার নিয়ে আসত এই সময়। রেওয়াজ ছিল যদি দাতার পরবর্তীকালে অর্থের প্রয়োজন হয়, তাহলে রাজকোষাগার উপহারের দ্বিগুণ ফেরত দেবে। মেহেরগানের সময় রাজা একটি পশমের পোশাক পরতেন এবং তার গ্রীষ্মের পোশাক দান করে দিতেন। সাসানিয়ান সাম্রাজ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব ছিল এই জশন-ই-মেহর। জলবিষুবের সময় ইয়াজাতাদের (উপাস্য) মধ্যে মিথ্রাকে বিশেষ সম্মান জানানো হয়। তিনিই শক্তির সঙ্গে সম্প্রীতির মেলবন্ধন ঘটান।
মহাবিষুব আর জলবিষুবের দিন দুপুরবেলা মায়ান পিরামিডের ওপর সূর্যের আলোতে তৈরি হয় ছায়ার লেজ। সারা বছর কেবল মাথা নিয়ে বসে থাকা কুকুলকান মূর্তি পেছনের সিঁড়িতে খাঁজকাটা সর্পিল শরীর ফিরে পায়। বছরে মাত্র দু বার। কাঠপাহাতরু— দৈব্য গাছ। তামিল ভাষায় তালগাছের এই নাম। এই দৈব্য ফলও পাকে শরৎকালে। ভাদ্র মাসে খাওয়া চাই তাল। নইলে পরে জুটবে নাকো অন্ন-নুন–ডাল।
শরৎকালেই তাঁতীরা পালন করেন বিশকরম ব্রত আর ভারতবর্ষে হয় বিশ্বকর্মা পূজা। দিন ছোট হয়েছে। আলো কম তাই কৃষিরও গতি কমেছে। হাতের কাজ, কারিগরি আর কুটির শিল্পের সবচেয়ে ভালো সময় এখন। সময়ের শুরুতেই তাই কারিগরের দেবতা বিশ্বকর্মার পূজা করে নিতে হয়। সাতক্ষীরায় শরৎকালে হয় গুড়পুকুরের মেলা। তাতে বিধবা নারীরা বেহুলার গান করে প্রণামি নেন। বরিশাল-কুয়াকাটা-খুলনা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে চলে মনসা বন্দনা। চট্টগ্রাম বন্দর এলাকার জেলেরা এ দিন কবিগান করেন। তার নাম পাল্টামনসা। টাঙ্গাইল-জামালপুরে হয় ওঝাদের ভাসান গান। সিলেট-মৌলভীবাজার-রাঙামাটি-বান্দরবানের চা বাগানে চলে বিষহরি বন্দনা।
মহিষের শিঙের বাঁশিতে আচ্ছিক মান্দি আর মান্দিরা মেঘালয় থেকে মধুপুর অবধি জুড়ে যায় শারদ বিষুবে। গ্রীষ্মের ফসল তোলার পর ‘মিশি শালজঙ’ কে কৃতজ্ঞতা জানাতে তিন দিনের ওয়ান্না বা ওয়ানগালা পালন করে গারো আদিবাসীরা। ওঁরাও, সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল, কড়া—এসব আদিবাসীদের গ্রামে এখন চলছে ভাদুই আর কারাম ব্রত। প্রবীণ কারাম বৃক্ষকে সাক্ষী রেখে সহস্র বছরের বিবর্তনশীল সামাজিক জ্ঞানধারা মাদলের বাদ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ছে।
শরৎকালে আউশ ধান কাটতে কিষাণিরা গান আউশের জারি। ওপারে হাজারদুয়ারী প্রাসাদের সামনে তোপখানা থেকে কামানদাগা মাত্রই দড়ি কাটে। বাঁশ ও কলাগাছের ভেলা চলতে থাকে হেলেদুলে। মুর্শিদাবাদের লালবাগ থেকে মহীনগর পর্যন্ত ভাগীরথী আর গঙ্গার তীর আলোকময় হয়ে ওঠে খিজিরের নামে। এপারে চাঁদপুরের বেলতলি, ঢাকার মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া, মানিকগঞ্জ আর আড়িয়াল বিলের মানুষও পানির পীর খোয়াজ খিজিরের বেড়া ভাসান। শীত জুড়ে যেন ঠিকঠাক পানি পাওয়া যায়।
বেহুলার ভেলা কিংবা খিজিরের বেড়া— দুইই যেন কোনো ধারাবিনাশী বাঁধে না আটকে ঠিকঠাক পৌঁছে যায় অন্যলোকে। বর্ষার বানে আমাদের নদীরা যেন ততখানি মুক্তধারা হয়। এই তো চাওয়া শরতের।
আশ্বিনে রান্দে কার্তিকে খায়।
যে বর মাগে সেই বর পায়।
গাসসি, গাড়ু সংক্রান্তি বা গারু হারকাইন। আশ্বিন মাসের শেষদিন ভাত-তরকারি রান্না করে রেখে দেয়া হয়। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাটা নিমপাতা-হলুদ-গিলা-মেথি-মেহেদি শরীরে মেখে গোসল করা হয়। ভেজা গায়ে উঠানে বসে বেতের ডাটি, পেরেক, কাচা হলুদে কামড় দিতে হয়। বাসি ভাত-তরকারি খাওয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় আচার। বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর চারিদিকে চর্মরোগ ও পেটের রোগের উপদ্রব দেখা দেয়। সমাজের সকলে মিলে প্রাকৃতিক জীবাণুনাশক উপাদান গ্রহণের আচারই হয়ে উঠেছে গাসসি উৎসব।
পানিতে গেরস্তের উনুনও ডুবে ছিল হয়তো। তাই শুক্লা পঞ্চমীতে উনুনকে ঘিরে চলে মঙ্গলকামনা। উনুনের ভেতর ধানগাছ ও কচু রেখে, সিঁদুরের তিনটি ফোঁটা দেওয়া হয়। আলপনা দিয়ে সাজানো হয় পাকঘর। আগের দিনে সেরে নেওয়া হয় সমস্ত রান্নাবান্না। পরদিন বাড়ির নারীরা সেসব ধান-কচুগাছ তুলে পুকুরে বিসর্জন দিয়ে শেষ করেন আখা পালনী ব্রত।
ভাদ্র মাসে কম করে ১৫ দিন স্বামীদের মুখ দেখবে না স্ত্রী। তাতে অমঙ্গল। আবার এ মাসে মামীর হাতে ভাত খেলে বাকি মাস ভালো থাকা যায়। এই ভাদর কাটানী করতে তাই ছেলেমেয়ে নিয়ে গৌরিরা চলেন নাইওরে। পকেটে তখন সদ্য পাট বেচা, আখ বেচা টাকা, শীতের বীজ বুনতেও ঢের বাকী। মায়ের বাড়ি যাওয়ার এর চেয়ে ভালো সময় আর কী!
শরৎকালে বঙ্গদেশে জলবিষুব পালন হয় নবপত্রিকার পূজা দিয়ে। বর্ষার জল থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানো নতুন পাতাদের এই মহা পূজায় এসে একদিন মিলে গেলেন বসন্ত বিষুবের এক দেবী। শারদ বিষুবের দিন বাসন্তী বিষুবের দেবী মাহাত্ম্য উচ্চারণে তার নাম হলো অকাল বোধন। অ–রণ্যে প্রবেশ করল কৃষি সমাজ। সে গল্প অন্যদিন।
সকলকে শুভ শারদীয়া..
লেখক ও গবেষক : নুসরাত জাহান।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the business
Address
Road/7, Block/C, Mirpur/12, Dhaka/
Dhaka
1216