Popy

Popy

Share

11/06/2026

#রণরঙ্গিণী
#পর্ব_৩৩(শেষ পর্ব)
#আরোহী_নূর

সুইডেনে আসার পর প্রায় তিন সপ্তাহ কেটে গেছে।

দিনগুলো মন্দ যাচ্ছিল না। সকালে সারহান অফিসে যাওয়ার আগে তাকে তাদের বাড়িতে নামিয়ে দিত, সন্ধ্যায় আবার নিয়ে যেত Malmö-এর ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টে। সব কিছুই ঠিকঠাক যাচ্ছিল। সারাদিন তাদের সাথে ভালোই কাটতো।
তবুও কিছু কিছু রাত আসে, যখন মানুষের ভেতরের শূন্যতাগুলো হঠাৎ জেগে ওঠে। সেদিনও তেমনই একটা রাত।

বাইরে হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। দূরের শহরের আলো জ্বলজ্বল করছে। বেলকনির রেলিংয়ে হাত রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল খুশি। তার চোখ দূরে কোথাও স্থির।।মনে হচ্ছিল বুকের ভেতরটা কেমন ভারী হয়ে আছে।

কিছুক্ষণ পর পরিচিত দুটো হাত এসে আলতো করে তাকে জড়িয়ে ধরল। সারহান খুশির কাঁধে থুতনি রেখে মৃদু গলায় বলল,

—এখানে দাঁড়িয়ে আছে আমার সাহেবা, আমি আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি।

খুশি কোনো উত্তর দিল না। সারহান তার ঘাড়ের পাশে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। খুশি হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আর তারপরই কেঁদে ফেলল। সারহান মুহূর্তেই থমকে গেল।

—খুশি!

সে তাড়াতাড়ি খুশির চেহারা উপরে উঠাল।

—কি হয়েছে?

খুশি কাঁদছেই।

—বল তো! শরীর খারাপ? কেউ কিছু বলেছে? কেউ ফোনে কিছু বলেছে? খুশি!

এবার খুশি বলল,

—এভাবে আর কতদিন? আমার আর ভালো লাগছে না।

সারহান এবার খুশির চোখ মুছে দিল।

—সেজন্য কাঁদতে হয়? সবকিছু তো আমাদের ভালোর জন্যই হচ্ছে। আর মাত্র কয়েকমাস, সব ঠিক হয়ে যাবে।

—আমি জানি সবকিছু আমাদের ভালোর জন্য হচ্ছে। কিন্তু সব আমার জন্যই হচ্ছে। তুমি কত কষ্ট করছ আমার জন্য। রোজ রোজ এতদূর যাওয়া। তুমি নিজের পরিবার থেকেও দূরে আছো।

—আমি কি তোর পর কেউ? এসব আমি করছি আমার জন্য। কারণ আমি সবসময় তোকে আমার পাশে চাই। তোকে ছাড়া একটা সাধারণ দিনও এখন কল্পনা করতে পারি না আমি। আর এটা একটা এডভেঞ্চার আমার জন্য। জীবনে কখনও কখনও কিছু আলাদা জিনিসও উপভোগ করা প্রয়োজন। শুধু শুধু তুই এসব নিয়ে ভাবছিস।

—জানিনা। ভালো লাগছে না কিছু। আমরা আর কবে একেবারে ফিরে যাব? কবে আর আলাদা থাকতে হবে না? কবে সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবতে হবে না আজ আবার কোথায় যেতে হবে? কবে সবকিছু স্বাভাবিক হবে?

সারহান কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর দুই হাত দিয়ে খুশির মুখটা ধরে বলল,

—শোন। এই কয়েক মাসকে পুরো জীবনের সাথে তুলনা করিস না। খুব শীঘ্রই এমন একটা দিন আসবে যখন এই সব ঝামেলার কোনো দরকারই হবে না। এই অবস্থাকেও উপভোগ করতে শুরু কর দেখবি সব ভালো লাগছে, আর দিনগুলোও কিভাবে কেটে যাবে বুঝতে পারবি না। আমি তো আছি তোর সাথে সবসময়।

—সত্যিই?

—না মিথ্যা। আমি তো আসলে তোকে এখানে রেখে নিজে পালিয়ে যাওয়ার প্ল্যান করছি। ভাবছি আগামী সপ্তাহে একটা সার্কাসে যোগ দেব। সেখানে আমার প্রধান দায়িত্ব হবে বানরের অভিনয় করা।

খুশি কান্নার মধ্যে খক করে হেসে দিল, তারপর বলল,

—হ্যাঁ, তুমি শিম্পাঞ্জি ডন হবে!

— তোর প্রেমে আমি সত্যিই শিম্পাঞ্জি হয়ে গেছি। কি সারহান কি হয়ে গেলাম।

খুশি এবার সত্যি সত্যি হেসে ফেলল। সারহান স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

—আলহামদুলিল্লাহ।

—কাঁদুনি রাণীটা অন্তত হাসল।

—আমি কাঁদুনি?

—অবশ্যই।
সারহান এবার খুশিকে কোলে নিয়ে নিল। খুশি চোখ বড় বড় করে তাকাল।

—সারহান!

—জি, মিসেস সারহান?

—আআআ! কি করছো!

—অপহরণ।

—নামাও!

—অসম্ভব।

—সারহান!

—চুপ।

সে খুশিকে আরও শক্ত করে ধরে বলল,

—আমার বউয়ের মন খারাপ। এখন তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসানোর জন্য রুমে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

—আমি হাঁটতে পারি!

—জানি।

—তাহলে?

—কোলে নিতে ভালো লাগে। আমার রোমান্টিকতার পরিমাণ বাড়ে।

খুশির মুখ লাল হয়ে গেল।

সারহান মুচকি হাসল।

বেলকনি পেরিয়ে সারহান ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে ভেতরে চলে গেল।

বাইরে তখন শহরের আলো জ্বলছে। আর ভেতরে, ছোট্ট সেই অ্যাপার্টমেন্টে, দুটো মানুষ তাদের অপেক্ষার দিনগুলোকে ভালোবাসা দিয়ে একটু একটু করে সহজ করে নিচ্ছিল।

কয়েকদিন পর,
রাত প্রায় সাড়ে নয়টা।

সারহান সোফার একপাশে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। চোখ স্ক্রিনে স্থির, আঙুলগুলো দ্রুত কিবোর্ডে চলেছে। অন্যদিকে খুশি তার পাশেই গুটিসুটি মেরে বসে টিভি দেখছে। মাঝে মাঝে টিভির দিকে তাকাচ্ছে, মাঝে মাঝে সারহানের দিকে।

তারপর আবার টিভি। আবার সারহান।

শেষমেশ বিরক্ত হয়ে বলল,

—তুমি কি সারাক্ষণ কাজই করবে?

—না।

—তাহলে?

—তারপর তোমার সাথে অনেককিছুই করব।

খুশি চোখ উল্টে ফেলল। তার অনেককিছুর মানে সে বুঝে গেল,
ঠিক তখনই সারহানের ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে সে কল রিসিভ করল।

—হ্যালো?

খুশি টিভির দিকে তাকিয়ে থাকলেও কান কিন্তু পুরোপুরি ফোনের দিকে।

কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে কথা শুনল সারহান।

—হুম...

—ভালো।

—চিকিৎসা ঠিকমতো চলছে তো?...আচ্ছা...ভালো। ডাক্তারের নির্দেশনা মেনে চলুক।

আরও কিছুক্ষণ কথা বলে সে কল কেটে দিল। আবার কাজে মন দিল।

খুশি কয়েক মিনিট চুপচাপ বসে রইল।

তারপর ধীরে বলল,

—এলিনার খবর?

সারহান মাথা না তুলেই উত্তর দিল,

—হুম।

—কেমন আছে?

—আগের চেয়ে অনেক ভালো।

—সাইকোলজিক্যাল ট্রিটমেন্ট চলছে।

—ডাক্তাররা আশাবাদী।

খুশি মাথা নাড়ল। আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর সে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,

—তোমার কখনও খারাপ লাগে?

—কিসের?

—এলিনার জন্য।

সারহানের আঙুল কিবোর্ডে থেমে গেল।

এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর সে অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

—অবশ্যই লাগে।

খুশি চমকে তাকাল।

—লাগে?

—অনেক।

—খুবই গভীর সম্পর্ক ছিল আমাদের।

খুশির চোখ বড় হয়ে গেল। সারহান এখনও ল্যাপটপের দিকেই তাকিয়ে। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ কথা বলছে।

—আগে তোকে বলিনি।

—কেন?

—বললে তুই আমাকে বিয়েই করতিস না।

খুশির মুখ শুকিয়ে গেল।

—কি?

—হুম।

—আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলতাম।

—দিন-রাত।

—একসাথে ভবিষ্যতের পরিকল্পনাও করেছিলাম।

খুশির বুক ধক করে উঠল।

—কি ধরনের পরিকল্পনা?

—এই ধর...

—বিয়ে।

খুশি এবার পুরোপুরি টিভি বন্ধ করে দিল।

—বিয়ে?!

—হুম।

—আরও অনেক কিছু। অনেক স্মৃতি আছে। অনেক আবেগ আছে।

খুশির চোখ চিকচিক করতে শুরু করল।

—তুমি আমাকে এসব কখনও বলোনি!

—এখন বলছি।

—কেন?

—এখন তো তুই আমার বউ। যাবি কোথায়? পালানোর রাস্তা নেই।

সারহান এমন গম্ভীর গলায় বলল যে মনে হলো সবকিছু শতভাগ সত্যি।

খুশির চোখে পানি চলে এল।

—সারহান...

—হুম?

—তুমি সিরিয়াস?

—অবশ্যই।

—আমি তো ভাবতাম...

কথা শেষ করতে পারল না সে। গলা ধরে গেল। সারহান এবারও মুখ তুলে তাকাল না।

—আরও অনেক কিছু আছে যা তুই জানিস না। আসলে আমরা সম্পর্কে খুব গভীরে চলে গিয়েছিলাম। ওর সাথে তো আমার ফিজিক্যাল রিলেশনও হওয়ার বাকি নেই।

ব্যস। এটুকুই যথেষ্ট ছিল। খুশি উঠে দাঁড়াল। চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।

—তাহলে আমাকে কেন বিয়ে করেছ! ধোঁকাবাজ। আমি এখনই ফুপির কাছে চলে যাব। তারপর বাংলাদেশে চলে যাব। আর কখনও ফিরে আসব না। খুশি কান্না করতে করতে সেখান থেকে চলে যাবে তখনই সারহান হাসতে হাসতে এসে তাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। সারহান জোরে হেসে উঠল। একদম প্রাণ খুলে।

খুশি থমকে গেল।

—ছাড় আমাকে?

—হাহাহা!

—সারহান!

—কাঁদুনি সাহেবা, তুই সত্যিই বিশ্বাস করে ফেলেছিস? আমি তো মজা করছিলাম। পাগলি একটা।

—মিথ্যা? তুমি এখন মিথ্যা বলছ।

—আরে পাগলি। এলিনার সাথে এমন কিছু থাকলে আমি তোকে বিয়ে কেন করতাম? আমি শুধু তোকে ভালোবেসেছি, বাসি আর আজীবন বাসব।

তারপর খুশিকে তার দিকে ফিরিয়ে তার চোখ মুছে দিল।

—শোন। আমি এলিনার খোঁজ নিয়েছি ঠিকই। কিন্তু শুধুই মানবিকতার কারণে। একটা বন্ধুত্বের কারণে। এর বেশি কিছু কখনও ছিল না।

খুশি চুপ। সারহান এবার নরম গলায় বলল,

—আমার জীবনে কোনো মেয়ের সাথেই ওই ধরনের সম্পর্ক ছিল না। কখনও না। প্রথম যে মেয়েটাকে আমি সত্যি ভালোবেসেছি...

সে খুশির হাত নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে দিল।

—সে তুই।

—সত্যি?

—আল্লাহর কসম।

—শেষ মেয়েটাও তুই।

—মাঝখানে কেউ ছিল না। আর আসবেও না।

খুশির রাগ এখনও পুরোপুরি যায়নি।

—তাহলে আমাকে কাঁদালে কেন?

—কারণ তুই অদ্ভুত প্রশ্ন করেছিলি।আর আমি সুযোগ পেয়ে দুষ্টুমি করেছি।

—শয়তান, শিম্পাঞ্জি ডন কোথাকার।

খুশি এবার তাকে একটা ছোট্ট ঘুষি মারল বুকে। সারহান নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরল।

—আহ!

—আমাকে মারছিস কেন?

—কম হয়েছে।

—আচ্ছা, শাস্তি হিসেবে কি করতে হবে?

খুশি মুখ ঘুরিয়ে নিল।

—কিছু না।

—নিশ্চিত?

—হুম।

সারহান একটু ঝুঁকে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,

—তাহলে আমি নিজেই একটা উপায় বের করি?

খুশির গাল লাল হয়ে গেল।

—কি উপায়?

—আমার রাগী বউকে শান্ত করার উপায়।

সে আলতো করে খুশির কপালে চুমু খেল। তারপর তাকে কাছে টেনে নিল।

—এখনও রাগ করে আছিস?

খুশি কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,

—একটু।

—তাহলে আরও সময় লাগবে।

—কিসের?

—তোকে মানানোর।

সারহানের চোখে দুষ্টু ঝিলিক ফুটে উঠল।

সময় যেন সত্যিই সবকিছু বদলে দেয়। কয়েক মাসের অপেক্ষা, কাগজপত্র, আর দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর অবশেষে খুশির ডেনমার্কের রেসিডেন্স কার্ড অনুমোদিত হলো। যেদিন কার্ডটা হাতে এলো, খুশি কয়েক সেকেন্ড সেটার দিকে তাকিয়েই ছিল।
তারপর অবিশ্বাস ভরা চোখে সারহানের দিকে তাকিয়েছিল।
—সত্যি?
সারহান হেসে বলেছিল,
—হ্যাঁ সাহেবা, এবার তুই আমার কাছ থেকে আর পালাতে পারবি না।
খুশি হাসতে হাসতে তার বুকে হালকা একটা ঘুষি মেরেছিল।
তারপর তারা Malmö-এর অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে আবার কোপেনহেগেনে ফিরে এলো। বাড়ির দরজা খুলতেই যেন উৎসব শুরু হয়ে গেল। আরিবা প্রথমেই খুশিকে জড়িয়ে ধরলেন।
—অবশেষে আমার মেয়েটা বাড়ি ফিরেছে।
শাহরিয়ার সাহেবের মুখেও প্রশান্তির হাসি।
ইয়ানা তো খুশিতে লাফিয়ে উঠল।

—এই বাড়ি আবার আগের মতো লাগছে!
খুশিরও মনে হচ্ছিল বহুদিন পর যেন সে সত্যিকারের নিজের ঘরে ফিরেছে।
এদিকে ইহানের বাবা-মাও অনেক আগেই ডেনমার্কে ফিরে এসেছেন। সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছিল।
আর ঠিক তখনই এলো নতুন সুখবর। এক সন্ধ্যায় সবাই লিভিংরুমে বসে আছে, ইহানের বাবা মা তাকে নিয়ে সারহানদের বাসায় এসেছেন। শাহরিয়ার সাহেব মুচকি হেসে বললেন,

—আচ্ছা, এবার আরেকটা বিয়ের প্রস্তুতি নেওয়া যাক?
ইহান প্রথমে কিছুই বুঝতে পারল না।
—কার?
পরের মুহূর্তেই সবাই একসাথে তার দিকে তাকাল।
লিভিংরুম হাসিতে ভরে গেল।
আরিবা বললেন,
—তোমার আর ইয়ানার।
ইহানের মুখের অভিব্যক্তি দেখে সবাই হেসে উঠল। ইয়ানাও লজ্জাময় হাসি দিল, সে লজ্জায় যেন আর দাঁড়াতে পারছিল না সেখানে। তাই রুমে চলে গেল। ইহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

—মানে... ঠিক হয়ে গেছে?
—হ্যাঁ।
—তারিখও ঠিক হয়ে গেছে।
আরিবার কথায় কয়েক সেকেন্ড ইহান কোনো কথা বলতে পারল না। তারপর মুখভরা হাসি নিয়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল।
—আলহামদুলিল্লাহ।

সেদিন রাতেই সে এলিনাকে ফোন করল। ওপাশ থেকে কল ধরতেই দুজনেই কয়েক সেকেন্ড কিছু বলল না। শুধু হাসছিল।
অবশেষে ইয়ানা বলল,

—তুমি হাসছো কেন?
—কারণ অবশেষে আমরা দুই পাগলের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। ভাবতেছি আমাদের বাচ্চা কাচ্চাও নাকি পাগল হয় আমাদের মতো।

—আমিও সেটাই ভাবছি।
দু'জনই হেসে উঠল। তারপর ইহান বলল,

—তুই খুশি তো?

—খুব। আর তুমি?
—অনেক।

ইহান মুচকি হেসে সোফায় হেলান দিল।

—জানিস, আজকে মনে হচ্ছে পৃথিবীটা আরও সুন্দর হয়ে গেছে।
—ওহ, তাই?
—হ্যাঁ।
—কারণ?
—কারণ আজকে জানতে পেরেছি তুই অবশেষে আমার হতে চলেছিস।
ওপাশে ইয়ানা হেসে ফেলল।
—আমি তো অনেক আগেই তোমার ছিলাম।

ইহান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর নরম গলায় বলল,
—ধন্যবাদ।
—কিসের জন্য?
—আমার জীবনে আসার জন্য।

ইয়ানা কিছুক্ষণ চুপ থাকল। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
—আমাকেও ধন্যবাদ দিতে হয়।
—কেন?
—কারণ তুমি অপেক্ষা করেছ। যখন আমার নিজের উপরই বিশ্বাস ছিল না যে আমি তোমাকে ভালোবাসি কি না, তখনও তুমি বিশ্বাস রেখেছিলে।

ইহান ধীরে উত্তর দিল,
—কিছু মানুষকে ছেড়ে দেওয়া যায় না। চোখ বন্ধ করে তাকে পাওয়ার বিশ্বাস রাখা যায়। তুমি তাদের একজন।

ওপাশে আবার নীরবতা। কিন্তু সেই নীরবতাটাও সুন্দর। তারপর দু'জন আবার নিজেদের আলাপে ব্যস্ত হলো।

আর বাড়ির অন্যদিকে তখন সবাই বিয়ের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কারণ বহু ঝড়ঝাপটার পর অবশেষে আরেকটি নতুন গল্প শুরু হতে চলেছে। ইহান আর ইয়ানার গল্প।

রাত অনেকটা নেমে এসেছে।
ইহান আর তার বাবা মা নিজেদের ঘরে চলে গেছে। দিনের ব্যস্ততা শেষ হয়েছে, কিন্তু শাহরিয়ার সাহেব আর আরিবা এখনও লিভিংরুমের এক কোণে বসে আছেন।

দু'জনের হাতেই ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ।
বাইরে জানালার ওপারে কোপেনহেগেনের রাত ধীরে ধীরে আরও গভীর হচ্ছে।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আরিবা মৃদু হেসে বললেন,

—মনে আছে?

—কী?

—একসময় কত চিন্তা করতাম।

শাহরিয়ার সাহেবও হেসে ফেললেন।

—কি নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করতাম না বলো? সারহানকে নিয়ে। ইয়ানাকে নিয়ে। খুশিকে নিয়ে। জীবন কিভাবে গোছাব এসব নিয়ে! সবাইকে নিয়ে।

তারপর দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেললেন শাহরিয়ার সাহেব। আরিবা বললেন,

—আজকে মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের অনেক বড় একটা শান্তি দিয়েছেন।

শাহরিয়ার সাহেব মাথা নাড়লেন।

—হ্যাঁ।

তার চোখের সামনে ভেসে উঠল আজকের সন্ধ্যার দৃশ্য। খুশির হাসি। সারহানের চোখের প্রশান্তি। ইহানের উচ্ছ্বাস।
ইয়ানার চোখে ফিরে পাওয়া জীবনের আলো।

—জানো আরিবা...

—হুম?

—একটা সময় ভয় পেতাম। ভবিষ্যৎ নিয়ে। ভাবতাম আমাদের ছেলেমেয়েরা সুখী হবে তো?

আরিবা চুপচাপ শুনছিলেন। শাহরিয়ার সাহেব মৃদু হাসলেন।

—আজকে উত্তরটা পেয়ে গেছি।

—হবে না?

—না। ওরা সুখী হয়েছে। আমাদের ভাবনা থেকেও বেশি।

আরিবা তাকিয়ে রইলেন স্বামীর দিকে।

তারপর নিজের হাতটা আলতো করে তার হাতের উপর রাখলেন।

—আলহামদুলিল্লাহ।

—আলহামদুলিল্লাহ।

দু'জনের চোখেই তখন তৃপ্তি। যে তৃপ্তি বহু বছরের অপেক্ষার পর আসে।

অন্যদিকে নিজের ঘরে।
খুশি মাথা রেখে শুয়ে আছে সারহানের বুকে। সারহান বিছানার হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে বসে আছে। এক হাতে খুশিকে জড়িয়ে রেখেছে। ঘরের আলো ম্লান।
চারপাশে এক ধরনের প্রশান্ত নীরবতা।
খুশি আঙুল দিয়ে সারহানের শার্টের বোতাম নিয়ে খেলছিল।
হঠাৎ বলল,

—একটা কথা বলব?

—বল।

—তুমি কি কখনও ভেবেছিলে আমাদের বিয়ে হবে?

সারহান সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,

—না।

খুশি অবাক হয়ে মাথা তুলল।

—না?

—আমি ভেবেছিলাম তুই আমাকে পাগল বানিয়ে একদিন পালিয়ে যাবি।

খুশি হেসে ফেলল।

—মিথ্যাবাদী।

—একদম না। তুই কম জ্বালাসনি আমাকে।

—তুমিও তো কম জ্বালাওনি।

—সেটা ভালোবাসা ছিল।

—আমারটাও।

দু'জনেই হেসে উঠল।

সারহান আলতো করে খুশির কপালে হাত বুলিয়ে দিল।

—কোনো আফসোস আছে?

খুশি কয়েক মুহূর্ত ভেবে মাথা নাড়ল।

—না। একটুও না। আর তোমার?

সারহান তার দিকে তাকাল।

—আফসোস থাকলে আজ এত শান্তি পেতাম না। বরং তুই আমার সাধনার ফল।

খুশি মুচকি হাসল। তারপর আবার মাথা রেখে দিল সারহানের বুকে। সারহানের হৃদস্পন্দন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। এই শব্দটা তার খুব প্রিয়।

কারণ এই শব্দের মাঝেই সে নিরাপত্তা খুঁজে পায়। ভালোবাসা খুঁজে পায়। বাড়ি খুঁজে পায়। ঘরের বাইরে রাত আরও গভীর হলো।

শহরের আলো ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে। আর খুশি চোখ বন্ধ করে নিজের জীবনের কথা ভাবতে লাগল। কত অদ্ভুত ছিল সবকিছু।
কত কঠিন। কত অসম্ভব লাগত একসময় সব। একটা সময় ছিল, যখন তার পৃথিবী যেন ভেঙে গিয়েছিল।
যখন সে মানুষ, সম্পর্ক, ভালোবাসা সবকিছুর উপর থেকে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিল। মনে হতো তার জন্য সুখ বলে কিছু লেখা নেই।
কিন্তু আজ...আজ সে নিজের মানুষদের মাঝে আছে।
নিজের পরিবারের মাঝে আছে। নিজের ভালোবাসার মানুষের বুকে মাথা রেখে আছে। জীবন তার কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছিল।
কিন্তু জীবনই তাকে অনেক কিছু ফিরিয়েও দিয়েছে। হয়তো এটাই নিয়তি। হয়তো এটাই আল্লাহর পরিকল্পনা। খুশি ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। তার ঠোঁটে এক টুকরো তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।

আমি খুশি, এই ছিল আমার গল্প,
আমার গল্পের শুরুটা ছিল বিষাক্ত, অন্ধকার আর কষ্টে ভরা।
কিন্তু এখন ততটাই সুন্দর। ততটাই তৃপ্তিময়।
কারণ শেষ পর্যন্ত আমি আমার সঠিক আপনজন খুঁজে পেয়েছি।
আর ভালোবাসা...সেটা শেষ পর্যন্ত আমাকেও খুঁজে নিয়েছে। দোয়া করবেন সবাই যাতে এভাবেই সুখে থাকি।

সমাপ্ত।

আসসালামু আলাইকুম সবাইকে। হ্যাপি রিডিং।

Want your public figure to be the top-listed Public Figure in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Website

Address


Dhaka
1212