Popy Acharjee

Popy Acharjee

Share

21/06/2026

কাজিনের বিয়ে খেতে এসে যে নিজেরই বিয়ে হয়ে যাবে সেটা কল্পনাও করতে পারেনি আলো। পুরো নাম আলো রহমান রিক্তা। পরিবারের বড় মেয়ে সে। আজ তার মামাতো বোন মেঘলার বিয়ে ছিল। অথচ মেয়েটা তাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে, বিয়ের ঠিক আগ-মুহুর্তে তার-ই চাচাতো ভাই রহিতের সাথে পালিয়ে যায়। এটা জানাজানি হওয়ার পর পুরো পরিবারের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বড়রা যখন জানতে পারল বউ পালিয়ে যাওয়ার পিছনে তাদের বাড়ির বড় মেয়ের হাত-পা আছে তখন উনারা ভীষণ রেগে যান। মিসেস আলেয়া রহমান সকলের সামনে আলোকে কষিয়ে থাপ্পড় মারেন। এই বেয়াদব মেয়েটার জন্য আজ তাদের তিন পরিবারের মানসম্মান সব ধুলোই মিশে গেল। আলেয়া রহমান আবারো আলোর দিকে তেড়ে এলে মতিউর রহমান নিজের মেয়েকে আগলে নেন। উনার ভীষণ আদরের মেয়ে সে। হাজার দোষ-ভুল করলেও উনি কিছুই বলেন না মেয়েটাকে। আর হয়তো বাবার এত ভালোবাসা, আদর পাওয়ার ফলেই মেয়েটা বাচাল স্বভাবের তৈরি হয়েছে। সাথে ভীষণ ঘাড়ত্যাড়াও বটে!

সমুদ্রের স্রোতের মতো সময় অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছিল। তবুও যখন বিয়ের আসরে নববধূকে দেখা গেল না তখন আশেপাশে হালকা গুঞ্জন সৃষ্টি হয়। উপস্থিতি মেহমানরা নিজেদের মধ্যে নানানরকম আলোচনা, সমালোচনা শুরু করে দিয়েছে। খান বাড়ির কর্তী মিসেস তাহমিনা খান পরিস্থিতি দেখে বড় ছেলের সঙ্গে উনার ভাইয়ের মেয়ে জ্যোতিকে বিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন সকলের সামনে। কিন্তু উনার প্রস্তাবকে অমান্য করে মি. আধার খান নিজেরই ভার্সিটির স্টুডেন্ট মিস. আলো রহমানকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দেয়। আজকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পিছনে যে দায়ী ছিল, আধার তাকেই সকলের সামনে তিন কবুল বলে নিজের অর্ধাঙ্গিনী রূপে গ্রহণ করে নিয়েছে।

হুট করে, সবটা হুট করে ঘটে যায়। পরিবারের চাপে পড়ে একপ্রকার বাধ্য হয়েই এই বিয়ে নামক বেড়াজালে নিজেকে বাঁধতে হয়েছে আলোর। কাজিনকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার শাস্তিস্বরূপ পেয়েছে ওই হিটলার, বদমেজাজি প্রফেসরকে। যাকে সে এতদিন মনে মনে ভয় পেয়ে এসেছে। অথচ ভাগ্যের কী নিয়তি! যেই মানুষটাকে একটুও পছন্দ করে না, আজ সেই মানুষটাই তার সদ্য বিয়ে করা স্বামী। এটা ভাবতেও বুকটা ফেটে যাচ্ছে তার। কী থেকে কী হয়ে গেল ঠিক বুঝতে উঠতেই পারল না।

রাত্রির দশটার দিকে চট্টগ্রাম শহর থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় খান বাড়ির সবাই৷ আর রহমান বাড়ির সবাই সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। আলোর জন্মস্থান সিলেটে। কিন্তু সে লেখাপড়ার সুবাদে ঢাকা শহরে তার আন্টির বাসায় থাকে। ওখান থেকেই ভার্সিটিতে যাতায়াত করে। এবার অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী সে। আলো যেই ভার্সিটির স্টুডেন্ট সেই একই ভার্সিটির একই ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর মিস্টার আধার খান। যার সাথে আজ তার না চাইতেও বিয়ে হয়েছে।

--- এ্যাই মেয়ে সমস্যা কী তোমার? এইভাবে ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদলে গাড়ি থেকে ফেলে দেবো একদম!

স্যার ওরফে স্বামীর ককর্শ গলার ধমক শুনে আলো কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। সে গাড়িতে বসে থেকে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া অঘটনগুলো ভাবছিল আর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। তখন পাশ থেকে মনোযোগ সহকারে ড্রাইভ করতে থাকা, আধার খান উপরোক্ত বাক্যটি বলে। আলো নাক টেনে ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলল,

--- আমি কাঁদছি আমার চোখ দিয়ে, এতে আপনার কী সমস্যা? আমি তো আর আপনার চোখদুটো খুলে নেইনি।

--- তুমি আমার মনোযোগ নষ্ট করছো।

--- কেন, কেন? আমি আবার কি করলাম?

--- এই যে তখন থেকে কুমিরের মতো নাকের জলে চোখের জলে হচ্ছো। এটাই আমাকে ডিস্টার্ব করছে।

--- এখন কী আমি নিজের ইচ্ছে মতো কাঁদতেও পারব না?

--- না পারবে না!

আধার দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠে। আলো ফুপিয়ে উঠে কিছু বলতে যাবে তখনই আধার হিসহিসালো,

--- চুপ! একদম চুপ! নয়তো চড়িয়ে সব ক'টা দাঁত ফেলে দেবো বেয়াদব।

স্যারের ধমক খেয়ে আলো চুপ হয়ে গেল। তবে তার নাক টানা বন্ধ হলো না। সে রাগে-দুঃখে পাশের জানালার কাঁচ নামিয়ে বাইরে ছলছল দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। রাতের আকাশটা আজ তার মনের মতোই ছন্নছাড়া, এলোমেলো। যেকোনো মূহুর্তে বৃষ্টি নামতে পারে। ঠিক তার দু-চোখের বাধভাঙ্গা অশ্রুধারার মতো। গাড়ির ভেতর পিনপতন নীরবতা ছেয়ে আছে। কেউ কারোর দিকে তাকানোর প্রয়োজনটুকুও মনে করছে না। দুজন মানুষ দুই প্রান্তে নিরবতা পালন করছে। কারোর মুখে টুঁশব্দও নেই। তাদের গাড়িটা সবার আগে বের হওয়ার কথা থাকলেও আধার শেষে বেড়িয়েছে। তখন ছিল মধ্যরাত! আলোর কান্না বহু আগেই থেমে গিয়েছে। আপাতত মেয়েটা ঘুমে ঢুলছে আর ঝিমাচ্ছে, মাঝেমধ্যে গাড়ির ঝাঁকুনির জন্য ঘুমটা বারবার ভেঙে যাচ্ছে। এতে সে মনে মনে প্রচুর বিরক্ত মানুষটার ওপর। তবে মুখে কিছু বলে না। চুপচাপ সিটে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে বসে থাকে। হঠাৎ করে মাঝরাস্তায় গাড়িটা থেমে যাওয়াতে আলো চমকে উঠল। ডানদিকে তাকিয়ে খেয়াল করল আধার স্যার সিট বেল্ট খুলে গাড়ি থেকে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

--- একি স্যার আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

আলো আঁতকে উঠে প্রশ্নটা করে। বিনিময়ে আধার গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

--- কাউকে কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই আমি।

--- দে....দেখুন স্যার। আমি জানি, আপনি আমাকে মোটেও পছন্দ করেন না। আজ যা কিছু করছেন সবটাই রাগের বশে। তাই বলে এইভাবে জলজ্যান্ত একটা মেয়েকে মাঝরাস্তায় ফেলে পালিয়ে যাবেন? এটা আবার কেমন কথা?

আলোর এমন কথা শুনে আধার ধরাম করে ডোর লাগিয়ে দাঁতে দাঁত পিষলো,

--- আপনার মতো আধপাগল মেয়েকে কেউই কিডন্যাপ করতে আসবে না। সো রিল্যাক্সে থাকুন মিস. কালো! নয়তো গাড়ি ড্রাইভ করে চলে যান। আই ডোন্ট কেয়ার।

একথা বলে আধার বড়বড় পা ফেলে ওখান থেকে চলে গেল। আর আলো বসে থেকে রাগে গজগজ করতে করতে স্যারের চৌদ্দ গুষ্ঠি ধুয়ে দিতে থাকল।

অনেকটা সময় পর ফিরে এল আধার। ডোরের লক খুলে ডাইভিং সিটে বসল। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই নববধূর ঘুমন্ত চেহারা ভেসে উঠল। আধার একটু সময় নিয়ে নজর সরিয়ে পানির বোতলের সিপি খুলে আলতো হাতে ঘুমন্ত মেয়েটার চোখেমুখে ছিটিয়ে দিতেই আলো নড়েচড়ে উঠল।

--- এখন কী আমার ঘুমেও আপনার সমস্যা?

আলো বিরক্তিতে বলে ওঠে। আধার প্রতিত্তোরে কিছু না বলে শুধু একটা প্যাকেট এগিয়ে দিল।

--- কী এটা?

--- হাতে আছে, খুলে দেখো।

আধার সোজাসাপ্টা জবাব দিয়ে গাড়ি স্টার্ট করে। আলো ভ্রু কুঁচকে প্যাকেট খুলে ওয়ান টাইম বক্স বের করে দেখে এতে বিরিয়ানি রয়েছে। খাবার দেখে আলোর চোখদুটো বড়বড় হয়ে গেল। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে শুধাল,

--- আপনি কি করে জানলেন, আমার খুদা পেয়েছে?

--- তোমার নেতিয়ে পড়া চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কতমাস ধরে খাবার খাওনি।

--- আপনি কিন্তু আমাকে অপমান করছেন স্যার।

--- যার মান নেই, তার আবার অপমান কিসের?

রাগে আলোর শরীর জ্বলে উঠল। সে ঠাস করে বিরিয়ানির প্যাকেট রেক্সের ওপর রেখে বলে উঠল,

--- খাব না আপনার কিছু৷

আধার একহাতে কপাল স্লাইড করতে করতে বিরবির করে বলল, --- আমার কিছু খেতে বলছি না তোমাকে৷ আপাতত বিরিয়ানি খাও!

#চলবে

#আঁধার_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_০১

Want your business to be the top-listed Media Company in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Website

Address


Dhaka
1212