Iskcon Times
27/02/2026
নবদ্বীপ ধামকে কেন 'গুপ্ত বৃন্দাবন' বলা হয় এবং এই ধামে নয়টি দ্বীপের পরিক্রমা একজন ভক্তের জীবনে কীভাবে পূর্ণতা আনে।
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর শ্রীচরণ স্মরণ করে শ্রীধাম নবদ্বীপের নয়টি দ্বীপের মাহাত্ম্য শ্রবণ করব।
এই নয়টি দ্বীপ যেন এক একটি আধ্যাত্মিক সোপান, যা জীবকে শ্রীকৃষ্ণের পাদপদ্মে পৌঁছে দেয়।
প্রথম প্রহর: প্রাতঃকালীন হরিকথা (অন্তর্দ্বীপ ও সীমন্তদ্বীপ)
মঙ্গলাচরণ শ্লোক:
নবধ্বীপং পরং ধাম জগন্নাথপুরীং তথা।
বৃন্দাবনং চ মথুরাম্ একৈকং পরমং পদম্।।
(নবদ্বীপ, জগন্নাথপুরী, বৃন্দাবন ও মথুরা—প্রতিটিই ভগবানের পরম ধাম ও অভিন্ন।)
অন্তর্দ্বীপ (আত্মনিবেদন): ব্রহ্মার মোহভঙ্গ
নবদ্বীপের কেন্দ্রে মায়াপুর হলো অন্তর্দ্বীপ। এখানে ব্রহ্মা দেব মহাপ্রভুর দর্শনের জন্য তপস্যা করেছিলেন।
দ্বাপর যুগে ব্রহ্মা যখন শ্রীকৃষ্ণের সখাদের ও বৎসদের হরণ করেছিলেন, পরে কৃষ্ণের ঐশ্বর্য দেখে তাঁর মোহভঙ্গ হয়। তিনি ভীত হয়ে নবদ্বীপে এসে কঠোর তপস্যা শুরু করেন। মহাপ্রভু তাঁকে দর্শন দিয়ে বললেন, "ব্রহ্মা, তুমি কলিযুগে যবন কুলে হরিদাসের রূপে জন্ম নেবে এবং উচ্চৈঃস্বরে নাম সংকীর্তন করে জগতকে উদ্ধার করবে।"
শিক্ষা:
এখানে জীব নিজের অহংকার ত্যাগ করে ভগবানের চরণে 'আত্মনিবেদন' করতে শেখে।
সীমন্তদ্বীপ (শ্রবণ): পার্বতী দেবীর কৃপা
এখানে দেবী পার্বতী মহাপ্রভুর নাম শোনার জন্য তপস্যা করেছিলেন।
কৈলাসে শিব যখন নিরন্তর 'গৌর গৌর' নাম জপ করতেন, পার্বতী দেবী তখন অত্যন্ত ব্যাকুল হয়ে নবদ্বীপে আসেন। তিনি মহাপ্রভুর চরণধূলি নিজের মস্তকের সিঁথিতে (সীমন্ত) ধারণ করেন। তাই এই স্থানের নাম 'সীমন্তদ্বীপ'। মহাপ্রভু তাঁকে বর দিলেন, "তুমি রাধিকার শক্তির অংশ হয়ে এখানে 'প্রৌঢ়া মায়া' রূপে অবস্থান করবে এবং ভক্তদের ভক্তি দান করবে।"
শিক্ষা:
এই দ্বীপ আমাদের শেখায় ভগবানের কথা পরম আদরে 'শ্রবণ' করতে।
দ্বিতীয় প্রহর: মধ্যাহ্নকালীন হরিকথা (গোদু্রমদ্বীপ ও মধ্যদ্বীপ)
গোদু্রমদ্বীপ (কীর্তন): ইন্দ্র ও সুরভীর আরতি
বৃন্দাবনে ইন্দ্র যখন মহাপ্রলয় ঘটিয়েছিলেন, পরে ক্ষমা চেয়ে তিনি নবদ্বীপে আসেন। সঙ্গে ছিলেন কামধেনু সুরভী। সুরভী দেবী একটি বড় বটগাছের (গোদু্রম) নিচে মহাপ্রভুর আরাধনা করেন। ইন্দ্র ও সুরভী এখানে উচ্চৈঃস্বরে সংকীর্তন করেছিলেন।
শিক্ষা:
কলিযুগের শ্রেষ্ঠ ধর্ম হলো ' সংকীর্তন'। এখানে ভক্তিবিনোদ ঠাকুরের ভজন কুঠির অবস্থিত, যেখানে আজও নামের তরঙ্গ অনুভূত হয়।
মধ্যদ্বীপ (স্মরণ): সপ্তর্ষির তপস্যা
প্রাচীনকালে সপ্তর্ষিগণ এখানে এসে শ্রীগৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। তাঁরা সর্বদা প্রভুর রূপ ও লীলা 'স্মরণ' করতেন। তাঁদের স্মরণে তুষ্ট হয়ে মহাপ্রভু জ্যোতির্ময় রূপে তাঁদের দর্শন দেন।
শিক্ষা:
'স্মরণ' হলো অন্তরের ভজন। জগতের কোলাহলের মাঝেও যেন মন ভগবানের কথা ভুলে না যায়, এই দ্বীপ সেই শিক্ষা দেয়।
তৃতীয় প্রহর: অপরাহ্ণ হরিকথা (কোলদ্বীপ, ঋতুদ্বীপ ও জহ্নুদ্বীপ)
কোলদ্বীপ (পাদসেবন): বরাহ দেবের আবির্ভাব
ত্রেতাযুগে এক ব্রাহ্মণ এখানে ভগবানের বরাহ (কোল) অবতারের আরাধনা করতেন। ভগবান বরাহ তাকে দর্শন দিয়ে বলেন, "কলিযুগে আমি এখানে সোনার কান্তি নিয়ে মহাপ্রভু রূপে আসব।" এই স্থানটি 'অপরাধ ভঞ্জন পাঠ' নামেও পরিচিত।
শিক্ষা:
ভগবানের 'পাদসেবন' বা চরণ সেবার মাধ্যমে হৃদয়ের সমস্ত অপরাধ ধুয়ে যায়।
ঋতুদ্বীপ (অর্চন): ঋতুদের মিলন
এখানে সমস্ত ঋতুরা (বসন্ত, বর্ষা ইত্যাদি) মূর্তিমন্ত হয়ে মহাপ্রভুর পূজা বা 'অর্চন' করার জন্য অপেক্ষা করেন। এটি শ্রীরাধা-কৃষ্ণের রাধাকুণ্ডের সাথে অভিন্ন।
শিক্ষা:
ভক্ত যখন শুদ্ধ মনে ভগবানের সেবা বা 'অর্চন' করে, তখন প্রকৃতিও তার সহায় হয়।
জহ্নুদ্বীপ (বন্দনা): জহ্নু মুনির ক্রোধ ও ভক্তি
জহ্নু মুনি যখন তপস্যা করছিলেন, গঙ্গা দেবী তার পাত্র প্লাবিত করেন। মুনি ক্রুদ্ধ হয়ে গঙ্গাকে পান করে ফেলেন। পরে দেবতাদের প্রার্থনায় তিনি গঙ্গার মাহাত্ম্য বুঝে নিজের জানু বিদীর্ণ করে গঙ্গাকে নির্গত করেন। তিনি গঙ্গা ও মহাপ্রভুর চরণে সশ্রদ্ধ 'বন্দনা' করেছিলেন।
শিক্ষা:
প্রার্থনার মাধ্যমে ভগবানের কাছে আত্মসমর্পণ করাই হলো 'বন্দনা'।
চতুর্থ প্রহর: সান্ধ্য হরিকথা (মোদদ্রুমদ্বীপ ও রুদ্রদ্বীপ)
মোদদ্রুমদ্বীপ (দাস্য): শ্রীরামচন্দ্রের অবস্থান
ত্রেতাযুগে শ্রীরামচন্দ্র সীতা ও লক্ষ্মণসহ বনবাসের সময় এখানে একটি বটের নিচে বিশ্রাম নিয়েছিলেন। রামচন্দ্র সীতাদেবীকে বলেছিলেন, "হে প্রিয়ে, কলিযুগে আমি এখানে স্বর্ণ গৌরবর্ণ ধারণ করে অবতীর্ণ হব এবং ঘরে ঘরে প্রেম বিতরণ করব।" এখানে গুহক চণ্ডালের প্রতি রামচন্দ্রের যে কৃপা, তা 'দাস্য' ভক্তির চরম পরাকাষ্ঠা।
শিক্ষা:
নিজেকে ভগবানের সেবক বা 'দাস' মনে করাই জীবের প্রকৃত স্বরূপ।
রুদ্রদ্বীপ (সখ্য): শিবের তান্ডব ও নাম
মহাদেব বা রুদ্র এখানে একাদশ রুদ্র রূপে মহাপ্রভুর নাম গান করে নৃত্য করেন। তিনি শ্রীকৃষ্ণকে সখা (বন্ধু) হিসেবে পান নবদ্বীপে এসে। এখানে পঞ্চবক্ত্র শিবের বিশেষ মহিমা রয়েছে।
শিক্ষা:
ভগবান ও ভক্তের নিবিড় বন্ধুত্বের নামই 'সখ্য' ভক্তি।
উপসংহার: দিনের শেষ প্রার্থনা
শ্লোক:
নম মহাবদান্যায় কৃষ্ণপ্রেমপ্রদায় তে।
কৃষ্ণায় কৃষ্ণচৈতন্যনাম্নে গৌরত্বিষে নমঃ।।
হে ভক্তবৃন্দ, এই নয়টি দ্বীপ মিলে যেন একটি সুন্দর পদ্মফুল। আর এই পদ্মফুলের কেন্দ্রে বসে আছেন নবদ্বীপচন্দ্র শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। যিনি এই নয়টি দ্বীপের মাহাত্ম্য শ্রবণ করেন, তাঁর হৃদয়ে নবধা ভক্তি জাগ্রত হয়। আজ আমরা সারা দিন যা শ্রবণ করলাম, তা যদি ক্ষণিকের জন্যও চিন্তা করি, তবে আমাদের এই মানব জন্ম সার্থক হবে।
গঙ্গার শীতল হাওয়ায়, খোল-করতালের ধ্বনিতে, নবদ্বীপের আকাশে-বাতাসে আজও একটিই সুর বাজে
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।
হরে কৃষ্ণ
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Website
Address
Dhaka