Sayeda Nuha
12/04/2026
কনফ্লিক্ট— পর্ব ২৮
সায়ীদা নুহা
___________
রাহা বেশ সুনিপূণভাবে তার কাজের সমাপ্তি টানল। ফোনের অপরপ্রান্তে থাকা লোকটিকে সবকিছু বুঝিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করল সে। বোঝার উপায়ই নেই, কাজটা যে রাহা নামক নিজের মিডিয়া চ্যানেলেরই একজন তুখোড় ও মেধাবী সিনিয়র নিউজ রিপ্রেজেন্টারের মতো কারও হতে পারে। চিফের নাকের ডগা দিয়ে যে এমন একটা কাজ হয়ে যেতে পারে, তা যেন কারোরই ধারণা নেই।
রাহা নিজের চেয়ারের কাঁধে দুহাত ভর দিয়ে অলক্ষ্যে বাঁকা হাসছে। মনে মনে আওড়াল— 'এবার দেখো জাভেদ ওয়াসিম, আমার পথ আটকাতে চাইছিলে আর আমি তোমার কী হাল করি! রাহাকে ধোয়া এত সোজা না!'
রাহা সুনিপুণ ভঙিমায় কফি মগে ঠোঁট ছোঁয়ায়। তখনই তাকে বুলেটিনের জন্য ডাকা হলো। রাহা দ্রুত কফি শেষ করে। এখন আর সময় নষ্ট করার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই!
∞
দুদিন পর নুরাইন অফিসে এলো। বাইক থেকে নেমে আলীকে তার হেলমেট ধরিয়ে বলল,
"আসছি। আপনি সাবধানে যাবেন।"
আলী হালকা ঠোঁট ছড়িয়ে হাসে। বলল,
"ইয়েস, প্রিন্সেস! যথাআজ্ঞা! আপনার হুকুমে শিরোধার্য!"
চরমভাবে ব্লাশ করল নুরাইন। আলীর দিকে বিমুগ্ধ চোখ রাঙিয়ে চাপা স্বরে শাসায়,
"এইইই, আস্তে!"
"আমার কণ্ঠ এমনিও ওত বেশি ভলিউমের না, নুরা। তুমি অযথা লজ্জা পেয়ে ব্লাশ করছ।"
নুরাইন কোথায় যাবে এবার বুঝল না। আশেপাশে তাকিয়ে সে দ্রুত আলীকে বিদায় দিয়ে অফিসের মেইন গেইটের দিকে ছোটে। মনের কোণায় লাজুক ক্ষোভ জমে তার— লোকটা তাকে পদে পদে বিধ্বস্ত করছে ইদানীং!
নুরাইন যেতেই আলী এবার বেশ গাঢ় ভঙিমায়ই হেসে ওঠে। নুরাইনকে ভেতরে যাওয়া অবধি দেখে এরপর সে বাইক স্টার্ট দেয়। বাসার দিকের গন্তব্যে না যেয়ে সে পথ ধরল অন্যদিকে। হাতের কাজগুলো দ্রুত সেড়ে তার আরও নানান জায়গায় ছুটতে হবে। বেশি সময় নেই তার। যত দ্রুত সম্ভব, কাজগুলোর অন্ত হোক!
∞
উত্তরা ব্যাংক।
ফাইয়ায আজ ইরামকে নিয়েই অফিসে এসেছে। মিসেস রোদেলা থেকে শুরু করে প্রায় প্রত্যেকে তাকে তার কর্মজীবনে স্বাভাবিকভাবে ফিরতে অনুরোধ করছে। ইরামও সেহেতু ভাবল, একবার কোনরকম দেখা করে এসেই সে নিজের এসব অনভ্যস্ততার ইতি ঘটাবে।
ফলস্বরূপ ফাইয়ায আজ কয়েকবার বলার পর ইচ্ছের বিপরীতে গিয়ে হলেও সে অফিসে এলো।
তবে নিজের ডেস্কে বসেনি। সকলের অভিবাদন গ্রহণ শেষে সে সরাসরি ম্যানেজারের কক্ষে প্রবেশ করে।
এমডি তাকে দেখে প্রথমে অভিবাদন জানালেন। এরপরই কিছুটা রাশভারি গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
"এখন কি তাহলে কাজে ফিরছেন, মিসেস ইরাম? আপনার অবশ্যই জানা থাকা উচিত, এতগুলো দিন কেউ কর্মস্থলে অহেতুক রিজন দেখিয়ে ছুটি কাটাতে পারে না?"
ইরাম সোজা গলায় জবাব দেয়,
"জি, স্যার। জানি। আমি এজন্যই আমার লিভ এর আবেদন করেছিলাম।"
"আপনি তো সিক লিভ নিয়েছিলেন। অথচ ঘটনা তো অন্যদিকে মোড় নিয়েছে দেখলাম।"
ইরাম বেস অস্বস্তি আর কুণ্ঠায় পড়ে যায়। তবুও কিছুটা শক্ত গলায় বলল,
"সরি ফর দ্যাট, স্যার। আ'ম এক্সট্রেমলি সরি! এন্ড... হেয়ার ইজ মাই রিজাইন লেটার।"
বলেই হাতের সাদা খামটা ম্যানেজারের দিকে এগিয়ে দিলো ইরাম। ম্যানেজার বেশ অবাকই হলেন। খাম না খুলেই জানতে চাইলেন,
"রিজাইন? কেন?"
ইরামের মাথা নিচু হয়ে আসে। সে ওভাবেই নম্র স্বরে জবাব দেয়,
"স্যার, আছে কিছু পার্সোনাল রিজন। এপ্লিকেশনে উল্লেখ করা আছে সবকিছু। আমি আশা করব এবং অনুরোধ করব, আমাকে যেন কোনকিছুতে জোর করা না হয়। আমি যতদিনই এখানে কাজ করেছি, পূর্ণ নিষ্ঠার সাথে কাজ করেছি। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনায় আমি একজন নিয়মিত কর্মী হয়েও বেশ আনপ্রোফেশনাল ছিলাম, এজন্য ক্ষমা চাইছি।"
ম্যানেজার এবার যেন কিছুটা নরম হলেন ইরামের প্রতি। বললেন,
"দেখুন, মিসেস ইরাম, পার্সোনালি আমরা আপনার এই ব্যাপারে শুরু থেকেই সব জানি। আমাদের আরও উপরে জবাব দিতে হয়, যার জন্যই রুলস মোতাবেক অনেক কিছু না চাইতেও করতে হয়। তাই বলে তো এই নয়, যে আমরা আপনাকে চাকরি ছেড়ে দিতে বলছি। উই নো, হাউ সিনসিয়ার ইউ আর!"
"না, স্যার। শুধু সেজন্য না। মূলত আমার আর মন টানছে না। আমি কিছুদিন একটু সকল ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকতে চাই। আমার যদি নিজেকে আবারও স্ট্রং আর যোগ্য মনে হয়, আমি আবার কাজে ফিরব।"
"এভাবে তো হয় না, মিসেস ইরাম।"
"না হোক, স্যার। যেখানে যেভাবেই হোক। আমার কোনো সমস্যা নেই। আমি শুধু এই মুহূর্তে একটু আড়ালে থাকতে চাই।"
ম্যানেজার আর জোর করতে পারলেন না ইরামকে। আবারও অভিবাদন আর বিদায়ী শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি ইরামের সাথে আলাপ ওখানেই শেষ করলেন।
∞
ফাইয়ায নিজের কাজে মনোযোগী হয় ইরাম যাওয়ার পর। ইরাম তাকে আপাতত কিছুই বলেনি।
ফাইয়ায ডেস্কের সামনে কারও আবছায়া বুঝতে পেরে মুখ তুলে তাকাতেই চমকে ওঠে। পরপরই সজোরে হেসে বেশ আন্তরিক সুরে বলল,
"কী ব্যাপার, আলী রায়হান! হঠাৎ আপনার আগমন হলো কোথা থেকে?"
আলী মুচকি হেসে ফাইয়াযের বন্ধুসুলভ সমাদর গ্রহণ করে। হ্যান্ডশেক করে চেয়ারে বসতে বসতে বলল,
"একটু কাজ ছিল। তবে আশা রাখিনি তোর সাথে দেখা হবে।"
ফাইয়ায হাসল। বলল,
"হ্যাঁ, বেশিদিন হয়নি জয়েন করেছি। আচ্ছা, আগে কাজটা শেষ করি? পরে কোথাও গিয়ে বসি। কী কাজে এসেছিস?"
আলী বুঝিয়ে বলল সবকিছু। সব শুনে ফাইয়ায অবশেষে বলল,
"যাক বাবা, অনেক খুশি হলাম বিয়ের কথা শুনে। অবশেষে আপনার ভালোবাসা ধরা দিলো তবে!"
আলী আবারও মুচকি হাসে।
হাতের কাজ নিপ্টিয়ে দুজনই কিছু সময়ের জন্য ব্যাংকের বাইরের এক ক্যাফেতে গিয়ে বসল। কথায় কথায় ফাইয়ায জানাল, তার বিয়ের ব্যাপারে। আলী মোটেও অবাক হলো না। বরং ফাইয়াযকে আরও উৎসাহ দিয়ে বলল,
"ভেরি গুড! এবার মা-মেয়ে দুজনের খেয়াল রাখিস।"
ফাইয়ায হঠাৎই কেমন যেন বাচ্চামো ভঙিমায় বলে ফেলল,
"ইশ, তুই যদি ইলাকে দেখিস না... ধরে খালি আদর করতে ইচ্ছে করবে। এত কিউট একটা বাচ্চা!"
আলী টেবিলের উপর ফেলে রাখা হাত উঁচিয়ে কিছুটা দূরে সরে নাকচ করল,
"না, থাক! বাচ্চাকাচ্চা আমার দুচোখের শত্রু এমনিতেই। আমার দরকার নেই এত আদর করার। তোর মেয়ে, তুই করিস। আমার সাথে শুধু দেখা করিয়ে দিলেই হবে।"
ফাইয়ায হো হো করে হেসে ওঠে। খোঁচা মারতে বলল,
"এখনও আগের স্বভাব যায়নি? অথচ নুরাইন কিন্তু বাচ্চাই ছিল!"
আলী অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। ধীর গলায় বলল,
"ওর ব্যাপার আলাদা! বাট আই হেইট কিডস!"
ফাইয়ায হাসল তবুও। বন্ধুর কাঁধ চাপড়ে বলল,
"নো প্রবলেম! কিছু সময় গেলেই ঠিক হয়ে যাবে!"
আলী যেন কানেই তুলল না ও-কথা।
কথা প্রসঙ্গে আলী জিজ্ঞেস করল ফাইয়াযকে,
"বাসার কী অবস্থা তোর? আন্টি কেমন আছেন?"
"হ্যাঁ, ভালোই। ইরাম আসার পর খুব একটা ভালো ছিল না বাসার অবস্থা। বিশেষ করে মা তো জানিসই... মানে ইরামের সাথে আমার বিয়েটা কোনভাবেই মানতে পারছিলেন না। কিন্তু ইদানীং ভালোই নরম হয়েছেন। খুব একটা কথা বলেন না, আবার রাগারাগিও করেন না।"
"যাক, ভালো। চিন্তা করিস না। আমাদের সমাজে এখনও মানুষ খুব একটা ইউজ টু না এসবে! ভালো থাকা দিয়ে মূল কথা! তোদেরকে সুখী দেখলে একদিন না একদিন মেনে নিবেনই।"
একটু থেমে আলী ফের জিজ্ঞেস করল,
"তোর একটা বোন ছিল না? কী যেন নাম? মনেই পড়ছে না। ও কেমন আছে?"
"হ্যাঁ, সুপ্তি। আছে ভালোই। ইরাম আর ইলার সাথে তার আবার খুব খাতির চলে!"
দুজনই সমস্বরে হেসে ওঠে।
আলী চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে বলল,
"আর বাকিরা সবাই ভালো আছে?"
ফাইয়ায এবার বেশ আফসোসের ভঙিমায় শ্বাস ছাড়ে। পরপর বলল,
"জানিসই তো, মেঝ ভাইয়া যে ঘর ছেড়েছেন, আর কোনদিনও বাসায় আসেননি। আমি আগে প্রায়ই তার নিউজ চ্যানেলে যেতাম। এখন আর যাওয়া পড়ে না খুব একটা।"
"নিউজ চ্যানেল? কোন চ্যানেলে?" আলীর স্বাভাবিক কণ্ঠ।
ফাইয়াযও তার চায়ে শেষ টান দেয়। মাথা নাড়িয়ে সম্মতিসূচক জবাব দিলো,
"হুম্ম! মেঝ ভাইয়া নিউজ নাইনে আছেন। বড়ো ভাইয়াও তো সেইম অফিসেই ছিলেন।"
আলী যেন বেশ বড়োসরো একটা ধাক্কা খেল এবার। মনের সন্দেহ চাপিয়ে রেখে সে ফের জিজ্ঞেস করল,
"নিউজ নাইন? নাম কী তার? কোন পদে আছেন উনি?"
ফাইয়ায স্বাভাবিকভাবেই প্রতিত্তুর করল,
"নিউজ নাইনের এডিটিং ডিরেক্টর সে। জাভেদ ওয়াসিম খান। কেন নিউজ দেখিস না? ডিরেক্টর হলেও প্রায়ই তাকে খুব গুরুত্বপূর্ণ নিউজ লাইভে দেখা যায় তো।"
সন্দিহান আলীর ভেতরে একপলক ছারখার অনুভূতি হলো যেন। সে কপাল চুলকে বেশ ভালো ভাবেই নিজেকে সামলে নেয়। পরপরই ফাইয়াযের উদ্দেশ্যে বলল,
"আচ্ছা, চল উঠি এখন। আমার আরও কিছু জায়গায় কাজ আছে।"
∞
জাভেদ ওয়াসিম একদমই নির্লিপ্ত ছিলেন নুরাইনের বলা কথায়।
— "স্যার, আই যাস্ট গট মেরিড টু ডে'স বিফোর।"
কথাটা প্রায় বিস্ফোরণের মতোই ছিল। অথচ জাভেদ ওয়াসিমের একটুও দৃষ্টি এলোমেলো হলো না। সে প্রায় অভ্যাসমতোই তার বাজখাঁই কণ্ঠ বজায় রেখে বললেন,
"কংগ্রেটস, মিসেস নুরাইন।"
নুরাইন মিষ্টি করে হাসল। পরপরই বলল,
"হুট করে ঐদিনই... তাই ওভাবে কাউকে জানানো হয়নি আসলে।"
জাভেদ ওয়াসিম ল্যাপটপের স্ক্রিনে মনোযোগ দৃষ্টি রেখেই বললেন,
"দ্যাটস নট আ ম্যাটার, মিসেস নুরাইন। ইটস অল এবাউট ইউর পার্সোনাল প্রায়োরিটি।"
নুরাইন আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। জাভেদ ওয়াসিম তার দিকে আর দ্বিতীয়বার চোখ তুলে দেখেনি। অবশ্য যাওয়ার আগে আবার পেছন ফিরে মনের কথাটা বলতে ভুলল না সে,
— "থ্যাংকিউ স্যার! সেদিন আপনি না প্রকাশ করলে আমি এখনও ভুলের ভেতরেই বসে রইতাম।"
জাভেদ ওয়াসিম তখনও অন্যমনস্ক নুরাইনের প্রতি। তবে তা শুধু নুরাইনই জানল। জাভেদের বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসা পোড়া দীর্ঘশ্বাস কেবিনের দরজায় দাঁড়ানো নুরাইন বুঝলই না।
নিরবতায় পানি না ফেলে চুপচাপ জাভেদ ওয়াসিমের কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে এলো নুরাইন।
পুরো অফিসের মধ্যে দ্বিতীয় ব্যক্তি শুধু ইশতিয়াক সাহেবই জানলেন, নুরাইনের বিয়ের বিষয়টা।
∞
রাতে...
ফাইয়ায ঘরে ফিরল প্রচণ্ড খারাপ মেজাজে। তবে প্রকাশ ঘটল না তার বদরাগী আচরণের। অভ্যাসবশত অতিরিক্ত রাগে সে চুপচাপ ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসে রইল। ইলা তখন সুপ্তির ঘরে বসে টুকিটাকি পড়ছে।
ইরাম এলো হাতে ঠান্ডা শরবতের গ্লাস নিয়ে। ফাইয়াযের দিকে বাড়িয়ে দিলে সে চুপচাপ গ্লাস খালি করে ইরামের হাতে ফিরিয়ে দেয়। ইরাম ফাইয়াযের নিরবতা আঁচ করে। মস্তিষ্ক মুহূর্তেই বুঝে যায়, ফাইয়াযের এরূপ শান্ত থাকার পেছনের কারণ কী হতে পারে! ইরাম অস্বীকার যেতে চাইল না। চুপচাপ ফাইয়াযের পাশটায় বসল। ফাইয়াযের কিছুই জিজ্ঞেস করতে হলো না তাকে। ইরাম নিজ থেকে বলা শুরু করে,
"চাকরিটা আপাতত করতে চাই না।"
ফাইয়ায নিরবে শুনল সে কথা।
সামনের মানুষটার নিরবতা বুঝে ইরাম নিজেই আবার বলল,
"ইলার জন্মের পর থেকে একটাদিনও আমি ওকে সময় দিতে পারিনি। আমার এইটুকু বাচ্চা বলতে গেলে একাই বড়ো হয়েছে। মানুষের কাছে অবহেলার শিকার হয়ে। মা হয়ে ওকে আমি রাতের সময়টুকু বাদে কখনোই কাছে রাখতে পারিনি। এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে, আমি হয়ত কিছুদিন ইলাকে কাছে রাখার সুযোগ পেয়েছি। একদিন ইলাও বড়ো হয়ে যাবে। আমি চাইলেও ও আর আমাকে সবসময় খুঁজবে না। আমার আদরের লোভে কাছ ঘেঁষবে না। তাই রিজাইন লেটার দিয়ে এসেছি। অন্য কোনো কারণ নেই।"
এবারও ফাইয়ায চুপ রইল। ইরাম এবার না পেরে কিছুটা কাছে আসে ফাইয়াযের। ফাইয়াযের গুটিয়ে রাখা লম্বা পা দুটোর কাছাকাছি ঘেঁষে হাত ছোঁয় তার হাঁটুর বাটে। ক্ষীণ স্বরে ডেকে উঠল,
"ফাইয়ায? আপনি কি শুনছেন আমি কী বলছি?"
ফাইয়ায অলক্ষ্যে পেঁতে রাখা নজর এবার ফিরিয়ে আনল ইরামের পানে। কেবল শান্ত গলায় জানতে চাইল,
"আমাকে কি এই কথাগুলো আগে বলা গেল না?"
ইরামের নজর নিচু হয়ে আসে। পরপরই বলল,
"যদি না বোঝেন আমায়। তাই বলতে..."
"আমি বুঝব না?" ফাইয়াযের ঠান্ডা গলার প্রশ্ন।
"ফাইয়ায...?" ইরাম পাল্টা সুর তোলে।
"আমি আপনাকে কারও সামনে ছোটো করতে চাইনি।"
"কিন্তু আমি তো হয়েছি, তাই না?"
ফাইয়াযের কাটকাট প্রশ্নে অস্বস্তিবোধ করে ইরাম। সে মানানোর চেষ্টায় আবার বলল,
"আমি চাইনি বিষয়টা ওভাবে বাড়ুক।"
"কিন্তু বেড়েছে তো?"
ইরাম আর বাক্য বিনিময় করতে পারল না। ফাইয়াযই এবার বলল,
"আপনি একটাবার আমার সাথে এই বিষয়ে কথা বলেই দেখতেন? মিসেস রোদেলা ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে কাজে ব্যাক করার কথা বলেছিল। তার অনুরোধও নাকচ করেছেন আপনি। ইলার জন্য, ফাইন! বলতে তো পারতেন? সবাই ভেবে নিচ্ছে, আপনার চাকরি ছাড়ার পেছনের কারণ আমি! আমি আপনাকে বিয়ে করেছি বিধায়। সিরিয়াসলি, ইরাম? আমি বলেছি একবারও আপনি আপনার ক্যারিয়ার, আপনার ইচ্ছে-অনিচ্ছা সব হাওয়ায় গুলিয়ে বাসায় বসে শুধু ঘর-সংসার করুন?"
ইরামের চোখ ছলছল করে। তখনই ফাইয়াযের চওড়া কণ্ঠের খাঁদ নেমে আসে। ইরামের চোখের পানি পড়ার আগেই সে তার বাহু খামচে ধরে। ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুটা কেঁপে ওঠে ইরাম। তবুও ফাইয়ায তাকে ছাড়ল না। হতাশ সুরে জিজ্ঞেস করল,
"আপনি এ কোন ইরাম? এতটা নাজুক, ভঙুর কি আপনি? আমি আপনাকে চিনতেই পারছি না। কিছু হলেই কেঁদে ফেলা, ভয় পেয়ে কেঁপে ওঠা, এই নাজুক ইরামকে আমি পছন্দ করিনি কখনো। আমি সেই ইরামকে চাই, যার জন্য আমার বুকে ঝড় উঠেছিল। যার আগুনচোখে আমি রীতিমতো হড়বড়িয়ে যেতাম, ইরাম। কেন আপনার এই বিশাল পরিবর্তন, কেন?"
ইরামের ভেতরের অস্বস্তি কাটে যেন। সে দুহাতের বাহু ছাড়িয়ে ফাইয়াযের গলা জড়িয়ে ধরে আচানক। ফাইয়াযের বুকে মিশে যায় মুহূর্তেই। শক্ত বাঁধনে আঁকড়ে ধরে পুরুষালি দেহটাকে। এরপরই ফাইয়াযকে শুধায়,
"আমি বরাবরই এমন ছিলাম। বরং ঐ শক্ত আর দাম্ভিক রূপের খোলসটা দুনিয়ার সামনে আমার অন্য এক পরিচয় ছিল।"
ফাইয়ায সুযোগ পেয়ে যেন উতলে ওঠে। সে নিজেও ইরামের পিঠে রাখা হাতদুটো আরও শক্তভাবে চেপে ধরে। ইরামকে হারিয়ে ফেলার ভয়েই কিনা কে জানে!
ফাইয়ায আবদার করে বসে,
"কিন্তু ঐ রূপটাই যে এই ভয়ঙ্কর দুনিয়ায় বেঁচে থাকতে সবথেকে বেশি প্রয়োজন, ইরাম।"
"হোক। দরকার পড়লে আবার ঐ রূপে ফিরব। কিন্তু এখন সবথেকে নিরাপদ জায়গায় আছি। এখন ওমন মুখ দিয়ে আগুন বের করা ড্রাগন রূপে ফিরতে চাই না।"
ফাইয়ায হতভম্ব হয়ে সজোরে হেসে ওঠে। ইরামকে ছাড়িয়ে সামনে টেনে আনে। তার একগালে আদর মাখা হাত বুলিয়ে ঠাট্টার সুরে বলল,
"বাহ! আপনি মজাও করতে জানেন তাহলে?"
পরক্ষণেই ইরামের ফর্সা গালদুটোতে লালিমা ছড়ায়। সে ফাইয়াযের বুকে আলতো চাপড় মেরে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।
ফাইয়ায আবার বলে ওঠে,
"আমাকে আপনার ভয় হয় না তাহলে? আমার কাছে নিরাপদ মনে হয় আপনার?"
ইরাম চোখ তুলে মায়াভরা চাহনিতে ফাইয়াযকে দেখে। দুপাশে মাথা নাড়িয়ে দ্রুত নিজের উত্তর জানায়। পরপরই বলল,
"আমি জানি, আপনি আমার স্বাধীনতায় কোনদিন বাঁধা দিবেন না। তবে এইটুকু স্পেস আমি নিজে চাইছি। একটু কিছুদিন ইলার সাথে, আপনার সাথে, একটু স্বস্তিতে থাকতে চাইছি আপনার ঘরে। আপনার কাছে।"
ফাইয়াযের বুঝি বুক ভরে ওঠে ও-কথায়। সে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করল ইরামকে। তার ওরনার আড়ালে থাকা কপালের চুলগুলো গুছিয়ে কোমল ওষ্ঠজোড়ায় নরম স্পর্শ মাখিয়ে বলল,
"আপনার যেমনটা ইচ্ছে, ইরাম!"
চলবে...
পড়ুন #কনফ্লিক্ট
— হাজারও দ্বন্দ্বের ভিড়ে জিইয়ে থাকা ভালোবাসাদের উপস্থিতিকে।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the public figure
Website
Address
Dhaka