Md. Enamul Haque Rabbi
28/02/2026
“আমার বন্ধু নাজমুল ৪ আগস্ট ২০২৪ তারিখে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানার ভিতরে নাজমুলকে নি* র্মমভাবে হ* ত্যা করা হয়। সারদায় ট্রেনিংয়ের পুরো এক বছর দিনের প্রায় ১৬ ঘন্টা একসাথে থাকা হতো। খুব কাছ থেকে দেখা হয়েছে নাজমুলকে। নাজমুলের দ্বারা মানুষকে হ* ত্যা তো দূরে থাক কোনো প্রাণীকে আঘাত করা সম্ভব নয়। এনায়েতপুর থানার ১৪ জন পুলিশকে হ* ত্যা করে ফেলে রাখার একটা ভিডিও ফেসবুকে এসেছিল। সবার বিভৎস র*ক্তাক্ত চেহারা দেখে সনাক্ত করা কষ্টকর হলেও নাজমুলকে চিনতে পেরেছিলাম। নাজমুল মুমূর্ষু অবস্থায় একবার হাত উঠানোর চেষ্টা করেছিল। পরক্ষণেই নিস্তেজ হয়ে গেছে। ভিডিওটা আর ২য় বার দেখার সাহস করতে পারিনি।
নাজমুলের মেয়ে আর আমার মেয়ে একই বয়সী। বাবার আদর স্নেহ থেকে আজীবনের জন্য বঞ্চিত হয়েছে আমাদের ভাতিজি।
আমি আবেগী একজন মানুষ। এই লেখাটা আরও বড় করতে চেয়েছিলাম। চোখের পানি আটকে দিলো আমাকে😭
আপনাদের কাছে হাত জোর করে মিনতি করে বলছি পুলিশ হ* ত্যার বিচারটা কইরেন🙏
-মোহাইমুমুল ইসলাম লিমন
*"অস্থির এক জেনারেশনের সাথে আছি আমরা। বিলিভ ইট অর নট, এই জেনারেশনের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই, আদর্শিক কোনো এমবিশান নেই, পবিত্র কোনো মিশন নেই।"*.....
*"এরা রোদে হাঁটতে পছন্দ করে না, বৃষ্টিতে ভিজতে চায় না। কাঁদামাটি, ঘাস, লতাপাতায় এদের এলার্জি। এরা আধা কিলোমিটার গন্তব্যে যেতে আধা ঘন্টা রিক্সার জন্য অপেক্ষা করে। এরা অস্থির, প্রচণ্ড রকম অস্থির এক জেনারেশন।*"..
*"এরা গান শোনে না, সিনেমা দেখে না, খেলাধুলাতেও এদের অনীহা। এরা এক্সারসাইজ করে না, সকালে ব্রেকফাস্টও করে না।*"....
*"এরা সিনিয়রদের সম্মান করে না — না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে হেঁটে চলে যায়, গায়ে ধাক্কা দিয়ে বা পায়ে পাড়া দিয়ে দাঁত কেলিয়ে হাসে। সরি বলার টেণ্ডেন্সিও এদের মধ্যে নেই। গুরুজনদের সাথে অনর্থক তর্ক জুড়ে দিতে এদের জুড়ি মেলা ভার।*".....
*"এদের মাঝে না পাবেন বিনয়ী ভঙ্গি, না পাবেন কৃতজ্ঞতাবোধ। এদের উদ্ধত আচরণ, ড্যাম কেয়ার অ্যাটিটিউডে আপনি পদে পদে বিব্রত হবেন। সংযত হওয়ার উপদেশ দিতে চাইলেই বিপদ, অপর পক্ষের নাজেহাল হওয়ার সম্ভাবনা একশোতে একশো।*".....
*"আপনি পাবলিক বাসে চড়ছেন, দেখবেন খালি সিটটায় জায়গা পেতে সবচেয়ে জুনিয়র ছেলেটাই বেশি প্রতিযোগিতা করছে। আপনাকে ধাক্কাটাক্কা দিয়ে সটান বসে পড়বে। তার বয়সের দ্বিগুণ হয়েও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আপনার তেমন কিছু করার থাকে না।*"......
*"বলছিলাম বর্তমান জেনারেশনের কথা। সবচেয়ে ভয়াবহ কথা, যে আসরে এদের দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেই আসরে এরা নিজের জন্য চেয়ার খোঁজ করে। যেখানে চুপ থাকার কথা, সেখানে জ্ঞান দিতে চেষ্টা করে।*"......
*"সারা রাত ধরে অনলাইনে থাকে, সারা সকাল ঘুমায়। এরা সূর্যোদয় দেখে না, সূর্যাস্ত দেখে না। সূর্যোদয়ে বিছানায় থাকে, সূর্যাস্তে মোবাইলে থাকে।*"....
*"এরা মোবাইল গেমস আর ফার্স্টফুডে আসক্ত। নির্দিষ্ট করে বললে মূলত অনলাইন গেম, ফেসবুক, ইউটিউব, রিলস দেখা এদের ফার্স্ট প্রায়োরিটি।*"..
*"এরা ইতিহাস জানে না, সাহিত্য বোঝে না, শিল্প সংস্কৃতি কি বস্তু তা চেনে না। এরা বই কেনে না, এরা বই পড়ে না, বই বোঝে না।*".........
*"এরা নন-স্কিলড। এরা হাঁটতে পারে না, দৌড়াতে পারে না, গাছে চড়তে জানে না, সাঁতার কাটতে পারে না, গান গাইতে পারে না, ছবি আঁকতে পারে না। এদের মধ্যে সাগর পাড়ি দেওয়ার দু:সাহস নেই, পাহাড় কেটে পথ তৈরি করার অদম্য মনোবল নেই। এদের উচ্ছ্বাস নাই, আবেগ নাই, ভালোবাসা নেই। এদের একটাই স্কিল, স্মার্ট ফোন দ্রুত স্ক্রল করতে পারা৷*"......
*"এদের না আছে মূল্যবোধ, না আছে শ্রদ্ধাবোধ, না আছে শৃঙ্খলা। কখন চলতে হবে, কখন থামতে হবে, কখন বলতে হবে, কখন শুনতে হবে, এরা জানে না। এরা কি যে জানে না সেটাও জানে না।"*....
19/10/2025
প্রায় ত্রিশ বছর পর হঠাৎ একদিন হোটেলের লবিতে দেখা হয়ে গেল আমার এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে। শৈশবের সেই মৃদুভাষী, ভদ্র, শান্ত ছেলেটি—যে খুব সাধারণ জীবন যাপন করতো—আজো যেন সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। চেহারায় বিনয়ের ছাপ, পরনে সাধারণ পোশাক, চালচলনে নেই কোনো বাহুল্য।
কুশল বিনিময়ের পর আমি বললাম, "চল, তোমায় গাড়িতে বাড়ি পৌঁছে দেই।"
আসলে গাড়িতে তুলে নেওয়ার পেছনে একটা গোপন উদ্দেশ্য ছিল—আমার দামী মার্সিডিজ গাড়িটা ওকে দেখানো! মনে হচ্ছিল, বন্ধু দেখুক আমি কত সফল, কত বড়লোক হয়েছি! কিন্তু সে বিনয়ের সাথে জানালো, “না, থাক, আমি আমার গাড়িতেই চলে যাব।”
পার্কিং লটে দুজনে পাশাপাশি হেঁটে এলাম। বন্ধুর গাড়িটা একেবারেই সাধারণ। মনটা একটু খচখচ করল, ভাবলাম, ও এখনও এমন সাধারণ গাড়ি চালায়?
সপ্তাহখানেক পরে ওকে ডিনারে আমন্ত্রণ জানালাম। ও পরিবারসহ এলো। তার স্ত্রী, সন্তান সবাই এতই নম্র আর মার্জিত যে দেখে মনটা ভরে গেল। সাজ-পোশাকে কোনো আড়ম্বর নেই, কিন্তু একটা প্রশান্তি, একটা শান্ত সৌন্দর্য তাদের চোখেমুখে।
সেই ডিনারে আমি কৌশলে বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছিলাম—আমার অভিজাত জীবন, দামি বাড়ি, লাক্সারিয়াস আসবাবপত্র, অফিসের বিদেশ ভ্রমণ, শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি ঝোঁক, কত কত ধনী লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ—এসব যেন ও দেখেই মুগ্ধ হয়।
সত্যি কথা বলতে, আমি যেন আমার আভিজাত্য ওর চোখে ঢুকিয়ে দিতে চাইছিলাম। একটার পর একটা ছবি দেখাচ্ছিলাম, গল্পের ফাঁকে ফাঁকে বিজনেস প্রসঙ্গ তুলছিলাম।
কিন্তু ও যেন এসব নিয়ে খুব একটা উৎসাহী না। বরং ওর মুখে তখন অন্য আলো—শৈশবের স্কুল, পুরোনো বন্ধু, প্রিয় স্যারদের কথা... কতদিন কারও খোঁজ নেওয়া হয় না, কতজন এখন আর বেঁচে নেই—এসব মনে করে ওর চোখে একটুখানি জলও দেখা গেল।
আমার স্ত্রী তখন পাশ থেকে একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “শুধু পুরোনো স্মৃতি আর নীতিকথা মনে করে থাকলে জীবনে এগোনো যায় না!”
আমি একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম।
ডিনারের পরে ওরা চলে গেল। আমি ভাবলাম, এবার নিশ্চয় ও বুঝতে পারল, কে কতদূর এগিয়েছে!
কয়েক সপ্তাহ পর ফোন এল বন্ধুর কাছ থেকে। বলল, “দুপুরে একটু সময় করো, বাড়িতে খেতে এসো।” আমি ওকে অনেক ভালোবাসি, তাই স্ত্রীকে জোর করে রাজি করিয়ে গেলাম ওর বাসায়।
বাড়িতে গিয়ে দেখি, খুব গোছানো, পরিপাটি কিন্তু একদম সাধারণ। দামি আসবাব নেই, ঝকমকে কিছু নেই, তবু কী যে শান্ত আর আপন একটা পরিবেশ! যেন একটা মমতার ঘ্রাণ চারপাশে ভাসছে।
টেবিলের উপর চোখ পড়তেই দেখি—আমার কোম্পানির পাঠানো একটা সুন্দর গিফট বক্স!
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, “এই কোম্পানিতে তো আমি চাকরি করি! তুমি এটা কোথায় পেলে?”
সে হেসে বলল, “জাফর পাঠিয়েছে।”
আমি থমকে গিয়ে বললাম, “কোন জাফর ? জাফর চৌধুরী ?”
সে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, সেই জাফর চৌধুরী । ও আমার পুরনো বন্ধু। আমরা বহুদিন ধরেই একসাথে ব্যবসা করি।”
আমি যেন অবিশ্বাস করছিলাম! এই মানুষটাই আমাদের কোম্পানির ৭০% মালিক! যার নামে আমরা সম্মানে মাথা নিচু করি, সেই জাফর চৌধুরীর বন্ধু—এই আমার সেই ছোটবেলার সাধারণ বন্ধু!
আমি যেন মুহূর্তেই নিজের ভেতরে খুব ছোট হয়ে গেলাম। যে মানুষটিকে আমি আমার দামী জিনিসপত্র দেখিয়ে মুগ্ধ করতে চেয়েছিলাম, সে তো নিজেই আমার চাকরিদাতার বন্ধু। এমনকি কোম্পানির বেশিরভাগ মালিকানাও তার!
আমার অহংকার, দম্ভ, গর্ব—সব যেন এক নিমেষে চুপসে গেল। গাড়িতে ফিরে স্ত্রীর দিকে তাকালাম। দেখলাম, তিনিও চুপচাপ। আমাদের মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু মনের মধ্যে চলছে অনেক কিছু।
হঠাৎ মনে পড়ল, আমাদের স্কুলের সেই প্রিয় স্যার বলতেন, “যে নদী যত গভীর, তার বয়ে চলার শব্দ তত কম।”
আজ সত্যিই বুঝলাম কথাটার মানে। যাদের হৃদয়, মানসিকতা আর আত্মবিশ্বাস গভীর—তারা কখনো বাহারি কথা বলে না, দামি জিনিস দেখিয়ে বড় হওয়ার চেষ্টা করে না। তারা নীরবেই বয়ে চলে, কিন্তু তাদের গভীরতাই সত্যিকারের বড়ত্ব।
আজ আমি একটা কারুকার্যখচিত ঘটের মধ্যে বন্দি জল নয়, বরং গভীর নদীর নিঃশব্দ বয়ে চলা দেখেই বাড়ি ফিরলাম।
(সংগ্রহীত)
26/07/2025
ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক পরিবারে ৭ জনকে হত্যা যা বাংলাদেশের ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ বলা হয়ে থাকে।
এই ইতিহাস টা জানতে আমার খুব আগ্রহ ছিলো কারণ প্রায় সময় হরষপুর গেলে রাস্তা থেকে কবর গুলা চোখে পরতো ছোটবেলা থেকে শুধু শুনতাম আজকে পুরো ঘটনা জানতে পারলাম।
১৯৮৭সালের মধ্য অক্টোবর মাসের একদিন ভোরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার নিদারাবাদ গ্রামে শশাঙ্ক দেবনাথ নামের এক দরিদ্র সনাতন ধর্মাবলম্বী মুড়ির মোয়া বিক্রেতা হঠাৎই নিখোঁজ হয়ে যান।
ঠিক নিখোঁজ বলা যায়না, কারন পূর্ব পরিচিত তাজুল ইসলামের ডাকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তিনি। সন্তানসম্ভবা স্ত্রী বিরজাবালাকে বললেন, তিনি গুড় আনতে বেরোচ্ছেন, কয়েক ঘন্টা পরেই ফিরে আসবেন।
না এরপর ফিরেননি শশাঙ্ক। ঘণ্টা যায়, দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়। শশাঙ্ক আর ফিরেন না। তাজুল কে এরপর যতোবারই বিরজাবালা জিজ্ঞেস করেছিলেন 'শশাঙ্ক কোথায়?'
তাজুলের একটাই জবাব শশাঙ্ক তার কাছে জমি বিক্রি করে ভারতে চলে গেছে! একপর্যায়ে বাধ্য হয়েই আদালতে তাজুলের নামে অপহরণের মামলা করেন বিরজাবালা। কারন তাজুলই তো তাকে ডেকে নিয়েছিল।
একপর্যায়ে তাজুল পুলিশের ভয়ে গা ঢাকা দেন। একদিন গ্রামে থাকেন তো এরপর আবার হারিয়ে যান। আবার গ্রামেও ফিরে আসেন। এদিকে বিরজাকে মামলা তুলে দিতে বারবার চাপ প্রয়োগ করেই চলেছেন। কিন্তু বিরজা অনড়। কোনমতেই তিনি মামলা তুলে নিবেন না।
এভাবে দু বছর কেটে যায়। মামলার রায় ঘোষণারও দিন ঘনিয়ে আসতে থাকে। আর তাজুল আঁটেন ভয়ঙ্কর এক ষড়যন্ত্র। যার ফলাফল দুই বছর পরের এক রাত্রি।
১৯৮৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের এক রাত্রিতে শশাঙ্কের মতো এবার উধাও হয়ে গেল শশাঙ্কের গোটা পরিবারও।
একরাতের মধ্যেই হাওয়া সবাই। শশাঙ্কের পরিবারে ছিলেন তাঁর স্ত্রী এবং পাঁচ সন্তান। গ্রামের মধ্যে রটে গেল মূলত শশাঙ্ক যেহেতু আগেই ভারতে চলে গেছে। দু বছর পর সুযোগ বুঝে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদেরকেও এখন নিয়ে গেছে। এখানেই সমাপ্ত হলো প্রথম অধ্যায়ে।
তার মধ্যে স্থানীয় কেউ কেউ দাবী করে বসলো শশাঙ্ক তাদের কাছে তাঁর বাড়িঘর ও জমিজমা বিক্রি করে চলে গেছে। এদের মধ্যেতাজুল বললেন যেহেতু শশাঙ্ক তার জমির মালিকানা বুঝিয়ে দেয়নি সুতরাং এই জমি তার। বিরজাও সেটি জানতো। একপর্যায়ে ঝগড়াঝাটি হলেও সময়ের ব্যবধানে তা একসময় মিটেও গেল।
গ্রামের লোকজন শশাঙ্ককে গালাগালি করে বলতে লাগলো, 'মালোউনের বাচ্চা, এক জমি তিনজনের কাছে বিক্রি করে আ-কাডাগো দেশে পালাইছে। বেঈমান, মালাউন।' কাহিনীটা তবে এখানে শেষ হলেও পারতো।
কিন্তু না। এখানেই ঘটনার শুরু। এর কিছুদিন পর গ্রামের স্কুল শিক্ষক আবুল মোবারক একদিন বিকেলে নৌকা যোগে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ধুপাজুড়ি বিলের পানিতে দুর্গন্ধযুক্ত তেল ভাসতে দেখেন। তিনি মাঝিকে নৌকাটা খানিক ঘুরিয়ে নিতে বলেন। হঠাৎ নৌকার নিচে কী একটা আটকে যাওয়ায় দুলে উঠে নৌকা। মাঝির বৈঠায় খটখট শব্দ হয়। কিছুটা সন্দেহ আবুল মোবারকের। মাঝি তখন বৈঠা দিয়ে পানির নিচে খোঁচাখুঁচি করতেই উঠে আসে একটি ড্রাম।
ড্রামটির মুখ আটকানো। চারদিকে ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধ। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হওয়ায় আবদুল মোবারক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার সহ গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের খবর দিলেন। একপর্যায়ে ড্রাম খুলতেই সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। ড্রামে তিনটি লা'শ।
কারো কারো মনে সংশয় আরও বাড়লো। সন্ধান চললো আরও অনেকক্ষণ। এক পর্যায়ে বিলেই পাওয়া গেল আরেকটি ড্রাম। সে ড্রামে টুকরো টুকরো করে রাখা আছে আরও তিনজনের লা'শ। মোট ছয়টি লাশ!
এরা আর কেউ নয়, ১১দিন আগে নিখোঁজ হওয়া ঐ গ্রামেরই নিরীহ শশাঙ্ক দেবনাথের স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানের লা'শ ছিল এগুলো। শশাঙ্কের এক মেয়ে সুনীতিবালা শ্বশুরবাড়ি থাকায় তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
এদিকে ঘটনার পরপরই গা ঢাকা দেয় তাজুল ও গ্রামের কিছু লোক। তখন তদন্তে নামে পুলিশ। পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শশাঙ্কের জমি দখল করতে প্রথমে শশাঙ্ককে খু'ন করে লাশ গুম, এবং পরে এক রাতে পুর পরিবার কেই, নৌকায় তুলে নিয়ে মেরে ড্রামে ভরে বিলে পুতে ফেলা হয়। দিনে তারা প্রচার করছিল বিরজাবালার পরিবার ভারতে চলে গেছে।
তদন্তে দেখা যায় মূলত শশাঙ্কের সম্পত্তির উপর লোভ ছিল পাশের গ্রামের কসাই তাজুল ইসলামের। এ কারণেই প্রথমে অপহরণ করে শশাঙ্ককে হ'ত্যা করেছিল সে। দুই বছর পর তার স্ত্রী-সন্তান সহ ছয়জন কে হ'ত্যা করে ড্রামে চুন মিশিয়ে লা'শ ভরে বিলে ফেলে দেয়া হয়। মনে রাখা ভালো, তাদের সর্বকনিষ্ঠ নি'হত সন্তানের বয়স ছিল দুই বছর।
বিরজা ও তার সন্তানদের লাশ পাওয়ার পরে তো তাজুল লাপাত্তা। এদিকে হত্যাকাণ্ডের আগে তাজুলের বিরুদ্ধে বিরজার অপহরণ মামলা এবং তারপর বিরজা ও ছয় খু'ন; এবং লাশ পাওয়ার খবরে তাজুলের ফেরারি হওয়া; পুলিশের তদন্ত সব জায়গাতেই তাজুল এই খুনের প্রধান আসামি। ইতিমধ্যে ধরা পড়ে গেছে তাজুলের সহযোগীরাও।
১৯৮৯ সালের অক্টোবর মাসে তাজুল কে খুঁজতে পুলিশ মরিয়া হয়ে উঠে। কিন্তু তার টিকিটিরও সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিলো না। এই ঘটনা নিয়ে সারাদেশের মানুষের কৌতূহল। পত্রিকায় ও কলামের পর কলাম ছাপা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনবরত চাপের মুখে পুলিশেরও ঘুম হারাম। এদিকে তাজুলের কোন ছবি নেই। তাই বোঝা যায়না কে তাজুল।
শেষপর্যন্ত স্থানীয় এক সাংবাদিকের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে তাজুল কৃষি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে ছিলো। সেখানে তার ছবি থাকতে পারে। শেষপর্যন্ত পুলিশ সেখানেই তার ছবি পেয়ে যায়। সেই ছবি মতে কিছু দিন অভিযান চালালেও পুলিশ তাজুলকে পায়নি।
এরই কিছুদিন পরে সিআইডির এক গোয়েন্দা ঢাকার কাকরাইল মসজিদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎই এক মুসল্লিকে দেখে থমকে যান তিনি। মুসল্লির গালে লম্বা দাড়ি। চুল পেছনে ঘাড়ের নিচ পর্যন্ত নেমে গেছে। মাথায় সাদা গোল টুপি। তাবলিগ জামাতের একদল মানুষের মাঝে লোকটি দাঁড়ানো। কিছুক্ষন পরেই তারা অন্য একটি জেলায় দ্বীনি দাওয়াতের কাজে চলে যাবে।
সিআইডির ওই গোয়েন্দা পকেট থেকে ভাঁজ করা পত্রিকার ছেঁড়া একটি কাগজ বের করলেন। একবার কাগজের দিকে তাকালেন, পরক্ষনেই তাকালেন সেই লোকটির দিকে। তিনি বুঝতে পারছেন না, পত্রিকার ছবির মানুষটি তার সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তিটি একই কিনা। ছবিতে কিন্তু দাড়ি নেই। চুল ছোট। আর সামনে যে লোক দাঁড়িয়ে আছেন সেই লোকের লম্বা দাঁড়ি এবং বাবরি চুল।
একপর্যায়ে ঐ লোকের চোখে চোখ রাখেন সেই গোয়েন্দা। চোখাচোখি হতেই তিনি নিশ্চিত হন এই সেই লোক। যাকে গোটা দেশের মানুষ খুঁজছে। সঙ্গে সঙ্গেই সঙ্গীদের নিয়ে জাপটে ধরেন জোব্বা পরা লোকটি কে। লোকটি তখন চিৎকার করে মুসল্লিদের কাছে সাহায্য চাইতে মুসল্লিরা এগিয়ে আসলো।
সঙ্গে সঙ্গে সিআইডির সেই গোয়েন্দা তার সঙ্গে থাকা সিআইডির পরিচয়পত্র দেখান এবং বলেন এই সেই তাজুল। গোয়েন্দা পুলিশের দল তাজুলকে মালিবাগ সিআইডি দফতরে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে পুলিশ এ ঘটনায় ৩৮ জনকে দায়ী করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছিল।
আদালতে দেয়া জবানবন্দীতে তাজুল এই হত্যাযজ্ঞের যে বিবরণ দিয়েছিলেন তা পড়তে গেলে যে কারোই গা শিউরে উঠবে। মানুষ যে কতোটা পাশবিক, নিষ্ঠুর ও ভয়ঙ্কর হতে পারে তা এই হত্যাযজ্ঞের জবানবন্দী প্রমান করে।
জবানবন্দীতে তাজুল বলেছিলো, ‘আমি শশাঙ্ক দেবনাথের সম্পত্তি দখল করার জন্য বিরজাবালা ও তার সন্তানদের হ'ত্যা করার পরিকল্পনা করি। হত্যার ৫/৬ দিন পূর্বে পাঁচগাওয়ের বাজারের একটি কাঠের দোকানের পিছনে আমি আবদুল হোসেন ও বাগদিউয়ার হাবিবকে প্রথমে জানাই যে শশাঙ্কের সম্পত্তি দখলের জন্য বিরজাবালা ও তার সন্তানদের হ'ত্যা করতে হবে।
আব্দুল হোসেন আমার কথায় রাজি হয় এবং সে ৩০ হাজার টাকা দাবী করে। আমি ২০ হাজার টাকা দিতে রাজি হই। এর পরের দিন বাজারের চায়ের দোকানে আবদুল হোসেন আমাকে টাকা যোগাড় করার করে বাগদা গ্রামের মোমিনের কাছে জমা রাখতে বলে। দুইদিন পর আমি মোমিনের নিকট প্রথম দিনে ১৫ হাজার টাকা জমা রাখি। একইসঙ্গে ঘটনার কাজে সহায়তা করার জন্য অন্যান্য আসামীকে নিয়োজিত করি।
৩রা সেপ্টেম্বর আবদুল হোসেন আমাকে জানায়, ঘটনার জন্য লোকজন প্রস্তুত এবং ৫ই সেপ্টেম্বর রাতে ঘটনা ঘটাতে হবে। আমি এক্তারপুরের সহিদ মাঝির ইঞ্জিনের নৌকা ২০০টাকায় ভাড়া করি। ৫ই সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১০টায় মোমিন, হাবিব, ইদ্রিস আলী, আজম, আলী আহমেদ, শামসু, বাদশা, সুতা মিয়া, বেলু, ফিরোজ, আবদুল হোসেন, সৈয়দ মিয়া, জজ মিয়া, আবু সায়েদ, কাসেম, তাজন, হরিপুরের ফিরোজ, সহিদ, মানু এবং পরিচিত ৮/১০জন নৌকা যোগে, পায়ে হেঁটে আমার বাড়িতে আসে। তখন আমি একটি ছোট ঘরে শুয়ে ছিলাম। আবদুল হোসেন সেই ঘরে গিয়ে আমাকে সংবাদ দেয়।
তখন সব লোকজন এসে পৌঁছেছে। এরপর একটি ইঞ্জিন নৌকায় আমি, আবদুল হোসেন, ইদ্রিস আলী, বাগদিয়ার হাবিব বাদশা, ফিরোজ, কাসেম, ধনু, আজম , আলী আহমেদ এবং বাকি চারজন উঠি। আমার হাতে একটা রামদা এবং অন্যদের হাতে লাঠি, বল্লম, টর্চ লাইট ছিল। মোমিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দুটি ড্রাম, লবণ ও দুই মন চুন আগেই কিনে রেখেছিলো। ড্রাম, চুন ও লবণ ইঞ্জিনের নৌকায় রাখি।
রাত আনুমানিক ১২টায় দুটি নৌকা যোগে আমরা শশাঙ্কের বাড়ির দিকে রওয়ানা দিই। নৌকা দুটি শশাঙ্কের বাড়ির পাশে ভিড়ে। নৌকায় দুজনকে পাহারায় রাখা হয়। বাকিরা সকলে শশাঙ্কের বাড়িতে উঠে আসি। ফিরোজ প্রথমে একটি লোহার শাবল দিয়ে বিরজাবালার ঘরের পিছনের জানালার রড বাঁকা করে ভিতরে প্রবেশ করে এবং ঘরের সামনের দরজা খুলে দেয়। আমরা কয়েকজন ভিতরে প্রবেশ করি। অন্যরা তখন বাইরে পাহারায়।
দরজা খোলার পর বিরজাবালা ও তার ছেলে মেয়েদের পশ্চিমের কক্ষে চৌকিতে ও মাটিতে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পাই। আমি ও আবদুল হোসেন বিরজাবালার মুখ চেপে ধরি। বিরজাবালার বড় মেয়ে সামান্য চিৎকার দিয়েছিল। বাকিরা বিরজাবালার ৫ ছেলে মেয়ে কে মুখ চাপিয়ে কোলে করে নৌকায় উঠায়।
নৌকায় উঠানোর পর আবুল হোসেন বিরজাবালা ও তার ছেলে মেয়েদের কে ধমক দিয়ে বলে শব্দ করলে কেটে ফেলবে। তারপর ইঞ্জিন নৌকাটি ধোপাজুরি বিলে যায়। ইঞ্জিন বিহীন নৌকাটি ইঞ্জিনের নৌকার পিছনে ছিলো। ধোপাজুরি বিলে নৌকা থামিয়ে আবদুল হোসেন ও ফিরোজ বিরজাবালা কে চেপে ধরে। আমি রামদা দিয়ে বিরজাবালার নাভী বরাবর দুই তিন কোপ দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করি।
আজম ও ফিরোজ বিরজার বড় মেয়ে নিয়তিকে চেপে ধরে, আবদুল হোসেন রামদা দিয়ে দুই কোপে মেয়েটিকে দ্বিখণ্ডিত করে। ধনু মিয়া বিরজার ছোট ছেলে কে গলা চেপে মেরে ফেলে। ফিরোজ আলী বিরজার ছোট মেয়েকে চেপে ধরলে আজম দা দিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে। বাদশা এবং হাবিব বিরজা ও শশাঙ্কের ছোট দুটি ছেলেকে কুপিয়ে দ্বিখণ্ডিত করে।
বিরজাকে কাটার সময় শরীরে কাপড় ছিলো না। তারপর খণ্ডিত দেহগুলিকে দুটি খালি ড্রামে ভর্তি করে লবণ ও চুন দিয়ে ঢাকনা বন্ধ করে পানিতে ডুবিয়ে রশি দিয়ে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখি। পরে রক্তরঞ্জিত নৌকাটি ধুয়ে ফেলি। আমি ও আবদুল হোসেন সবাইকে সতর্ক করে দিই, ঘটনা ফাঁস করলে বিরজাবালার মত পরিনতি হবে।
ঘটনার পরদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসে আমার চাচাতো ভাই মতিউর রহমান কে ৯শতক নিজের জমি রেজিস্ট্রি করে দিই।
জবানবন্দীতে তাজুল বিরজার স্বামী অর্থাৎ শশাঙ্ককে হ'ত্যার বিবরণও দিয়েছিল। শশাঙ্ককে তাজুল হত্যা করেছিল আরও দু বছর আগে। জবানবন্দীতে তাজুল সেই হ'ত্যা সম্পর্কে বলেছিলো!
'দুই বছর পূর্বে এক শুক্রবার সকাল সাড়ে পাঁচটায় আমি ও আমার জামাতা ইনু শশাঙ্কের বাড়িতে যাই। শশাঙ্ককে জানাই তার মেয়ের জামাই মনা দেবনাথ ভারত সীমান্তে তার জন্য অপেক্ষা করছে। শশাঙ্ক তার কথা অনুযায়ী জামা পরে আমাদের সাথে বের হয়।
আমি এবং ইনু শশাঙ্ককে নিয়ে মাধবপুরের নিজনগর গ্রামে আজিদের বাড়িতে গিয়ে উঠি। আজিদের বাড়ির একটি ঘরে শশাঙ্ক কে বসিয়ে রাখি। আজিদ শশাঙ্ককে জানায় সীমান্তে স্পেশাল পার্টি কাজ করছে তাই এখন সীমান্ত পার হওয়া সম্ভব না। মধ্য রাতে পেরোতে হবে।
আনুমানিক রাত ১২টায় ঐ ঘরে আমি, ইনু, আজিদ এবং অপর দুইজন লোক শশাঙ্কের গলায় গামছার ফাঁস দিয়ে হ'ত্যা করি! আজিদ এবং অপরিচিত দুই ব্যক্তি শশাঙ্কের মৃতদেহ কাঁধে করে ভারতের চেহরিয়া গ্রামে নিয়ে যায় এবং একটি পরিত্যক্ত রিফিউজি ক্যাম্পের পাত কুয়ায় নিক্ষেপ করে চলে আসে।
এই নারকীয় হ'ত্যাযজ্ঞের দায়ে বিচারের রায়ে ফাঁসি হয়েছিলো তাজুল ও তাঁর সহযোগী'দের। তাদের প্রতি মানুষের এতোটাই ঘৃণা ছিল ফাঁসি হওয়ার পর নিদারাবাদ গ্রামে মানুষ উৎফুল্ল হয়ে ঘরে ঘরে মিষ্টি বিতরণ করেছিল।
এমনকি তাজুল ও তার সহযোগীদের লাশ যখন জেল থেকে বের করছিল তখন মানুষ থুতু আর জুতা মেরেছিল। সেই খুনের ঘটনা স্মরণ করতে গেলে আজো আঁতকে উঠেন নিদারাবাদের মানুষ।
পরবর্তীকালে এ নিদারাবাদের সেই নিকৃষ্ট হত্যাকাণ্ড নিয়ে ‘কাঁদে নিদারাবাদ’ নামেও একটি চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছিলো।
©আজহার উদ্দীন।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Contact the public figure
Telephone
Address
Brahmanbaria
3450