SMS TV

SMS TV

Share

24/06/2026

হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার: সংস্কার, বিতর্ক ও আমাদের করণীয়
-মুহাম্মদ ওলীউর রহমান মানিক

কিছুদিন ধরে সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার ও মাজার-সংশ্লিষ্ট আর্থিক বিষয় নিয়ে সারা দেশে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম হয়েছে। একজন সিলেটি হিসেবে এ বিষয়ে কিছু কথা না বললে নিজেকে ক্ষমা করতে পারছি না। যদিও আমার কথায় হয়তো খুব বেশি কিছু যায় আসে না।

কথা (১): আমার অবস্থানঃ
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার-সহ সকল ধর্মীয় স্থাপনার আয়-ব্যয় এবং আর্থিক খাত স্বচ্ছ ও সুস্পষ্টভাবে জনসম্মুখে প্রকাশ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
আল্লাহর ওলিদের নাম ভাঙিয়ে কেউ যেন ব্যবসা বা অনিয়ম করতে না পারে, সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে মাজারের আশপাশে শরিয়তবহির্ভূত কর্মকাণ্ড—যেমন মাজারে সিজদা, শিরক, কুফরি, নাচ-গান ও মাদক—চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
তবে এসব বন্ধ করার নামে যেন মাজারের আদব রক্ষা, মাজার জিয়ারত, জিকির-আজকার, মিলাদ-কিয়াম, এতিম-অনাথ ও দুস্থ মানুষের খিদমত, এবং মসজিদ-মাদরাসা পরিচালনায় কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, সেদিকেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতে হবে। এবং মাজারবিদ্বেষীদের যেকোনো ষড়যন্ত্র রুখে দিতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা জরুরি।

কথা (২): মাজার কারা পরিচালনা করেন?
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, হযরত শাহজালাল (রহ.) জীবদ্দশায় বিবাহ করেননি। তাঁর কোনো সন্তান-সন্ততি ছিল না। এ কারণেই তাঁকে “মুজাররাদে ইয়ামানী” বলা হয়।
১৩৪৬ কিংবা ১৩৪৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর রেখে যাওয়া খিদমত আঞ্জাম দেওয়া, তাঁর মাজার রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত লঙ্গরখানা পরিচালনার জন্য তাঁর সঙ্গে আগত ৩৬০ আউলিয়ার বংশধরেরা “সারেকওম” নামে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
সেই খাদিমদের মুতাওয়াল্লি (প্রধান) ছিলেন তাঁর অন্যতম প্রধান সহচর হাজী মুহাম্মদ ইউসুফ।
প্রায় ৭০০ বছর ধরে তাঁর বংশধরেরা মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব পালন করছেন এবং অন্যান্য ৩৬০ আউলিয়ার বংশধরেরা খাদিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
বর্তমান মুতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান, হাজী মুহাম্মদ ইউসুফ-এর বংশধর।
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সঙ্গী ৩৬০ আউলিয়া বৃহত্তর সিলেটজুড়ে দ্বীন ইসলামের প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের উত্তরসূরীরা বংশপরম্পরায় এই খিদমতের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছেন।
বিশেষ করে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার-এর খিদমত প্রায় ৭০০ বছর ধরে তাঁরাই আঞ্জাম দিয়ে আসছেন।
সেই সময় যোগাযোগব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না, অর্থনৈতিক সচ্ছলতাও আজকের মতো ছিল না। আউলিয়া একরামের বংশধরেরা নিজেদের সম্পদ ও সামর্থ্য থেকেই দীর্ঘদিন আর্থিক খাত পরিচালনা করতেন। সুতরাং আউলিয়া একেরামদের খিদমত ও ত্যাগের ফলেই সিলেটে আজকের ইসলামের এতো জয়জয়কার। তাদের অবদান কোনভাবেই খাটো করে দেখা যাবেনা। তাদের ব্যাপারে কথা বলতে সর্বোচ্ছ সতর্কতা জরুরী।

কথা (৩): সিলেটের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আজকের শাহজালাল (রহ.) মাজারের আর্থিক অবস্থানঃ
সিলেটের আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন মূলত ১৮৭০-এর দশকে ব্রিটিশ আমলে শুরু হয়। ১৮৭৮ সালে সিলেট মিউনিসিপ্যালিটি গঠনের পর রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং ১৯৩৬ সালে কিন ব্রিজ (Keane Bridge) চালুর মাধ্যমে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে ধাপে ধাপে সড়ক, রেল ও আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হতে থাকে।
ফলে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আউলিয়া প্রেমি মুসলমানদের পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্তের পর্যটক, ভক্ত ও মুরিদানগণ সহজেই সিলেটের দরগাহে শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করতে আসেন। মূলত মাজার পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খিদমতে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে ভক্ত, মুরিদ ও পর্যটকদের আর্থিক অনুদান আজ একটি বড় অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।

কথা (৪): সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রপাগান্ডা:
গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শাহজালাল (রহ.) মাজারের আর্থিক খাত নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা-সমালোচনা চলছে। অনেক জায়গায় এ নিয়ে একটি False Narrative তৈরি করা হচ্ছে—যেন মাজারে জমাকৃত নাজরানার সমস্ত অর্থ খাদেমরা আত্মসাৎ করে ফেলেন।
এখানে আমার মনে দুটি প্রশ্ন জাগে।
প্রথমত, যারা এই ন্যারেটিভ ছড়াচ্ছেন তারা আসলে কারা?
দ্বিতীয়ত, যদি দরগাহ কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ অর্থ আত্মসাৎ করে ফেলেন, তাহলে এত বিশাল পরিসরের দরগাহ পরিচালিত হয় কীভাবে?

আমার পর্যবেক্ষণে, যারা দরগাহর আর্থিক খাত নিয়ে বিতর্ক ছড়াচ্ছেন, তাদের একটি বড় অংশ মাজারবিদ্বেষী। তারা এমন একটি আদর্শ ধারণ করেন, যাদের অনুসারীরা অতীতে এই দরগাহে বো*মা হা*ম*লা চালিয়েছে। তাদের কেউ কেউ মাজার ভেঙে ফেলার হুমকি দিয়েছেন, কেউ শাহজালাল (রহ.)-এর মর্যাদা খাটো করার চেষ্টা করেছেন, আবার কেউ মাজারকে “মারকাজুশ শিরক” বলেও আখ্যায়িত করেছেন।
এসব বিবেচনায় বিষয়টি নিছক সংস্কারের দাবি নয়; এর পেছনে ষড়যন্ত্রমূলক উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।

শাহজালাল (রহ.) মাজার পরিচালনায় প্রতিদিন বিপুল ব্যয় হয়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ, দর্শনার্থীদের জন্য তাবারুকের ব্যবস্থা, লঙ্গরখানায় অসহায় মানুষের খাবারের আয়োজন—সবকিছুতেই বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়। স্বাভাবিকভাবেই এসব ব্যয় এই তহবিল থেকেই আসে।
তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে, খাদেমরা এখান থেকে অর্থ গ্রহণ করেন এবং এ খাতে স্বচ্ছ হিসাবের ঘাটতি রয়েছে। তাই একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় এনে খাদেম পরিবারগুলোর জন্য নির্ধারিত বণ্টন ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন। এই বিষয়টি সুশাসনের আওতায় আনা জরুরি।

কথা (৫): ডিসি মহোদয়ের সাহসিকতা এবং বাড়াবাড়িঃ
বাংলাদেশের আইনি কাঠামোতে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের মতো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি মূলত ‘ওয়াকফ সম্পত্তি’ হিসেবে স্বীকৃত। বাংলাদেশে ওয়াকফ সম্পত্তির পরিচালনা, আইনি অধিকার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রধানত Waqfs Ordinance, 1962 এবং ওয়াক্ফ (সম্পত্তি হস্তান্তর ও উন্নয়ন) বিশেষ বিধান আইন, ২০১৩-এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।
সে হিসেবে সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলম সাহেব যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তার আইনি ভিত্তি রয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি সাহসী উদ্যোগ।
তবে আমার মতে, এই সাহসিকতা কিছু ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছে। কারণ, প্রায় ৭০০ বছর ধরে একটি কওম বা গোষ্ঠী বংশপরম্পরায় যে খিদমত আঞ্জাম দিয়ে আসছেন, তাদের সরাসরি বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রশাসনের হাতে নিয়ে আসা যথাযথ হয়নি।
ডিসি ও এসপি সাহেবের নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, দানবাক্স সিলগালা করা এবং প্রশাসনের একক নিয়ন্ত্রণে হিসাব পরিচালনা—এসব পদক্ষেপে দীর্ঘদিনের খাদেমদের মতামত ও ভূমিকা উপেক্ষিত হয়েছে। যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খিদমত করে আসছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত ছিল।

কথা (৬): করণীয় ও বর্জনীয়ঃ
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ধর্মীয় স্থান। এখানে যেমন অতিরিক্ত কঠোরতা দেখানো উচিত নয়, তেমনি সম্পূর্ণ ছাড়ও দেওয়া উচিত নয়।
মাজারের আর্থিক খাতে যেমন সংস্কার প্রয়োজন, তেমনি অনৈসলামিক কার্যক্রম বন্ধ করাও জরুরি। একইসঙ্গে ৩৬০ আউলিয়ার উত্তরসূরি ও মাজারের খাদেমদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এজন্য স্থানীয় প্রশাসন, মাজারের খাদেম এবং মাজারকে ভালোবাসেন—এমন স্থানীয় উলামায়ে কেরামের সমন্বয়ে একটি বিশেষায়িত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটির অধীনে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করে মাজার পরিচালনার খিদমত আঞ্জাম দেওয়া সম্ভব।

উপসংহারঃ
সর্বোপরি, হযরত শাহজালাল (রহ.) ইসলামপ্রিয় জনতার আবেগ, ভালোবাসা ও আস্থার প্রতীক। তাই সংস্কারের নামে কোনো মাজারবিদ্বেষী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রমূলক নীলনকশা যেন বাস্তবায়িত না হয়, সে বিষয়ে সিলেটের মুসলমানদের সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা জরুরি।

21/06/2026

উপদেষ্টা হযরত মাওলানা হাবিবুর রহমান সাহেব ও সহ সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ শাহাব উদ্দিন কে বিদায়ী সংবর্ধনা প্রদান কালে নেতৃবৃন্দের বক্তব্য।

Want your business to be the top-listed Media Company in Sylhet?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Telephone

Address

Sylhet Divisions
Sylhet
3100