Rakhal Raha
পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জনার চ্যালেঞ্জ–১
ধর্ম বই থেকে হাদীস সব ফেলে দেওয়া হচ্ছে, এর প্রতিবাদে এনসিটিবি ঘেরাও হবে এবং এনসিটিবির ইট খুলে নেওয়া হবে—এরকম একটি প্রোগ্রামের কথা একদিন আমরা জানতে পারলাম।
গত অক্টোবর মাসে হবে সম্ভবত। যেহেতু এমন কোনো কাণ্ড আমরা করছিলাম না, বা তা করার কথাও না, তাই সেই চরম ব্যস্ততার মধ্যে এসব বিষয়ে আমাদের মনোযোগ দেওয়ার সময় ছিল না।
সময় ঘনিয়ে এলে একদিন সেই ঘেরাও প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত আমার এক পরিচিত জন ফোন করে দেখা করতে চাইলেন। তিনি ইসলামী পণ্ডিত এবং মুফতী। আমি তাঁকে আসতে বললাম। তিনি আমার অফিসে এলেন এবং বললেন, গত রাতে এই আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ মিলে তাঁরা গভীর রাত পর্যন্ত মিটিং করেছেন, এবং তিনি এসেছেন শেষ মুহূর্তে এ বিষয়ে আমাকে জানাতে।
আমি তাঁকে নিয়ে এনসিটিবিতে গেলাম। যাওয়ার পথেই ফোন করে ইসলাম শিক্ষা বইয়ের পরিমার্জনা কাজের সাথে যুক্ত দুজন বিশেষজ্ঞকে এনসিটিবিতে আসতে অনুরোধ করলাম। তাঁরাও এসে গেলেন। আমরা টেবিলে বসলাম বিষয়টা নিয়ে আলোচনার জন্য। আমাদের সাথে চেয়ারম্যান সাহেবও যোগ দিলেন।
আমি ৬ষ্ঠ, ৭ম, ৮ম ও ৯ম শ্রেণীর ইসলাম শিক্ষা বইয়ের পরিমার্জিত পাণ্ডুলিপি দিয়ে বললাম, দেখুন তো কোথায় এখানে হাদীস ফেলে দেওয়া হয়েছে?
তিনি আগের বইগুলো চাইলেন এবং সেগুলো দেওয়ার পর তেমনকিছু না পেয়ে বললেন, তাহলে হাদীস অস্বীকারকারীকে পরিমার্জনার কাজে নিয়েছেন কেন?
বললাম, তিনজন বিশেষজ্ঞ একসাথে বসে কাজ করেছেন। দুইজন একমত হয়ে পরিমার্জনার সুপারিশ করেছেন এবং একজন আলাদাভাবে মতামত দিয়েছেন। এনসিটিবি-র নিজস্ব বিশেষজ্ঞ এবং সমন্বয় কাজের সাথে যারা আমরা যুক্ত, তারা আলাদা মতকে গ্রহণ করিনি। তাই তিনি বুঝেছেন যে, এটা গ্রহণ করা হচ্ছে না এবং মেনে নিয়ে চলে গেছেন।
মুফতী সাহেব বললেন, কিন্তু তাকে নিলেন কেন, তিনি তো আগে থেকেই হাদীস অস্বীকার করেন?
বললাম, এখানে তিনটা শিক্ষাধারা থেকে তিনজন ইসলামী বিশেষজ্ঞ আছেন। একজন আলীয়ার, একজন কওমীর এবং একজন সাধারণ ধারার। তাঁদের মধ্যে একজন মানুষের একটা মত থাকতে পারে এবং তিনি এখানে কাজের মাধ্যমে দেখলেন যে, তা গ্রহণযোগ্য হবে না, এবং তিনি এটা বুঝে চলে গেলেন। এটা ভালো, নাকি বাইরে থেকে তিনি সমাজে তর্কবিতর্ক করে চলবেন, এটা ভালো?
তিনি বললেন, তবু আপনি অনেক ঝুঁকি নিয়েছেন, এ সময়ে এতো ঝুঁকি নেওয়া ঠিক হয় নাই। আপনি জানেন না, এটা কয়েক কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে। কিন্তু ট্রান্সজেণ্ডার আবার ঢোকানো হচ্ছে কেন?
আমি বললাম, কাজ করতে হলে কিছু ঝুঁকি নিতেই হয়, কিন্তু ট্রান্সজেণ্ডার কেন ঢোকাবো আমরা? এটা ছিল নতুন কারিকুলামে এবং সেই কারিকুলাম তো সরকার শুরুতেই বাতিল করেছে। আমরা তো ২০১২ সালের কারিকুলামের বই পরিমার্জনার কাজ করছি, ওখানে তো ট্রান্সজেণ্ডার নেই।
তিনি বললেন, তাহলে সারা দেশে এতো কিছু হচ্ছে কেন? আপনারা জানাচ্ছেন না কেন সবাইকে?
আমি বললাম, আমরা তো শুরু থেকেই বলছি যে, আমরা কি করছি। এখন আমি বললে শুনতে পায় একশো জন মানুষ, আর আপনি বললে শুনতে পায় এক কোটি মানুষ। তাহলে কি আমার কথা আপনার কাছে পৌঁছাবে? তো আমার কি করার আছে বলেন? আপনি তো এসে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারতেন যে ভাই কি হচ্ছে এগুলো। এখানে ঢুকতে তো সচিবালয়ের মতো পাশ লাগে না। এনসিটিবি কি আপনার প্রতিষ্ঠান না? তাহলে আপনি কাকে ঘেরাও করতে আসছেন, আর ইট খুলে নিতে চাইছেন? ৫ই আগষ্টের পরেও যদি আমাদের ৫ই আগষ্টের আগের মতোই চলতে হয়, তবে আর এতো রক্ত দিলাম কেন?
তিনি বুঝতে পারলেন এবং বললেন, আমার মনে হয় আমাদের মধ্যে ইনফরমেশন গ্যাপ হয়েছে, এ কারণে এমনটা ঘটেছে।
আমি বললাম, এই গ্যাপের কি কোনো দরকার ছিল? আপনারা কয়েকজন এসে চেয়ারম্যান সাহেবকে বললেই কি হচ্ছে বুঝতে পারতেন। এখন কি হলো? সারা দেশের মানুষের কাছে একটা ভুল মেসেজ গেল না? এতো শক্তি ক্ষয় করার কি দরকার ছিল?
তিনি বললেন, আসলেই এর কোনো দরকার ছিল না। আমি সবাইকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলবো এবং আশা করি আর কোনো সমস্যা হবে না। কিন্তু বইয়ের নামটা “ইসলাম ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা” পাল্টায়ে যদি শুধু “ইসলাম শিক্ষা” করে দেন, এতে অনেক দোয়া পাবেন, সবাই খুব খুশী হবে।
আমি বললাম, বিষয়টা শিক্ষাসংক্রান্ত ও আনুষ্ঠানিক বিষয়, হুট করে করা তো যাবে না, এবারই এটা করা যাবে কিনা এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ ভেবে জানাতে পারবে।
চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, এটা করা যাবে আশা করি। কারণ পরিমার্জন কাজগুলো যথাযথ প্রক্রিয়ায় অনুমোদন করা হবে।
মুফতী সাহেব আবারও বললেন, এটা যদি করা যায় সারা দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের অনেক দোয়া আপনারা পাবেন।
এরপর তাঁর সাথে অনেক হৃদ্যতাপূর্ণভাবে আমাদের সেদিনের মিটিংটা শেষ হলো এবং ঘেরাও কর্মসূচীও থেমে গেল এবং এভাবেই “ইসলাম ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা” বইয়ের নাম “ইসলাম শিক্ষা” হলো।
শিক্ষা : সর্ব পরিস্থিতিতেই কোথাও কিছু শুনে বা পড়ে বিশ্বাস না করুন, কারো সম্পর্কে বা কোনো কিছু সম্পর্কে আগেই সন্দেহ না করুন, ভালোভাবে জানার ও বোঝার চেষ্টা করুন, এবং সবসময় কাণ্ডজ্ঞান জাগ্রত রাখুন।
[জগতে ভালবাসা এবং আরও ভালবাসার সুযোগ সৃষ্টি করে যাওয়াই মানুষের একমাত্র কাজ।—রাখাল রাহা, ১লা ফাল্গুন ১৪৩১]
23/02/2025
আমেরিকা থেকে বইয়ের জগতের সম্পাদক ও প্রবন্ধকার আহমাদ মাযহার ভাইয়ের আগমন এবং আজ বাসায় দুজনের শবেবরাতের হালুয়ারুটি ভক্ষণ। তিনি আসা মানেই আমার ছেলেমেয়ের পছন্দের বই কলম ইত্যাদির আগমন। পরে সবাই মিলে বইমেলা ও ফাল্গুনের উৎসবে গমন।
Click here to claim your Sponsored Listing.
Category
Website
Address
Dhaka
1205