Tale By Samia
19/05/2026
#প্রণয়াবেশিত_ধ্রুবতারা
#সামিয়া_জামান
পর্ব ০৫
১০|
অরীব বার দুয়েক ঘড়ি দেখলো। চারটা বেজে ঊনপঞ্চাশ মিনিট। উনিশ মিনিট লেইট। অরীব এখন গুলশানের একটা নামিদামি ক্যাফেতে বসে আছে। খুব সুন্দর করে সাজানো একটা ক্যাফে। নিজের জন্য অর্ডার করা দু নম্বর কফির কাপে চুমুক দিল অরীব। মা সকালে বাগানের বেতের চেয়ারে বসে বসে মেয়েটার সম্পর্কে তাকে ব্রিফিং দেওয়ার সময় বলেছিল মেয়েটা নাকি ডাক্তারি পড়ছে। মায়ের অন্যপাশের বেতের চেয়ারে বসে অরীব তখন বাধ্য ছেলের মতো উনার কথাগুলো শুনেছে। তখন মেয়েটার ডাক্তারি পড়া নিয়ে কিছু বোধ না হলেও এখন মনে হলো ডাক্তারি পড়ে একজন সময়জ্ঞান নিয়ে এতো কান্ডজ্ঞানহীন? কিরকম ডাক্তার হবে ভবিষ্যতে? দ্যা পেশেন্ট হ্যাড ডাইড বিফোর দ্যা ডক্টর অ্যারাইভড টাইপ? তাও বাংলাদেশের মতো দেশে। যেখানে হাসপাতালে মৃত রোগীকে এনে ডাক্তারদেরকে দোষারোপ করা হয়? আর এমন সময় জ্ঞানহীন মেয়েকেই কিনা তার মা তার জন্য বাছাই করেছেন। ভাগ্য! ফোন বের সে ওর জুনিয়র জাবেরকে একটা দরকারি টেক্সট দিতে দিতে আবারো কফির কাপে চুমুক দিল।
“ এক্সকিউজ মি? ”
মেয়েলি কন্ঠ শুনে অরীব ফোন থেকে মুখ তুলে সামনে তাকালো। তার সামনে শাড়ি পড়ুয়া এক তরুণী দাঁড়িয়ে। বুঝতে পারলো এ-ই তার জন্য মায়ের পছন্দ করা মেয়ে। আসার আগে মা তাকে হোয়াটসঅ্যাপে মেয়েটার কিছু ছবি দিয়েছিল। ছবিগুলোতে বড় বড় লাগলেও মেয়েটাকে সামনাসামনি ছোট লাগছে দেখতে। অবশ্য তার তুলনায় তো ছোটই। অরীব ফোনটা পকেটে রেখে উঠে দাঁড়ালো। ভদ্রতার সহিত শান্ত স্বরে প্রশ্ন করলো,
“ সামিহা রহমান? ”
মেয়েটা মাথা নাড়লো। অরীব এগিয়ে গিয়ে তার সামনের দিকে রাখা চেয়ারটা টেনে মার্জিত কন্ঠে বললো,
“ প্লিজ সিট। ”
সামিহা এক পলক অরীবকে দেখলো। চোখ দুটো সরু করে! লোকটার পরনে নীল সাদা চেক শার্ট। শার্টটার উপরের দিকের দুটো বোতাম খোলা। স্লিভ কুনই অবধি খুব সুন্দর করে ফোল্ড করা। শার্টের কোথাও কোনো ভাঁজ চোখে পড়লো না সামিহার। অথচ সে দূর থেকে লক্ষ্য করেছে লোকটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিল। গাঢ় ধূসর রঙের ফরমাল প্যান্টে শার্টটা টাক ইন করা। কোমড়ে কালো লেদার বেল্ট। পায়ে কালো শু। ভ্রুজোড়া কুঁচকে আড় চোখে যতটুকু চুলচেড়াভাবে একজনকে পর্যবেক্ষণ করা যায় সামিহা করে ফেললো। মনে মনে ভাবলো মিলেনিয়াল হওয়ার পরও এতো ভালো ফ্যাশন সেন্স! ইমপ্রেসিভ ব্যাপার স্যাপার। লোকটা ভালোই সুপুরুষ দেখা যায়। উঠে এসে চেয়ার টেনে ধরেছে তার বসার জন্য! এরপর সে ওর জন্য টেনে ধরা চেয়ারটায় বসে পড়লো। অরীব নিজের চেয়ারে গিয়ে বসতেই সামিহা তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো আরো কিছুক্ষণ। লোকটা বেশ লম্বা। তার পাশে যখন দাঁড়িয়েছিল তখন সে খেয়াল করেছে সে লোকটার কাঁধের পেরিয়ে আরেকটু লম্বা হবে। অথচ সামিহা নিজে পাঁচ ফুট ছয়। পাশে যখন দাঁড়িয়েছিল তখন সামিহার নাকে লোকটার গায়ে মাখা কোলোনের সুবাস ঠেকেছে। স্যান্ডেলউড আর সিডারউডের বেশ সতেজ ও ঝাঁঝালো একটা সুগন্ধ। চওড়া, শক্তপোক্ত গড়নের শরীর লোকটার। শার্টের আবরণও তার ফুলেফেঁপে থাকা মাংসপেশি গুলোকে আড়াল করতে পারেনি। সগর্বে তারা জানান দিচ্ছে তাদের অবস্থান। নিশ্চয়ই স্বাস্থ্য সচেতন। জিম টিমের অভ্যাস থাকলেও অবাক করা কিছু হবে না। দেখতেও বেশ সুদর্শনই। গায়ের রঙ তামাটে হলেও বেশ আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে লোকটাকে। সামনে ভদ্রভাবে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা অরীবকে ভালোমতো নিরীক্ষণ শেষে একটা কথাই মাথায় এলো সামিহার। সেটা এই যে, সামনে বসা লোকটি এতক্ষন অবধি বেশ ব্যক্তিত্ব-সম্পন্ন সুদর্শন সুপুরুষ! অবশ্য সেটা মুখ খুললে বোঝা যাবে। সুন্দর ব্যাটা মানুষ মুখ খোলার আগ পর্যন্ত সুপুরুষ ব্যক্তিত্ব সম্পন্নই থাকে। মুখ খুললে দেখা যায় তাদের চিন্তাধারা ঠিক কি পরিমাণ ব্যক্তিত্বহীন। নীচ! শ্রীহীন চিন্তাধারার। সামনে তাকিয়ে সে লক্ষ্য করলো তার মতো করে লোকটাও তার দিকে তাকিয়ে আছে। দৃষ্টি দিয়ে মেপে নিচ্ছে যেন। কালো চোখদুটির সে কি গভীর দৃষ্টি! অন্য কেউ হলে লোকটার অমন দৃষ্টিতে লজ্জা পেয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিত। কিন্তু সামিহা নিলো না। নিহালের মতে তার লজ্জা শরম একটু কম। কথাটা বোধহয় আসলেই সত্যি। কি একটা খেয়াল হতেই সে নিজের স্বাভাবিক হয়ে আসা ভ্রু দুটোকে আবারো কুঁচকে ফেললো। মনকে কড়াভাবে শাসিয়ে বোঝালো সে লোকটার উপর মুগ্ধ হতে মোটেও আসেনি। মোটেও না। তার উদ্দেশ্য লোকটার মুখের উপর বিয়ের প্রস্তাবখানি প্রত্যাখান করা। সে সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে হড়বড়িয়ে বলতে শুরু করলো,
“ দেখুন! আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই না! আপনাকে কেন! আমি কাউকেই বিয়ে করতে চাই না। এসব বিয়ে-টিয়ে আমার জন্য না। কি বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার। আমাকে নাকি সারাজীবনের জন্য আমার বাবা-মাকে ছেড়ে আরেকজনের বাসায় থাকতে হবে। তাও আরেকজনের রুমে এক বিছানায়। গুরুজনদের সামনে দিয়ে। ছিঃ! ছিঃ!! আমি পারবো না বাপু। তাছাড়া আমি নিজের ঘর আর আমার নরম বিছানা ছাড়া কোথাও ঘুমোতে পারি না। হলেও বেশিদিন থাকতে পারিনা এজন্যই। তাছাড়া আমার এখনো বিয়ের বয়স হয়েছে নাকি! সবে মাত্র তেইশ। আচ্ছা টু বি এক্সাক্ট সাড়ে তেইশ। এই বয়সে কে বিয়ে করে ভাই? তাছাড়া যদিও ধরে নেই আমার বিয়ের বয়স হয়েছে তাহলে বলতে হয় আমার বাবার অতি আদরের দরুন সংসার করার মতো কোনো ধরনের গুণই আমার নেই। আমি রাঁধতে পারি না, বাঁধতে পারি না। ঘরের অন্যান্য কাজ তো বাদই দিলাম। জানার মধ্যে যা জানি তাহলো কেবল পড়াশোনা করতে। এমন মেয়েকে কেউ বিয়ে করতে চাইবে? বলুন? আবার চাইতেও পারে! হু নোজ? মানুষের চয়েস যা বাজে আজকাল! কি আর বলবো। সে যাই হোক। কথা সেটা নয়! কথা হলো আমি আজ এখানে এসেছি শুধুমাত্র আমার আর আপনার আম্মুর সম্মানার্থে। তাছাড়া অন্য কোনো কারন নেই... আচ্ছা! আরেকটা কারন আছে। আমি এই সাক্ষাৎগুলো মানে ব্লাইন্ড ডেট কেমন হয় জানতে চেয়েছিলাম। তাছাড়া আর কোনো কারন নেই। আপনি কিন্তু আবার আমাকে বিয়ে করা নিয়ে জল্পনা কল্পনা সাজিয়ে ফেলবেন না জনাব। এতে করে আপনার আশা ভঙ্গ ব্যতীত কিচ্ছুই হবে না। কারন আমি বাসায় গিয়েই এই বিয়ের প্রস্তাবে মানা করে দিব। বুঝতে পেরেছেন? সেই সাথে আশা রাখবো আপনিও মানা করে দিবেন। ”
অরীব এতক্ষণ ধরে সামিহার কথাগুলো শুনছিল। মেয়েটাকে প্রথমে দেখে সে চুপচাপ ঠান্ডা ধরনের মেয়ে ভেবেছিল। এখন দেখা যাচ্ছে সে সম্পূর্ণ তার বিপরীত। মেয়েটা বললো তার বয়স নাকি তেইশ! দেখে মোটেও মনে হচ্ছে না এর বয়স তেইশ। শাড়ির কারনে কিছুটা ম্যাচিউর লাগছে বটে। গোলগাল ফর্সা মুখ, ঘন ও টানা ভ্রুদ্বয়ের নিচে ডাগর ডাগর কাজল কালো চোখ, লম্বা নাক আর সামান্য পুরু ঠোঁট। কোমড় ছুঁয়েছে ঘন চুলগুলো ছাড়া। সাদা রঙের ফুল স্লিভ ব্লাউজের সাথে হালকা নীল রঙের জামদানি শাড়িটা খুবই মার্জিত ভাবে পরা। মেয়েটাকে সব মিলিয়ে ভালো লাগছে দেখতে ভীষণ। মায়া মায়া লাগছে। মায়ের দেওয়া ছবিগুলোতে মেয়েটিকে এক পলক দেখে অরীবের মনে হয়েছিল মেয়েটি রূপবতী। এখন সামনাসামনি দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটি মায়াবতীও বটে। সেই সাথে মারাত্মক চঞ্চলও। অরীবকে কিছু বলতে না দেখে সামিহা ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মনে মনে ভাবলো লোকটা কি আদৌ তার কথা গ্রাহ্য করলো কিনা। নাকি হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে কোনো মতলব আটছে এই লোক। সামিহাকে অমন ভ্রু কুঁচকে তাকাতে দেখে অরীব সামান্য মুচকি হেসে বললো,
“ বলা শেষ? ”
সামিহা হঠাৎ এমন প্রশ্নে থতমত খেয়ে বললো,
“ জ্বি? ”
অরীব কফির কাপে চুমুক দিয়ে আগের মতোই শান্ত স্বরে বললো,
“ বলা শেষ? ”
সামিহা হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে থাকলো অরীবের দিকে। অরীব কিছুক্ষণ সামিহার নির্বাক প্রতিক্রিয়া দেখলো। এরপর ওয়েটারকে ডেকে বললো একগ্লাস ঠান্ডা পানি দিতে। ওয়েটার মিনিট খানেকের মধ্যেই পানি দিয়ে গেল। অরীব গ্লাসটা সন্তর্পনে পানির গ্লাসটা সামিহার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
“ আপনি পানিটা খাওয়ার পর নাহয় আমরা ঠান্ডা মাথায় কথা বলি? ”
সামিহা একবার চোখ ছোট ছোট করে অরীবকে দেখলো আরেকবার পানির গ্লাসটাকে। অরীব তার দিকে আগের মতোই সামিহাকে নাক মুখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসলো। সামিহা কপালে ভাঁজ ফেলেই পানির গ্লাসটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে পানিটা শেষ করলো। লোকটার মতলব সে বুঝতে পারছে না। গ্লাসটা আবারো টেবিলে রেখে সামিহা অরীবের দিকে তাকালো। সন্দিগ্ধ কন্ঠে বললো,
“ আপনি কি মতলব আটছেন বলুন তো? ইমপ্রেস করতে চাচ্ছেন কি? আমি কিন্তু সহজে মুগ্ধ হওয়ার পাত্রী নই। ”
অরীব শান্ত স্বরে বললো,
“ আমার আপাতত উদ্দেশ্য আপনাকে মুগ্ধ করা নয় জনাবা! আপনি সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকুন। ”
সামিহার লোকটার কথা শুনে মনে হলো সে হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। সেই সাথে এও মনে হলো সে একটা মিথ্যা কথা বলছে লোকটাকে। সে সহজে মুগ্ধ হয়না বলে। লোকটা খানিকটা, এই কিঞ্চিৎ পরিমাণ হলেও তাকে মুগ্ধ করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সেটা বলার তো কোনো প্রয়োজন নেই! কে কখন তাকে কোন কাজ দিয়ে মুগ্ধ করেছে সেটা কি এখন সে সবাইকে বলে বেড়াবে! কক্ষনো না। মানুষ তাহলে মাথায় চড়ে বসবে। চেয়ারে নিশ্চিন্তে হেলান দিয়ে বসে সামিহা বললো,
“ তা এখন আমাদের প্ল্যান কি? ”
অরীব বুঝতে পারলো না মেয়েটা কিসের প্ল্যানের কথা বললো। তাই জিজ্ঞেস করলো,
“ প্ল্যান? ”
সামিহা আগাগোড়া অরীবকে একবার জাজমেন্টাল লুক দিয়ে বিড়বিড় করলো,
“ পুউর মিলেনিয়ালস! সো স্লো টু প্রসেস ওয়ার্ডস! ”
তারপর স্বাভাবিক ভাবে বললো,
“ জিজ্ঞেস করলাম আপনার প্ল্যান কি? আমার মতে আমাদের কথাবার্তা শেষ। আমি বিয়ে করতে চাই না! আপনি আমাকে মুগ্ধ করতে চান না! সুতরাং পরিচিত হবার কোনো প্রয়োজন আমি দেখছি না। কিন্তু সমস্যা হলো আমার মাতাশ্রী চাচ্ছেন আমরা পরিচিত হই, আমাদের মধ্যে কথাবার্তা হোক। তাই তিনি আমাদের ড্রাইভারকে ‘ স্পাই ’ হিসেবে বরাদ্দ করেছেন। উনার উপর দায়িত্ব হলো এই যে উনি লক্ষ্য রাখবেন যে আমি আপনার সঙ্গে কতটা সময় ব্যয় করলাম। তাই আমি এক্ষুনি চাইলেও উঠে চলে যেতে পারছি না। তাছাড়া এতো জ্যাম পার করে মিনিট বিশ লেট করে যখন চলেই এসেছি তাই সৌভাগ্য বশত আপনি আমার তরফ থেকে কিছু সময় পাচ্ছেন। এই পুরোটা সময় কি আপনি ক্যাফেতেই কাটাতে চাচ্ছেন নাকি অন্য কোথাও যাওয়ারও ইচ্ছা আছে তাই জানতে চাচ্ছিলাম? তবে আপনি চাইলে আমরা এক্ষুনিও উঠতে পারি। বাসায় আমার জন্য একগাদা পড়াশোনা অপেক্ষা করছে। ”
অরীব হাসলো। মেয়েটা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কথা বলে। অবশ্য শুনতে বেশ মজা লাগছিল। সুন্দর বাচনভঙ্গি হবার দরুন মেয়েটার উদ্ভট কথাবার্তাগুলোও শুনতে ভালো লাগছে তার। মেয়েটাকে এতো তাড়াতাড়ি চলে যেতে দিতে অরীবের ইচ্ছে হলো না কেন যেন! তাছাড়া হঠাৎই সে মেয়েটাকে আরেকটু জানার আগ্রহ বোধ করছে। তাই অরীব বললো,
“ আমরা কিছু অর্ডার করি। তারপর নাহয় ভেবে দেখা যাবে! ”
অরীবের কথা শুনে সামিহা মাথা নাড়লো। অরীব হাতের ইশারায় একজন ওয়েটারকে ডাকলো। ওয়েটার মেন্যুকার্ড আর নোটপ্যাড নিয়ে তাদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ালো। অরীবের দিকে মেন্যুকার্ড এগিয়ে দিল ওয়েটার। অরীব তা সন্তর্পণে এগিয়ে দিল সামিহার দিকে। সামিহা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বিষয়টা লক্ষ্য করলো বটে তবে অরীবের সুপুরুষ ধরনের আচরণ তার মনে দাগ কাটলো। সে শুরু থেকেই এই লোককে পছন্দ করতে চাইছে না একটুও। কিন্তু লোকটা কাজগুলো করছে এমন যে সামিহা বেশ মুগ্ধ হচ্ছে। তার চিরায়ত হেইট এট ফার্স্ট সাইট কেনো হচ্ছে না সেটা নিয়ে সে বিরক্ত। আর সেই বিরক্তি নিয়েই সামিহা মেন্যুকার্ডটা তুলে নিল। বাহিরের খাওয়ায় ওর বাতিক আছে। সব ধরনের খাবার সে খেতে পারে না। বাইরে খেতে গেলে সে ভীষণ চুজি হয়ে যায়। সচরাচর বাইরে খেতে গেলে তার জন্য খুঁজে পেতে খাবার অর্ডার করে নিহাল আর সাবা। দুই বন্ধুকে বেশ মিস করলো সামিহা এই মুহূর্তে। মেন্যুকার্ড খুঁজে পেতে খাওয়ার লায়েক আইটেম বের করলো সে।
" ওয়ান স্প্যাগেটি বোলোনিজ, এন্ড দিস কোর্টইয়ার্ড মকটেল। উমমম, দ্যাটস ইট! ”
ওয়েটারকে নিজের অর্ডার বলতে বলতে সে মেন্যুকার্ড এগিয়ে দিল অরীবের দিকে। অরীব নিজের জন্য সিজার স্যালাড আর সামিহার মতো একটা মকটেল অর্ডার করলো। ওয়েটার তাদের অর্ডার টুকে নিয়ে চলে গেল। ওয়েটার চলে যেতেই সামিহাকে অস্বস্তিতে চেপে ধরলো। খাবার না আসা অবধি কি করবে সে? বাকপটু হলেও সেটা সে কাছের মানুষদের কাছে। অপরিচিত কারো কাছে তেমন একটা বাকপটু সে না। তাও তো হুশের বসে অনেক কিছু বলে ফেলেছে আজ! কিন্তু এখন কি করবে সে? গাধার মতো চুপ করে বসে থাকা উচিত নয়। কারন বিষয়টা অদ্ভুত আর দৃষ্টিকটু দেখায়। অথচ বলার মতোও কিছু নেই। তার পরিস্থিতিটাকে সহজ করে দিল অরীব। বললো,
“ আপনি সহজ হোন। চিন্তার কারন নেই। এই বিয়ে নিয়ে আপনার আর আমার অনুভূতি মিউচ্যুয়াল। ”
সামিহা ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“ মানে? ”
“ মানে হলো এই যে আমিও এখন বিয়ে করতে চাচ্ছি না। আমারও এখানে আসা কেবল মাত্র আমার মায়ের জন্যই। তাই আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। ”
নিজের থেকে বছর সাতেকের ছোট কাউকে আপনি করে বলতে অরীবের অস্বস্তি হচ্ছিল বটে। কিন্তু সে বিষয়টাকে তেমন পাত্তা দিল না। দেখা গেল সে তুমি করে বললো আর মেয়েটি নিজের চোখের তেজী দৃষ্টি দিয়ে তাকে ঝলসে দিল। যে হারে তার দিকে সন্দিহান দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে কিছুক্ষণ পর পর। অরীব মনে করতে চাইলো কেউ কখনো কি তার দিকে এইভাবে তাকিয়েছে কিনা। হঠাৎ করেই সামিহা একটা উদ্ভট প্রশ্ন করে বসলো।
“ প্রেম ঘটিত বিষয় কি? ”
অরীব সামিহার কথা বুঝলো না। জিজ্ঞাসাসূচক দৃষ্টিতে তাকাতেই সামিহা মাথা নেড়ে এমন ভাবে অরীবের দিকে চাইলো যেন এতো বোকা মানুষ সে আর জীবনেও দেখেনি। তারপর খানিকটা বোঝানোর ভঙ্গিতে বললো,
“ বিয়েটা কি কোনোভাবে প্রেমঘটিত কোনো কারনে করতে চাচ্ছেন না? মানে আপনার প্রেমিকা এখন বিয়ে করতে পারবে না বলে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না নাকি আপনাদের ছেলেদের তথাকথিত ভীত শক্ত হয়নি বলে বিয়ে করতে চাচ্ছেন না? নাকি চিরকুমার থাকার পরিকল্পনা! ”
অরীব মাথা নিচু করে নিয়ে হাসলো। তারপর মুখ তুলে সামিহার দিকে তাকিয়ে বললো,
“ তেমন কিছু না। প্রেমিকা আমার নেই, তাছাড়া ভীতও আলহামদুলিল্লাহ শক্তই। চিরকুমার থাকারও কোনো পরিকল্পনা নেই। ”
“ তাহলে? শারীরিক... ইউ নো হোয়াট আই অ্যাম ট্রাইং টু সে! ”
সামিহার করা প্রশ্নে অরীব কিছুক্ষনের জন্য জবাবে বলার মতো কিছু খুঁজে পেল না। বেচারা শকড! দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরীব মেয়েটার ইঙ্গিত এড়িয়ে বললো,
“ বিয়ের পর একজন সহধর্মিণী তার স্বামীর কাছ থেকে যে নূন্যতম সময়টুকু পাবার আশা রাখে যা তার প্রাপ্য অধিকার, আমার কাছে আপাতত কাউকে সেই সময়টুকু দেবার সুযোগ নেই। তাই বিয়েটা এখন করতে চাচ্ছি না। ”
“ কেন? সময় নেই কেন? ”
অরীব মেয়েটার চোখে মুখে প্রবল কৌতূহল দেখতে পেল।বললো,
“ আমার পেশা নিশ্চয়ই জানেন? তার জন্য আমাকে সর্বদা অন কল থাকতে হয় মিস! পরিবারকেই দেওয়ার মতো যথাযথ সময় আমার মিলে না সেখানে নতুন একজনকে নিজের সাথে জড়িয়ে তাকে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করাকে আমি এখন উচিত বলে মনে করছি না। আমি জানি সম্পর্কে আন্ডারস্ট্যান্ডিং ম্যাটার করে কিন্তু সেই আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা তৈরি করার জন্য সম্পর্কটাকে সময় দিতে হয়। এন্ড আই ডোন্ট হ্যাভ এনাফ টাইম ফর দ্যাট। ”
সামিহা আসার আগে একবার লোকটার সিভি পড়ে এসেছে। সে জানে লোকটা দেশের নৌবাহিনীর একজন সদস্য। তাই মাথা নেড়ে বললো,
“ ওহ, আচ্ছা! ”
এরই মধ্যে ওয়েটার এসে খাবার দিয়ে গেল। অরীব সামিহাকে খেতে ইশারা করলো। সামিহা খেতে শুরু করলো। অরীব খানিকক্ষণ তার খাওয়ার দৃশ্য দেখলো। তারপর নিজে খানিকটা স্যালাড মুখে পুরে বললো,
“ তোমার... আই মিন আপনার বিয়ে করতে না চাওয়ার কারনটা কি জানতে পারি? ”
সামিহা অরীবের কথা শুনে মুখভর্তি পাস্তা নিয়ে তার দিকে তাকালো। এরপর মুখের পাস্তাটুকু গিলে নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই বললো,
“ আপনি আমাকে তুমি করে বলতে পারেন। আপনি আমাকে আপনি আপনি করে বলছেন তাতে নিজেকে কেন যেন আপনার বয়সী বলে মনে হচ্ছে। আই হ্যাভ স্টিল হ্যাভ দোজ গুড ইয়ার্স ইন মি। সো তুমি করেই বলুন! আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ফিল ওল্ড! আই লাভ মাই ইয়ুথ। ”
অরীব বুঝতে চেষ্টা করলো মেয়েটাকে কি মাত্রই তাকে বয়স্ক বলে আখ্যায়িত করলো? অবশ্য করতেই পারে। মেয়েটা তার থেকে গুণে গুণে সাত বছরের ছোট। সামিহা তার মকটেল খানিকটা খেয়ে বললো,
“ আর বিয়ে করতে না চাওয়ার বিশেষ কোনো কারন নেই। আমি কেবল এখন বিয়ে করতে চাচ্ছি না। তাই! তাছাড়া চেনা নেই জানা নেই এমন কাউকে তো আরো আগেই না। আমি যাকে বিয়ে করবো তাকে আমি চিনে জেনে বিয়ে করতে চাই। যাতে আফসোসের সুযোগ না থাকে। এমনিতেই আমার অনেক আফসোস আরো বাড়াতে ইচ্ছুক নই আমি। ”
অরীব মাথা নাড়লো। তার জানতে ইচ্ছা করলো এই চঞ্চল প্রজাপতির জীবনে কি আফসোস রয়েছে। কিন্তু সেটা জিজ্ঞেস করা বড্ড অযাচিত হবে বলে ইচ্ছাটাকে গিলে ফেললো সে। বাকি খাবারটুকু তারা নিঃশব্দে খেয়ে শেষ করলো। একজন ওয়েটার এসে তাদের খাবার প্লেট নিয়ে গেল। মিনিট পাঁচেক খানেক পর তাদের বিল নিয়ে এলো ওয়েটার। অরীব আর সামিহা দুজনই একসাথে তাদের কার্ড এগিয়ে দিল। অরীব সামিহার বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা দেখলো একবার আর সামিহাকে দেখলো একবার। তারপর অন্যহাতে সামিহার বাড়িয়ে ধরা কার্ডটা নিয়ে নিল। এরপর নিজের কার্ডটা দিয়ে বিল পে করলো সে। সামিহা পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করলো ভ্রু কুঁচকে। বিল পে করা হলে ওয়েটার চলে গেল। ওয়েটার চলে যেতেই সামিহা বললো,
“ আপনি আমাকে বিল পে করতে দিলেন না কেন? ”
অরীব সামিহার কার্ডটা তার দিকে এগিয়ে কিছুটা গভীর কন্ঠে বললো,
“ টেল মি অ্যা রিজন হোয়াই আই শুড লেট ইউ পে ফর আওয়ার ডেট, মিস? ”
সামিহা প্রথমে বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। তারপর বললো,
“ বিকজ আই ক্যান পে! ”
অরীব সামান্য হেসে দৃঢ় কন্ঠে বললো,
“ আই ডোন্ট থিংক আই শুড লেট মাই ডেট পে, ইভেন ইফ শি ক্যান। হোয়াই শুড শি পে হোয়েন আই অ্যাম দেয়ার উইথ হার! দ্যাটস নট হাউ ম্যান শুড এক্ট ইন ফ্রন্ট অফ অ্যা উইমেন এন্ড ইটস সারটেইনলি নট হাউ আই এক্ট ইন ফ্রন্ট অফ অ্যা উইমেন। ইটস মেনস ডিউটি টু টেক কেয়ার অফ থিংস অন অ্যা ডেট সো দ্যাট উইমেন ক্যান এনজয় দ্যা টাইম উইদাউট থিংকিং এবাউট এনিথিং বাট দ্যা মোমেন্ট। দিস ইজ হাউ আই ওয়াজ টট বাই মাই বাবা টু এক্ট ইন ফ্রন্ট অফ অ্যা উইমেন। ”
সামিহা বেশ চমৎকৃত হলো লোকটার কথায়। মনে মনে ভাবলো,
“ সো, হি ইজ অ্যা ম্যান উইথ প্রোভাইডার মেন্টালিটি! ইম্প্রেসিভ! সান অফ অ্যা গ্রিন ফ্ল্যাগ ফাদার। ”
কিন্তু নিজের কার্ডটা নিয়ে ব্যাগে রাখতে রাখতে বললো,
“ আপনি যত যাই করুন না কেন আমি ইমপ্রেস হচ্ছি না জনাব! ”
অরীব হেসে উত্তর দিল,
“ আমি আগেও একবার আপনাকে বলেছি মিস আমি আপনাকে ইমপ্রেস করতেও চাচ্ছি না! ”
“ গুড! ”
হঠাৎ করেই অরীবের কল এলো। টেবিলে উল্টো করে রাখা ফোনটা তুলে নিয়ে কন্ট্যাক্ট নম্বরটা দেখে অরীবের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গিয়ে সেখানে গম্ভীরতা ভর করলো। সামিহার দিকে তাকিয়ে এক্সকিউজ মি বলে সে উঠে দাঁড়ালো। তারা যেখানে বসে ছিল সেটা ওপেন স্পেস ছিল। অরীব এক কোণে গিয়ে কলটা রিসিভ করে কানে চাপলো। সামিহা অরীবের দিকে তাকিয়ে রইলো। অরীব ফোন কানে চেপেই বললো,
— হ্যাঁ, বলো জাবের!
— কয়টায়?
— আমি আসছি। দেরি হতে পারে কিছুটা।
বলেই অরীব কল কেটে দিল। তিন বাক্যে কথা বলা হয়ে গেল! সামিহা কিছুই বুঝতে পারলো না। অরীব ফোনটা পকেটে রেখে এগিয়ে আসতেই সামিহাও উঠে দাঁড়ালো। অরীব সামিহার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো,
“ দুঃখিত মিস। আমার একটা কাজ পড়ে গিয়েছে। আজকের সাক্ষাতের সমাপ্তি এখানেই টানতে হচ্ছে। ”
সামিহা তার কাঁধ ব্যাগটা তুলে নিয়ে বললো,
“ ইটস ওকে। ইট ওয়াজ নাইস মিটিং ইউ! ”
অরীব হেসে ফেললো সামিহার কথা শুনে। সামিহা বুঝতে পারলো না সে হাসার মতো কি বললো! কিন্তু প্রথমবারের মতো খেয়াল করলো লোকটার হাসি বেশ সুন্দর। তার ভালো লাগলো লোকটার হাসি। পরক্ষনেই মাথা ঝেড়ে এই ভালো লাগার বিষয়টা দূর করতে চাইলো সে। মনে মনে নিজেকে বললো,
“ সবার হাসি সুন্দর সামিহা। সবার হাসি সুন্দর! হাসলে সবাইকে ভালো লাগে। এই লোকটার হাসির মধ্যে কোনো বাড়তি বিশেষত্ব নেই। ”
কথাগুলো মনে মনে বলে খানিকটা ভালো লাগলো তার। কিন্তু দু সেকেন্ড পরই মনে পড়লো মাইক্রোবায়োলজির ওই প্রফেসরের হাসি দেখতে ভেনমের মতো বিচ্ছিরি। দূর ছাই! একদম ভালো লাগে না। সামিহাকে আকাশ কুসুম ভাবতে দেখে অরীব বললো,
“ আমি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিচ্ছি সামিহা। ”
সামিহা প্রতিবাদ করতে চাইলো। কিন্তু অরীব তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
“ ইটস অ্যা রিকোয়েস্ট! আই হোপ ইউ উইল গিভ মি দ্যাট অনার সামিহা? ওন্ট ইউ? ”
সামিহা কিছু বললো না। তাকিয়ে রইলো অরীবের দিকে। তারপর সে মাথা নেড়ে সায় দিতেই অরীব সরে দাঁড়ালো। তাকে জায়গা করে দিতেই সামিহা হাঁটা ধরলো। অরীবও তার পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলো। হাঁটার মাঝেই অরীব খেয়াল করলো মেয়েটা তার ঘাড় অবধি লম্বা। অরীব আর সামিহা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে পার্কিং লটে গিয়ে পৌঁছলো। অরীব পকেট থেকে গাড়ির চাবি করে কোণের দিকে রাখা একটা কালো গাড়ির দিকে এগুলো। সামিহাও তার পিছু পিছু গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বিএমডব্লিউ এক্স থ্রি মডেলের ঝকঝকে তকতকে গাড়ি। সামিহার প্রিয় ব্র্যান্ডের গাড়ি! মনে মনে একবার ভাবলো লোকটাকে গুম করে দিয়ে, গাড়িটা নিয়ে কি কোনোভাবে একটা চম্পট দেয়া যায় না! সামিহা এবার তার জন্য প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির মালিকের দিকে তাকালো। বুঝতে পারলো সেটা কোনোভাবেই সম্ভব না। হাতির সামনে পিঁপড়ের অবস্থার মতো অবস্থা হবে তার। সে আবারো অরীবের দিকে তাকালো। আবিষ্কার করলো লোকটার পার্সোনালিটির সাথে গাড়ির ভাইবের বেশ মিল। সেই সাথে লক্ষ্য করলো গাড়ির দরজায় লোকটার হাত আর তাতে ভেসে থাকা শিরা উপশিরা গুলো। ভেইনি হ্যান্ড!!! পরক্ষনেই বেহায়া মনকে একটা মারাত্মক গালি দিয়ে সে এগিয়ে গিয়ে তার জন্য মেলে ধরা প্যাসেঞ্জার সিটে বসে পড়লো। মনে মনে শাসাতে লাগলো নিজেকে। অরীব দরজা বন্ধ করার আগে ভালোমতো লক্ষ্য করলো কোথাও শাড়ি বেরিয়ে আছে কিনা। সামিহা ঠিকঠাক মতো বসেছে সেটা নিশ্চিত হয়ে সে দরজা বন্ধ করে দিয়ে নিজে ড্রাইভিং সিটে এসে বসে পড়লো। গাড়ি চলতে শুরু করলো। সামিহার মনে হলো তার উচিত ভদ্রলোককে বাসার এড্রেসটা বলা।
“ উত্তরা, সেক্টর...
সামিহা পুরোটা বলে শেষ করার আগেই অরীব তার বাসার সম্পূর্ণ এড্রেস বলে দিল। সামিহা অবাক হয়ে গেল।
“ আপনি জানলেন কিভাবে? ”
সামিহার বিস্ময়ে করা প্রশ্নের জবাবে অরীব গাড়ি চালাতে চালাতে বললো,
“ মা বলেছিল। সেই সাথে বায়োডাটাতেও ছিল। ”
সামিহা কিছু বললো না। নীরবতায় পার হলো তাদের যাত্রার বাকি সময়টুকু। সামিহা ফোনে নোটস পড়ে পড়ে সময়টা কাটালো। আর অরীবের সময় কাটলো গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে সামিহার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে ফোনে কিছু পড়ছে আর বিড়বিড় করছে। প্রায় ঘণ্টাখানেকও বেশি কিছু সময় পর অরীব সামিহাদের বাসার সামনে গাড়ি থামলো। গাড়ি থামতেই সামিহার হুশ হলো। ফোনটা ব্যাগে রেখে বললো,
“ আপনার আর কার্টেসি দেখিয়ে নামবার প্রয়োজন নেই। আমি নিজেই দরজা খুলে বেরোতে পারবো। থ্যাংকস ফর দ্যা রাইড। ”
বলেই সে সিট বেল্ট খুলে গাড়ি থেকে নেমে গেল। অরীব কেবল তাকিয়ে দেখলো। সামিহা গেটের ভেতর চলে যেতে গিয়েও থেমে গেল। ঘুরে আবারো গাড়ির প্যাসেঞ্জার সিটের সামনে এসে দাঁড়ালো। সামান্য ঝুঁকে জানালার কাঁচে টোকা দিল। অরীব গাড়ি ঘোরাতে যাচ্ছিলই কিন্তু টোকার আওয়াজ শুনে জানালার কাঁচ নামিয়ে দিল। দিতেই মেয়েটার হাসিমাখা মুখ দেখতে পেল সে। কাঁচ নামতেই সামিহা বললো,
“ ইট ওয়াজ নাইস মিটিং ইউ মিস্টার অরীব আহমেদ। এন্ড ওয়ান মোর থিং। জাস্ট বিকজ আই রিজেক্টেড ইউ, ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু লুক ডাউন এট ইউরসেলফ। ইফ ইউ ডোন্ট নো, ইউ আর কোয়াইট এভরি গার্লস টাইপ। অ্যা গ্রিন ফ্ল্যাগ হু ইজ বোথ চার্মিং এন্ড হ্যান্ডসাম। আই হোপ ইউ ফাইন্ড সামওয়ান ওর্থ গিভিং ইউর প্রেসিয়াস টাইম ভেরি সুন এন্ড দ্যাট পারসন আন্ডারস্ট্যান্ড ইউ দ্যা ওয়ে ইউ নিড টু বি উন্ডারস্টুড। বাই! এন্ড ওয়ান মোর থিং! অ্যা স্মল ডেটিং টিপস। ট্রাই টু ব্রিং সাম ফ্লাওয়ারস নেক্সট টাইম ইউ গো অন অ্যা ডেট। ”
অরীব সামিহার কথাগুলো মন দিয়ে শুনছিল। তার মেয়েটার কথাগুলো শুনে তার হাসি পাচ্ছিল খুব। কাউকে রিজেক্ট করে এই ধরনের কথা একমাত্র এই মেয়েটাই বলতে পারে বলে মনে হলো। সামিহা তাকে বাই বলতেই সে হেসে বললো,
“ থ্যাংক ইউ ফর ইউর কাইন্ড এন্ড বিউটিফুল ওয়ার্ডস এন্ড ইট ওয়াজ রিয়েলি অ্যা প্লেজার মিটিং ইউ ঠু মিস। বাই! ”
সামিহা অরীবকে একটা হাসি উপহার দিয়ে গেটের দিকে পা বাড়ালো। অরীব সামিহার গেটের ভেতর ঢুকে যাওয়া অবধি তার দিকে তাকিয়ে রইলো। একদৃষ্টিতে। মেয়েটা ভেতরে চলে যেতেই সে গাড়ি চালু করলো। অরীব তার ত্রিশ বছরের জীবনে কোনোদিন কাউকে নিজের করে নেওয়ার কথা ভাবেনি। কিন্তু আজ প্রথমবারের মতো ভাবলো এই চঞ্চল প্রজাপতির মতো মেয়েটি তার হলে মন্দ হতো না। হলেও সে সেটা পুষিয়ে দিতো। সর্বোচ্চ চেষ্টায়।
( শয়তান আমাকে নাড়ে নাকি আমি শয়তানকে আমি আপাতত বুঝতে পারতেসি না। আইটেমের পড়া না পড়ে আমি কি করতেসি এসব! আম্মুউউউউ! কালকে মারা না খেলেই হইলো।
আবার কবে আসবে বলতে পারছি না। তবে আসবে। আমার জন্য দোয়াও করবেন। পড়াশোনা আর অসুস্থতা নিয়ে ভেটকায় গিয়েছি।
পড়ে কেমন লাগলো জানাবেন কেমন? হ্যাপি রিডিং! )
11/05/2026
#প্রণয়াবেশিত_ধ্রুবতারা
#সামিয়া_জামান
পর্ব ০৪
৭|
রাতে খাবার টেবিলে খেতে বসে আতিক সাহেব লক্ষ্য করলেন মেয়ে খেতে বসেনি। বা পাশে বসা স্ত্রীর দিকে তাকালেন তিনি। ফারহানা অন্যমনস্ক হয়ে বসে আছেন। খালি প্লেটের দিকে তাকিয়ে কি যেন আকাশ কুসুম ভাবছেন। আতিক রহমান গলা খাঁকারি দিতেই ফারহানা তার দিকে তাকালেন। আতিক সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
“ সামিহা কোথায়? খেয়েছে ও? ”
ফারহানা স্বামীর কথায় যেন বাস্তবতায় ফিরলেন। তিনি এবার প্লেটে ভাত নিতে নিতে বললেন,
“ তোমার মেয়ে তার নিজের ঘরে। সকালে ঘরের যা কিছু ভেঙ্গেছে সন্ধ্যায় সেগুলো কিনে এনে বাড়ি ফিরেছে। গোছাচ্ছে বোধহয় সেসব। মিতা ওকে খেতে ডেকেছিল। সে খাবে কি খাবেনা কিছু বলেনি। ”
“ তুমি ডাকতে যাওনি? ”
ফারহানা স্বামীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। আতিক সাহেব বুঝতে পারলেন ফারহানার দৃষ্টি উনাকে স্পষ্ট ভাষায় বলছে,
“ আমি ডাকতে গেলেই তোমার মেয়ে আসবে খেতে? ”
এমন সময় হঠাৎই ডাইনিং রুমে সামিহার আগমন ঘটলো। ঢিলাঢালা ফুল স্লিভ শর্ট কুর্তি আর স্কার্ট পরনে তার। কোমড় অবধি চুলগুলো ক্ল ক্লিপ দিয়ে উঁচু করে বাধা। মেয়েকে দেখতে বড় বড় লাগলো ফারহানার কাছে। অথচ মেয়ের বয়স তেইশ। মায়েদের কাছে বোধহয় সবসময়ই তার সন্তানকে ছোট মনে হয়। সামিহা এগিয়ে এসে বাবার ডান পাশে বসে পড়লো। দুহাতের স্লিভ গুটিয়ে নির্বিকার ভাবে প্লেট উল্টে তাতে ভাত নিতে নিতে বললো,
“ বাবা, এস্প্রেসো মেশিনটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আরেকটা লাগবে আমার।”
আতিক সাহেব মেয়েকে খেতে বসতে দেখে খুশি হয়েছেন ভীষণ। কারন আজকে সকালে যা কিছু হলো তারপরও যে মেয়ে খেতে বসেছে সেটাই বড় কথা! তার চেয়েও বড় ব্যাপার হলো মেয়ে বাড়ি এসেছে। সামিহার হলে সিট আছে। প্রায়ই এমন হয় যে সে রেগে বাসা থেকে বেরিয়ে গেলে সেদিন হলেই থেকে যায়। এক সপ্তাহ দুই সপ্তাহ তার দেখা মিলে না। সামিহা নিজের প্লেটে খাবার নিয়ে বাবার প্লেটে ভাত বেড়ে দিতে শুরু করলো। মেয়েকে উনার প্লেটে ভাত বেড়ে দিতে দেখে তিনি বললেন,
“ বাবা অর্ডার করে দিয়েছি তোমার জন্য প্রিন্সেস। সেই সাথে কফি বিনসও। সপ্তাহ খানেক লাগবে আসতে। ততদিন পর্যন্ত ইনস্ট্যান্ট কফি দিয়ে চলবে না? ”
সামিহা হেসে মাথা নাড়লো। ফারহানা বাপ বেটির কথাবার্তা শুনছিলেন। এরা যেন ডাইনিং টেবিলে উনার অস্তিত্ব ভুলেই গেছে। সামিহা আর আতিক সাহেব এটা সেটা নিয়ে কথা বলতে বলতে খাবার খেয়ে শেষ করলেন। এইটা তাদের নিত্যদিনের রুটিন। ফারহানাও স্বামী আর মেয়ের কথোপকথন শুনতে শুনতে খেয়ে শেষ করলেন। সামিহার খাওয়া শেষ করে উঠতে উঠতে মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্তস্বরে বললো,
“ কাল কখন, কোথায় দেখা করতে হবে? ”
ফারহানা চমকে মেয়ের দিকে তাকালেন। আতিক সাহেবও চমকেছেন। ফারহানা মেয়ের মতিগতি বুঝতে পারলেন না। যেই কারনে পুরো সকাল ঘরে তান্ডব চালিয়েছে রাতের বেলায় এসে সেটা মেনে নিল! এতো সহজে? কি কারনে? তবে ফারহানা সেটা জিজ্ঞেস করলেন না। ঘাটাতে গিয়ে যদি আবার সবটা ঘেঁটে যায়। মেয়ের রাগ তার নাকের ডগায়ই উঠে থাকে। উনার যেকোনো কথায় সেই রাগ তার মাথায় চড়ে বসে। তাই তিনি নির্বিকার একটা ভাব নিয়ে বললেন,
“ উনারা চাচ্ছেন সময় আর স্থান তুমি নির্ধারণ করো! ”
সামিহা কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে গুলশানের একটা নামিদামি ক্যাফের নাম বলে বললো,
“ বিকাল সাড়ে চারটা! ”
বলেই সে রান্নাঘরে চলে গেল। তার মিনিট খানেক বাদে সেখান থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। মেয়ে চলে যেতেই ফারহানা স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেন,
“ কি হলো বলো তো ব্যাপারটা? এতো ভাঙচুর করার পরও রাজি হয়ে গেল! ঘটনাটা কি? ”
আতিক সাহেব কাঁধ উঁচিয়ে বললো,
“ আমি কি করে জানবো? ”
ফারহানা সন্দেহপ্রবণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“ তুমি কিছু বলোনি? ”
আতিক সাহেব অবাক হয়ে বললেন,
“ আমি কি বলবো! সারাদিনে আমার সাথে ওর কথাই তো হলো এই খাবার টেবিলে। ”
ফারহানা বিষয়টা নিয়ে চিন্তায় পড়ে গেলেন। সামিহা উনার কোনো কথায় আজকাল রাজি হয়না তেমন একটা। রাজি হলেও তাতে আতিক রহমানের হাত থাকে। মেয়েকে এইটা সেইটা বলে কয়ে রাজি করান তিনি, যেন মেয়ে তার মায়ের কথা শুনে। সেটাও দুই তিন দিন ধরে বলে কয়ে। আজ বলার আগেই রাজি হয়ে গেল। তাও বেলা ঘুরতে না ঘুরতেই? ফারহানা এতক্ষণ ধরে মেয়েকে রাজি করাবেন কি করে তা নিয়ে চিন্তায় ছিলেন। আর এখন চিন্তায় পড়ে গেলেন মেয়ে কারো কিছু বলা না সত্ত্বেও রাজি হয়ে গেল কি করে! ভাবনার বিষয়! তবুও তিনি খুশি। যে করেই হোক রাজি তো হয়েছে। সুবুদ্ধি উদয় হয়েছে সেটাই যথেষ্ট। কাল ছেলেটার সাথে দেখা করতে গিয়ে কোনো অঘটন না ঘটালেই হলো। কি যে ঘুরছে মেয়ের মাথায় আল্লাহই ভালো জানেন। তিনি প্রার্থনা করলেন দিনটা যেন ভালোয় ভালোয় কাটে কাল।
৮|
“ কাল মেয়ের সাথে দেখতে যাচ্ছো তাহলে! ”
ভাইয়ের কথা শুনে অরীব ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালো। ছাদের দরজার সামনে আরিয়ান দাঁড়িয়ে। তার পরনে কালো রঙের টিশার্ট আর ট্রাউজার। চোখে বরাবরের মতো রিমলেস চশমা। অরীব এক পলক ভাইকে দেখে আবারো ঘাড় ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকালো। আরিয়ান এগিয়ে এসে ভাইয়ের পাশাপাশি দাঁড়ালো। মিনিট কয়েক পেরুলো নীরবতায়। আরিয়ান ঘাড় বাঁকিয়ে তার পাশে দাঁড়ানো ভাইকে দেখলো। তার থেকেও উচ্চতায় ইঞ্চি দুয়েক লম্বা ভাই তার। শারীরিক গঠনও তার থেকে অনেক মজবুত। ওভারসাইজড সাদা টিশার্ট আর কালো ট্রাউজার তার পরনে। টিশার্ট ওভারসাইজড তবুও তাতে তার প্রশস্ত কাঁধ দৃশ্যমান। গায়ের ফর্সা ত্বক রোদে পুড়ে তামাটে হয়ে গেলেও আরিয়ান জানে কত রমণী তার ভাইয়ের জন্য পাগল। সে ভাইকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে লক্ষ্য করলো ভাইয়ের মুখ গম্ভীর। কিছু নিয়ে যে সে বিস্তর চিন্তা ভাবনা করছে সেটা মুখ দেখেই বুঝতে পারলো আরিয়ান। কিন্তু কি? আরিয়ান আবারো প্রশ্ন করলো,
“ কাল তাহলে যাচ্ছো দেখা করতে? ”
অরীব সামনের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললো,
“ হ্যাঁ! ”
“ হঠাৎ সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হওয়ার কারনটা জানতে পারি কি? যদি তোমার বলতে অসুবিধা না থাকে তাহলেই আরকি। ”
অরীব দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশ ফিরে ভাইয়ের দিকে শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,
“ মাকে গত মাসে হসপিটালে নেওয়া হয়েছিল তা আমাকে জানাসনি কেন আমি কি সেটা জানতে পারি? ”
হঠাৎ এহেন প্রশ্নে আরিয়ান থতমত খেয়ে গেল। ভাই বিষয়টা জানলো কি করে? মা বলেনি সে নিশ্চিত। কারন মা আর ভাইয়ের মধ্যকার সেতুবন্ধন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সে। মাঝে মধ্যে বাবাও। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাবাও বলবেন না। কারন বললেই তিনি বকা খাবেন বড় ছেলের কাছ থেকে। তবে জানলো কি তার ভাই? নীহার আপু কি? ভাইকে তব্দা খেয়ে যেতে দেখে অরীব বললো,
“ সাইফের বোনকে আজ কামরুল আংকেলের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। উনি বলেছেন মাকে নাকি গত মাসে দুদিন হসপিটালে ভর্তি রাখা হয়েছিল। আমাকে সেটা বলিসনি কেনো? নাকি আমাকে জানানোর প্রয়োজনবোধ করিস নি? ”
কামরুল মাহমুদ একজন প্রখ্যাত বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ। ভদ্রলোক ইফতেখার আহমেদের বন্ধুও বটে। রেহেনার শ্বাসকষ্ট ছাড়াও ফুসফুসে কিছু জটিলতা রয়েছে। তাই ভদ্রলোককে রেহেনার রুটিন চেকআপের জন্য দেখানো হয়। গত মাসে হঠাৎ করেই রেহেনার শ্বাসকষ্ট প্রচুর পরিমানে বাড়ে। ইনহেলার আর প্রয়োজনীয় ওষুধ নেওয়ার পরও তা না কমলে হসপিটালে ভর্তি করা হয় তাকে। অরীব তখন ডিউটিতে মাঝ সমুদ্রে। আরিয়ান ভাইকে জানাতে চেয়েছিল কিন্তু রেহেনা জানাতে দেয়নি। কি লাভ হবে জানিয়ে? ছেলে উনার জানবে ঠিকই কিন্তু মাঝ সমুদ্র থেকে আসতে পারবে না। সেটা না পেরে উনাকে নিয়ে চিন্তা করতে করতে একশোবার কল করবে, ভাই আর বাপকে বকবে তারা থাকতে উনার অমন হলো কেমন করে! উনাকে কড়া কড়া কথা শুনাবে। বিশাল বিড়ম্বনা। তার চেয়ে ভালো ছেলে তার নিশ্চিন্তে তার কাজে থাকুক। উনার জন্য তো উনার স্বামী আর আরেক সন্তান তো আছেই। কি দরকার উনার বড় ছেলেটাকে টেনশন দেওয়ার। মায়ের এসব কথা শুনে আরিয়ানও ভেবেছিল মায়ের কথা তো ঠিকই! ভাইকে জানালেই তো ভাই এখন আসতে পারবে না। তাই শুধু শুধু ভাইকে জানানোর কি মানে! উল্টো তাকে দুশ্চিন্তার খোরাক জোগাড় করে দেওয়া। সে ভেবে রেখেছিল পরে একসময় সুযোগ বুঝে জানাবে ভাইকে। সে জানতো ভাই রেগে যাবে জানলে। তারপরও সে ভেবেছিল পরিস্থিতি বুঝে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলবে। ভাই যে তার আগেই জেনে যাবে কে জানতো। আরিয়ান আমতা আমতা করতে করতে কোনোমতে বললো,
“ ভুলে গিয়েছিলাম। ”
অরীব ভাইয়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেই আরিয়ান একটা শুকনো ঢোক গিললো। ওকালতি নিয়ে পড়াশোনা করে এতো বাজে বাহানা দেওয়াতে আরিয়ানের নিজেরই ইচ্ছা করলো নিজের গালে একটা চড় দিতে। না না! দুটো চড় দিতে। দুইদিন পর ব্যারিস্টার হবে কি আদালতে এই ধরনের বাজে যুক্তি দেবার জন্য? ছিঃ! আরিয়ান মাথা নিচু করে এবার সত্য কথাটাই বললো,
“ মা মানা করেছিল। ”
“ মাসে মাসে যেই মোটা অংকের পকেটমানিটা দেই সেটা কি বাসার গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো, জটিল পরিস্থিতিগুলো আমাকে না জানানোর জন্য দেই? ”
“ না! ”
“ তাহলে? ”
“ সরি! ”
আরিয়ানের কন্ঠে অপরাধবোধ ঝরে পড়ছে। অরীব কিছু বললো না। আরিয়ানও কিছু বললো না। অরীব খানিক বাদে জিজ্ঞেস করলো,
“ কার্ডিওলজিস্ট দেখানো হয়েছে? ”
“ হ্যাঁ। ”
“ কি বলেছেন? ”
“ হার্ট ঠিকঠাক মতো ব্লাড পাম্প করতে পারছে না। তাই হার্টবিট অনেকটাই অনিয়মিত। ডাক্তার সাজেস্ট করেছেন পেসমেকার বসাতে। দেরি হলে কমপ্লিকেশন আরো বাড়তে পারে। দ্যা সুনার, দ্যা বেটার। ”
অরীব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত স্বরে বললো,
“ আমাকে এসব আরো আগে জানানো উচিত ছিল আরিয়ান। তোর থেকে এমন মূর্খতা আমি আশা করিনি। ”
আরিয়ান অপরাধবোধে মিইয়ে গেল। তার ভাই মাকে বড্ড বেশি ভালোবাসে। ভাইয়ের রাগ-জেদ যেমন মায়ের সাথে বেশি তেমনি ভালোবাসাও মায়ের প্রতিই বেশি। এমন অনেকবার হয়েছে যে মায়ের কোনো সামান্যতম অসুস্থতায়ও তার ভাই ছুটি নিয়ে চলে এসেছে ঢাকায়। সেখানে মায়ের অসুস্থতার খবর তাকে না জানানো তার জন্য কষ্টের হওয়া স্বাভাবিক। সেই সাথে দুশ্চিন্তারও। তার বউপাগল বাবাও মায়ের অসুখে তখন পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। সে নিজেও সে সময় ঘাবড়ে গিয়েছিল ভীষণ। ভাই তখন পাশে থাকলে সে ভরসা পেত। কিন্তু সেও মায়ের মতো ভাইকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চায়নি। আরিয়ান আবারো বললো,
“ সরি ভাইয়া। ”
অরীব কিছু বললো না। আরিয়ান আরো অপরাধবোধে ডুবে গেল। তবে কিছু না বলে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলো ভাইয়ের পাশে। বেশ অনেক পর অরীব নিজের ঘরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। ছাদের দরজার কাছাকাছি পৌঁছাতেই আরিয়ানের প্রশ্নে সে দাঁড়িয়ে পড়লো।
“ কাল মেয়েটার সাথে দেখা করতে কি কোনোভাবে মায়ের কথা ভেবেই যাচ্ছো ভাইয়া? ”
“ হ্যাঁ! ”
স্পষ্ট জবাব। বলেই অরীব ছাদ থেকে প্রস্থান করলো। আরিয়ান হাসলো। মা তার বড় ছেলের উনার জন্য থাকা ভালোবাসার পরিমান জানেন না। জানলে বোধকরি মা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতেন। সেই সাথে ছেলের এই ভালোবাসার ফয়দা তুলতেও ভুলতেন না। একদম টিপিক্যাল এশিয়ান মায়েদের মতো!
৯|
“ নিহালের বাইচ্চা! তোর জন্য যদি আমি কালকের আইটেমে নম্বর কম পাই শুধু! বা যদি পেন্ডিং খাই! তাহলে তোকে কিন্তু আমি কেটে কুটে রাস্তার কুকুরদের খাওয়ায় দিবো। বলে দিচ্ছি আমি। ”
সামিহার চিৎকার শুনে নিহাল কান থেকে হেডফোন খুলে নিল। স্ক্রিনে দেখতে পেল সামিহা ওর সাথে চেঁচামেচি করছে। হেডফোনটা তাই তৎক্ষণাৎ আবারো কানে গুঁজতে সাহস পেল না সে। বেলা সাড়ে নয়টা বাজছে। শুক্রবার হওয়ায় তাদের আজ ছুটির দিন। তারা দুজন ভিডিও কলে একটু পড়তে বসেছিল। উদ্দেশ্য কালকের আইটেমের পড়াগুলো ক্লিয়ার করে রাখা। সামিহা হলে থাকলে পড়াশোনার এই সেশনটা লাইব্রেরিতে হয়ে থাকে।তারা দুজন স্টাডি পার্টনার। সাবাও। সে আজ দাওয়াতে গিয়েছে তাই ভিডিও কলের এই পড়াশোনায় নেই। পড়াশোনা ভালোই হচ্ছিল কিন্তু প্যাঁচ লাগলো তখন যখন নিহাল সামিহাকে জানালো কালকে তাদের দুইটা আইটেম। সামিহার মাথায় বজ্রপাত হলো বলে তার মনে হলো। কাল ক্লাসে সে একটু বেশিই অন্যমনস্ক ছিল তাই সে খেয়াল করেনি প্রফেসরদের কথা তেমন একটা। বেচারি জানলে রাতেই সুন্দর মতো পড়ে রাখতো টপিকটা। আজকে আরেকবার পড়লেই ক্লিয়ার হয়ে যেত সব। সামিহা কতক্ষন নিহালকে বকে চুপ করে গেল। তার ভাবনা এখন কি করবে সে? বিকালে গুলশান যেতে হবে। যাওয়ার কথা বলে ফেলেছে। এখন না গিয়েও পারবে না সে! সেখান থেকে এসে কখন পড়বে না কি করবে সে ভেবে পেল না। নিহাল যখন বুঝতে পারলো সামিহা আর তাকে বকছে না তখন আবারো সে হেডফোনটা কানে পরে নিল। এরপর অপরাধীর ন্যায় বললো,
“ সরি রে! বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আমি তো ভেবেছি তুই জানিস। ”
সামিহা কিছু বললো না। দোষ তারই। আর নিজের দোষে অন্য কারো উপর চেঁচামেচি করা যায় না। অন্যদিকে নিহালের রাগ হলো নিজের উপর। সে সবসময়ই সামিহাকে মনে করিয়ে দেয় যেকোনো এক্সামের কথা। সামিহার মনে আছে কি নেই সেটা কোনো ম্যাটার না। ছোট বড় কোনো এক্সামই বিষয় না। তাছাড়া তাদের কোনো পরীক্ষাই কম গুরুত্বপূর্ণ না। সে তো জানে মেয়েটা খুব ভুলোমনা। তারপরও কি করে ভুলে গেল এক্সামের কথা বলতে! নিহাল স্ক্রিনে সামিহার দিকে তাকালো। মেয়েটা কি যেন আকাশ কুসুম ভেবে যাচ্ছে। নিহালের আরো খারাপ লাগতে শুরু করলো। সে জানে সামিহা রেজাল্ট খারাপ করার বিষয়টা তেমন একটা মেনে নিতে পারে না। মেয়েটার এনজাইটি কাজ করে ভীষণ। খুব একটা খারাপ ফলাফল যদিও সে কখনো তেমন একটা করে না। সব আইটেম কার্ডে এইটি টু নাইনটি পার্সেন্ট নম্বর তার থাকে। তিন বছরে সে কেবল দুইবার দেখেছে সামিহাকে আইটেম পেন্ডিং খেতে। যেখানে সবাই প্রায় অহরহ আইটেমে, কার্ডে পেন্ডিং খাচ্ছে, সাপ্লি খাচ্ছে। প্রথমবার সামিহা পেন্ডিং খেল ফার্স্ট ইয়ারে। সেবার তার ভীষণ রকমের জ্বর ছিল। তবুও এসেছিল মেয়েটা ক্লাসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিতে পারলো না এক্সাম। জ্বরের তীব্রতায় বেহুঁশ হয়ে গেল। আরেকবার কি যেন হলো! সেটাও ফার্স্ট ইয়ারেরই। প্রতিদিন ক্লাসে আসা সামিহা সেদিন ক্লাসই করতে এলো না। পেন্ডিং খেল আবার। আর পেন্ডিং খেয়ে তার মাথা খেয়ে ফেলেছিল মেয়েটা। তার মান সম্মান শেষ হয়ে গেল, প্রফেসররা কি বাজে ইম্প্রেশন পেল ওর কাছ থেকে সেই সাথে আরো বিবিধ উল্টা পাল্টা কথা। সামিহার সাথে তার বন্ধুত্ব লকডাউন থেকে। তারা একই কোচিং সেন্টারে ভর্তি ছিল। নিহালও সেকেন্ড টাইমার ছিল। তাদের পরিচয় হয় টেলিগ্রামে। তাদের ব্যাচের একটা গ্রুপ ছিল। সামিহা সেখানে অ্যাড ছিল না। নিহালই তাকে নক করে প্রথম। জিজ্ঞেস করে সামিহা গ্রুপে অ্যাড আছে কিনা। সামিহা গ্রুপে নেই জেনে সে সামিহাকে অ্যাড করে দেয় সেখানে। বন্ধুত্ব হয় তখন যখন নিহাল একদিনের জুম ক্লাস মিস করে। কঠিন একটা চ্যাপ্টার ছিল সেদিন। রেকর্ডেড ক্লাস দেখে এতো কিছু তার বুঝে এলো না। কার থেকে বুঝে নেওয়া যায় সেটা ভাবতে গিয়ে তার সামিহার কথা মাথায় আসে। সে জানতো মেয়েটা হেল্পফুল। এর আগে দুই-তিনবার সে ছোটখাটো কিছু সাহায্য চেয়েছে মেয়েটার কাছে। মেয়েটা তাকে বিনা বাক্যে সাহায্য করেছে। তাছাড়া মেয়েটা ভীষণ ভালো পড়াশোনায়। প্রায় প্রত্যেক পরীক্ষায় ফার্স্ট বা সেকেন্ড হচ্ছে। সাহস করে সে সামিহাকে নক করে বলেছিল,
“ সামিহা, তুমি কি আমায় কালকের ক্লাসটা বুঝিয়ে দিতে পারো একটু? আসলে একটা কাজে ব্যস্ত থাকায় আমি ক্লাসটা করতে পারিনি। রেকর্ডেড ক্লাস দেখে কিছু বুঝতে পারছি না। কিন্তু তোমার অসুবিধা হলে প্রয়োজন নেই! ”
সামিহা কেবল মাত্র জিজ্ঞেস করেছিল,
“ তুমি ভিডিওকলে কমফোর্টেবল? ”
নিহাল অবাক হয়েছিল। তারপর সেটা কাটিয়ে উঠে হ্যাঁ বলতেই সামিহা তাকে বলেছিল সে কি তখনই ক্লাসটা বুঝে নিতে চায় নাকি অন্য কোনো সময়। নিহাল তখনই বুঝতে চাইলে সামিহা তাকে ভিডিওকল দিয়েছিল। নিহালের স্ক্রিনে ভেসে উঠেছিল সুন্দর, সুশ্রী আর মায়া মায়া একটা চেহারা। কিন্তু সেই চেহারায় যেন কোনো প্রাণ নেই। যেন সে চির দুখিনী। সামিহা ততক্ষণে ফোনটা জায়গা মতো রেখে দিয়ে তাকে পড়া বুঝানো শুরু করেছে। নিহালও সেসব মাথা থেকে ঝেড়ে নিয়ে পড়ায় মনোযোগ দিল। ঘন্টা খানেক পর সামিহা যখন তাকে পড়া বুঝানো শেষ করলো নিহাল আবিষ্কার করলো মেয়েটার কাছে সে পড়া বুঝেছে কোচিংয়ের ভাইয়াদের চেয়েও ভালোভাবে। এইভাবে শুরু হলো সামিহা আর নিহালের কথাবার্তা। নিহাল তার কোনো পড়ায় অসুবিধা হলেই সামিহাকে নক করে। সামিহাও তাকে সুন্দর করে সেই পড়াগুলো বুঝিয়ে দেয়। কোনো অতিরিক্ত বাক্যব্যয় ব্যতিত। একসময় পড়াশোনার বাইরেও তাদের মধ্যে দুই একটা কথা হতে লাগলো। এইভাবে কোন সময় যে তারা দুজন বন্ধুতে পরিণত হলো তারা টেরই পেল না। নিহাল হলো সেই একজন যে সামিহাকে তার খোলস থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করেছে। নিহাল জানে না কেন সে সামিহাকে তার খোলস থেকে বেরিয়ে আনাকে অত প্রয়োজন বলে মনে করেছিল। সামিহাকে আবারো ড্রয়িং শুরু করতে নিহালই বলেছিল তার ড্রয়িং স্কিল দেখে। সামিহা এড়িয়ে যেতে চাইলে বলেছিল,
“ ট্যালেন্টের কদর করতে হয় সাম্বো ব্যাম্বো! কদরহীনা কত ভালো ভালো জিনিস নষ্ট হয়ে যায়। কদর করতে জানতে হয়। সেটা সম্পর্ক হোক আর গুণই বা হোক না কেন! ”
নিহালের কথাটা সামিহার মনে দাগ কেটেছিল। আবারো শুরু করেছিল সে আঁকাআঁকি। এক সময় ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখে নিজের ছোটবেলার কত্থক নৃত্যের শখটাও। নিহাল তখন সামিহাকে সবসময়ই বলতো,
“ তোকে তুই বানায় তোর শখ, আহ্লাদ, ইচ্ছে আর তোর গুণগুলো। সেগুলোকে কক্ষনো অবহেলা করবি না। অলওয়েজ ভ্যালু দেম। যা ইচ্ছে হয় তা যদি অন্য কারো ক্ষতির কারন না হয় তাহলে সেই ইচ্ছেগুলো মেটানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করবি! কে কি বললো ভাবাভাবির প্রয়োজন নেই। তোর জীবনে তোর অধিকার আল্লাহর পর সবার আগে। চারজন কি ভাববে সেটা তোর ভাবার কোনো প্রয়োজন তো নেই! সেটা তাদেরকেই ভাবতে দে। ”
নিহাল সামিহাকে কখনো বন্ধুর চেয়ে বেশি অন্য কোনো নজরে দেখেনি। দেখলেও সেটা সবসময়ই বোনের নজরে দেখেছে। অদ্ভুত রকমের কাকতালীয়ভাবে সামিহা আর নিহালের সারনেইম আর ডেট অফ বার্থ একই। এমনকি বছরটা সহ। সামিহা আর নিহাল বন্ধু কম ভাই-বোন বেশি। অবশ্য মিলেমিশে থাকা কুচুপুচু টাইপ ভাইবোন নয়। তারা মারপিট করে নাক মুখ ফাটিয়ে দেওয়া টাইপ ভাই বোনের মতো। ঢাকা মেডিক্যালে চান্স পাওয়ার পর সামিহা সবার আগে চেক করেছে নিহালের ফলাফল। যখন দেখেছিল ছেলেটাও তার মতোই ঢামেকে চান্স পেয়েছে আর তাদের সিরিয়ালও তার কাছাকাছি সে যে কি খুশি হয়েছিল। নিহালও তাই। ওরিয়েন্টেশনের দিন তাদের প্রথমবারের মতো সরাসরি দেখা হয়েছিল। সামিহা অতি উৎসাহে তার বাবার সঙ্গে নিহালের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। সামিহা আতিক সাহেবকে অবশ্য অনেক আগে থেকেই নিহালের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে রেখেছিল। নিহালও সামিহাকে তার বাবা মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। যদিও উনারাও সামিহাকে চিনতেন ফোনের মাধ্যমে। ক্লাস শুরু হওয়ার পর তাদের একসাথে দেখে, তাদের মধ্যকার বন্ডিং দেখে অনেকেই মনে করতো তারা প্রেমিক প্রেমিকা। সামিহা তখন নাক ছিটকে বলতো,
“ ছিঃ! তুই আর আমি! ইউ! ভাবলেই তো আমার বমি পাচ্ছে। মানুষের কি রুচি! ছ্যাহ্! তাছাড়া আমার এখনো এতো দুর্দশা আসেনি যে তোকে...ইউ! ছিঃ! ”
নিহাল সামিহার কথা শুনে এক আকাশসম পরিমাণ বিরক্তি নিয়ে ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতো। আর ভাবতো মেয়েটা যখন শান্ত শিষ্ট ছিল তখনই বোধহয় ভালো ছিল। আগে সে চৌদ্দ লাইন বললে মেয়েটা বলতো দুইটা শব্দ। আর এখন তার সাথে কথা বলে এক লাইন আর পঁচায় চার লাইন। সাবার সাথে তাদের দুজনের বন্ধুত্বে একটু ঘাপলা আছে। প্রণয়ঘটিত ঘাপলা। প্রথম দেখায়ই নিহালের সাবাকে ভীষণ রকমের ভালো লেগেছিল। একটা শান্ত-শিষ্ট মিষ্টি ধরনের মেয়ে। মেয়েটাকে যখনই দেখতে পেত তার দিকে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতো নিহাল। সামিহার তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণী দৃষ্টিতে বিষয়টা এড়ালো না। সে তক্কে তক্কে রইলো নিহালকে বাগে আনার। একদিন কার্ডের প্রস্তুতি নিতে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে দুজন পড়তে বসেছে। লাইব্রেরি ভর্তি মানুষ। সামিহার মাথায় শয়তানী একটা বুদ্ধি খেলে গেল। তার মনে হলো নিহালকে এখনই এখানে খপ করে ধরা যায়। সে তার প্ল্যান মাফিক নিহালের সামনের বইটা সরিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এলো। হঠাৎ এহেন কান্ডে নিহাল অবাক হয়ে সামিহার দিকে তাকালো। তাকাতেই দেখলো মেয়েটার মুখে দুষ্টু হাসি। সে বুঝতে চেষ্টা করলো কি শয়তানি পাকাচ্ছে মেয়েটা মনে মনে। সামিহা টেবিলের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বললো,
“ তোকে এখন কয়েকটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবো নিহাল! সত্যি কথা বলবি। সত্যি কথা না বললেই আমি চেঁচিয়ে এখানের সবাইকে বলে দিব তুই স্পাইডার ম্যান মুভি দেখেও কাঁদিস! সেই সাথে এইটাও যে তুই ভূতে ভয় পাস! ”
বলেই সে কুটিল হাসি হাসলো। নিহাল বান্ধবীর এহেন কথায় বিমূঢ় হয়ে গেল। মেয়েটা যে দিনকে দিন একটা বিচ্ছুতে পরিণত হচ্ছে খুব টের পেল সেটা। তবুও সে বললো,
“ দিবো না আমি তোর কোনো প্রশ্নের জবাব! কি করবি তুই সাম্বো ব্যাম্বো! ”
“ বলবি না? ”
“ নাহ! ”
নিহাল দৃঢ় কন্ঠে জবাব দিল। যতোটা দৃঢ়তা তার কন্ঠে ছিল ততটাই দুশ্চিন্তা ছিল তার মনে। সামিহাকে সে চিনে। মেয়েটা যা বলে তাই করে। আর সে নিজে মেয়েটাকে এটা শিখিয়েছে। খাল কেটে কুমির আনা যাকে বলে। হতে নিলও তাই। সামিহা চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিলই। নিহাল খপ করে সামিহার হাত ধরে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো তার দিকে। সামিহা বিজয়ী হাসি হেসে জিজ্ঞেস করলো,
“ সাবা এনায়েত, রোল নম্বর ১২৭। ওকে তোর অনেক ভালো লাগে তাই না? ”
নিহাল অসহায় দৃষ্টিতে সামিহার দিকে তাকালো। তারপর হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গিতে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। সামিহা এমন ভাবে হাসলো যেন সে মাত্রই একটা হাজার কোটি টাকার লটারি জিতেছে। নিহাল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো বান্ধবীর দিকে। সামিহা তার প্রথম প্রশ্নের জবাবে বেশ খুশি হয়ে তার দ্বিতীয় প্রশ্ন করলো,
“ ভালোবাসিস ওকে? ”
নিহাল সামিহার প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেল। উত্তরে কি বলবে ভেবে পেল না। সামিহা অবশ্য এবার আর তার উত্তরের অপেক্ষায় থাকলো না। উঠে দাঁড়ালো চেয়ার থেকে। নিহাল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার মতিগতি তার সুবিধার ঠেকছে না। সামিহা তাদের টেবিল থেকে উঠে গিয়ে সামনের দিকে হাঁটা ধরলো। নিহাল ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই দেখলো সাবা নামের মেয়েটি লাইব্রেরিয়ানের সাথে কথা বলছে। সামিহাও সেদিকে হাঁটা ধরেছে। নিহালের রুহ কেঁপে উঠলো। মেয়েটা না জানি এখন কি একটা অঘটন ঘটায়। সামিহা অবশ্য কোনো অঘটন ঘটালো না। সে সুন্দর মতো গিয়ে সাবার সাথে বন্ধুত্ব পাতিয়ে বসলো। সাবা ফার্স্ট টাইমার। সামিহা তাদেরকে পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার বাহানা দিয়ে মেয়েটাকে ডেকে নিয়ে এলো তাদের পড়ার টেবিলে। সাবা যদিও প্রথমে অস্বস্তিতে ভুগছিল। কিন্তু সামিহার মিশুকে স্বভাব তাকে বেশিক্ষণ অস্বস্তিতে ভুগতে দিল না। এরপর ধীরে ধীরে সামিহা আর নিহালের সাথে সাবাও যুক্ত হলো। সামিহা ভালো রকমের কো অপারেটিভ হলো নিহাল আর সাবার মধ্যে একটা স্বাভাবিক বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে। নিহালের জন্য সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। বাকিটা সে নিজেই করে নিয়েছিল। বছর খানেক ঘুরতেই সে সোজা বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলো সাবাকে। সেদিন মেয়েটার জন্মদিন ছিল। নিহালের কান্ডে সাবা হতভম্ব। সামিহা বিরক্ত! সে গাধাটাকে বলেছিল আস্তে ধীরে আগাতে। গরু সোজা বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসে আছে! এই হাঁদারামকে নিয়ে সে কি করবে সেটা ভাবতে ভাবতে যখন তার কপাল চাপড়ানোর জো ঠিক তখনই তাকে অবাক করে দিয়ে সাবা নিহালের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। সামিহা অবশ্য খুশিই হলো তবে এমন একটা ভাব করলো বন্ধুদের এই নতুন প্রেমময় সম্পর্কে সে মহা বিরক্ত। নিহালকে প্রতিনিয়ত এই নিয়ে বিরক্ত করা আর ত্যাড়া বাঁকা কথা শোনানো তার মৌলিক কাজ হয়ে গেল। আর সাবাকে বলা যে সে কি দেখে নিহালের প্রেমে পড়লো। এতো সুন্দর একটা মেয়ের এতো বিচ্ছিরি পছন্দ! অথচ তাদের প্রেমে কলকাঠি নেড়েছে সে বান্দা নিজেই। নিহাল সেগুলো মনে করে হাসলো। সামিহা আকাশ কুসুম ভাবতে ভাবতে তখনই কেবল মাত্র ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়েছিল। নিহালের ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা দেখে সে খেঁকিয়ে উঠলো।
“ বজ্জাত কোথাকার! আমার জীবন শেষ করে দিয়ে মহাশয় মুচকি হাসছেন! নিহালের বাইচ্চা! শুধু তোমার তোর জন্য আমি কালকে পেন্ডিং খাবো! বাবাআআ!!! ”
সামিহা কাঁদার ভঙ্গিতে বললো। নিহাল এবার জোরে হেসে ফেললো। তারপর হাসি থামিয়ে বিরক্তি নিয়ে বললো,
“ তুই একটু নমুনা কম কর তো ফাজিল মহিলা! এমন ভাব করছেন আপা যেন তিনি টপিকটা আগে একটুও পড়েননি। বুকে হাত দিয়ে বলতো সামি তুই একেবারে ওই টপিকটা পারিস না! একটুও পড়িসনি। ”
সামিহা চুপ হয়ে গেল। সে পড়েছে। কিন্তু তবুও তার মনে হচ্ছে সে কিছুই পারে না। কালকে পেন্ডিং খাবে। নিহাল হতাশ হয়ে মাথা নাড়লো। এরপর বললো,
“ সামি, তুই তো আগে থেকেই পড়ে রেখেছিস তাই না? বল। তাহলে এতো চিন্তার কি আছে? আইটেমে পারার মতো করে পড়িসনি তো কি হয়েছে। আমরা এখন একবার পড়ে নিবো। বিকেলেই তো তোর ব্লাইন্ড ডেট তাই না? সেখান থেকে এসে রাতে আবার পড়ে নিস। তারপর আমরা আবার একটা সেশন করে নিব। আবার সকালে আইটেমের আগে আরেকবার। তোর আইটেম আমি ক্লিয়ার করিয়ে দিব। টেনশন কম কর। ”
সামিহা কিছু বললো না। তবে সে বেশ আশ্বস্তবোধ করলো। সে জানে নিহাল একবার যখন বলেছে তাকে আইটেম ক্লিয়ার করিয়ে দিবে মানে সে দিবে। নিহাল সামিহাকে কিছু বলতে না দেখে মেকি বিরক্ত নিয়ে বললো,
“ হয়েছে হয়েছে! এতো চিন্তা করতে করতে কপালে পার্মানেন্ট ভাঁজ ফেলে দিতে হবে না। এমনিতেই পেঁচামুখী! পরে দেখবো কপালে ভাঁজ পড়া মেয়েকে কেউ বিয়ে টিয়ে করবে না! তখন তো আবার আমাকে আর আমার ভবিষ্যৎ বউটাকেই জ্বালাবি। সেটা তো হতে দেওয়া যাবে না। এই ধান্দা ঝেড়ে ফেলে বত্রিশ পাটি দেখিয়ে একটু হাসতো! দাঁতে কোনো সমস্যা আছে কিনা দেখি! ”
সামিহা চোখ কটমট করে তাকালো। নিহাল হেসে উঠলো। ভয় পাবার ভঙ্গি করে বললো,
“ ওহ বাবা! ভয় পেয়ে গেলাম! ”
সামিহা হেসে ফেললো। নিহালও হাসলো। কি একটা কথা মনে পড়তেই বললো,
“ তুই নিশ্চিত তুই আজ ছেলেটার সাথে দেখা করতে যেতে চাস? ”
সামিহা মাথা নাড়লো। নিহাল জিজ্ঞেস করলো না কেন। কারন সে জানে সামিহা নিজেও জানে না কেন সে দেখা করতে যাচ্ছে। তার অধিকাংশ কাজেরই কোনো ভ্যালিড কারন থাকে না। তার হঠাৎই মনে হয় এইটা করা উচিত। তখন সে সেটা করে বসে। নিহাল এবার শান্ত স্বরে বললো,
“ কোনো দরকার হলে বলবি কেমন? ”
“ আচ্ছা। এখন এইসব বাদ দিয়ে আমাকে পড়া বুঝিয়ে দে নিহালের বাচ্চা! ”
নিহাল হাসলো। আবার পড়াশোনা শুরু করলো দুজন। ঘন্টা দুয়েক পড়লো তারা। সামিহার ততক্ষনে পড়া বুঝা শেষ। নিহাল পড়ানো শেষ করে বললো,
“ তুই শয়তান মহিলা বুঝেছিস আশা করি। আঁতেল গোষ্ঠী! আমি রাখি এখন। গোসল দিয়ে নামাজে যেতে হবে। ”
সামিহা চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে বললো,
“ হ্যাঁ! আর সাবুদানাকে কে যেন কল করে বলবে দাওয়াতে কেমন লাগছে আমার ভবিষ্যৎ বউ? যত্তোসব ভন্ড! ”
নিহাল ভালো রকমের লজ্জা পেল সামিহার কথায়। কারন সে একদম সত্য কথা বলেছে। লজ্জা ঢাকতে বললো,
“ তো দিবো না! আমার একটা মাত্র গার্লফ্রেন্ড! ”
সামিহা বিরক্ত হবার ভান করে বললো,
“ হ্যাঁ! আর জাহিদ আংকেল জানলে গার্লফ্রেন্ড থেকে বোন হয়ে যাবে! ”
নিহাল এবার অসহায় কন্ঠে বললো,
“ এমনে বলিস না সামি! কষ্ট লাগে! ”
সামিহা খিলখিলিয়ে হাসলো। এরপর বললো,
“ রাখ কল! আমার সাবুদানা তোর কলের অপেক্ষায় ওদিকে বোধহয় শুকিয়ে যাচ্ছে! যেয়ে ওকে কল দে। ”
নিহাল হেসে আল্লাহ হাফেজ বলে কল কেটে দিল। সামিহা সময় দেখলো। বারোটা বাজতে আরো কিছু সময় বাকি আছে। কিন্তু তার অনেক কাজ! মায়ের পাঠানো সিভি খানা পড়তে হবে। জানতে হবে কোন মহাশয়ের সাথে তার সাক্ষাৎ হতে যাচ্ছে আজ। হোয়াটসঅ্যাপে মায়ের পাঠানো সিভিটা পড়তে শুরু করলো নিতান্ত অবহেলার সহিত। সে আজ দেখা করতে যাচ্ছে কেবল মাত্র তার হঠাৎ করেই মনে হয়েছে জীবনে এই ব্লাইন্ড ডেটের অভিজ্ঞতাটার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সিভি পড়ার মাঝেই দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজ হলো। সামিহা সিভি থেকে চোখ না সরিয়েই বললো,
“ দরজা খোলাই! ”
ফারহানা ঘরে ঢুকলেন। তিনি গলা খাঁকারি দিতেই সামিহা পিছু ফিরে তাকালো। মাকে দেখে ফোনটা রেখে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ফারহানা মেয়েকে দেখলেন। রাতে যেই পোশাকে দেখেছেন সেটাই তার পরনে। কি সুন্দর লাগছে উনার মেয়েকে! মেয়েটার রূপ দিনকে দিন যেন বাড়ছেই। এতো চমৎকার দেখতে একটা মেয়ের মা তিনি সেটা ভাবতেই অবাক হলেন। তিনি চোখ সরিয়ে নিলেন। সন্তানের উপর মায়েদের নজর বেশি লাগে। মাকে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সামিহা বললো,
“ কিছু বলবে? ”
ফারহানা মেয়ের দিকে তাকালেন। মেয়ের দৃষ্টি শীতল। ফারহানা সে দৃষ্টিতেই চোখ রেখে বললেন,
“ এই শাড়িটা পড়ে যেও। ”
সামিহা এতক্ষণে মায়ের হাতে থাকা শাড়িটা লক্ষ্য করলো। হালকা নীল রঙের একটা জামদানি শাড়ি। শাড়িটা মায়ের অতি প্রিয় একটা শাড়ি। শাড়িটা সামিহার নানাজানের দেওয়া। খুব কম পড়েন মা এই শাড়িটা। শাড়িটা সামিহারও ভীষণ প্রিয়। তার অনেকদিনের ইচ্ছে ছিল শাড়িটার পরার। কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা না চাইতেই পেয়ে সে বেশ আনন্দিতবোধ করলো। পরক্ষনেই মনে পড়লো তার এই বহু আকাঙ্ক্ষিত শাড়িখানা পরেই তাকে আজ একটা অনাকাঙ্ক্ষিত সাক্ষাতে যেতে হবে। কি যন্ত্রণা!
[ হিলো! বালু আচেন? চেতে আচেন জানি! কিন্তু আমার নিজের অবস্থা সামিহার মতো! আইটেম!!!!! (আইটেম হলো ভাইভা এক্সাম, কার্ড ও একপ্রকার এক্সাম! অদ্ভুত নাম, তাই না?) দোয়া করবেন আমি যেন আল্লাহ আল্লাহ করে মেডিকেল উত্রে যেতে পারি! সেই সাথে আমার শখ-আহ্লাদগুলোও যেন ঠিকঠাক করে পূরণ করতে পারি! নাহয়... ]
Click here to claim your Sponsored Listing.