Sensus

Sensus

Share

05/05/2025

#আয়নানীড়_কুঞ্জ
#সাদিয়া_ইসলাম_দৃষ্টি

শরৎকাল।
বিকেলের ম্লান আলোটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল পুরোনো বাড়িটার গা-ধরা দেয়ালের ফাঁকে। আলো যেন নিঃশব্দে গিলে যাচ্ছিল সেই ইট-পাথরের মাঝে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলোর মধ্যে।

বাড়িটা অদ্ভুতভাবে লোকালয় থেকে অনেকটাই দূরে, এক নির্জন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে—যেন বাগান ছিল একসময়, এখন কেবল অবহেলিত এক টুকরো জমি। চতুর্দিকে এমন নিস্তব্ধতা, যেন শব্দও পথ হারিয়ে ফেলে এখানে এসে।

বাড়ির সামনে এক বিশাল ফাঁকা মাঠ। শুকনো ঘাসে ছাওয়া জমিনের মাঝে উঁকি মারে কিছু বুনো আগাছা আর ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলো, যাদের পাতায় বাতাস নেই, তবু মাঝে মাঝে কেমন যেন কাঁপুনি ধরে।

সেই সবুজ-ধূসর বিরক্ত নিস্তব্ধতার ঠিক শেষে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোহার গেট—পুরোনো, কালো রঙের, মরিচায় ঢেকে যাওয়া। দেখতে পেলেই মনে হয় বহু বছর ধরে কেউ ছুঁয়েও দেখেনি ওটা।
তবু কোথায় যেন এক চাপা উপস্থিতি টের পাওয়া যায় ওর আশেপাশে—যেন কিছু রয়ে গেছে এখানে, সময়ের গা থেকে খুলে ফেলা কোনো পুরোনো গল্প।

গেটের ওপরে, পুরোনো দেয়ালের একপাশে, কালচে রঙের ধুলোমাখা একটি ফলক ঝুলে আছে। দীর্ঘদিনের অবহেলায় চাপা পড়ে গেলেও, তার গায়ে খোদাই করা শব্দদুটো যেন ধুলোর ভেতর থেকেও উঁকি দেয়। অদ্ভুত এক আকর্ষণে চোখ আটকে যায় সেখানে—

“আয়নানীড় কুঞ্জ”

এই দুটি শব্দ একসাথে যেন অচেনা এক ছায়া তৈরি করে মনে।
“আয়না”— প্রতিচ্ছবি, যে নিজের রূপ দেখায়, কিন্তু সবসময় সত্য বলে না।
“নীড়”— নিরাপদ আশ্রয়, কিংবা বসবাসের জায়গা।

বাড়িটা দোতলার। বাইরে থেকে যতটা সাদামাটা মনে হয়, ভেতরে ততটাই ছড়িয়ে রয়েছে নিঃশব্দ এক রহস্য।
মোটামুটি আটটি কক্ষ — নিচ তলায় চারটি আর দোতলায় তিনটি, আর একটি ছাদের ঘরে।

ছাদের ঘরটি বহু বছর ধরে বন্ধ। মোটা তালা ঝুলে থাকে দরজার গায়ে, যেন সময়ের মতোই জমে আছে তার ওপরে ধুলোর স্তর। কেউ সেখানে যায় না, কেউ যেতে চায়ও না।
বাড়ির মানুষজন বলে,
“ওটা শুধু পুরোনো জিনিসপত্র রাখার জায়গা।”
তবে আশ্চর্যের বিষয়—এই বাড়িতে “মানুষজন” বলতে আদৌ কেউ আছেন তো?

এই বিশাল বাড়ির বাসিন্দা মূলত একজনই—সায়ন্তিকা বেগম।
দেখতে খুবই শান্ত, স্থির এক ভদ্রমহিলা, বয়স আনুমানিক ষাট পেরিয়েছে। তার চলাফেরায় এক ধরণের মিতভাষী নিস্তব্ধতা আছে, যেন প্রতিটি পা ফেলে অনেক হিসেব করে।
সন্ধ্যার পর তিনি আর ঘর থেকে বের হন না। ঘরের আলো জ্বলে থাকে, কিন্তু জানালার পর্দা কখনো সরে না।

তার সঙ্গে একজন পুরুষ কেয়ারটেকার আছেন—আফযাল রহমান।
চেহারায় দৃঢ়তা থাকলেও চোখের কোণে যেন সবসময় চাপা চিন্তার ছায়া। বয়স পঁয়তাল্লিশের আশেপাশে।
তবে তিনিও সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরে যান।
রাত নেমে এলে, বাড়িটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে আবার।

তবু... রাত ঠিক বারোটার পর, সেই নিস্তব্ধ বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসে হালকা কাশির শব্দ।
না, তীক্ষ্ণ নয়—বরং একধরনের মোড়ানো কাশি, যেন বহু পুরোনো ফুসফুসে জমে থাকা ধোঁয়া গিলে কাশছে কেউ।

আর শোনা যায় পায়ের শব্দ, ধীরে ধীরে…
“কট কট… কট কট…”
পুরোনো কাঠের মেঝেতে হাঁটার সেই চেনা আওয়াজ।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়—
এই শব্দগুলোর উৎস কোথায়?
যখন বাড়ি সম্পূর্ণ নির্জন...

নতুন ভাড়াটিয়া অরুণিমা এই বাড়িতে এসেছে মাত্র এক সপ্তাহ হলো। শহরের চেনাজানা মুখগুলোর বাইরে, দূরে কোথাও একটু নির্জনতা খুঁজছিল সে—শুধু তার লেখালেখির জন্য।
সে একজন প্রতিষ্ঠিত লেখিকা। প্রতিবছর তার লেখা নতুন উপন্যাস প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো সোল্ড-আউট হয়ে যায়। পাঠকরা তার লেখা পেলে অন্য কিছু ভুলে যায়, আর অরুণিমা নিজেও তার লেখায় ডুবে থাকতে পছন্দ করে।

এই পুরোনো বাড়িটা প্রথম দেখাতেই তার ভালো লেগেছিল।
নিঃসঙ্গ, ছায়াময়, আর শব্দহীন—একেবারে নিখুঁত।
তবে একটা বিষয় বারবার তার মনোযোগ কাড়ছিল—ছাদের ঘরটা।

বাড়ি দেখাতে এসে সায়ন্তিকা বেগম যখন নিচতলার রুমগুলোর কথা বলছিলেন, তখনই অরুণিমা সাহস করে জিজ্ঞেস করে ফেলে ছাদের ঘরটির কথা।

ভদ্রমহিলা এক মুহূর্ত চুপ থাকেন। মুখে কোনো রাগ নেই, কিন্তু চোখের ভেতর হঠাৎ যেন অস্বস্তির পরত জমে ওঠে।

তারপর শান্ত গলায় বলেন—
“শোনো মাইয়া, যেইটা করতে আইছো, ওইটুকুই করো। লেখালেখি। ছাদের ঘরের দিকে তাকানোরও দরকার নাই। এত কৌতূহলী হইলে চরম বিপদে পড়বা।”

তার কণ্ঠে কোনো ভয় দেখানোর ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু অরুণিমার কানে কথাগুলো ঠিকভাবে বাজে না—
শব্দগুলো যেন মেঘলা আকাশের নিচে একটা চাপা গর্জনের মতো শোনায়।
“চরম বিপদে পড়বা…”

আর তখনই, বারান্দার ওপাশে থাকা তালাবদ্ধ সিঁড়ির মুখে চোখ যায় অরুণিমার।
দেয়াল বেয়ে এক চিলতে বাতাস বয়ে যাচ্ছে…
ঠিক যেন কেউ ওপরে দাঁড়িয়ে নিচের কথাগুলো শুনছে।

অরুণিমা একটু অবাকই হলো সায়ন্তিকা বেগমের কথায়। ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, তিনি ছাড়া আর কেউ নেই বাড়িতে। তার এক ছেলে, সেও থাকে এই গ্রাম থেকে বহু দূরে, কোনো এক শহরে। তবে... সেই সমস্ত আওয়াজগুলো!

এসব কী তাহলে?
তার ভ্রান্তি?

এক রাতে, হঠাৎ করেই পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেল।
মোবাইলের ক্ষীণ আলোর মাঝে অরুণিমা রান্নাঘর থেকে মোমবাতি খুঁজছিল। তখনই, অদ্ভুত এক খুটখুট শব্দ তার কানে এল।
শব্দটা ছাদের ঘর থেকে আসছিল।
খুট... খুট...
ঠিক যেন ধাতব কিছু একটা টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

অরুণিমার গা শিরশির করে ওঠে, কিন্তু সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেনি। কৌতূহল তাকে আর বসে থাকতে দিল না। মোমবাতি হাতে সে সিঁড়ির দিকে চলে যায়।

অন্ধকারে মোমবাতির আলো থেকে ছায়াগুলি যেন আরও বড় হয়ে উঠছিল। প্রতিটি পা যেন সিঁড়িতে আরো ভারি হয়ে উঠছিল, যেন ছাদের দিকে যাওয়ার জন্য নিজেকেই বোঝাতে চেষ্টা করছিল সে।

কেন? ছাদের ঘরটা কেন এত আকর্ষণীয় হয়ে উঠল তার কাছে?

ছাদের দরজাটা জং ধরে লালচে হয়ে গেছে। সময়ের সাথে সাথে যেন এক প্রকার নিঃশব্দ মৃত্যু বয়ে এসেছে তার ওপর। তবে আজ... আজ সেটা একটু ফাঁকা—যেন কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সামান্য খুলে রেখেছে।

অরুণিমা মনে করল, একবার সে চুপিচুপি এসেছিল ঘরটি দেখার জন্য। তবে সেদিন যখন সে দরজার কাছে পৌঁছেছিল, তখন সেখানে মস্ত একটা তালা ঝুলছিল।
এটা দেখে সে চুপচাপ চলে গিয়েছিল, ভেবেছিল পরের বার আবার আসবে। কিন্তু আজ... আজ তালাটা তো নেই, আর দরজাও এমন করে খোলা!

দরজার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে আসছিল, শরীরের প্রতিটি কোণে প্রবাহিত হয়ে। বাতাসের সঙ্গে এক অদ্ভুত গন্ধ মিশে ছিল—গন্ধটা ছিল পুরোনো, বিস্মৃত; যেন বহু বছর আগে রয়ে গিয়েছিল।

"এখানে তো কেউ থাকার কথা নয়,"
অরুণিমা নিজেকে সান্ত্বনা দিতে গিয়েও কণ্ঠে একটা অদ্ভুত শঙ্কা শুনতে পেল। তার শব্দ যেন রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিল, নিঃশব্দ গভীরতার মাঝে হারিয়ে যাচ্ছিল।

কিন্তু সে থেমে থাকল না।
হাতে মোমবাতি তুলে সে এক পা বাড়াল।

সে ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে দরজাটাকে এক চিলতে ধাক্কা দিল।

ক্যাঁচ্‌ করে একটা কর্কশ শব্দ তুলে দরজাটা খুলে গেল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই—মোমবাতির শিখা নিভে গেল। চারপাশে নেমে এল ঘুটঘুটে অন্ধকার।
চোখের সামনে আর পেছনে—সবই একাকার।
অরুণিমা থমকে গেল। হঠাৎ...ঠিক সেই মুহূর্তে,
তার কানে এল এক অস্বাভাবিক নিঃশ্বাসের শব্দ।

ধীর, ভারী, থমথমে নিঃশ্বাস...
যেন কেউ তার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে, ঠিক ঘাড়ের পেছনে—আর তার দিকে চেয়ে আছে নিঃশব্দে।

অরুণিমার কণ্ঠ শুকিয়ে গেল। হৃদপিণ্ড যেন এক লাফে গলা পর্যন্ত উঠে এলো। সে এক চুলও নড়তে পারছিল না। চারপাশের অন্ধকার এখন কেবল অন্ধকার নয়—তা যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

কোনো রকমে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে সে চারদিকে তাকালো। ঘরটা খালি। পুরোনো কিছু কাঠের বাক্স, ধূলোমাখা চেয়ার... আর এক কোণে একটা আয়না। লম্বাটে, ডিম্বাকৃতি আয়নাটি ঝুলছে এক জংধরা শিকলে। ছাদের কাছ থেকে নিচু হয়ে নেমে এসেছে আয়নার মাথা পর্যন্ত সেই শিকল।

কাঠের ফ্রেম—পুরোনো, কালচে বাদামি, হাতে খোদাই করা পাতার নকশা ফ্রেমটিকে ঘিরে রেখেছে এক অদ্ভুত ঘূর্ণির মতো। তার উপর খানিকটা ছোপছোপ ফাটল, যেন আয়নাটি অনেক কিছু দেখেছে—আরও অনেক কিছু জানে।

আয়নার কাচটি স্পষ্ট, তবুও মাঝেমধ্যে একটু কুয়াশার মতো জমে যায় তার উপর। আর আজব করা বিষয় হচ্ছে যে, ঘরের আর বাকি সব জিনিসপত্র ধুলোয় ঘেরা থাকলেও আয়নাটি একেবারেই পরিষ্কার। যেন প্রতিদিন কেউ আয়নাটি যত্ন করে মুছে রাখে।

অরুণিমা আয়নাটি দেখার জন্য কাছে যায়। হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখতে থাকে।

আয়নাটা দেখে তার গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেল।

আয়নাতে সে একা ছিল না।

তার পেছনে একটা ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে...যদিও স্পষ্ট নয় তবুও আবছা বোঝা যাচ্ছে—চোখ দুটো লাল, আর ঠোঁট থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।

অরুণিমা চিৎকার করতে পারছিল না। গলা শুকিয়ে গেছে। হঠাৎ ছায়ামূর্তিটা ফিসফিস করে বলল,
“আমার জায়গায় কেন এসেছিস?”

অরুণিমা পেছনে ঘুরে তাকাল—কেউ নেই। কিন্তু আয়নায় সে এখনো সেই রক্তাক্ত চোখদুটো দেখতে পাচ্ছে। ধীরে ধীরে ছায়ামূর্তিটা আয়নার ভেতর থেকে তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল, ঠিক আয়নার নিয়ম উল্টো করে।

হাত-পা যেন জমে গেছে। শরীর নড়ছে না, গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না।

“আমার জিনিস ছুঁয়েছিস তুই,”
ফিসফিস করা সেই গলা এবার যেন মাথার ভেতরে বাজল।

আতঙ্কে অরুণিমার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল। সে টলতে টলতে পিছিয়ে এল, আর পায়ের নিচে কিছু একটা চটাস করে ভেঙে গেল।

মাটিতে তাকিয়ে দেখে—একটা পুরোনো ফ্রেমে ছবি। তার আশেপাশে কাঁচের টুকরো, ধুলোময়, ছবিটার এক কোণে ছোট করে লেখা:
“সুভা – ১৯৮৮”

ছবির মেয়েটার মুখটা দেখে অরুণিমা কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। চোখ যেন আটকে গেল সেই কালো-সাদা ছবিটার ওপর। মেয়েটার চুল অদ্ভুতভাবে কাঁধ ছুঁয়ে আছে, চোখে একরকম অনন্ত দৃষ্টির ছাপ—কিন্তু তার চেহারাটা... বড়োই পরিচিত।

হঠাৎ স্মৃতির খোলা জানালায় ভেসে উঠল সেই বিকেলের কথা।
যখন এই বাড়ির মালিকনি সায়ন্তিকা বেগমের সঙ্গে চুক্তি করছিল অরুণিমা।
তখন তিনি বলেছিলেন,
"আমার এক মাইয়া আছিল... অনেক বছর আগে নিখোঁজ হইয়া গেছে।"

তার চোখে তখন একরাশ অদেখা ব্যথা ছিল, যা হয়তো তিনি কখনো কাউকে দেখাতে চাননি।

গ্রামের মানুষজন এই ঘটনাটাকে ঘোলাটে করে তুলেছে।
"বুড়ির মাইয়া নাকি কারে লইয়া পালায়া গেছে..." "হয়তো কেউ ধোকা দিয়া ফালাইয়া দিছে..."
"তাই দুঃখে আত্মহরণ করছে..."
—এমনই কুৎসা উড়ছিল হাওয়ায়।

আরও বাজে কথা শুনেছিল অরুণিমা, যখন সে প্রথম এই গ্রামে পা রাখে। অনেকেই তো তাকে ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল এই বাড়িতে উঠতে,
“এই বাড়ি ভালো না, মা। এই বাড়িতে শান্তি নাই।”
—এমন সতর্কবাণী শুনে তার মনে একটু ভয় জাগলেও, সে পাত্তা দেয়নি।

তবে এখন...
এই ছবিটার মুখ দেখে যেন সমস্ত গল্প হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠল।
অরুণিমার মনে পড়ে গেল—যখন সে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিল সায়ন্তিকা বেগমকে,
সেই ভাঙা কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন,
"এগুলা সব মিছা কথা, এগুলাতে কান দিও না... আমার মাইয়ারে আমি চিনি।"

এই কথাগুলো এখন কানের মধ্যে যেন বাঁশির মতো বাজছিল অরুণিমার।

হাতে ছবিটা নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এল সে সেই অন্ধকার ঘর থেকে।
আর পেছনে রয় গেল—
এক রক্তঝরা, কুয়াশায় ভেজা দৃষ্টি—
যার মাঝে ছিল অজানা এক অভিশাপের আর্তি।

পরদিন সকালটা কেমন যেন কুয়াশায় ঢাকা ছিল,
যদিও রোদ উঠেছিল ঠিকই।
তবুও বাড়ির ভেতরে অরুণিমার গায়ে একরকম হিম ঠান্ডা লেগে ছিল সারাক্ষণ।

সে সাহস করে নামল নিচে।
হাতে ছিল সেই কালো-সাদা ছেঁড়া ছবিটা—
যেটার চারপাশে রক্তের মতো দাগ লেগে আছে কি না, সে আর খেয়াল রাখেনি।

সায়ন্তিকা বেগম তখন উঠোনে বসে চা খাচ্ছিলেন চুপচাপ।
অরুণিমা কাছে গিয়ে ছবিটা বাড়িয়ে দিলো। আর জিজ্ঞেস করলো,
"মেয়েটি কে?"

ভদ্রমহিলা ছবির দিকে তাকালেন।
প্রথমে কিছুই বললেন না।
তারপর হঠাৎ ঠোঁট কেঁপে উঠল, গলা কাঁপতে শুরু করল—

“এই হইলো... সুভা... আমার মাইয়া...”
তার চোখে জল আসেনি,
কিন্তু গলার প্রতিটি শব্দ যেন কাঁদছিল।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন—

“কিন্তু... এই ছবি তো আমরা... তেরো বছর আগে... কবরের ভিতর রাইখা দিছিলাম!
তুমি কই থেইকা পাইছো?”

অরুণিমার মুখ শুকিয়ে গেল।
সে বুঝে উঠতে পারছিল না কী বলবে।
চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে
একটা সত্যি বেরিয়ে এল তার ঠোঁট থেকে—

“ছাদের ঘরটা থেকে।
একটা আয়নার নিচে পড়ে ছিল…”

এই কথা শোনামাত্রই সায়ন্তিকা বেগমের মুখ রক্তশূন্য হয়ে গেল।
তাঁর চোখে যেন আতঙ্ক ছায়া ফেলল,
আর সেই সঙ্গে জ্বলে উঠল প্রবল রাগ।

“বড্ড বেয়াড়া তুমি। কতবার না করলাম!
এই কালের মাইয়ারা কিছুই শুনে না।
বড়দের কথা বুঝেও না বোঝার ভান করে।
বাপে-মা কি কোনো শিক্ষা দেয় না এইসব ছেলে-মেয়েদের?”

অরুণিমা কিছু বলেনি।
কারণ তার নিজেরও মনে হচ্ছিল—সে ভুল করেছে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেছে সে।

সায়ন্তিকা বেগম তখন এক দমে উঠে দাঁড়ালেন।
চোখে শুষ্ক আতঙ্ক আর একরাশ অভিশপ্ত স্মৃতি।

"ঠিকাছে, গেছ যখন, শুনো তাহলে...
সুভা... শেষবার সেই আয়নার সামনেই দাঁড়াইয়া ছিল।
তারপর... তারপর থেকে আর তারে খুঁজে পাওয়া যায় নাই।"

সেই রাতেও আকাশ ছিল নিঃসঙ্গ। চাঁদের আলো পর্যন্ত যেন মুখ লুকিয়ে ছিল মেঘের আড়ালে।

অরুণিমা সাহস করে আবার ছাদে উঠল। কেবল এক রহস্য ভেদের আকর্ষনের তাগিদে। আজ সে একা নয়, সঙ্গে এনেছে ছোট্ট একটি গোপন ক্যামেরা—সব রেকর্ড করে রাখবে বলে।

ঘরের দরজাটা আগের মতোই আধ-খোলা। ভিতর থেকে সেই ঠান্ডা বাতাস আজও বেরিয়ে আসছে, এক অজানা ভয় নিয়ে।

সে ধীরে ধীরে ভিতরে পা রাখল।

ঘরটা নিঃসাড়, নির্জন। দেয়ালের ধারে দাঁড়িয়ে সেই আয়নাটা—যেন কারো প্রহরায় রয়েছে।

অরুণিমা ক্যামেরাটা চালু করল। লেন্স ঠিক করলো আয়নার দিকে।
তারপর চোখ তুলে তাকাল আয়নায়।
এক মুহূর্তেই গলার কাছে জমে গেল এক তীব্র কিছু—
কারণ সে নিজেকে দেখতে পেল না সেখানে।

বরং আয়নার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ে।

সাদা পোশাক, রক্তে ভেজা শরীর, মুখ ঢেকে রাখা লম্বা এলোমেলো চুলে। ঠোঁটের একপাশ কাটা—হলুদ আলোয় তা যেন আরও ভয়ানক।

মেয়েটি চেয়ে আছে সরাসরি তার দিকে। ঠান্ডা গলায় বলল—

“আমাকে কবর দিয়েছে, আয়নাটাকে নয়।
আমি এখানেই ছিলাম... এখনও আছি।”

ঠিক তখনই ক্যামেরার স্ক্রিন ঝাঁকুনি দিয়ে হঠাৎ সাদা হয়ে গেল।
একটা বিকট, কর্কশ চিৎকার ঘরের নিস্তব্ধতা চিরে ভেসে এল—

সেই রাতেই নিখোঁজ হলো অরুণিমা।
বাড়ির কোথাও তার হদিস নেই।
মোবাইল, ব্যাগ, এমনকি সেই ক্যামেরাটাও পাওয়া যায়নি আর।

অরুণিমার নিখোঁজ হওয়ার পর পুরো বাড়িটা গুঞ্জনে ছেয়ে গেল।

পুলিশ এলো, তদন্ত চলল বহুদিন। তারা পুরো বাড়ি চষে ফেলল—নিচতলা, দোতলা, এমনকি ছাদ পর্যন্তও। কিন্তু কোথাও অরুণিমার কোনো চিহ্ন মেলেনি।

সে রাতের পর থেকে অদ্ভুত কিছু ঘটতে লাগল।

অরুণিমার মোবাইল, সেই গোপন ক্যামেরা, এমনকি ছাদের ঘরের দেয়ালে টাঙানো সেই রহস্যময় আয়নাটাও কোথাও নেই—একেবারে গায়েব।

কিন্তু যেটা সবচেয়ে ভয়ংকর, তা হলো ছাদের ঘরের দরজা।
যেটা আগে সবসময় তালা দেয়া থাকত,
সেই দরজাটা এখন সবসময় খোলা থাকে।

আর কেউ যখনই সাহস করে ছাদে ওঠে, তখন দরজাটা—

“ক্যাঁচ...”

শব্দে ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়...
আপনাআপনি।
কাউকে ছুঁতে হয় না।

প্রথমে সবাই ভেবেছিল বাতাসের খেলা,
কিন্তু কেমন বাতাস যে কেবল মানুষ উঠলেই দরজা বন্ধ হয়?

গ্রামের লোকেরা এখন আর ওই বাড়ির পাশে পর্যন্ত হাঁটতে সাহস করে না।
শুধু মাঝে মাঝে শোনা যায় একটানা ফিসফিস...
কোনো নারীকণ্ঠ—

“আমি এখানেই ছিলাম... এখনও আছি…”

কয়েক মাস পর…

“আয়নানীড় কুঞ্জে” আবার নতুন ভাড়াটিয়া।

নাম—অভিরূপ। পেশায় সাংবাদিক, তবে তার লেখালেখির বিষয়বস্তু একটু আলাদা—অলৌকিক ঘটনা।

অরুণিমার নিখোঁজ হওয়ার খবরটা যখন প্রথম শুনেছিল, তখনই সে ঠিক করেছিল—যেভাবেই হোক, একদিন এই বাড়িটা ভাড়া নেবে।

আর অবশেষে সুযোগ মিলল।

বাড়িতে ঢুকেই তার চোখ আটকে গেল ড্রইংরুমের এক কোণে টাঙানো একটা পুরনো আয়নায়।

কাঁলচে বাদামী কাঠের ফ্রেম, হালকা ফাটা কাচ, আর এক ধরনের অদ্ভুত ঠান্ডা শীতলতা ছড়িয়ে আছে তার চারপাশে।

কিন্তু... এই আয়নাটা সে আগে কোথাও দেখেছে!
কোথায়?

মনে করার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না।

রাতে, যখন সে দাঁত ব্রাশ করছিল, আচমকা সে বুঝতে পারল—

আয়নায় তার প্রতিবিম্ব নেই।

তার বদলে, এক আবছা ছায়া পেছনে দাঁড়িয়ে।
লম্বা চুল, রক্তাক্ত ঠোঁট, আর এক ধরণের নিষ্পাপ অথচ কষ্টে-ভরা হাসি।

নরম কণ্ঠে ছায়াটা বলল...

“আমার গল্পটা তুমি শেষ করবে তো?”

অভিরূপ বিদ্যুৎবেগে পেছনে তাকাল।
কেউ নেই।

কিন্তু তখনই…
আয়নার নিচে ছোট করে একটা লেখা ধীরে ধীরে ভেসে উঠল।
লালচে রঙে খোদাই করা…

“অরুণিমা – ১৯৯৯ – ∞”

(সমাপ্ত)

কপি কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫

(বিঃদ্রঃ
আমি কোনো প্রফেশনাল লেখিকা নই। তাই ভুলত্রুটি দয়া করে মার্জনার চোখে দেখবেন এবং ভুলগুলো শুধরে দিতে সাহায্য করবেন। গল্প পড়ে আপনাদের মূল্যবান মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না। ভালো লাগলে লাইক, শেয়ার, কমেন্ট করে উৎসাহ দিবেন।)

#রহস্যময়
#গল্প
#কল্পনা
#লেখালেখি
#লেখিকা
#বাংলাগল্প

26/04/2025

#ডায়েরি_জুড়ে_তুমি
#পর্ব_সাত (০৭)
#সাদিয়া_ইসলাম_দৃষ্টি

সন্ধ্যার নরম আলোয় তৃণা আর আদিব পাশাপাশি বসে ছিল। তৃণার হাতে এখনো সেই পুরনো ডায়েরিটা ধরা, পাতাগুলো যেন এখনো তার বুকের গল্পে সজীব হয়ে উঠেছে। আদিব চুপচাপ তাকিয়ে ছিল তার দিকে, এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতা নিয়ে।
তৃণার চোখে চিকচিক করছিল অশ্রু, কিন্তু সে হাসছিলও—কারণ...(কিচ্ছুক্ষণ আগে)

*তৃণা চোখ বন্ধ করে রাখল। তার সাহসে কুলোচ্ছেনা আদিবের চোখের দিকে তাকাবার। চারপাশ নীরব। শুধু বাতাসের মৃদু শব্দ… এবং দুটো হৃদস্পন্দনের শব্দ, যা তারা নিজেরাই শুনতে পাচ্ছিল। কোনো সারা শব্দ না পাওয়ায় ধীরে চোখ খুলল তৃণা।

আদিব তখনো চোখ বন্ধ করে বসে আছে। মুখে কোনো হাসি নেই, চঞ্চলতা নেই, শুধু একরকম চাপা অভ্যন্তরীণ আন্দোলন। তৃণা খেয়াল করল—তার আঙুল ডায়েরির মলাটটা শক্ত করে চেপে রেখেছে। যেন অনুভূতিগুলোর ভার ধরে রাখতে পারছে না ঠিকঠাক।

হঠাৎই আদিব চোখ খুলল।

তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সেই দৃষ্টিতে ছিল প্রশ্ন, স্বস্তি, আর এক অদ্ভুত রকমের স্বীকৃতি।

তারপর নিচু গলায় বলল, “তুমি জানো? আমি যা খুঁজেছি চলেছি, বহুদিন ধরে। তা যে আমি পেয়ে গেছি।”

তৃণা নিশ্চুপ।

আদিব একটু এগিয়ে এলো, কণ্ঠটা আরও কোমল হয়ে গেল—

“শুধু কখনো এটা ভাবিনি, উত্তরটা হয়তো ঠিক আমার সামনে বসে আছে। আমার এত কাছে আছে। বুঝতে একটু দেরি হয়ে গেলো।”

তৃণা একেবারে স্থির। যেন শ্বাস নিতেও ভুলে গেছে।

ডায়েরির পাতাগুলো বাতাসে একটু নড়ে উঠল—
এই মুহূর্তটা, এই স্পর্শহীন স্বীকারোক্তি… ।*

(বর্তমান)
প্রথমবারের মতো সে অনুভব করেছিল, তার গভীর, নিঃশব্দ ভালোবাসা বুঝতে পেরেছে তার পছন্দের মানুষ।

“তুমি সত্যিই... ঠিক একইভাবে অনুভব করো?” তৃণা ফিসফিস করে বলল, গলায় কাঁপন।

আদিব তার হাতটা শক্ত করে ধরল। যেনো তাকে বিশ্বাস করানোর জন্য আর কোনো শব্দের প্রয়োজন নেই। তার স্পর্শেই যেন সমস্ত উত্তর ধরা আছে। “হ্যাঁ, তৃণা। অনেক দিন ধরেই। শুধু বলা হয়ে উঠেনি।”

তৃণা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। চোখে ছিল কৌতূহল, অভিমান, আর একরাশ না বলা কথা।

“তাহলে এতদিন বলোনি কেন?” ধীরে উচ্চারণ করল সে, যেন প্রতিটি শব্দে ছিল একটি করে জমে থাকা রাতের প্রতিধ্বনি।

আদিব মাথা নিচু করল। “ সাহস হয়নি... আমি ভয় পেয়েছিলাম। যদি তুমি আমাকে ফিরিয়ে দাও?”

তৃণা চোখ সরু করে তাকাল। “হাস্যকর কথা! আমি যদি তোমার জন্য এত অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে পারি, তাহলে তুমি কেন ভেবেছিলে আমি না বলতে পারি?”

আদিব হেসে ফেলল। “ সেটাই তো বোকা মেয়ে। অনুভূতি গুলো তো লুকায়িত ছিল। আমি কী করে জানতাম? তুমি জানো, আমি সবসময় ভাবতাম, তুমি আমাকে শুধু বন্ধু হিসেবে দেখো।”

“আর আমি ভাবতাম, তুমি আমাকে শুধুই এক ক্লাসমেট হিসেবে দেখো!”

ওরা দুজনেই এবার হেসে ফেলল। অনেকক্ষণ পর যেন চাপা উত্তেজনার দেয়াল ভেঙে গেছে।

তৃণা এবার ডায়েরিটা ধীরে বন্ধ করল। কাগজের পাতাগুলো যেন একটা পর্ব শেষ করল।
“তাহলে… এখন?” কণ্ঠে ছিল প্রশ্ন, কিন্তু চোখে ছিল আশঙ্কা আর আশা।

আদিব আরও এক কদম এগিয়ে এল, তার গলার স্বর কোমল, অথচ গভীর—
“এখন?”
“এখন আমি চাই… তুমি আর তোমার অনুভূতিগুলোকে ডায়েরির পাতায় বন্দি করে রেখো না।”

সে তৃণার ডায়েরির ওপর হাত রাখল, ধীরে বলল—
“আমি চাই, তুমি আজ শুধু আমার দিকে তাকিয়ে বলো।
আমার চোখে চোখ রেখে বলো…
তৃণা, আমাকে বলো—তোমার মনে ঠিক কী আছে।”

তৃণার গাল ধীরে ধীরে লাল হয়ে উঠল। তার চোখে লুকিয়ে থাকা অভিমান, লজ্জা আর একটুকরো প্রশান্তি সব একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল।

সে মুচকি হাসল। তারপর খুব নিচু স্বরে, যেন নিজের বুকের ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসছে—বলে উঠল, “ভালোবাসি।”

আদিব এক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। তারপর ধীরে হাত বাড়িয়ে তৃণার থুতনিতে আঙুল রাখল।

“উহু, এভাবে নয়…” আদিবের কণ্ঠ ছিল মোলায়েম, গভীর।

“আমার চোখে চোখ রেখে বলো।”

তৃণা একটু কেঁপে উঠল। তারপর ধীরে মাথা তুলে, চোখে চোখ রেখে বলল, “ভা-লো-বা-সি।”

তার কণ্ঠ কাঁপছিল না, চোখেও কোনো দ্বিধা ছিল না। শুধু একরাশ নির্ভরতা আর ভালোবাসার মিশ্র স্নিগ্ধতা।

আদিব নিঃশব্দে হাসল। “এখন আমি নিশ্চিত, আমার ভালোবাসা একতরফা নয়।”

সে তৃণার দুই গাল দুহাত দিয়ে আলতো করে ধরল। দুজনের নিঃশ্বাস প্রায় এক হয়ে গিয়েছিল।

“ভালোবাসি তৃণা… অনেক বেশিই ভালোবাসি।”

তৃণার চোখ বন্ধ হয়ে এলো, আর পরের মুহূর্তে…
আদিব ধীরে, সংবরণ করা আবেগে তার কপালে এক চুমু আঁকল।

তৃণা আদিবের চোখের দিকে তাকালো। সেখানে কোনো দ্বিধা নেই, কোনো প্রশ্ন নেই—শুধু একরাশ নির্ভরতা।

আদিব ধীরে তৃণার মুখের কাছে এগিয়ে এল।
তৃণাও চোখ নামাল না, সরে গেল না—শুধু নিঃশ্বাস ফেলে থাকল।

তাদের মাঝের দূরত্ব আর রইল না।
এক নরম, কাঁপা, অথচ গভীর চুমু—তৃণার ঠোঁটে ঠোঁট রেখে, আদিব বলল না কিছুই,
কিন্তু সে চুমুই বলে দিল এমন কিছু, যেটা ভাষা দিয়েও বোঝানো যায় না।

তৃণার চোখ বুঁজে গেল।
তার শরীর কেঁপে উঠল, কিন্তু তা ভয় থেকে নয়—ভালোবাসার এমন মৃদু স্পর্শে, যা সে বহুদিন ধরে শুধু কল্পনায় রেখেছিল।

তৃণা ধীরে চোখ খুলল, মুখে এক টুকরো হাসি।

“এই মুহূর্তটার জন্য আমি অপেক্ষা করছিলাম...” তার কণ্ঠটা ভেজা।

তৃণা আরেকবার ঠোঁট রাখলো আদিবের ঠোঁটে,
সেই চুমুতে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না। ছিল আশ্বাস, ছিল প্রতিশ্রুতি—আর এক অনন্ত অনুভব, যা শুধুই তাদের দুজনের।

__________________________________________

ছয় বছর পর...

বিকেলের রোদ্দুরটা ঝিম ধরা সোনালি আলোয় ভেসে আসছে জানালা গলে। জানালার পাশে একটা ছোট্ট কাঠের টেবিলে চায়ের কাপ রেখে তৃণা হেসে তাকিয়ে আছে সামনের দৃশ্যটার দিকে—সেই চেনা আদিব, এখন আরও পরিণত, আরও মমতাভরা চোখ নিয়ে বসে আছেন তাদের ছোট্ট রাজকন্যার সঙ্গে।

তাদের তিন বছরের মেয়ে, নাম আলিমা, মাটিতে ছড়ানো রঙপেন্সিল নিয়ে একটি গোলাপি সূর্য আঁকার চেষ্টা করছে।

“বাবা, সূয্য দুলাপি হয় না!” সে মুখ ফুলিয়ে বলে।

আদিব হেসে বলল, “কেন হয় না, মামণি? তোমার আঁকা সূর্য যেমন হবে, তেমনই হবে আমাদের পৃথিবীর রঙ।”

তৃণা চুপচাপ তাকিয়ে রইল—এই শান্ত বিকেল, ঘরে ছড়িয়ে থাকা ভালোবাসার গন্ধ, আর সামনে থাকা তার দুই প্রিয় মানুষ—সব মিলিয়ে যেন একটা নিখুঁত চিত্রপট।

আলিমা হেসে উঠে বলল, “তাহলে আমি এবার নীল লঙ দিয়ে মেঘ আঁতবো, আর মেঘেল নিচে আমরা তিনজন থাকব—আমি, মা আর বাবা!”

আদিব আলিমাকে কোলে তুলে নিয়ে বলল, “আর মেঘ থেকে নামবে শুধু ভালোবাসার বৃষ্টি, ঠিক তো?”

তৃণা এবার ধীরে এগিয়ে এসে আদিবের পাশে বসে।
তার কাঁধে মাথা রাখে, আর চুপচাপ বলে,
“এই তো আমার স্বপ্ন ছিল… তুমি, আমি, আর আমাদের ছোট্ট পৃথিবী।”

আদিব তার কপালে একটা আলতো চুমু দিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“এটা স্বপ্ন না, তৃণা… এটা আমাদের ভালোবাসার গল্পের বাস্তব রূপ।”

"ভালোবাসি আদিব," তৃণা বলল চোখের কোণে জমে থাকা আবেগটা লুকিয়ে।

"ভালোবাসি তৃণা," আদিবও কাঁধে মাথা রাখা মেয়েটার কপালে চুমু খেয়ে জবাব দিল।

আর পাশ থেকে ছোট্ট কণ্ঠে একরাশ উৎসাহে, তাদের তিন বছরের রাজকন্যা বলে উঠল—
"আমিও... ভালুতি!"

তৃণা আর আদিব দু’জনেই হেসে ওঠে।

আদিব বলল, “আলিমা, এটা ‘ভালোবাসি’, মামণি... আবার বলো তো?”

"ভালুবাতি"

তারা তিনজনেই এবার খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।
আর এভাবেই শেষ হয় এক চিরন্তন প্রেমের গল্প—

যেখানে ভালোবাসা শুরু হয়েছিল নিঃশব্দ অনুভব থেকে,
গভীর হয়েছিল ডায়েরির পাতায়,
ভরসা পেয়েছিল একে অপরের চোখে,
আর পূর্ণতা পেল ছোট্ট একটা কণ্ঠে—

“ভালুবাতি”

----

(সমাপ্ত)

কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

(বিঃদ্রঃ
ভুলত্রুটি দয়া করে মার্জনার চোখে দেখবেন এবং ভুলগুলো শুধরে দিতে সাহায্য করবেন।)

[A/POV : গল্পের শেষে নতুন একটা সূচনা, যেখানে ভালোবাসা, সম্পর্ক, এবং জীবন আরও গভীর হয়ে ওঠে—
যদি গল্পটি পড়ে থাকেন তবে এর সম্পর্কে আপনাদের মুল্যবান মতামত জানাতে ভুলবেন না!]

#বাংলাগল্প
#লেখালেখি
#গল্প
#কল্পনা
#লেখিকা
্প

22/04/2025

#ডায়েরি_জুড়ে_তুমি
#পর্ব_ছয় (০৬)
#সাদিয়া_ইসলাম_দৃষ্টি

রাতের বাতাসে একধরনের মিষ্টি শীতলতা ছিল। বাইকের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই, আদিব আর তৃণা শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে তারা যেন একটা ছোট্ট শান্তিপূর্ণ মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছে।

তৃণা আর আদিব সেই ছোট্ট নির্জন জায়গাটায় বসে ছিল। চারপাশটা যেন একখানা রঙিন স্বপ্ন—প্রকৃতির আদরে বেড়ে ওঠা নানা রকম ফুল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঠিক যেন একেকটা ছোট ফুলের বাগান। পাশেই রয়েছে ছোট্ট একটি কাঠের ব্রিজ, যার নিচ দিয়ে শান্তভাবে বয়ে যাচ্ছে এক ধারা স্বচ্ছ জল। পানির স্বচ্ছতায় দেখা যাচ্ছে ছোটো ছোটো অনেক মাছ—তারা যেন নিজেদের ভুবনে খেলছে মুক্তভাবে। ব্রিজের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে চারটি সুদর্শন গাছ, যেন কেউ ইচ্ছে করেই সেগুলো লাগিয়েছে এই ব্রিজের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য। সব মিলিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে আছে এক অনাবিল প্রশান্তি—নির্জন, কোমল আর আবেগ ছুঁয়ে যাওয়া এক পরিবেশ। বাতাস নিস্তব্ধ, যেন প্রকৃতি তাদের কথোপকথন শুনছিল।একেকটা মুহূর্ত মনের মধ্যে গেঁথে যাচ্ছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, জায়গাটা প্রায় পরিত্যক্ত। আদিব আগেই বলেছিল—এখানে খুব বেশি মানুষের আনাগোনা নেই। কিন্তু কেন? এতটা সুন্দর, শান্ত আর মন ছুঁয়ে যাওয়া জায়গা কীভাবে পরিত্যক্ত হয়ে থাকে? যাজ্ঞে, তার এতকিছু ভেবে কাজ নেই। এই মুহুর্তে তার কাজ শুধু এই পরিবেশকে মন খুলে উপভোগ করা।

“তুমি কি কখনো এমন জায়গায় এসেছো আগে?” তৃণার ভাবনায় ছেঁদ ঘটিয়ে আদিব হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

তৃণা মাথা নাড়ল, “না, কখনো না। এটা বেশ শান্ত... অন্যরকম। গত কালের জায়গা থেকে বেশ মায়াময়।”

“আমি সব সময় ভাবতাম, শহরের কোলাহল থেকে এমন হুটহাট দূরে কোথাও গেলে কেমন লাগবে... তোমার সাথে।” শেষের কথা টা আদিব নিজের মনে মনেই বলে।

“কেমন লাগছে এখন?” তৃণা কৌতুহলী দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা করলো।

আদিব হেসে বলল, “অসাধারণ। কারণ আমি একা নই। আমার খুব কাছের একটা মানুষ আমার সাথে আছে।”

তৃণা কিছু বলল না, শুধু ধীরে ধীরে পায়ের আঙুল দিয়ে মাটির ওপর ছোট ছোট নকশা একে চলল। মাথায় ঘুরছে হাজারটা প্রশ্ন। তার খুব কাছের মানুষ? সে নিশ্চয়ই তৃণা কে ইঙ্গিত করেনি! এই একই কথা বার বার আওড়াচ্ছে মন গহীনে। কিন্তু বিশেষ কোনো লাভ হচ্ছে না। কারণ, "অন্তরের গভীর থেকে সে জানে, আদিবের কথাটি কোনো ইঙ্গিত নয়—এটি ছিল সরাসরি তার উদ্দেশেই বলা এক স্পষ্ট উচ্চারণ।" কী করবে তৃণা? সে কি বলে দেবে আদিবের প্রতি পুষে রাখা তার গোপন অনুভূতির কথা। বলাটা বোকামি হবে না তো? কারণ সে তো জানে না, আদিব তার সম্পর্কে কেমন ধারণা করে!

নাহ্! আর ভেবে কাজ নেই। সে আজকে বলবেই। সে আর পারছে না তার অনুভূতির সাথে লড়াই করতে।

“তুমি আবার নিজের মধ্যেই কথা বলছো?” আবারও তার কল্পনায় ছেঁদ ফেললো আদিব। তবে এবার নরম কণ্ঠে, যেন তার চোখে ধরা পড়েছে তৃণার এক অদৃশ্য লড়াই।

“কারণ, অন্তত আমার কল্পনাগুলোতে তুমি হারিয়ে যাও...সেটা আমি চাই না।" মলিন কন্ঠে বলে তৃণা।

“তৃণা… আমি যদি বলি, তোমার কল্পনার ভেতর হারিয়ে যেতে আমার ভয় নেই—তুমি কি আমাকে সেখানে জায়গা দেবে?”
তার কণ্ঠে একধরনের মৃদু অনুনয়।

একটু থেমে আদিব চোখ রাখে তৃণার চোখে, যেন ভেতরের সব কথা চোখ দিয়েই বলে দিতে চাইছে সে।
“ভয়… হ্যাঁ, সেটা থাকেই।
কিন্তু তুমি কি সত্যি বিশ্বাস করো, ভয় আমাদের চিরকাল আটকে রাখে?
আমি তো তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছি।
তুমি শুধু চাইলে, আমাকে একটা বার সুযোগ দিলে… আমি তোমার ভয়টাকেও ভালোবেসে আপন করে নেব।”

তৃণার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে চায়না আদিব তার এই অশ্রু ঝড়া দেখুক।

আদিব ধীরে ধীরে বলে উঠে—
“আমার ভয় হয়…
যদি কোনো একদিন তোমার অনুভূতিগুলো এতটাই গভীরে চাপা পড়ে যায় যে তুমি নিজেকেই আর চিনতে না পারো?
যদি তোমার কণ্ঠ একদিন নিঃশব্দ হয়ে যায়…
আমি কি তখনও তোমার মনেও নিঃশব্দই থেকে যাবো?”

আদিব তৃণার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাল, “ভয় কি তোমাকে সব সময় এভাবেই বেঁধে রাখবে? নিজেকে হারিয়ে যেতে দেবে এভাবে?”

“আমি জানি না...” কাঁতর স্বরে বলে উঠলো তৃণা।

তৃণা একটু চুপ করে থাকল। ভেতরের কান্না গুলোকে থামিয়ে তারপর মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে বলল, “আমি ভয় পাই, যদি অনুভূতিগুলো খুব গভীরে চলে যায় আর আমি বের হতে না পারি।”

আদিব একটু হেসে তৃণার থুতনি ধরে তার চোখ বরাবর তৃণার চোখ রেখে বলল, “ কে বলেছে তোমাকে বের হতে? আর যদি হারিয়ে যাওয়াই হয়, তাহলে একসাথে হারিয়ে যাওয়াই ভালো, তাই না?"

তৃণা চমকে তাকাল। তার চোখে একঝলক অস্থিরতা।

“তুমি সব সময় এমন করে কথা কেন বলো?”
গলায় ছিল হালকা ক্ষীণ কম্পন, যেন সে ভেতর থেকে কেঁপে উঠছে।

আদিব একটু থেমে বলল,
“কারণ… আমি তোমার অনুভূতিগুলো শুধু শুনতে নয়, বুঝতে চাই। অনুভব করতে চাই।
তোমার নীরবতাকেও, তোমার চাওয়াগুলোকেও… এমনকি, যেগুলো তুমি লুকিয়ে রাখো সেগুলোকেও।”

তৃণা চোখ নামিয়ে নিল, যেন নিজেকে আড়াল করতে চাইছে তারই ভেতরের গর্জন থেকে।

আদিব ধীরে তার দিকে এক পা এগিয়ে এল, কণ্ঠটা আরেকটু নরম হয়ে গেল, তৃণার গালে হাত রেখে বলল—
“তুমি কি জানতে চাও… আমি কেমন অনুভব করি?
তোমার প্রতি আমার অনুভবগুলো ঠিক কেমন করে রোজ একটু একটু করে গেঁথে যাচ্ছে আমার প্রতিটা নিঃশ্বাসে?”

তৃণা ধীরে মাথা নাড়ল।
কণ্ঠে ছিল চাপা স্বর, যেন তার প্রতিটি শব্দ বুকের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে উঠে আসতে চাইছে।

“আমি অনুভব করি…
তুমি আমার জীবনে মৌসুমের নতুন কোনো বাতাস হয়ে এসেছো—নরম, অচেনা, কিন্তু শান্ত।
আমি জানি না, এই অনুভূতির নাম কী…
কিন্তু এটুকু জানি, আমি এটা হারাতে চাই না।”

তৃণা চুপ করে গেল। আর কিছু বলল না।
শুধু বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে চোখ বুজল।
যেন সময়কে ধরে রাখতে চাইছে।
যেন এই ক্ষণিক ছোঁয়াগুলোই একদিন সত্যি হয়ে উঠবে—অভিমানহীন, সংশয়হীন, শব্দহীন ভালোবাসায়।

“তুমি কি কখনো এমন অনুভব করেছো, যেখানে মনে হয় কিছু বলার আছে… কিন্তু বলা যায় না?”
তৃণা হঠাৎ বলে উঠল।

আদিব এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল। তারপর চোখ সরু করল, গভীরভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকল। যেন সে তৃণার প্রশ্নের ওজন মাপতে চাইছে, বুঝতে চাইছে শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যিটাকে।

“অনেকবার।”
একটা ক্ষীণ দীর্ঘশ্বাস টেনে আদিব বলল।
“কিন্তু তুমি এই প্রশ্নটা করলে কেন, তৃণা?”

তৃণা কোনো উত্তর দিল না।

শুধু ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে ব্যাগের চেইন খুলল। কিছু খুঁজছে, এমন নয়—সে জানে না, কী বের করতে যাচ্ছে।

একটা ছোট্ট ডায়েরি বের করল সে। পাতলা, কিন্তু তার গায়ে পুরোনো স্মৃতির গন্ধ লেগে আছে। বাঁধাই নরম হয়ে এসেছে, হয়তো অসংখ্যবার স্পর্শ করার কারণে। পাতার কিনারাগুলো সামান্য ভাঁজ খেয়েছে, প্রমাণ করে, কতবার যেন এটা খোলা হয়েছে… আবার বন্ধও হয়েছে।

আদিব চুপচাপ দেখল।

“এটা কী?”

তৃণা এবারও কিছু বলল না। শুধু ডায়েরিটার মলাটের ওপর আলতো করে আঙুল বোলালো। যেন সেখানে কোনও চিহ্ন লুকিয়ে আছে, কোনও না বলা গল্পের স্পর্শ।

“এটা আমার ডায়েরি,” তৃণা বলল নিচু গলায়, যেন কোনো গোপন সত্য উন্মোচন করছে।

আদিব অবাক হয়ে তাকাল।
“মানে… তোমার ব্যক্তিগত লেখা?”

তৃণা ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তার চোখ নিচের দিকে নামানো, আঙুলগুলো ডায়েরির মলাটে আঁকিবুঁকি কাটছে।
“যা মুখে বলতে পারি না… তা এখানে লিখে রাখি।”

এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল।

আদিব মুচকি হাসল, কিন্তু চোখের ভেতর কৌতূহলের ছায়া।
“আমার সম্পর্কে কিছু লিখেছো?”

তৃণা এবারও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তার নিশ্বাস টুকরো টুকরো হয়ে আসছে। তারপর আস্তে করে চোখ তুলল, কিন্তু সরাসরি তাকাল না।

মৃদু কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—

“হয়তো…”

এই ‘হয়তো’ কথাটা যেন বাতাসে ঝুলে রইল,
অজস্র না বলা শব্দের ভার নিয়ে।

তৃণা নিঃশব্দে ডায়েরিটা এগিয়ে দিল আদিবের হাতে।

আদিব চমকে তাকাল।
সে কি ঠিক দেখছে? তৃণা… স্বেচ্ছায় তাকে এটা দিচ্ছে? যেই ডাইরিটা সে কখনো কাউকে ছুঁতে পর্যন্ত দেয়নি।

তার চোখে প্রশ্ন ছিল, দ্বিধা ছিল, কিন্তু হাত বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ডায়েরিটা নিল। পুরোনো মলাটের স্পর্শে এক অদ্ভুত উষ্ণতা টের পেল। সে ডায়েরিটার পাতায় চোখ রাখার আগে একবার তৃণার দিকে তাকাল।

আর তখনই দেখল—

তৃণা মুচকি হাসছে।
একটা নরম, অথচ গভীর হাসি।

সে যেনো ইঙ্গিত দিচ্ছে—
‘পড়ে দেখো… আমি আমার না বলা কথাগুলো তোমার হাতে তুলে দিলাম।’

বাতাস একটু নড়ে উঠল।
কোনো এক অদৃশ্য অনুভূতির ঢেউ এসে ছুঁয়ে গেল তাদের দুজনকে।

আদিব ডায়েরিটা হাতে নিয়ে একটু থমকালো। পাতাগুলোর ওজন যেন কেবল কাগজের নয়, বরং অনুভূতির।

তারপর মৃদু হেসে বলল, “তুমি যদি নিজেই পড়ে শোনাও?”

তৃণা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
“আমি?”

“হ্যাঁ, তুমি। আমি তোমার মুখে আমার সম্পর্কে শুনতে চাই। এ যে পরম শান্তিদায়ক হবে।”

তৃণা ইতস্তত করল। স্পষ্ট বুঝতে পারছে, আদিব কেবল তার লেখা নয়—তার অনুভূতিগুলো তার কণ্ঠেই শুনতে চাইছে।

একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো,

অবশেষে, তৃণা আস্তে বলল,
“ঠিক আছে… আমি পড়ে শোনাবো। কিন্তু একটা শর্ত আছে।”

আদিব ভ্রু কুঁচকালো। “কী শর্ত?”

“তুমি চোখ বন্ধ করে থাকবে।”

“কেন?”

তৃণা একটু ইতস্তত করল, তারপর নিচু গলায় বলল,
“নাহলে আমার লজ্জা করবে।”

আদিব হাসল।
সেই হাসিটা ছিল নরম, গভীর… যেন তৃণার লজ্জাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, যেন তার অনুভূতিগুলোকে স্বস্তি দিচ্ছে।

“বেশ,” সে বলল, মৃদু স্বরে। তারপর ধীরে চোখ বন্ধ করল।

“তুমি…”

তৃণার কণ্ঠ একটু কেঁপে উঠল। সে একবার চোখ বন্ধ করল, যেন নিজেকে সংযত করছে। তারপর আবার ডায়েরির পাতায় চোখ বুলিয়ে পড়তে শুরু করল—

“আমি জানি না তুমি কখন আমার জীবনের এতখানি জায়গা নিয়ে নিয়েছো। কবে থেকে তোমার কথাগুলো আমার মনে এত গভীর ছাপ ফেলতে শুরু করেছে। শুধু জানি, যখন তুমি কথা বলো, আমি শুনতে বাধ্য হই। যখন তুমি পাশে থাকো, আশপাশের সব শব্দ ম্লান হয়ে যায়। আর যখন তুমি চোখে চোখ রাখো…”

তৃণা থেমে গেল।

তার কণ্ঠ এবার সত্যিই কাঁপছে। সে কি সত্যিই এগুলো বলতে পারবে? এতদিন ধরে নিজের ভেতর গোপন রাখা অনুভূতিগুলো এখন কেবল শব্দ হয়ে ভেসে আসছে।

আদিব চোখ বন্ধ করেই শান্ত গলায় বলল, “থেমে গেলে কেন?”

তৃণা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। হাতের আঙুল শক্ত করে ধরে আছে ডায়েরির পাতায়।

“কেননা… এটা বলার জন্য লেখা হয়নি,” সে ফিসফিস করল।

একটা নিঃশব্দ মুহূর্ত কাটল। বাতাসের মৃদু শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছে না।

তারপর আদিব ধীরে বলল, “কিন্তু আমি শুনতে চাই।”

তৃণার শ্বাস ভারী হয়ে এলো। সে আবার ডায়েরির পাতায় তাকাল।

“যখন তুমি চোখে চোখ রাখো… আমার মনে হয়, তুমি কিছু খুঁজছো। হয়তো কোনো উত্তর। হয়তো কোনো অনুভূতি, যেটা আমি বুঝতে পারছি না, বোঝাতে পারছি না। কিন্তু আমি বুঝতে চাই… আমি চাই, তুমি সেই উত্তরটা আমার মাঝেই খুঁজে পাও।”

তৃণা এবার চোখ বন্ধ করল।

সে সাহস করে এগুলো বলে দিল।

এবার? এবার কী হবে?

(চলবে...)

কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

(বিঃদ্রঃ
ভুলত্রুটি দয়া করে মার্জনার চোখে দেখবেন এবং ভুলগুলো শুধরে দিতে সাহায্য করবেন।)

#গল্প
#বাংলাগল্প
#লেখালেখি
#লেখিকা
#কল্পনা
্প

20/04/2025

#ডায়েরি_জুড়ে_তুমি
#পর্ব_পাঁচ (০৫)
#সাদিয়া_ইসলাম_দৃষ্টি

বাইকের ইঞ্জিন থেমে গেলেও তৃণা স্থির হয়ে বসে রইল। চারপাশ যেন নিঃশব্দে তাকে ঘিরে ধরেছিল। শুধু রাতের হাওয়ায় পাতার মৃদু কাঁপুনি—একটানা অনুরণন তুলছিল নিরবতার ভেতর। গেটের সামনে পৌঁছেও তার মন যেন ভেসে ছিল অন্য কোথাও, অন্য কোনো অনুভবের গভীরে।

“তুমি নামবে না?” আদিবের কণ্ঠ ভেসে এল—ধীর, কোমল, আর একরাশ যত্নে মোড়ানো।

তৃণা চমকে উঠল। যেন কোনো ঘোর থেকে জেগে উঠল হঠাৎ। ধীরে তাকাল তার দিকে, কণ্ঠ মৃদু কাঁপল, “হুম... আসছি।”

সে ধীরে ধীরে বাইক থেকে নামল। কিন্তু হাত ছাড়ানোর আগেই আদিব তার হাতটা আলতো করে ধরে ফেলল।

“তৃণা।”

তৃণা বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকাল। আদিবের চোখে ভেসে ছিল এক রকম গভীর উদ্বেগ।

“তুমি ঠিক আছো?” প্রশ্নটা নরম, কিন্তু তার দৃষ্টিতে ছিল এক নির্লিপ্ত অনুসন্ধান—যেন সে শুধু উত্তর নয়, সত্যটা খুঁজে নিচ্ছিল।

তৃণা হালকা মাথা নাড়ল। “হুম... ঠিক আছি।”

কিন্তু তার নিজের কণ্ঠেই যেন নিশ্চিততা ছিল না। যেন কথাগুলো বলা হচ্ছে, শুধু বলার জন্য।

আদিবের দৃষ্টি আরও গভীর হলো। “সত্যি বলছো?”

তৃণা কিছু বলল না। শুধু চোখটা নিচু করল। ভেতরে এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে চলেছে, তার নিঃশব্দ ঢেউগুলো কেবল সে নিজেই টের পাচ্ছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তা বলা সম্ভব নয়। সে প্রস্তুত নয়—এখনও না।

একটু থেমে, একটু শ্বাস নিয়ে—সে বলল, “হ্যাঁ।”

আদিব তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর আস্তে করে তার হাতটা ছাড়িয়ে নিল। “আচ্ছা... তাহলে যাও।”

তৃণা কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল। পায়ের গতি থেমে থাকলেও, মন যেন ছুটে চলেছে কোনো এক অনিশ্চিত অনুভবের দিকে। কিছুক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে থেকে সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।

“আদিব?”

আদিব এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাল। “হুম?”

তৃণা একটু থেমে বলল, “তুমি কি... কিছু নিয়ে ভয় পাও?”

আদিব একটু চমকে উঠল। “কিসের ভয়?”

তৃণা চোখ সরিয়ে নিয়ে বলল, “যে কোনো কিছুর... হারিয়ে ফেলার, না-পাওয়া, না-বলা থেকে শুরু করে... সব কিছুর।”

আদিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। দৃষ্টিটা যেন কোথাও আটকে গেল—অতীতের কোনো স্মৃতি, কিংবা ভবিষ্যতের কোনো শূন্যতায়। তারপর খুব ধীরে বলল, “হ্যাঁ, মাঝে মাঝে... খুব ভয় পাই। কিন্তু কেনো বলো তো?”

তৃণা অস্বস্তিতে ভুগছিল। সে নিজেকে খুব অদ্ভুতভাবে আটকে ফেলেছিল তার অস্বস্তিতে। “তুমি কখনো এমন কিছু অনুভব করেছো, যা ব্যাখ্যা করতে চেয়েও পারছো না?”

আদিব চোখে কোনো দ্বিধা না রেখেই বলল, “হ্যাঁ, কিছু অনুভূতি সত্যিই এমনই হয়।”

তৃণা আরো গভীরভাবে তার দিকে তাকাল, যেন নিজের অজানা ভাবনা খুঁজে পেতে চাইছে। “যেমন?”

আদিব এক মুহূর্তের জন্য নীরব থাকল, তারপর তার মুখে এক ছোট্ট হাসি ফুটল। তবে সেই হাসির মধ্যে কিছু যেন গোপন ছিল, অপ্রকাশিত। “তুমি কি সত্যিই জানতে চাও?”

তৃণা কিছু বলল না, কেবল হ্যাঁ বলে মাথা নাড়িয়ে নীরব হয়ে রইল। যেন তার ভেতরে কিছু প্রশ্ন উঁকি মারছে।

“তাহলে আজ নয়,” আদিব বলল, তার কণ্ঠে কিছুটা নিষ্কলুষ শান্তি ছিল। “যখন সময় হবে, তখন বলব।”

তৃণা আরো কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল—তার চোখে যেন কিছু অজানা খোঁজ ছিল, কিছু অনুসন্ধান। তারপর ধীরে ধীরে গেটের ভেতরে ঢুকে গেল।

গেট পার হয়ে যাওয়ার পরেও, তার ভেতর যেন কিছু একটা ছিল—এক ধরনের অদৃশ্য টান। সে বুঝতে পারছিল, আদিবের দৃষ্টি এখনও তার পেছনে রয়ে গেছে, যেন তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে। এমন এক অনুভূতি, যা সে অনুভব করলেও, সেটা নিজে থেকেও বোঝাতে পারছিল না। আদিব কি সত্যিই এমন কিছু অনুভব করছিল? না এটা কেবল তার কল্পনার মায়া?

__________________________________________

তৃণা জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে ছিল। রাতের হালকা বাতাস চুপিচুপি তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল, অথচ মন ছিল দূরে কোথাও—একটা অজানা অস্বস্তিতে জড়ানো। বারবার কানে বাজছে আদিবের সেই শেষ কথাগুলো—

“যখন সময় হবে, তখন বলব।”

কী মানে এর? কী এমন কথা, যা এখন বলা যায় না? সে কি কিছু লুকাচ্ছে? নাকি তৃণাই শুধু মনে মনে এসব কিছু কল্পনা করছে?!

মোবাইলটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে রইল তৃণা। ফোন করতে ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু একরাশ দ্বিধা তাকে আঁকড়ে ধরেছিল। শেষমেশ, একরকম ঝোঁকের বশেই টাইপ করল:

তৃণা: তুমি ঘুমিয়ে গেছো?

মিনিট দুয়েক কেটে গেল। কোনো উত্তর নেই।
তৃণা ঠিক করল মেসেজটা ডিলিট করে দেবে—এই ভেবেই হাত বাড়াতেই, ঠিক তখনই ফোনটা হঠাৎ ভাইব্রেট করল।

আদিব: না, তুমি?

তৃণা: না... ঘুম আসছে না।

আদিব: কেন? কিছু ভাবছ?

তৃণা: না... এমনি।

একটা দীর্ঘ নীরবতা।
দু’জনেই যেন কিছু ভাবছিল, কিন্তু মনের কথাগুলো ভাষায় রূপ দিতে পারছিল না।

আদিব: তৃণা?

তৃণা: হুম?

আদিব: আজ তোমার চোখে কিছু একটা আলাদা লেগেছে।

তৃণা: কেমন?

আদিব: এমন মনে হচ্ছিল, তুমি কিছু বলতে চাইছো... কিন্তু পারছো না।
যেন কোনো দ্বিধা, কোনো ভয় তোমাকে আটকে রেখেছে।

তৃণা: তুমি সব কিছু এত বিশ্লেষণ কেনো করো?
সব সময় এত বোঝার চেষ্টা কেনো করো?

আদিব: কারণ... আমি সত্যিই তোমাকে বুঝতে চাই।

তৃণার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে কি সত্যিই তাকে বোঝার চেষ্টা করছে?
নাকি... এ কেবল বন্ধুত্বের নামে একধরনের দায়িত্ববোধ?

তৃণা: জানি না...

আদিব: জানো। শুধু স্বীকার করতে চাও না।

তৃণা কিছুক্ষণ চুপ করে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কী বলবে, বুঝে উঠতে পারছে না।
হাতটা কাঁপছে।

অবশেষে, অনেক দ্বিধা কাটিয়ে টাইপ করল—

তৃণা: ঘুমাও... কাল কথা হবে।

আদিব: হুম...স্বপ্নে দেখা হবে।

মেসেজটা দেখে তৃণার মুখে একরকম হাসি ফুটল, আবার একরকম চিন্তার রেখাও ভেসে উঠল।
“স্বপ্নে দেখা হবে”—এই কথাটার মানে কী?
সত্যিই কি একরাশ অনুভূতি লুকিয়ে আছে এতে?
নাকি... এ কেবল নিছক একরাশ বন্ধুত্বের মায়াবী ছোঁয়া?

__________________________________________

সকালের প্রথম আলো জানালার ফাঁক গলে নিঃশব্দে ঢুকে পড়েছে তৃণার ঘরে।
কিন্তু তার চোখের পাতায় এখনো ঘুমের কোনো ছাপ নেই।

রাতভর মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা,
আর শেষমেশ ফোনটা নিঃশব্দে বালিশের পাশে রেখে চোখ বন্ধ করে ফেলা—
এই চক্রটা যেন দিনকে দিন এক নতুন অভ্যাস হয়ে উঠছে।

গত রাতের কথাগুলো এখনো কানে বাজছে।
বিশেষ করে আদিবের সেই শেষ লাইনটা...
‘স্বপ্নে দেখা হবে।’

এই কথাটা মনে হতেই তৃণা নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল—
একটু অস্বস্তি, একটু শিরশিরে ভাব, আর একটা অনুচ্চারিত অনুভূতির চাপা গর্জন যেন ভিতরে ভিতরে দোলা দিয়ে গেল।

হুট করে ফোনটা বেজে উঠল।
তৃণা চমকে উঠে স্ক্রিনের দিকে তাকাল—আদিব?
সকালে এই সময়?

“হ্যালো?”

“উঠেছো?”

“হুম... কেন?”

“আজ বেরোবো। তোমাকে নিতে আসব। তৈরি হয়ে থেকো।”

“আজও?!”
তৃণার কণ্ঠে অবাক কৌতূহল—একসাথে উভয় অনুভূতির ছাপ।

“এত কথা না বলে দ্রুত তৈরি হও।”
সরাসরি আদেশের মতো গলা, যেন কোনো জবাব চায় না।

তৃণা ভ্রু কুঁচকালো।
“কোথায় যাচ্ছি?”
এইটুকুই বলল।
এর চেয়ে বেশি কিছু আর বলল না।
বলতেও পারল না—ভালো করেই জানে, আরও কিছু বললেই হয়তো বকুনির একটা মিষ্টি ঝড় নেমে আসবে তার উপর।

“জানতে হলে বেরোতে হবে।”

“আ-আমি আসতে পারবো না।”

“কিছু বললে?"

তৃণা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল। এই ছেলেটা এতটাই একরোখা! শুধু নিজের কথাই বলে চলে, অন্যের কথা শোনার যেন সময়ই নেই। অসহ্য একটা।

"তৈরি হচ্ছি "

"গুড...আমি আসছি।"

দশ মিনিটের মধ্যেই বাইকের হর্ন বাজার শব্দ শুনতে পেল তৃণা। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখলো আদিব হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে হেলমেট নিয়ে।

“তুমি আসলেই চলে এসেছো? তাও এত দ্রুত?”

“হ্যাঁ, চলো।”

তৃণা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “দাঁড়াও, আসছি।”

---

বাইকের পিছনে তৃণা চুপচাপ বসে ছিল। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাতাসের শীতল ছোঁয়া তাকে এক অন্য অনুভূতিতে ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

“তুমি এত চুপচাপ বসে আছো কেন?”
আদিব জানতে চাইল, তৃণার নীরবতা যেন তাকে কিছুটা বিরক্ত করছিল।

“আমি চুপ থাকলে তোমার সমস্যা কোথায়?”
তৃণা একটু বিরক্ত নিয়ে উত্তর দিল।

“হ্যাঁ, আমার সমস্যা আছে বলেই বলছি। আমি চাই তুমি কথা বলো, হাসো, রাগ করো, যাই করো—কিন্তু চুপ থেকো না।”
আদিবের কথায় ছিল এক ধরনের অনুরোধ, যেন তার পাশে তৃণার উপস্থিতি তার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। সে চায় তৃণা যেন নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে, চুপ থাকলে তার কিছু একপ্রকার ফাঁকা মনে হয়।

তৃণা একটু হেসে ফেলল, তার বুকে কী যেন একটা ছড়িয়ে গেল। “তুমি এত কথা বলো কীভাবে?”

আদিব হেসে বলল, “কারণটা তুমি। তোমার পাশে থাকলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব কঠিন।”
তার কণ্ঠে এক ধরনের উষ্ণতা ছিল, যেন সে তৃণাকে তার জীবনের একটা অপরিহার্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে।

তৃণা কিছু বলল না, শুধু বাইকের গতির সাথে তাল মিলিয়ে বাতাসের স্পর্শ উপভোগ করছিল। এর চেয়ে বেশি আর কী-ই বা করতে পারে সে। নিজের অস্থির মনকে তো যে কোনো ভাবেই স্থির করতে হবে। আদিবের প্রতিটি কথা যেন তাকে বেসামাল করে তুলছে। যেটা কোনোভাবেই করতে দেওয়া যাবে না। এখনো যে অনেক কথা বলা বাকি....

(চলবে...)

কপি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

(বিঃদ্রঃ
ভুলত্রুটি দয়া করে মার্জনার চোখে দেখবেন এবং ভুলগুলো শুধরে দিতে সাহায্য করবেন।)

#গল্প
#লেখালেখি
#লেখিকা
#বাংলাগল্প
#কল্পনা
্প

Want your public figure to be the top-listed Public Figure in Dhaka?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Website

Address

Dhaka
1214