Emran
10/08/2025
অঘটন
– পৃষ্ঠা ১২
রিকশা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। রাস্তার ধুলো হালকা বাতাসে উড়ে এসে মোহনাদের নিকাবের কোণে আটকে যাচ্ছিল। আমি একবার তার দিকে তাকালাম—চোখদুটো এবার শান্ত, কিন্তু ঠোঁট শক্তভাবে চেপে আছে।
আমি ভেবেছিলাম হয়তো রিকশায় ওঠার পর কিছু বলবে, কিন্তু সে চুপ। আমার মনটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল।
— মোহনা, রাগ করেছো নাকি?
সে মাথা নাড়ল, কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।
আমার বুকের ভেতরে হালকা ধাক্কা লাগল। এই নীরবতাই হয়তো সবচেয়ে বেশি শাস্তি।
রিকশাওয়ালা ভাই হঠাৎ বললেন—
— আপনের বাসা অনেক দূর নাকি?
আমি উত্তর দিলাম—
— হ্যাঁ, আরেকটু গেলেই।
মোহনা তখনও চুপ। আমি সাহস করে আবার বললাম—
— দেখো, আমি আসলে… মানে ওইভাবে বলার টাইমটা ঠিক ছিল না। তোমার আম্মুর কথা মাথায় রাখা উচিত ছিল আমার।
সে এবার ধীরে আমার দিকে তাকাল। চোখে তেমন রাগ নেই, কিন্তু যেন ভেতরে কোথাও জমে থাকা অভিমান লুকিয়ে আছে।
— শুধু টাইম ঠিক ছিল না—এইটুকুই বলবা?
আমি কিছু বলার আগেই রিকশা হঠাৎ ব্রেক কষল। সামনে একটা ছোট্ট বাচ্চা রাস্তা পার হচ্ছিল। বেটারি রিকশা থেমে গেলে চারপাশের শব্দ হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে গেল—চায়ের দোকানের আড্ডা, দূরের মাইকে বাজতে থাকা গানের শব্দ, আর আমার বুকের ভেতরের ধুকপুকানি।
মোহনা নিকাব ঠিক করে আবার সামনে তাকাল। মনে হলো, এই যাত্রাপথটা আমার জন্য সবচেয়ে দীর্ঘ হয়ে যাবে।
রিকশা আবার চলতে শুরু করল। মোহনা সারাটা পথেই আর আমার দিকে তাকাল না। আমি বুঝে গেছি, এখন কিছু বললে কথাটা শুধু বাতাসে মিলিয়ে যাবে।
দশ মিনিট পর একটা সরু গলিতে ঢুকল রিকশা। দুপাশে পুরনো দালান, দেয়ালে ঝুলছে ছেঁড়া পোস্টার, কোথাও কোথাও ভাঙা ইটের গুঁড়ো ছড়িয়ে আছে।
— এইখানেই নামবেন ভাই?
মোহনা মাথা নেড়ে বলল— হ্যাঁ, সামনের টিনের গেটটা খুলে ঢুকবেন।
রিকশা থামল। আমি ভাড়া দিয়ে দরজা খুলে ভিতরে ঢুকলাম। গেট পেরোতেই ছোট্ট একটা উঠান, একপাশে কয়েকটা ফুলগাছ, অন্য পাশে ধোয়া কাপড় শুকোচ্ছে।
দরজার সামনে একটা চেয়ার পেতে এক মহিলা বসে আছেন— মুখে ক্লান্তি স্পষ্ট, কপালে ঘাম জমেছে। মোহনা ছুটে গিয়ে বলল— আম্মু, এই নিন মুবতাহিজ ভাই এসেছে।
আমি সালাম দিলাম— আসসালামু আলাইকুম আন্টি, শুনলাম জ্বর এসেছে?
আন্টি হালকা হাসলেন— ওরে বাবা, এই গরমে কার না শরীর খারাপ হয় বলো! এসো, ভেতরে আসো।
ভিতরে ঢুকতেই একটা অদ্ভুত গন্ধ পেলাম— গরম শরীরের ঘাম, ফ্যানের বাতাসে মিশে একধরনের ভারী পরিবেশ তৈরি করেছে। আমি দ্রুত ব্যাগ খুলে প্রেসার মেশিন আর গ্লুকোমিটার বের করলাম।
মোহনা পাশে দাঁড়িয়ে বলল— দেখো কিন্তু, আমি কিন্তু হাত লাগাবো না—সব তুমি করবে।
আমি একটু হাসলাম— ঠিক আছে, তবে ভুল হলে দায় তোমার।
সে মুচকি হেসে তাকাল— সেই হাসিটা আমার কাছে আবারও অদ্ভুতভাবে শান্তি এনে দিল, যদিও আমি জানি, কিছুক্ষণ আগের অভিমান পুরোপুরি কাটেনি।
পৃষ্ঠা ১৩ upcoming...
Click here to claim your Sponsored Listing.