Bijoy Hossain
হালাল শিক্ষণীয় নতুন গল্প!!!
হুজুর মিয়ার বউ:২০পর্ব (১ম খন্ডের শেষ পর্ব)
এরই মাঝে হঠাৎই একদিন বড্ড দুপুরে সেই উকিল মীমের নাম্বারে কল দিয়ে বলল
“আগামীকাল সকাল দশটায় নূরের জামিন হবে, আপনারা উপস্থিত থাকবেন।
মীম’ হায়দার সাহেবকে ডেকে, যতগুলো হাঁস-মুরগী ছিল, কয়েকটা রেখে সব বিক্রি করে দিল। এর আগেও অনেক টাকার হাঁস-মুরগী বিক্রি করেছে। পুঁথির মালা, ব্যাগ, ঘর সাজানোর বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করেও অনেক টাকা পেয়েছে। আর এলাকার অধিকাংশ মেয়েরা তার থেকে কাপড় বানিয়েছে। কেননা সে নিত্যনতুন ডিজাইনে তাদের ইচ্ছে মত কাপড় সেলাই করে দিত। এই সবকিছুর টাকা মিলিয়ে তিন মাসে প্রায় লাখ টাকার উপরে আয় হয়েছে। ব্যয়ের কোনো সংখ্যা ছিলনা, তাই আয়'ও কম হল না।
মীমের খুশি আর দেখে কে! খুশিতে সারারাত ঘুমোতে পারেনি সে। শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনছে, কখন সকাল হবে আর নূরের কাছে ফিরে যাবে। তাহাজ্জুত নামায আদায় করে একটা মুরগী জবাই করল। সকাল হওয়ার আগেই পোলাও, মুরগী আর ধনিয়া পাতা ভর্তা করে, বাটিতে ভরে নূরের জন্য নিয়ে গেল।
সকাল দশটার আগেই নূরের পরিবারের সবাই হাইকোর্ডের সামনে একত্রিত হল। খোদার অশেষ মেহেরবানীতে, সকাল দশটা পঁচিশ মিনিটে নূরের জামিন হল। মীম আর তার ভাই, উকিলের হাতে চার লাখ টাকা দিয়ে দিল।
নূর' হাইকোর্ডের সিঁড়ি দিয়ে নামছে আর পরিবারের সকলকে মন ভরে দেখছে। কিন্তু সেখানে 'মীম'কে দেখা গেলনা! নূর' এদিক সেদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগল। দেখল অদুরেই 'মীম' দাঁড়িয়ে নূরের পানে অপলক নেত্রে চেয়ে আছে আর চোখ থেকে খুশির অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে।
নূর’ সিঁড়ি বেয়ে নেমে, প্রথমেই মা-বাবার কাছে গেল। বাবা, ভাই, শ্বশুর, সমন্দি, তাদের সাথে মুসাহাফা এবং মুয়ানাকা সেরে, মা এবং শ্বাশুড়িকে ভাল-মন্দ জিজ্ঞেস করে, মীমের দিকে এগিয়ে গেল। মীমের কাছে গিয়ে 'নূর' দুই হাত প্রসারিত করে দিল। মীম' কোন কথা না বলেই নূরের বুকে মাথা গুছিয়ে নিল। আঁখিজলে ভিজিয়ে দিল নূরের বুক। সেদিন হাইকোর্ডের সামনে যত জোড়া চোখ ছিল, নূর আর মীমের প্রেমে তীরবিদ্ধ হল। তাদের প্রেম লিলায় জুড়িয়ে দিল সকলের অন্তর। রিয়া মীমের কাছে গিয়ে বলল
সত্যিই, তোমার তুলনা হয় না। তোমার শুনগান বলে শেষ করা যাবেনা। এত কষ্ট সহ্য করে নূরকে উদ্ধার করেছো, তবুও পিছু ফেরোনি। আসলেই তোমার কোনো অদ্বিতীয় হয় না। তোমার সাথে দেখা না হলে, মায়ের জাতি কতটা ত্যাগ শিকার করতে পারে, সেই কথা বুঝতামই না! স্যালুট তোমার মা-বাবাকে, যারা এমন মেয়ে জন্ম দিয়েছে। স্যালুট তোমার ভাইকে, যে এমন ভাবে তার বোনকে গড়ে তুলেছে। স্যালুট তোমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে, যেখানে তোমায় আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে। স্যালুট সেই ব্যক্তিকে, যে তোমাকে বধূ হিসাবে পেয়েছে। সত্যিই তুমি ভাগ্যবান।
রিয়ার কথা শেষ হতেই কাউসার হাসি মুখে বলল
“ভাগ্য শুধু আমারই পুড়া।
রমযান মিয়া কাউসারকে থামিয়ে নূরের পানে চেয়ে বললেন
“এবার চলো সবাই আমার বাসায়। খুব জমিয়ে কাটানো হবে ক'টাদিন।
নূর' মীমের হাত থেকে খাবারের বাটি নিয়ে বলল
"এই পাগলীটি রাত জেগে আমার জন্য রান্না করে এনেছে। সেও
হয়ত এখনো খাবার খায় নি। একসাথে খাব বলে উপবাস রয়েছে। আমার যদি ভুল না হয়, তাহলে শুনেন আমাকে পাওয়ার লক্ষে ঘরের দরজার 'জীন লাগাতেও ভুলে গেছে। বিশ্বাস না হয়, সবাই চলেন আমার কুড়ে ঘরে, তখনই দেখা যাবে।
নূরের কথায় একে অপরের দিকে তাকাতে লাগল। নূর সবাইকে লক্ষ করে বলল “ভয় পাবেননা, থাকার মত অনেক জায়গা রয়েছে। হয়ত আমার ঘরে বিদ্যুৎ নেই তাতে কী হয়েছে, পাশেই হায়দার চাচার ঘর রয়েছে। সেই ঘরে এসিরও ব্যবস্থা আছে। তাই আপনারা যদি দুই দিনের জন্য হলেও আমাদের ভালবাসার ঘরে 'পা' রাখতেন, তাহলে বড্ড খুশি
হতাম।
রমযান মিয়া কয়েক সেকেন্ড নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থেকে, সবাই গাড়িতে উঠে নূরের বাড়ির দিকে চলতে বললেন।
তিনটি গাড়ী নিয়ে দুপুরের দিকে রমযান মিয়া গ্রামে প্রবেশ করলেন। এক সাথে তিনটা গাড়ী দেখে এলাকার মানুষগণ দৌড়ে আসলেন। নূরকে দেখতে সবাই খুশি হলেন। রমযান মিয়া সেই ইমাম সাহেবকে ডাকলেন, যে বিপদের সময় নূরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ইমাম সাহেব হুজুর আসার পর, রমযান মিয়া কোলাকুলি করে, এক লক্ষ টাকা ইমাম সাহেবের হাতে তুলে দিয়ে বললেন
“এটা আপনার জন্য হাদিয়া।
ইমাম সাহেব আশ্চর্য হয়ে বললেন
“এত টাকা দিয়ে আমি কী করব!? আমার যা আছে এবং মসজিদ মাদরাসা থেকে টুকটাক যা পাই, বেশ চলে যায়। আপনার টাকা ফিরিয়ে নিলে ভাল হয়।
“হাদিয়া কখনো ফিরিয়ে দেয়া যায় না।
বাধ্য হয়ে ইমাম সাহেব টাকা নিয়ে বাড়ী ফিরে গেলেন।
নূর' সবার জন্য নিজ হাতে রান্না করল। মাগরিবের পর খাবার খেয়ে সকলেই বারান্দার সামনে গাছ তলায় বসল। মীমের বাবা জানতে চাইলেন
“মামলা করার মূলত মানুষটি কে?
নূর' মুচকি হেসে বলল-
আছে আমাদের এলাকার রিটায়ার্ড প্রাপ্ত আর্মির বাবুচি এবং তার কিছু চ্যালারা। যারা সারা জীবন উল্টাপাল্টা করেছে, আর এখন মসজিদে গিয়ে ভাল হওয়ার ভান ধরেছে। এলাকার সব নষ্টের মূলে, ওদের নাম রয়েছে।
মীমের বাবা বললেন
"তাহলে তো এদের বিরুদ্ধে কিছু একটা করা দরকার।
নূর মাথা নাড়িয়ে বলল
"না, এদের পিছু সময় নষ্ট করা দরকার নেই। সময়েই এরা বাতাসের
মত উড়ে যাবে।
রমযান মিয়া উচ্চ কণ্ঠে বললেন
“ঠিক বলেছো নূর। সব জায়গায় মশা-মাছি মেরে কাপড় নষ্ট করা যায় না। কিছু কিছু জায়গায় ফুঁ’ দিয়ে উড়িয়ে দিতে হয়।
মীমের বাবা বললেন
খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন বেয়ায় সাহেব। তাইতো লোকে বলে বাপকা বেটা, সিপাঙ্কা ঘোড়া।
রমযান মিয়ার সকলের পানে তাকিয়ে বলতে লাগলেন
"এবার আপনারা শুনেন আমি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলি। বিশেষ করে কাউসার আর রিয়া শুনো। তোমরা যখন প্রথম বিবাহ করলে, তখনই আমার সন্দেহ লেগেছিল তোমাদের সংসার জীবন সুখি হবে কি না। কেননা, একটা কথা সর্বদাই মনে রাখবা যেকোনো জিনিস শুরু করার আগে যদি কেউ সেই জিনিসটি সম্পর্কে তোমাকে ভাল এবং মন্দের দিক বুঝিয়ে বলে, তরপরও যদি তুমি না বুঝো, তাহলে মনে রেখো, তোমার কপাল পুড়েছে। ঠিক তেমনি, কাউসার বিবাহ করার আগে, বিবাহের পদ্ধতি এবং রীতিনীতি সম্পর্কে নূর' অনেক বুঝিয়েছে। কিন্তু কাউসার তার মত করেই বিবাহ এবং অনুষ্ঠান করেছে। যার ফলে আজ তোমাদের সংসার জীবনে এতটা অশান্তি। কেননা রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা কখন মিথ্যা হতে পারেনা। তিনি তো বলেছেন, 'যার বিয়েতে যত খরচা কম হবে, তার সংসার জীবনে ততটাই বরকত হবে। কিন্তু তোমার বিবাহ ছিল সম্পূর্ণ রাসূলের কথার বিপরিত।
তারপর তোমরা যখন বিবাহ করে আসলে, ভাবলাম আমার যেহেতু মেয়ে নেই, রিয়াকেই মেয়ের মত দেখব। কিন্তু রিয়া শুধু তার মতই থাকতে ভালবাসে। সে তার বন্ধু-বান্ধব, আড্ডা, বেপর্দা, অন্য পুরুষদের সাথে চাকুরী করা, এগুলোকেই ভালবাসে। যা ইসলামে নিষিদ্ধ। আর আমাদের সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলাটাই তোমাদের খারাপ লাগত। তারপরও সন্তান বলে আমরা কষ্ট নিতাম না।
অতপর নূর যখন বিবাহ করল, মনে মনে ভয় কাজ করছিল যে, না জানি নূরের বউ কেমন হয়। আল্লাহর কাছে হাজার কোটি শুকরিয়া, তিনি আমাদের ঘরে মেয়ে জন্ম না দিয়েও, মেয়ে পাঠিয়েছেন। মীমের কথা-বার্তা, চাল-চলন, আদব-আখলাক, সবই যেন মন জুড়ানো। আমাদেরকেও সে মা-বাবার নজরে দেখেছে সর্বদাই। মীমের বাবার সাথে হাজারবার গল্প করে বলেছি যে- ‘খাঁটি সোনা জন্ম দিয়েছেন। যার কোনো তুলনা হয় না।'
সেই মেয়েটিকেও তোমাদের কারণে দূরে সরিয়ে দিলাম। তোমরা শুধু চাইতে পৃথক হয়ে কিছু একটা করে দেখাবে। দু'জনেই চাকুরী করবে, অনেক সুখে থাকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হল কি? দু'জনে চাকুরী করে লাখ টাকা বেতন পেয়েও, এই ছয় মাসে ব্যাংক থেকে সাত লাখ টাকা লোন' নিয়ে রেখেছো। আর আমার থেকে যে কয়েক লক্ষ টাকা 'ধার' নিয়ে ছিলে, সেগুলোর তো দেবার কোনো নামোই নেই। অথচ 'নূর' জেলে যাওয়ার আগে প্রতি মাসে পাঁচ হাজার করে টাকা দিয়ে বলেছে, 'জানি এই টাকায় তোমাদের কিছুই হবেনা, তবুও আমার সামর্থ অনুযায়ী তোমাদের দিলাম। আমাদের কুঁড়ে ঘরে আসলে অনেক খুশি হব।' নূর যে মাসে জেলে গিয়েছে, হয়ত সেই মাসেরও টাকা জমিয়ে ছিল। কিন্তু পাঠানোর আগেই কারাগারে আবদ্ধ হতে হল।
শুনো,
আমি শুধু তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য ছয় মাস পৃথক রেখেছি। যাতে করে এই কথা বুঝতে পার, সুখি সংসার কেমন করে গড়া যায় এবং তোমাদের দুটি সংসারের মাঝে কোন সংসার সুখি হয়। হেরে গিয়েছো কাউসার তোমরা। মীম দেখিয়ে দিয়েছে, পর পুরুষের সাথে অফিস আদালতে মেয়েদের চাকুরী না করেও, কেমন করে ঘরে বসে টাকা উপার্জন করা যায়। নূরে আলম দেখিয়ে দিয়েছে, কেমন করে স্ত্রীকে ভালবাসার করিডরে আবদ্ধ রাখতে হয়, কেমন করে প্রিয় মানুষটিকে আপন করে নিতে হয়। এই কারণেই তোমাদের বার বার বলি,
শিক্ষা অর্জন করলেই হয়না, আদর্শ শিক্ষায় শিক্ষিত হতে হয়
__________________________
বিঃ দ্রঃ -- সকলে আমার জন্য দোয়া করবেন, যেন আমিও মীম এর মতো একজন দীনদার জীবন সঙ্গী পাই।।।।।
__________________________
এখন শুধু তোমাদের সন্তান প্রতিপালনের দিকটা দেখার বাকি অপেক্ষায় রইলাম, নূর এবং কাউসারের সন্তান মানুষ করার পদ্ধতি জানতেন।
(পাঠকদের বলছি সন্তান মানুষ করার পদ্ধতি জানার জন্য চোখ রাখেন, “আমার সন্তান" বইটির দিকে)
হুজুর মিয়ার ব্উ বইটির ১ম খন্ড শেষ আরো আছে। হুজুর মিয়ার ব্উ বইটির মূলত৪খন্ড আছে
বিঃদ্রঃ ভুলগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন প্লিজ 🙏
সকলে ভালো থাকবেন আর আমার জন্য দোয়া করবেন।
আবারো আপনাদের সামনে আসবো অন্য কোন গল্প নিয়ে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহ হাফেজ।
Click here to claim your Sponsored Listing.