AdiDev Krishna
19/06/2026
একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র তখনই প্রকাশ পায়, যখন সে কোনো স্বার্থ, লাভ বা প্রশংসার আশা না করেও সত্যের পক্ষ অবলম্বন করতে পারে। কারণ সত্য বলা সহজ তখনই, যখন তা আমাদের সুবিধা এনে দেয়; কিন্তু সত্যের জন্য নিজের স্বার্থ ত্যাগ করা মহৎ চরিত্রের লক্ষণ।
এই শিক্ষা আমাদের ভগবদ্গীতাতেও পাওয়া যায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে সর্বোচ্চ জ্ঞান, ধর্ম, কর্তব্য ও আত্মার তত্ত্ব শিক্ষা দেওয়ার পর তাকে জোর করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বলেননি। বরং তিনি বলেছেন—
"ইতি তে জ্ঞানমাখ্যাতং গুহ্যাদ্ গুহ্যতরং ময়া।
বিমৃশ্যৈতদশেষেণ যথেচ্ছসি তথা কুরু।।" (গীতা ১৮.৬৩)
অর্থ: "আমি তোমাকে এই অতি গোপন জ্ঞান বললাম। এখন তুমি তা ভালোভাবে বিচার-বিবেচনা করে তোমার ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ কর।"
এখানে ভগবান দেখিয়েছেন যে সত্য ও জ্ঞান মানুষকে স্বাধীনতা দেয়, জোর করে না। তাই উত্তম চরিত্রের মানুষও সত্যকে গ্রহণ করে বিবেকের আলোকে সিদ্ধান্ত নেয়, স্বার্থের মোহে নয়। যে ব্যক্তি লাভ-ক্ষতির হিসাব না করে সত্য, ন্যায় ও ধর্মের পথে অবিচল থাকে, তার চরিত্রই প্রকৃত অর্থে মহৎ ও দৃঢ়।। হরেকৃষ্ণ।।
।। জয় শ্রীকৃষ্ণ।।
।। জয় সনাতন ধর্ম।।
19/06/2026
এই পৃথিবী, এই জগত মানুষের শেষ আশ্রয় নয়। জন্ম, মৃত্যু, সৃষ্টি ও প্রলয়ের ঊর্ধ্বে আরেকটি নিত্য, অপ্রাকৃত এবং অবিনশ্বর জগত রয়েছে। এই প্রসঙ্গে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন—
"পরস্তস্মাত্তু ভাবোহন্যোহব্যক্তোহব্যক্তাৎ সনাতনঃ।
যঃ স সর্বেষু ভুতেষু নশ্যৎসু ন বিনশ্যতি।।৮/২০।।
অনুবাদঃ কিন্তু আর একটি অব্যক্ত প্রকৃতি রয়েছে, যা নিত্য এবং ব্যক্ত ও অব্যক্ত বস্তুর অতীত। সমস্ত ভূত বিনষ্ট হলেও তা বিনষ্ট হয় না।"
অর্থাৎ এই পৃথিবী, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বা জড় প্রকৃতির অতীত আরেকটি সনাতন, অব্যক্ত প্রকৃতি রয়েছে। সমস্ত জীব ও জগৎ বিনষ্ট হলেও সেই পরম ধাম কখনও বিনষ্ট হয় না।
কিন্তু মায়ার দ্বারা আবৃত মানুষ সাধারণত এই ক্ষণস্থায়ী জগতকেই সবকিছু মনে করে। অথচ এই জড় জগৎ পরিবর্তনশীল—এখানে জন্ম আছে, মৃত্যু আছে, বিচ্ছেদ আছে। তাই যে ব্যক্তি কেবল ইন্দ্রিয়সুখকেই জীবনের লক্ষ্য মনে করে, সে বুঝতে পারে না কোন জগত তার প্রকৃত কল্যাণের স্থান।
শ্রীমদ্ভাগবতের সূচনাতেই ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, পরমেশ্বর ভগবান তাঁর স্বীয় ধামে চিরকাল বিরাজমান, যেখানে তাঁর অন্তরঙ্গ শক্তির প্রভাব বিদ্যমান এবং মায়া-শক্তির কোনো প্রবেশাধিকার নেই। অতএব, ভগবানের ধাম কোনো কল্পনা বা মানসিক সান্ত্বনা নয়; তা হলো বৈকুণ্ঠ—চিন্ময়, আনন্দময় এবং সম্পূর্ণ অপ্রাকৃত জগতসমূহ।
সেই ধামে নেই জন্মের ভয়, মৃত্যুর যন্ত্রণা কিংবা পুনর্জন্মের আবর্তন। সেখানে প্রতিটি পদক্ষেপ নিত্যসেবা, প্রতিটি সম্পর্ক বিশুদ্ধ প্রেম এবং প্রতিটি মুহূর্ত ভগবানের সান্নিধ্যের আনন্দে পরিপূর্ণ। তাই শাস্ত্র বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের জীবনের পরম লক্ষ্য কেবল সাময়িক ভোগ-বিলাস অর্জন নয়, বরং ভক্তি ও আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে সেই সনাতন ধামে প্রত্যাবর্তন করা, যেখানে পৌঁছালে আর এই দুঃখময় জগতে ফিরে আসতে হয় না।। হরেকৃষ্ণ।।
।। জয় শ্রীকৃষ্ণ।।
।। জয় সনাতন ধর্ম।।
16/06/2026
গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—
"তেষামেবানুকম্পার্থমহজ্ঞানজং তমঃ।
নাশয়াম্যাত্মভাবস্থো জ্ঞানদীপেন ভাস্বতা।।১০/১১।।
অনুবাদঃ ভক্তদের প্রতি অনুগ্রহ করার জন্য আমি তাঁদের হৃদয়ে অবস্থিত হয়ে, উজ্জ্বল জ্ঞান-প্রদীপের দ্বারা অজ্ঞান-জনিত অন্ধকার নাশ করি।"
ভগবান ভক্তকে কেবল মুক্তির পথ দেখিয়েই থেমে থাকেন না, তিনি অন্তর্যামী রূপে তার প্রতিটি পদক্ষেপে পথপ্রদর্শক হন। যখন মানুষ অহংকার, ভোগবাসনা ও স্বার্থপরতা ত্যাগ করে আন্তরিকভাবে ভগবানের শরণ গ্রহণ করে, তখন পরমাত্মা তার হৃদয়ে জ্ঞানের প্রদীপ প্রজ্বলিত করেন। সেই জ্ঞান মানুষকে সত্য ও মায়ার পার্থক্য উপলব্ধি করতে সাহায্য করে।
এই আধ্যাত্মিক জাগরণের ফলে ধীরে ধীরে ভক্তের চেতনার রূপান্তর ঘটে। তার আত্মা ভগবৎস্মরণে উজ্জ্বল হয়, মন কাম, ক্রোধ, লোভ ও দ্বেষের কলুষতা থেকে নির্মল হতে থাকে এবং দেহও ভগবানের সেবার উপযোগী পবিত্র সাধনের মাধ্যম হয়ে ওঠে। ঈশ্বরে আত্মসমর্পণ ও ভক্তি মানুষের সমগ্র অস্তিত্বকে শুদ্ধ করে তাকে মুক্তির পথে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে।
অতএব, আত্মসমর্পণ কোনো দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং এটি আত্মার সর্বোচ্চ জাগরণ। ভক্ত যখন ভগবানের ইচ্ছাকে নিজের জীবনের পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করে, তখন ভগবানই তার শিক্ষক, রক্ষক ও মুক্তির সহায়ক হয়ে ওঠেন। তাঁর কৃপায় জ্ঞান প্রস্ফুটিত হয়, হৃদয় শুদ্ধ হয় এবং জীব ধীরে ধীরে চিরশান্তি ও পরম গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হয়।। হরেকৃষ্ণ।।
।। জয় শ্রীকৃষ্ণ।।
।। জয় সনাতন ধর্ম।।
14/06/2026
জীবনে বেঁচে থাকার অন্যতম কারণ হলো ভালো কিছু অর্জন করা। অর্জন মানেই শুধু ধন-সম্পদ, খ্যাতি বা উচ্চ পদ নয়; বরং নিজের চরিত্রের উন্নতি, জ্ঞান অর্জন, পরিবার ও সমাজের কল্যাণে অবদান রাখা এবং মানবিক গুণাবলির বিকাশও এক মহান অর্জন। লক্ষ্যহীন জীবন দিকহীন নৌকার মতো, আর সৎ উদ্দেশ্য মানুষকে প্রতিকূলতার মধ্যেও এগিয়ে চলার শক্তি দেয়।
নিজেকে গতকালের চেয়ে আরও উন্নত, আরও উপকারী এবং আরও পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত। জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত আছে সেই অর্জনে, যা শুধু নিজের নয়, অন্যের জীবনেও আলো ছড়ায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় অর্জুনকে বলেছেন,
"নিয়তং কুরু কর্ম ত্বং কর্ম জ্যায়ো হ্যকর্মণঃ।
শরীরযাত্রাপি চ তে ন প্রসিদ্ধ্যেদকর্মণ।।৩/৮।।
অনুবাদঃ তুমি শাস্ত্রোক্ত কর্মের অনুষ্ঠান কর, কেন না কর্মত্যাগ থেকে কর্মের অনুষ্ঠান শ্রেয়। কর্ম না করে কেউ দেহযাত্রাও নির্বাহ করতে পারে না।"
অর্থাৎ মানুষের জীবনে কিছু অর্জনের আকাঙ্ক্ষাই তাকে কর্মঠ করে তোলে। কিন্তু গীতার শিক্ষা হলো—সেই অর্জন যেন কেবল ভোগ, অহংকার বা প্রশংসা লাভের জন্য না হয়; বরং কর্তব্যবোধ, আত্মউন্নয়ন এবং ঈশ্বরসেবার মনোভাব নিয়ে সম্পাদিত হয়।
তাই জীবনে ভালো কিছু অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই অর্জনের প্রতি অন্ধ আসক্তি নয়; বরং নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা এবং উচ্চতর আদর্শের প্রতি সমর্পণই মানুষের জীবনকে অর্থবহ করে তোলে।। হরেকৃষ্ণ।।
।। জয় শ্রীকৃষ্ণ।।
।। জয় সনাতন ধর্ম।।
12/06/2026
আপনি যদি হিন্দু হন, তবে নিজের সনাতন ধর্মকে জানার চেষ্টা করুন। বেদ, উপনিষদ, গীতা, ভাগবত ও পুরাণাদি পড়ুন। এই গ্রন্থ গুলো মানবজীবনের উদ্দেশ্য, আত্মার প্রকৃতি এবং পরম সত্যের সন্ধানের পথপ্রদর্শক।
শাস্ত্র অধ্যয়নের মাধ্যমে যেমন জ্ঞান অর্জিত হয়, তেমনি সাধুসঙ্গের মাধ্যমে সেই জ্ঞান জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং হৃদয়ে ভক্তির উদয় ঘটায়।
এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্তরালে যিনি বিরাট, অনাদি, অনন্ত ও সর্বব্যাপী পরমাত্মা হিসেবে বিরাজমান, তাঁকে কেবল ইন্দ্রিয়ের দ্বারা জানা যায় না। তাঁকে জানতে হলে তাঁর প্রদত্ত জ্ঞানে জ্ঞানী হতে হয়, শাস্ত্রের আলোকে জীবনকে পরিচালিত করতে হয় এবং ভক্তিভাবে তাঁর শরণ গ্রহণ করতে হয়। কারণ, শুদ্ধ জ্ঞান ও নিষ্কাম ভক্তির সমন্বয়েই পরম সত্যের উপলব্ধি সম্ভব হয়।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন—
"ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান্ যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ।
ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা বিশতে তদনন্তরম্।। ১৮/৫৫।।
অর্থ: একনিষ্ঠ ভক্তির মাধ্যমেই আমাকে যথার্থরূপে জানা যায়— আমি কে এবং কেমন। আর আমাকে সেইভাবে জেনে ভক্ত আমার নিত্যধামে প্রবেশ করে।"
তাই নিজের ধর্মকে অন্ধ অনুসরণের বিষয় হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান, অনুশীলন ও আত্মোপলব্ধির বিষয় হিসেবে গ্রহণ করুন। শাস্ত্র পাঠ করুন, প্রশ্ন করুন, চিন্তা করুন এবং সাধুসঙ্গের মাধ্যমে জীবনের গভীরতর সত্য উপলব্ধির চেষ্টা করুন। কারণ, পরমাত্মাকে জানা মানেই কেবল ধর্মীয় পরিচয় অর্জন নয়; বরং নিজের প্রকৃত সত্তাকে চিনতে শেখা এবং জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য উপলব্ধি করা।। হরেকৃষ্ণ।।
।। জয় শ্রীকৃষ্ণ।।
।। জয় সনাতন ধর্ম।।
Click here to claim your Sponsored Listing.